বিগ্রহ

রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য

পরদিন রাজকুমারেরা বলল, ‘আচার্য, আপনার বলা নীতি-গল্পগুলি আমাদের খুবই ভালো লেগেছে। এখন, আমরা একটা যুদ্ধের গল্প শুনতে চাই।’

বিষ্ণুশর্মা বললেন, ‘তোমরা রাজপুত্র। অতএব যুদ্ধ-বিগ্রহের গল্প তোমাদের ভালো লাগার কথা। বেশ, আমি একটা যুদ্ধের গল্প বলছি—পাখিদের দুই রাজার যুদ্ধের গল্প। এই গল্পটায় দেখবে:

হংস-রাজ আর ময়ূর-রাজের বিগ্রহের কালে,

নষ্টমতি কাক কেমন করল ধ্বংস হংসপালে।

রাজপুত্রেরা অবাক হয়ে বলল, ‘পাখিতে-পাখিতেও যুদ্ধ হয়!’ বিষ্ণুশর্মা বললেন, ‘গল্পে সবকিছুই হতে পারে। মানুষের মধ্যে যেমন রাজা মন্ত্রী অনুচর গুপ্তচর বিশ্বাসঘাতক বা নষ্টমতি থাকে, পাখিদের মধ্যেও এদের দেখতে পাবে। শোনো…’

কর্পূরদ্বীপে পদ্মকেলি নামে একটা হ্রদ ছিল। এই হ্রদে হিরণ্যগর্ভ নামে বিচক্ষণ একটি রাজহাঁস বাস করত। জলের পাখিরা মিলে হিরণ্যগর্ভকে রাজা মনোনীত করল। তারা এসে হিরণ্যগর্ভকে বলল—পরিচালকহীন নৌকা তার যাত্রীসহ যেমন দিশেহারা হয়ে সমুদ্রে ভেসে যায়, আমরাও বিপদে পড়লে তেমনি কোথায় ভেসে যাব! তাই আমরা আপনাকে আমাদের ‘রাজা’ মনোনীত করলাম। আপনার আদেশমতো আমরা চলব। রাজা হয়ে আপনার প্রধান কাজ হবে আমাদের মতো প্রজাদের রক্ষা করা, দেশকে রক্ষা করা। প্রজারা সুখে থাকলে, তবেই না রাজার রাজত্ব, সমৃদ্ধি। আপনি আপনার পছন্দমতো কাউকে মন্ত্রী, কাউকে সেনাপতি নির্বাচন করে নিন।’

হিরণ্যগর্ভ রাজা হয়ে সেই হ্রদের এক বিস্তীর্ণ পদ্মবনে দুর্গ তৈরি করে বাস করতে লাগল। তার মন্ত্রী আর অনুচরেরা তার চারদিক ঘিরে বসবাস করত। সুখেই তাদের দিন কাটছিল।

এমন সময় একদিন, দীর্ঘমুখ নামে একটি বক এসে রাজা হিরণ্যগর্ভকে প্রণাম করে দাঁড়াল। রাজা হিরণ্যগর্ভ বলল, ‘দীর্ঘমুখ, তোমায় তো বড়ো ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সম্ভবত দেশান্তর ঘুরে এসেছ। কী খবর নিয়ে এসেছ, বলো।’

দীর্ঘমুখ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, ‘প্রভু, একটা বিশেষ খবর আছে। সেই খবর দিতেই আমি আপনার কাছে এসেছি।’ হিরণ্যগর্ভ আর তার মন্ত্রীরা উদগ্রীব হয়ে বলল, ‘কী খবর?’

দীর্ঘমুখ বলতে লাগল, ‘জম্বুদ্বীপে বিন্ধ্য নামে এক পর্বত আছে। চিত্রবর্ণ নামে এক ময়ূর বিন্ধ্য পর্বতের রাজা। আমি বিন্ধ্য পর্বতে গিয়ে একটা পুকুরের জলে এক পায়ে দাঁড়িয়েছিলাম। এমন সময় সেদেশের রাজা চিত্রবর্ণের অনুচরেরা আমায় দেখতে পেয়ে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কে? কোন দেশ থেকে, কেন এখানে এসেছ?’ আমি বললাম, ‘আমি কর্পূরদ্বীপের রাজার সামান্য একজন প্রজা। দেশভ্রমণ করতে ভালোবাসি। তাই এখানে এসেছি।’ আমার কথা শুনে ওরা বলল, ‘এবার বলো দেখি তোমার দেশ আর আমাদের দেশ—এ দুটোর মধ্যে কোনটা বেশি ভালো?’

আমি বললাম, ‘এ কথার উত্তর হয় না। যে যে-দেশে থাকে তার কাছে সেই দেশই ভালো। তবু যদি তুলনা করতে বলো, তাহলে বলব, আমাদের কর্পূরদ্বীপ দেশটা সুজলা, শ্যামলা। আর আমাদের রাজা হংসরাজ হিরণ্যগর্ভ তো দেবরাজ ইন্দ্রের তুল্য। তাঁর আর তুলনা হয় না।’

আমার কথা শুনে সে-দেশের পাখিরা ভীষণ রেগে গেল। তারা বলতে লাগল, ‘তুমি আমাদের দেশকে, আমাদের রাজাকে নিন্দা করছ!’

আমি তাদের অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম। অনেক উপদেশ দিলাম। কিন্তু উপদেশে তো মূর্খের রাগ কমে না। সাপকে দুধ-ক্ষীর খাওয়ালেও তার বিষই বেড়ে যায়। মূর্খ বাঁদরদের উপদেশ দিতে গিয়ে বাবুই পাখিদের কী দুর্দশাই না হয়েছিল!’

রাজা হিরণ্যগর্ভ জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছিল, বাবুই পাখিদের?’ দীর্ঘমুখ বলল, তবে শুনুন…

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%