গৌতমকুমার দাস
ক্রান্তীয় পটভূমিকায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদের মোহানায় জেগে ওঠা পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দর ঘন সবুজ লবণাম্বু উদ্ভিদের (Mangroves) অরণ্য সমৃদ্ধ ব-দ্বীপ হল সুন্দরবন৷ জালিকাকারে বিন্যস্ত বড় ছোট নদী নালার মাঝে মাঝে সুন্দরবনের দ্বীপগুলিতে সারিবদ্ধ ঘন লবণাম্বু উদ্ভিদ প্রত্যহ দু’বার করে জোয়ারের জলে প্লাবিত হয়৷ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের মাঝে অজস্র জলরাশির মধ্যিখানে পলি দিয়ে তৈরী সুন্দরবন বিখ্যাত তার জীব-বৈচিত্র্যের জন্য আর সেই জন্যেই ভারত সরকার এর পরিবেশ মন্ত্রক সম্প্রতি সুন্দরবনকে ‘‘জীব পরিমন্ডল’’ (Sundarban Biosphere Reserve) হিসাবে ঘোষণা করেছেন৷
পূর্ব ভারতে অবস্থিত বৈচিত্র্যময় সুন্দরবন অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব-দ্বীপ এর সমষ্টি৷ পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে এই দ্বীপগুলির সংখ্যা ১০২টি৷ এর মধ্যে ৫৪টি দ্বীপে জঙ্গল কেটে মানুষ বসতি স্থাপন করেন৷ ছোট, মাঝারি, বড় মিলিয়ে নদীর সংখ্যা ৩১৷ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের মোহানায় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ব-দ্বীপ সুন্দরবনের মোট আয়তন ২৫,৫০০ বর্গ কিমি৷ এর মধ্যে ভারতীয় সুন্দরবন ৯,৬৩০ বর্গ কিমি জুড়ে অবস্থিত৷ আবার সুন্দরবনের ব্যাঘ্র প্রকল্প (Sundarban Project Tiger) এর আয়তন ২৫৮৫ বর্গ কিমি৷ সুন্দরবনে গড় বৃষ্টিপাত ১৯০৮ মিমি; গড় তাপমাত্রা ২৫০-৩০০ সেলসিয়াস; নদীনালায় জলের লবনাক্ততা ৮.৬-২৮.৪ পি.পি.টি; জলের তাপমাত্রা ২৫.৩-৩১.৭ সেন্টিগ্রেড৷ নদীগুলিতে জোয়ার ও ভাটার সময় স্রোতের গতিবেগ (গড়) যথাক্রমে সেকেন্ডে ৬৯ এবং ৯১ সেমি৷ সুন্দরবনে বাতাসের গড় গতিবেগ ঘন্টায় ৬.৬৫—১১.৫ কিমি এবং গড় বৃষ্টির দিন ১৪.৮১—৬৫.৭৯%৷
পলিসমৃদ্ধ সুন্দরবনের ব-দ্বীপ গুচ্ছ দেখতে নীচু-চাতাল এর মতো, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সামান্য উঁচু কোথাও ৩ মিটার কোথাওবা ৮ মিটার৷ গঙ্গা ও তার শাখা নদীগুলির থেকে আসা মিষ্টি জলের উৎস ছাড়াও বর্ষার সময় খাঁড়ি নালা হয়ে সুন্দরবনের নদীতে এসে মেশে মিষ্টি জল৷ আর এই বর্ষার জল নদীগুলির মোহানায় এসে জলের লবণাক্ততা কমিয়ে দেয় বলেই ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভস্ এর অস্তিত্ব সুন্দরবনে৷ মিষ্ট জলের সরবরাহ কমলে ধীরে ম্যানগ্রোভস্ (লবণাম্বু উদ্ভিদ) এর অস্তিত্ব বিপন্ন হবে৷
পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন কর্কটক্রান্তির দক্ষিণে ৮৮০-৮৮০ ২৯' পূর্ব দ্রাঘিমা এবং ২১০-২২০৩০' উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত৷ সুন্দরবন ১৪০ কিমি লম্বা পূর্ব-পশ্চিমে এবং দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৫০-৭০ কিমি উত্তর দিকে অবস্থিত যেখানে সুন্দরবনের আয়তনকে সীমায়িত করেছে ডাম্পিয়ার ও হেজেস রেখা৷ ডাম্পিয়ার এবং হেজেস ছিলেন বিখ্যাত দুই ব্রিটিশ জরিপবিদ৷ ৩১টি ছোট বড় নদী নিয়ে গঠিত নদীমাতৃক সুন্দরবন৷ বড় নদীগুলির মধ্যে রায়মঙ্গল, ইচ্ছামতী, মাতলা, হেড়োভাঙ্গা, বিদ্যা, গোসাবা, ঠাকুরান, জগদল, সপ্তমুখী ও মুড়িগঙ্গা উল্লেখযোগ্য৷ সুন্দরবনের আনুমানিক বয়স ৭-৮ হাজার বছর৷ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের ব-দ্বীপ সৃষ্টির সাথে সাথে জোয়ারের জলে বয়ে আনা পলি সঞ্চয়নের মধ্য দিয়ে এই সময়ের ব্যবধানে গড়ে উঠেছে আজকের সুন্দরবনের বাস্তুভূমি৷
পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলের উপকূলের ক্রমবিকাশ পাত সংঘট্ট (Plate tectonics) তত্ত্বের নিয়মানুসারে ভূ-ত্বকের পাত চলনের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত৷ ভারতীয় পাত (ভারত, ভারত মহাসাগর এবং অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গঠিত) উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরোপীয় পাতের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে৷ ভারতীয় পাতের স্থলভাগের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গ উপকূল তাই ক্রমাগত পিছু হটতে থাকা এক প্রান্তীয় উপকূল৷ সুন্দরবন অঞ্চলের সৃষ্টির ইতিহাস একদিকে যেমন গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের ব-দ্বীপ নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তেমনই আবার সমুদ্র উপকূলবর্তী প্রক্রিয়ার দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত৷ এই উপকূলবর্তী প্রক্রিয়ায় জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র উপকূলীয় স্রোত উভয়েই সমান গুরুত্বপূর্ণ৷ এই পলি সঞ্চয়নের পালা চলছে সমগ্র বাংলা অববাহিকা (Bengal Basin) জুড়ে যার পরিমন্ডল বেষ্টিত হয়ে আছে টার্সিয়ারি যুগের শিলা ও অপেক্ষাকৃত নবীন প্লাইস্টোসিন (Pleistocene) যুগের টেরাস বা ধাপ দিয়ে৷ বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রবল স্রোত সুন্দরবনের খাঁড়ি অধ্যুষিত উপকূলবর্তী এলাকায় অধিকতর জোয়ারের জলস্ফীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ তাই সুন্দরবনের নদীগুলিতে জোয়ার ভাটায় জলের ওঠানামা গড়ে ৩.৫-৫.৫ মিটার৷ ভরা কোটালে যা হয়ে দাঁড়ায় ৭-৮ মিটার ও ষাঁড়াষাঁড়ির কোটালে ১০ মিটার পর্যন্ত৷
সুন্দরবনে প্রধানত তিনটি পদ্ধতিতে দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে— (ক) নদীগর্ভে মৃত্তিকার কণাগুলি থিতিয়ে পড়ে নদীর বা খাঁড়ির মধ্যিখানে বালির চড়া তৈরী করে৷ এগুলি অবক্ষেপিত দ্বীপ৷ প্রাথমিকভাবে সমুদ্র থেকে আসা জোয়ারের স্রোতের প্রভাবে এই দ্বীপগুলির সৃষ্টি হওয়ায় এরা সাধারণত নদী কিংবা খাঁড়ির ঢালের বিপরীতে বিস্তৃত হতে থাকে৷ আবার নদী-মোহানায় অবস্থিত দ্বীপগুলি ভাটির স্রোতের প্রভাবে তৈরী হওয়ায় সমুদ্রের দিকে বিস্তৃত হতে থাকে৷ (খ) নদী বা খাঁড়ির প্রান্তিক চর (Point Bar) জোয়ার কিংবা ভাটার স্রোতে মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলে নদীর বুকে দ্বীপের আকার নেয়, যার সৃষ্টির ইতিহাস সমকালীন পলি অবক্ষেপনের সঙ্গে আদৌ জড়িত নয়৷ (গ) মূল ভূ-খন্ড নদীর প্রবাহের দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে নদীগর্ভে অবস্থিত হলে তৃতীয় প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট দ্বীপগুলির জন্ম হয়৷
সুন্দরবনের প্রধান নদীনালা এবং এই অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক বিবর্তনের মূল হল নদীবাহিত পলি ও উপকূলবর্তী প্রক্রিয়া৷ সুন্দরবনের নদীগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে পলি বহন করে নিয়ে আসার জন্য প্রতিনিয়ত দ্বীপ সৃষ্টি হয়ে চলেছে প্রত্যেকটি নদীর মোহানায়৷ এমনই অন্যতম বৃহৎ একটি দ্বীপ যা রয়েছে এখনো সৃষ্টির পর্যায়ে অথচ বিতর্কিত—হেড়োভাঙা নদী আর বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে বাংলাদেশের তালপট্টি আর ভারতের পূর্বাশা৷ একটিই দ্বীপ ভিন্ন দুই নাম৷
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পলল প্রক্রিয়ার অন্তরায় প্রায় ৪২৫০ কিমি নদী বাঁধ৷ লক্ষ মানুষ তার বসতি এবং কৃষিজমির সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে নদীতীরে কোথাও কাঁচা কোথাও বা কংক্রীটের বাঁধ তৈরী করে৷ ফলে নদী বাহিত পলি নদী তীরে (Flood Plain) সঞ্চিত না হয়ে জমা হচ্ছে নদী গর্ভে৷ তৈরী হচ্ছে দ্বীপ৷ নদীগুলি হারাচ্ছে নাব্যতা৷ ঠাকুরান, বিদ্যা, মাতলা, সপ্তমুখীর কোন কোন স্থানে আজ খাঁড়ির মতো অবস্থা৷
একসময় রাজ্যসরকার বিভিন্ন নদী, প্রাকৃতিক খাল, খাঁড়ি বেঁধে দিয়ে কৃষিজমিতে সেচের জন্য জলাধার বানিয়েছে৷ এতে মোহানাতে ওই নদীবাহিত মিষ্টি জল আর আসছে না৷ লবণাম্বু উদ্ভিদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে৷ বিপন্ন হচ্ছে বাস্তুতন্ত্র৷ পিয়ালী এরকম এক মৃত্যুপথযাত্রী নদীর উদাহরণ৷ সুন্দরবনের উন্নতির জন্য অনেকগুলি সরকারি দপ্তর রয়েছে যেমন সুন্দরবন ডেভেলাপমেন্ট বোর্ড, সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ, সুন্দরবন প্রোজেক্ট টাইগার, সেচ দপ্তরের অধীনে রিভার রিসার্চ ইন্সটিটিউট ইত্যাদি৷ উল্লিখিত দপ্তরগুলির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্তের দ্বারা মুমূর্ষু সুন্দরবনের সতত পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা আজ অত্যন্ত জরুরী৷

সুন্দরবনের মানচিত্র
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন