গুণিন

গৌতমকুমার দাস

জঙ্গলে গুণিন ছাড়া বনজীবীরা এক পা-ও বাড়ায় না৷ সুন্দরবনে বাউলে মউলেরা খুব কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়৷ হান্টার সাহেব (১৮৭৫) তাই দেখে Statistical Account of Bengal, Sundarbans (page No-31) এ লিখেছেন—‘All woodcutters are very superstitious, and belive in the existence of numbers of forest spirits. None of them will go into the forest to cut wood unless accompanied by a fakir, who is supposed to receive power from the presiding deity– whom he propitiates with offerings-over the tigers and other wild animals.’ হান্টার সাহেব যাদের ফকির বলেছেন, তারা-ই বাউলে মউলেদের কাছে গুণিন বা ওঝা৷ মন্ত্র পড়ে, ঝাঁড় ফুক করে জঙ্গলে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে কোথায় নিরাপদে কাঠ কাটা যাবে বা মধু পাওয়া যাবে তার সন্ধান এরা দেয়৷ গুণিন জঙ্গলে ঢোকার আগে তার দলের বাউলে বা মউলেদের এক জায়গায় জড়ো করে৷ গাছের ডাল দিয়ে একটা ছোট আকারের কুটীর বানিয়ে নেয়৷ তার ভেতরে সঙ্গে করে নিয়ে আসা জঙ্গলের দেবদেবী যেমন বনবিবি, দক্ষিণ রায়, গাজীবাবা, শাহ জঙ্গুলীদের মূর্তি বসায়৷ বাতাসা নকুলদানা কখনো বা শুধু চিনি দিয়ে নৈবেদ্য দেওয়া হয়৷ গুণিন বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে যায়৷ মন্ত্র পড়া শেষে সব বাউলে বা মউলেদের গড় (মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম) করতে বলে৷ তারপর গুণিন ঘোষণা করে দেয় জঙ্গল সম্পূর্ণ বাঘ-মুক্ত৷ তখন গুণিন একটি গাছের ডাল হাতে করে দু’পাশের ঝোপে পেটাতে পেটাতে জঙ্গলের ভেতরে যায়, আর বাউলে বা মউলেরা তাকে অনুসরণ করে৷ এরপর যদি কোন কাঠুরে বা মউলেকে বাঘে নিয়ে যায়, তাহলে গুণিন কাঠ কাটা বা মধু সংগ্রহ সেবারের মতো মুলতবী ঘোষণা করে দেয়৷ বাঘে খাওয়া বনজীবীর লাশ উদ্ধার হলে তার দেহের পোষাক জঙ্গল ঘেঁষা বা খাঁড়ির পাড়ে বড় কোন গাছে বেঁধে দেওয়া হয়৷ বেঁধে দেওয়া পোষাকের টুকরো ঐ জঙ্গলে মানুষ খেকো বাঘের উপস্থিতি চিহ্নিত করে যা দেখে অন্য মউলেরা ওই জঙ্গলে প্রবেশ এড়িয়ে চলে৷

গুণিনরা শুধু চালাক চতুর নয়, বাউলে মউলে জেলেদের উপর সুযোগমত প্রভাব খাটায়৷ বাউলেরা যা কাঠ কাটে বা মউলেরা যা মধু সংগ্রহ করে তার থেকে নির্দিষ্ট শতকরা বা আনুপাতিক ভাগ গুণিনরা তাদের পারিশ্রমিক হিসাবে নেয়৷ ব্রিটিশ সরকারের সেকালের শাসকরা এই গুনীনদের বাধাদানে প্রথম প্রথম সুন্দরবনের বনজসম্পদ আহরণে বাউলে মউলেদের থেকে কোন রাজস্ব আদায় করতে পারে নি৷ এদের বিষয়ে W.W. Hunter এর বক্তব্য পড়লেই গুণিনদের সম্পর্কে ব্রিটিশদের ধারণা পরিষ্কার হয়—‘I consider the only difficulty likely to arise in realizing a revenue from the forest, will be opposition on the part of these man, who are very sharp and intelligent, and have great influence over all the wood cutters, of whatever caste, engaged in collecting forest produce’.

জেলেরাও গুণিন নিয়ে জঙ্গলের ভেতরে নদী খাঁড়িতে মাছ ধরতে যায়৷ বুড়ি গোয়ালিনী রেঞ্জ (বাংলাদেশ) থেকে পারমিট নিয়ে চুনার পেরিয়ে খোল পেটুয়া নদীর জঙ্গল লাগোয়া মাত্র দুজন জেলের একটা জেলে ডিঙিতে দুবছর আগে এক গুণিনকে দেখেছি৷ সে গুণিন তখন ডিঙিতে বসে কান মাগুরের কাঁটার আঘাতে ফুলে যাওয়া এক জেলের হাতে নদী থেকে নোনা জল তুলে তুলে ছুঁড়ে মেরে মন্ত্র গুপ্তি পাঠ করছিল৷ আর গেঁওয়া গাছের ভাঙা ডাল থেকে বেরোনো আঠা দিচ্ছিল কানমাগুরের কাঁটা-মারার ক্ষতস্থানে৷ গুণিনরা বাঘ তাড়ায়, আবার চিকিৎসাও করে৷ প্রকৃতিতে এরা চালাক চতুর হবার কারণে কয়েকটি বাস্তববোধকে গুণিনগিরির কাজে লাগায়৷ যেমন, বাঘ কখনো সামনাসামনি আক্রমণ করে না আর ঝোপেঝাড়ে ওঁৎ পেতে থাকে৷ জঙ্গলে ঢোকার পর থেকে একটা গাছের ডাল নিয়ে দু’পাশের ঝোপে পেটাতে পেটাতে এরা এগোয়৷ বাঘ কাছে পিঠে থাকলে তফাতে যায় এবং আক্রমণের পরবর্তী ধাপ খুঁজতে খুঁজতে অনুসরণ করে নিঃশব্দে৷ ততক্ষণে কাঠুরের দল এগিয়ে যায়৷ তবে কাঠুরে বা মউলের দলে গুণিনরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়৷ তাই পারিশ্রমিক যেমন বেশী, তেমনি প্রাণের ঝুঁকিও থাকে সবসময়৷ গুণিনদের বাঘে খেলে তাদের পরিবার সরকারি সাহায্য পায় না কারণ গুণিনরা মউলে বা জেলেদের মতো বনজীবী নয়৷ ঝুঁকির এই পেশায় মৃত্যুর পরও কি বিড়ম্বনা!

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%