গৌতমকুমার দাস
ডাকাতি কাজটা বেশ ঝুঁকির, বিশেষ করে সুন্দরবনের জলাজঙ্গলে৷ যেখানে পথঘাট নেই৷ সেই ডাকাতদের জীবন ও জীবিকার বিভিন্ন কথা-কৌশল-অভিজ্ঞতার কথা লিখতে হলে কলজের জোর থাকা চাই৷ এক কথায় যারা ধড় থেকে মুন্ডু সাফ করে দেয়, তাদের মেজাজ-মর্জির নাগাল পাওয়া দুষ্কর৷ তবে ছিঁচকে চোরও আছে৷ ওরা খুব ভীতু৷ একটু সাড়া শব্দ বা গৃহস্বামীর কাশি হাঁচির শব্দে চুরি ছেড়ে পালায়৷ সুন্দরবনের মোহানার জলে বা ঘন বনের মধ্যে ডাকাতের কথা তেমন একটা শোনা যায়নি৷ গত শতকে একজনই ছিল— বাচ্চু সর্দার৷ গাঁয়ে ঘরে কিছু ডাকাত ছিল বটে, তবে তাদের থেকে ছিঁচকে চোরের সংখ্যাই বেশি৷ সুন্দরবন থেকে ডাকাতের অভিবাসন ঘটেছিল৷ খোদ যাদবপুরে৷ রামলাল ডাকাত৷ যার নামে রামলাল বাজার৷ বাচ্চু সর্দার, রামলাল ডাকাত— এমন দু-চারজন ছাড়া ডাকাতিতে তেমন নামডাক কারও নেই৷ সুন্দরবনের ডাকাত ভয়ঙ্কর বা পরাক্রমী নয় যেমন, তেমনই ছিঁচকে চোর চুরি করে দিশি পানসি নৌকায় লগি-দাঁড় মেরে পালানোয় ওস্তাদ হওয়ায় সংগত কারণেই ওদের সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত বলা যেতে পারে৷
সুন্দরবনে সাধারণ গৃহস্থের বাড়িতে ডাকাতি হয় না৷ বরং ডাকাত পেশায় পরিচিত থাকা সেই লোকেরা প্রতিবেশীর প্রয়োজনে, বিপদে আপদে, অর্থ ও শ্রম দিয়ে সাহায্য করে থাকে৷ ছোটো থেকে ডাকাতির যে-সব কাহিনি শুনে এসেছি, তাতে ডাকাতদের বেশ ভয়ংকর মনে হতো৷ কিন্তু সামনাসামনি ধরা পড়া ডাকাতদের দেখে মনে হয়েছে ওরা আমাদের মতোই সাধারণ৷ চেহারা-পোশাক-আশাক মাথায় বাঁধা গামছা দেখে সেই ছেলেবেলায় মনে হয়েছে ওরা খুব গরিব৷ খেতে পায় না তাই ওরা ডাকাতি করে৷ বড়োলোক হওয়ার বাসনায় নয়৷ অন্যের সম্পদ বিশেষ করে গরিবের টাকা আত্মসাৎ করে সমাজের গণ্যমান্য ও কেউকেটার বাড়িতে ডাকাতির মানচিত্র ছকে ডাকাতেরা৷ সল্টলেক নিউটাউন রাজারহাটে৷ সকালে সন্ধ্যায় দুপুরে৷ একাকিনীর গলা থেকে সীতাহার ছোঁ মেরে নিয়ে বাইকে চেপে নিমেষে মিলিয়ে যায়৷ বন্দুক পিস্তল নিয়ে একালের শহরে ডাকাতি অনেক সহজ সরল এবং কম সময়ে কাজ সারা যায়৷ ডাকাতরা অবশ্য রিভলবার বা পিস্তলকে বলে চেম্বার৷ কেউ কেউ বলে মেশিন৷ সুন্দরবন ঘেঁষা শহরে থেকে কলকাতায় ডাকাতি করতে এসে মেশিন বার করলেই ফ্ল্যাট কালচারের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ির গৃহস্বামীদের কুপোকাত হতে বেশি সময় লাগে না৷ মাঝেমাঝেই এই আধা-আধুনিক ডাকাতরা বাড়াবাড়ি করে ফেলে৷ ফেসবুক হোয়াটসআপ করা মহিলারা অবশ্য গা ঘেঁষার আগেই ডাকাতদের দিকে আলমারির চাবি ছুঁড়ে দিয়ে দূরে সরে পড়ে৷ ডাকাতদের গায়ে যা দুর্গন্ধ, সাবান সেন্টের ব্যবহার এরা জানেই না৷ এরা শহরে ডাকাতি করলেই বা৷ আসে তো সুন্দরবন থেকে৷ বসিরহাট, হাসনাবাদ, মীনাখাঁ, হাড়োয়া, ক্যানিং, বাসন্তী, কৈখালি, জামতলা থেকে৷ এরা পোশাকে-আশাকে স্মার্ট, স্বভাবে কৃত্রিম৷ ডাকাতি করে দু-পয়সা জমলে শেকড়কে ভুলতে বসে৷ অবশ্য সুন্দরবন এলাকার মধ্যে ডাকাতি করে চলা মানুষেরা ভীরু, লাজুক, স্বভাবের৷ রাতের আঁধারে কাজ সারে৷ খুন-খারাপির মধ্যে নেই৷ সাম্প্রদায়িক তো নয়ই৷ সামাজিক গন্ডির বাইরে যায় না৷ এমনকী নিজেরা ডাকাতি করলেও পাড়ার যে কোনো ডাকাতিতে ওরাই রুখে দাঁড়ায়৷ অন্য গৃহস্থের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ডাকাতদের বাড়ির ছেলেরা একই স্কুলে পড়ে৷ একসঙ্গে খেলাধুলা করে৷ ছেলেবেলার ছিঁচকে চোরের এক চুরির ঘটনা মনে পড়ে গেল৷ সুন্দরবনে পাঁচ দশক আগের এক সকালে পাড়া জুড়ে হৈ চৈ, শোরগোল কচিকাচার দল স্লেট-খড়ি খাগের কলম-বড়ি কালির দোয়াত ফেলে দে-দৌড়৷ পুব পাড়ার রাস্তা লোকে লোকারণ্য৷ মিছিল করে লোকে আসছে৷ মধ্যের সাত-আটজনের কোমরে একটা কাছি বেড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধা৷ কাছি নৌকা বেঁধে রাখার শক্তপোক্ত মোটা কাতা দড়ি দিয়ে তৈরী৷ কোমরে দড়ি বাঁধা লোকেদের বেশ লম্বা-চওড়া কালো গোলগাল চেহারা৷ চোখ জবাফুলের মতো লাল৷ তাছাড়া প্রত্যেকের মাথায় চাপানো একটা করে ভর্তি বস্তা৷ বস্তার ভিতরে কোনোটায় চাল, কোনোটায় খেসারি কলাই, কোনোটায় ভর্তি শুকনো লঙ্কা৷ ওগুলো চুরি গেছিল৷ হরি মাইতির বাড়ি থেকে৷ গতরাতে৷ চুরির সময় হরি মাইতির ছেলে প্রবোধকে ইচ্ছা করে বেঁধে ফেলে রেখেছিল চোরের দল৷ এমনকি কথা যাতে বলতে না পারে তার জন্য তার মুখে গামছা কষে বেঁধেছে৷ প্রবোধের স্ত্রী সাহসী, বেশ চালাক চতুর মেয়ে৷ চোরেদের চাল-ডাল আলু-লঙ্কা সবকিছু নিয়ে যেতে দেখে প্রবোধের বউ বাসন্তী গলায় আঁচল দিয়ে বলে, বাবা ঠাকুরেরা, ঘরে তিন তিনটে বাচ্চা, সকালে ওদের খেতে দেব কী? করুণা করে চোরেরা সকালের খাবারের মতো চাল ডাল আলু বাসন্তীর আঁচলে দিয়ে যায়৷ শুকনো লঙ্কা বের করার সময় বাসন্তী লঙ্কার বস্তা ফুটো করে দেয়৷ চোরেরা চুরি করে পালানোর সময় লঙ্কা রাস্তায় পড়তে পড়তে যায়৷ সকাল হতেই লঙ্কা পড়া সেই পথ ধরে পুবপাড়া থেকে অনুসরণ করে দক্ষিণ পাড়ায় এক বাড়িতে অবশেষে চুরির চাল-খেসারি-কলাই-লঙ্কা বস্তার হদিশ মেলে৷ সেই বাড়ির গাট্টা গোট্টা চওড়া ছাতির একজনকে ধরে পুবপাড়ার কয়েকজন মিলে দু-চারটে চড় থাপ্পড় দিতেই সে চুরির কথা স্বীকার করে নেয়৷ পরবর্তী একটা দুটো কিল পিঠে পড়ার উপক্রম হতেই সে বাকি চোরেদের নাম বলে দেয়৷ সবাই ধরা পড়ে৷ ওদের মাথায় ওদের চুরি করা সামগ্রী বইয়ে এনে স্কুলের একটি ঘরে ঢুকিয়ে তালাবন্দি করে দেওয়া হয়৷ সিঁড়ির পাশের ওই ঘরটায় ক্লাস ফোরে পড়ার সময় আমরা বসতাম৷ ঘরটির কোনো জানালার পাল্লা নেই৷ দুরুদুরু বুকে দূর থেকে কোনোরকমে সাহস এনে জানালা দিয়ে চোর দেখছি৷ সেই প্রথম চোর দেখা৷ চোর দেখতে গাঁয়ের সবাই জড়ো হয়েছে৷ নদী পেরিয়ে বে-গাঁয়ের মানুষও এসেছে৷ এত দর্শক দেখে চোরেরা বেশ বিরক্ত৷ এক চোর বলে বসে—ধরে যখন নিয়েই এসেছ, যা করার জলদি করলে হয় না, এমনিতেই সারারাত জাগা৷
এবার বড়োরা মিলেজুলে ঠিক করে— যা কিছু করার এখানেই হবে৷ থানা-পুলিশ হবে না৷ চোরেরা গাঁয়েরই মানুষ৷ চুরি না হয় করেই ফেলেছে৷ স্বভাবে নয়, অভাবে৷ দুপুরে ওদের জন্য খাবার-দাবারের ব্যবস্থা হয়৷ চুরির সামগ্রী থেকে রান্না করা ভাত, আলু-মাখা, খেসারি ডাল খেয়ে দুপুর থেকে বিকেল স্কুলের ঘরের মেঝেয় পড়ে চোরেদের নাক ডাকিয়ে ঘন্টা দুই ঘুম৷ বিকেলে আটকে রাখা চোরেদের ঘরের তালা খোলা হয়৷ তারপর শুরু হয় মার৷ যারা দুপুরে রান্না করে খাইয়েছিল, তারাই গরান বাতা দিয়ে রাম ধোলাই দিচ্ছে৷ সে মার দেখা যায় না৷ চোরেদের আর্তনাদে ভিড় ফাঁকা হতে থাকে৷ সন্ধেয় ওখানে আর কাউকে দেখা যায় না৷ চোরেদেরও না৷ ওরা বাড়ি ফিরে যায়৷
মাতলা পাড়ের বৃত্তান্ত৷ রাত তখন দু-প্রহর৷ চারদিক নিঝুম৷ বাঁশ বাগানে শেয়ালের ডাক থেমেছে৷ রাখাল দাস গুটি গুটি পায়ে বাড়ির পথে এগোচ্ছে৷ বড়ো মেয়ের বাড়ি গেছিল৷ শেষ বিকেলে হাঁটা পথে তিন ক্রোশ রাস্তা পেরোতে রাত দুপুর৷ রাখাল দাসের চেহারা দোহারা গোছের৷ কিন্তু বেশ ডাকাবুকো৷ তার বয়স ঠিক ঠাহর হয় না৷ ভূত পেতনি আট ব্রহ্মদত্যির ভয়ডর সে করে না৷ হাতে টর্চ লাইট আছে৷ আঁধার রাতে সাপ-খোপের হাত থেকে অন্তত রেহাই৷ দোলুইদের পুকুর বাঁদিকে রেখে ডাইনে ঘুরলে জীবন দাসের মাটির দোতলা বাড়ি৷ লম্বাটে গড়ন৷ মাটির ছাদ, মাটির দেওয়াল৷ দেওয়াল প্রায় বিশ ইঞ্চি চওড়া৷ জমিতে মাটির জাব তৈরি করে পিটিয়ে পিটিয়ে মাটির কণাগুলির মধ্যে ফাঁক ফোঁকর ঘুঁচিয়ে কোদাল দিয়ে বরফির মতো করে কাটা এক একটা খণ্ডপর পর সাজিয়ে মাটির দেওয়াল তৈরী করা হয়৷ তারপর ভেতরে বাইরে দেয়াল মাটি ও গোবর লেপে মসৃণ করে তোলা হয়৷ বরফির মতো মাটির চাকা চাকা খণ্ডগুলিকে আর দেখতে পাওয়া যায় না৷ আঁধার রাতে ওই দেওয়ালে সিঁধ কাঠি দিয়ে বরফি আকারের মাটির খণ্ডগুলিকে আলগা করে খানিকটা ব্ল্যাক হোলের মতো গহ্বর তৈরীর কৌশল এতটাই নিপুণ হাতে চোরেরা করে থাকে যে তা প্রায় শিল্পের পর্যায়ে চলে যায়৷ জীবন দাসের বাড়ির দেওয়ালে তেমনটাই হচ্ছিল৷ টর্চলাইটের আলোয় রাখাল দাস সিঁধকাঠি হাতে দু-জনকে দেখে চেঁচিয়ে ওঠে— কে? কে ওখানে?
উত্তর আসে— তোর বাপ৷
—কি বললি? তোর বাপ? তবে রে... বলে খালি হাতেই রাখাল দাস ওদের দিকে তেড়ে যায়৷ ঠিক তখনই ওদের একজন রাখাল দাসের দিকে একটা সিঁধকাঠি ছুড়ে দেয়৷ বল্লমের মতো এসে সিঁধকাঠি রাখাল দাসের দাপনায় গেঁথে যায়৷ বাবা গো বলে রাখাল দাস মাটিতে পড়ে যায়৷ রাখাল দাসের গোঙানির মাঝে সিঁধকাঠি উরু থেকে টেনে নিয়ে নিঝুম রাতের জীবেরা চম্পট দেয়৷ জ্ঞান হারানো রাখাল দাস সারারাত ওই অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকে৷ সকালে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে ক্ষত সেলাই করে সাত দিন চিকিৎসা করিয়ে তবে বাড়ি ফিরে আসে৷ জীবন দাসের বাড়ি সে যাত্রায় চুরি থেকে রেহাই পায়৷
সিঁধকাঠি লোহার তৈরী৷ কামারশালে মোটা লোহার রডের একটা দিক সুঁচালো করে নিলে সিঁধকাঠি তৈরি করা হয়ে যায়৷ কামারশালে নির্জনে সিঁধকাঠি তৈরি হয় যেমন, তেমনই চোরেরা সিঁধকাঠি কামারের থেকে নিতে আসে নিঝুম রাতে৷ তাদের নাম কামারের খাতায় লেখা হয় না৷ কামাররা তাদের চেনেও না৷ সিঁধেল চোরেরা অবশ্য সিঁধকাঠি তৈরির মজুরি দিয়ে যায়৷ সিঁধকাঠি দেওয়া-নেওয়ায় সিঁধেল শাস্ত্রে কথোপকথন রীতিবিরুদ্ধ৷ সিঁধকাটায় সিঁধকাঠি খুবই উপযোগী৷
প্রথমে দেওয়ালে মাটির প্রলেপ তুলে বরফির মতো মাটির চাঁইগুলোয় সিঁধকাঠি দিয়ে টান মারলেই একটার পর একটা খণ্ড উঠে আসে৷ মাটির চাঁইগুলি সরিয়ে ফেললে একটা গোল গহ্বর তৈরী হয়ে যায়৷ গর্তের পরিধি একটা মানুষ ঢোকার মতোই হলে চলে৷ যদিও পরে চাল লঙ্কা কলাই কাঁসার বাসনপত্রের বস্তা বার করার জন্য গর্ত বড়ো করতে হয়৷ সিঁধকাঠি দিয়ে দেওয়ালে গর্ত তৈরি হয়ে গেলে প্রথমে সর্দার ঢোকে৷ মাথা নয়, প্রথমে পা ঢোকানোই নিয়ম৷ সিঁধ কাটার সময় গৃহস্থের বাড়ির কেউ টের পেয়ে গেলে বিপদ৷ ধারালো অস্ত্র নিয়ে তারা সিঁধের অপর দিকে অপেক্ষা করে থাকে৷ মাথা ঢেকালে মুণ্ডুচ্ছেদ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা৷ তবে সিঁধ দিয়ে একবার ঘরের মধ্যে ঢুকে যেতে পারলেই এরা তখন আর সিঁধেল চোর নয়, দুর্ধর্ষ ডাকাত হয়ে ওঠে৷ গৃহস্থ বাড়ির সদস্যরা ডাকাত দেখলেই এমনিতেই ভয়ে সিঁধিয়ে যায়৷ বাধা না দিলে গৃহস্থদের মারধোর বা বাঁধাবাঁধি করার রেওয়াজ ডাকাতির ব্যবহারিক শাস্ত্রে অন্তত নেই৷
ডাকাতদের কেউ কেউ সুন্দরবন থেকে এসে শহর বা শহরতলিতে প্রতিষ্ঠিত৷ যেমন রামলাল ডাকাত৷ এর প্রকৃতি একটু অন্যকরম৷ ডাকাতরা অসামাজিক হয়৷ ইনি আধাসামাজিক৷ দিনের বেলায় দান-ধ্যান৷ রাতে ডাকাতি৷ দরিদ্রকে সাহায্য বা মেয়ের বিয়েতে বরপণ দেওয়ায় কখনো কার্পণ্য করেনি রামলাল৷ তার দান-ধ্যানের কথা এখনও এলাকায় মুখে মুখে ফেরে৷ রামলাল ডাকাতের কথা শুরু হলেই এলাকার প্রবীণদের মুখে একটা কাহিনি শোনা যায়৷ এক গরিব বামুনের মেয়ের বিয়ের জন্য বরপণ দেবার কাহিনি৷ সকালে রামলাল মণ্ডল সবে ঘুম থেকে উঠে মুখ হাত ধুয়ে বসেছে৷ এমন সময় এক বামুন এসে রামলাল ডাকাতের পায়ে পড়ে আর বলে, বাবু আমায় বাঁচান৷ রামলাল ডাকাত দু-পা পিছনে সরে গিয়ে বলেন, আরে মশাই করছেন কি! আপনার গলায় পৈতে, বামুন হয়ে এই চাঁড়ালের পায়ে হাত দিচ্ছেন৷ এবার সাক্ষাৎ নরকে ঠাঁই হবে আমার৷ উঠুন উঠুন, বলুন কী সাহায্য করতে পারি বলুন৷ বামুন বলে, আমার মেয়ের বিয়ে, বরপণ চেয়েছে পাঁচশো, জোগাড় করতে পারিনি৷ পণ দিতে না পারলে মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাবে বাবু৷ পাত্রের বাপ বলে দিয়েছে পণের টাকা না পেলে বরের পিঁড়ি থেকে ছেলে তুলে নিয়ে যাবে৷
—কটি মেয়ে আপনার?
—আজ্ঞে বাবু, পাঁচটি৷
—পাঁচটি, মেয়ে জন্ম দেওয়ার সময় বরপণের কথা মনে ছিল না? এখন সাহায্য চাইতে এসেছেন, লজ্জা করে না?
—কি করবো বাবু, পুত্রসন্তান কামনার্থে—
—তা কি শেষে পিণ্ডিদানের জন্য ছেলের বাপ হতে পারলেন?
—না, পূর্বজন্মের পাপ৷
—আচ্ছা, আপাতত আটশো টাকা রাখুন৷ এই টাকায় ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিন৷ বরপণের টাকা আমি নিজে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো৷ কই, মেয়ের বিয়েতে আমায় নেমন্তন্ন করবেন না?
—অবশ্যই, অবশ্যই৷ কিন্তু বাবু, বিয়ের কার্ড ছাপাতে পারিনি৷ আপনার হাতে কার্ড দিয়ে নেমন্তন্ন করতে পারলুম না৷
—কার্ডের কি দরকার! আমার বাড়ি বয়ে এসে নেমন্তন্ন করছেন, তাই যথেষ্ট৷ বিয়ের দিন ঠিক সময়ে আপনার বাড়ি পৌঁছে যাব৷ মাথায় কোনো চিন্তা রাখবেন না৷
বিয়ের আয়োজন সম্পূর্ণ৷ লগ্ন দোরগোড়ায়৷ এদিকে বরপণ হাতে না পাওয়ায় বরের বাপ হম্বিতম্বি শুরু করেছে৷ বরের পিড়ি থেকে বর এই তুলে তো ওই তোলে অবস্থা৷ মেয়ের বাপ গলায় গামছা দিয়ে বরের বাপের কাছে কাতর অনুরোধ করে সবে ঘরের ভেতর গিয়ে মেয়েদের কান্নাকাটি সামাল দিচ্ছেন, এমন সময়ে হাঁটুর উপরে ধুতি পরণে হাফশার্ট এক বেঁটেখাটো লোক এসে বরের বাপের কাছে হাতজোড় করে বলে, বাবু, বরপণ থেকে গরিব বাপের মেয়েটাকে রক্ষে করুন৷ বরের বাপ বলে— ওসব চালাকি চলবে না৷ আমি এবার বরের পিঁড়ি থেকে ছেলে তুলে নিয়ে যাব৷ বরের বাপ কোনো কথা না শোনায় বেঁটে লোকটা উপায়ান্তর না পেয়ে পণের টাকা দেবে বলে বরের বাপকে আড়ালে ডেকে নিয়ে যায়৷ আড়ালে আলো-আঁধারে ছাপার অযোগ্য দু-চারটে শব্দ প্রয়োগ করে বরের বাপকে বলে, আমাকে চিনিস, আমি রামলাল ডাকাত৷ পাঁচটি কড়কড়ে একশো টাকার নোট বার করে বলে, তোর বরপণ চাই তো, এই নে৷ তাড়াতাড়ি ধর নইলে এখানে কেটে খাল পাড়ে পুঁতে দেব৷ বরের বাপ প্রাণ হাতে নিয়ে ঠকঠক করে কাঁপে৷ কোনোরকমে বলে, বরপণ চাই না৷ এমনি বিয়ে হবে৷ আমায় রেহাই দিন৷
—বরপণের টাকা তোকে নিতেই হবে৷ এই নে৷ তবে আড়াল থেকে আমি মেয়েটাকে মাঝে মধ্যে দেখে আসবো৷ যদি মেয়েটার উপর কোনরকম অত্যাচার হয়, তা হলে সকলের সামনেই তোকে কেটে কুচিকুচি করে বাড়ির উঠোনে ফেলে আসবো৷ কথাটা মনে রাখিস৷
রামলাল ডাকাত ছিল এমনই৷ রামলাল অর্থে সাক্ষাৎ ত্রাস৷ আবার চরিত্রে রবিন হুড৷
ডাকাতির প্রকৃতি বা সংখ্যায় ডাকাতের তুলনায় সুন্দরবনে ছিঁচকে চোরই বেশি৷ রাতের আঁধারে ওরা এটা ওটা হাতিয়ে নিয়ে যায়৷ ওরা ভীরু-প্রকৃতির৷ এমন ছিঁচকে চোরের পাল্লায় পড়ে আমার কয়েক রাতের ঘুম দফারফা হয়েছিল৷ তখন কলেজে পড়ি৷ গরমের ছুটিতে সুন্দরবনে দেশের বাড়ি গেছি৷ কলকাতায় মেসবাড়িতে অধিবাসের কারণে পারিবারিক স্থায়ী সদস্যপদ সাময়িকভাবে হারিয়ে আমার শোবার বিছানা ঘেরা বারান্দায়৷ আসনাই কাঠের বাটাম দিয়ে ঘেরা বারান্দায় ফাঁক দিয়ে চাঁদের জোছনাও ঢোকে, দক্ষিণা বাতাসও খেলে৷ আমাদের বাড়ির দক্ষিণে প্রায় আধ মাইল কোনো বাড়ি ঘরদোর না থাকায় চিনাই নদীর বুক থেকে উঠে আসা বাতাসে মাঝেমাঝে বিছানা থেকে মশারি পর্যন্ত উড়ে যায়৷ এমন সুশীতল হাওয়ায় প্রাণ জুড়োয়৷ শরীর জুড়োয়৷ বিছানায় শুয়ে পড়লেই গাঢ় ঘুম আচ্ছন্ন করে দেয়৷ হঠাৎই খটখট আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়৷ ঘরের বাইরে দরজার শেকল নিয়ে টানাটানির কসরত চলছে বোঝা যায়৷ নিঝুম রাতের এই শব্দে অদ্ভুত একটা ভয় গ্রাস করে আমাকে৷ বাবাকে ডাকাডাকির শত চেষ্টায় মুখ দিয়ে ‘রা’ শব্দও বেরোয় না৷ বিছানা ছেড়ে কোনোরকমে উঠে পড়ে বাবার শোয়ার ঘরের দরজায় সজোরে ধাক্কা দিতেই দরজার পাল্লা দুটো খুলে দেওয়ালের দু-দিকে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে৷ বিকট শব্দে বাবার ঘুম ভেঙে যায়৷ জিজ্ঞাসা করে, কে? কিছুটা সাহস ফিরে পেয়ে আমি বলি, বাইরের দরজায় কেউ কড়া নাড়িয়ে খোলার চেষ্টা করছে৷ বাবা তখন পাড়ার দু-চারজনের নাম ধরে তারস্বরে ডাক দেয়৷ বাবার কয়েক বার ডাকাডাকির পর তাদের সাড়া পাওয়া যায়৷ মাঝরাতে এমন ডাকের উদ্দেশ্য গাঁয়ের কারুরই অজানা নয়৷ অনেকগুলি টর্চের আলো একযোগে আমাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসে৷ ওরা কাছাকাছি আসতেই আমি বারান্দায় দরজার খিল খুলি৷ পাড়ার ভাগ্যধর দাস বাবার হাত থেকে পাঁচ ব্যাটারি টর্চলাইট হাতে নিয়ে মাঠের মাঝে ফেলতেই তিনজন লোককে মাঝমাঠের নিকষ কালো আঁধারে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়৷ সেবার দেশের বাড়িতে যে-কয়দিন ছিলাম, হ্যারিকেনের বাতি কমিয়ে আবছা আলোয় বারান্দায় ঘুমোতাম৷ বাছাধনেরা সে দফায় আর সাহস দেখায়নি৷
মৃদঙ্গভাঙা পারের গদামথুরা খণ্ডের কালামের ডাকাতির স্টাইল সম্পূর্ণ আলাদা৷ ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে কখনো ডাকাতি করতে যায়নি৷ ইচ্ছে না থাকলে ডাকাতের কোনো সর্দারের ক্ষমতা নেই তাকে বাড়ি থেকে বার করে৷ ওর বন্ধু সাধনের খুব ইচ্ছে হয়েছিল ওর সাগরেদ বাকি ডাকাতদের সে চোখে দেখে৷ রামগঙ্গাগামী বাসে কালাম তার দলের বাকি ডাকাতদের চিনিয়েছিল৷ সাধনকে কালাম আগে থেকেই বলে রেখেছিল— বাসের মধ্যে কালাম বিভিন্ন জনের নাম ধরে ডাকবে, আর ওরা সাড়া দিলে বুঝে নিতে হবে কালাম কাদের সঙ্গে ডাকাতি করতে যায়৷ কালাম সেদিন অবশ্য ডাকাতি করতে যায়নি৷
যাত্রী ঠাসা ভিড় বাসে একে একে ফজলু, বসির, ইলিয়াস, আতিয়ার প্রভৃতির নামে ডেকে ডেকে বাড়ির খবরাখবরের সুলুক সন্ধান করে চলে কালাম৷ কখনো-বা একজনকে ডেকে অন্যরা বাসের কোথায় বসে আছে, তার হাল হদিশ করে৷ সাধন মোটামুটি চিনে যায় কালামের সঙ্গী-সাথীদের৷ সাধনদের কালামরা খুব মেনে চলে৷ ছোটোবেলা থেকে অভাবের সংসারে কালামরা সাধনদের বাড়ি থেকে চাল ডাল তরিতরকারি-সহ সবরকম সাহায্য পেয়ে এসেছে৷ কালাম জানে ডাকাতি অসামাজিক৷ কালাম-সাধনের বন্ধুত্ব সামাজিক৷ সাধনকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কালামরা কি বেছে বেছে অন্য সম্প্রদায়ের বাড়িতে ডাকাতি করতে যায়? সাধন বলে, কোনোমতেই নয়৷ যাদের আছে, চোরাপথে, ঘুরপথে, পকেট ভরিয়েছে, তাদের বাড়িতে এরা ডাকাতি করে৷ ডাকাতরা আর যাই হোক, সাম্প্রদায়িক নয়৷
নব্বইয়ের দশকে সুন্দরবনের জলে-জঙ্গলে ডাকাতি করত বাচ্চু সর্দার৷ লোকে জলের ডাকাতকে জলদস্যু ও জঙ্গলের ডাকাতকে বনদস্যু নামে চেনে৷ কিন্তু বাচ্চু সর্দারকে জলদস্যু বা বনদস্যু নামে ডাকতে শোনা যায়নি৷ আশি ও নব্বইয়ের দশকে সুন্দরবনের জল-জঙ্গলের ত্রাস বাচ্চু সর্দারের ডাকাতির পদ্ধতি অভিনব৷ মাছ ধরার ভটভটি বা ট্রলারকে একা চলতে দেখলে নিজের ভটভটি করে সেই ট্রলারের কাছে বাচ্চু সর্দার তার দলবল নিয়ে মুহূর্তেই পৌঁছে যায়৷ তারপর সেই ট্রলার থেকে খাবার দাবার, মাছ ধরার জাল, ডিজেল, খাবার জল, এমনকি ট্রলারের ইঞ্জিনটি খুলে নিয়ে নিজের ট্রলারে তুলে নেয়৷ ত্বরিতগতিতে এমন সব কান্ডকারখানার মাঝে মাঝি-মাল্লাদের হাত-পা বেঁধে নৌকার পাটাতনে ফেলে রাখে বাচ্চু সর্দারের দলবল৷ ডাকাতিপর্ব সমাপনে ইঞ্জিনহীন ট্রলারের নোঙর তুলে ভাসিয়ে দেয়৷ স্রোতের টানে ট্রলার মোহানার দিকে ভেসে যায়৷ ডাকাতি করলেও বাচ্চু সর্দার কখনো মাঝি-মাল্লাদের খুন করেনি৷ নব্বইয়ের শেষের দিকে বাচ্চু সর্দার ডাকাতি বর্জন করে এক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সারাক্ষণের কর্মী হিসাবে নাম লেখায়৷ প্রথম জীবনের ডাকাতকর্মী শেষ জীবনে সমাজ জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসে মেশে৷ নদীর উজান স্রোত যেমন মোহানায় এসে আত্মসমর্পণ করে নোনা গাঙের সুন্দরবনে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন