রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
কোনো একটা বনের এক এলাকায় একটা সিংহ ছিল। তার ছিল তিনজন সেবক—এক কাক, এক বাঘ, আর এক শেয়াল। সেবকদের কাজ ছিল, এই এলাকায় অন্য কোনো বলবান সিংহ এলে, বা বুনো হাতির দল এলে তাদের প্রভুকে সতর্ক করে দেওয়া; আর, বনের কোথায়, কখন কোন পশু শিকার করা যাবে তার সন্ধান দেওয়া। সিংহ কোনো পশু শিকার করলে, সে একাই অর্ধেক মাংস খায়। বাকিটা অনুচরেরা ভাগ করে খায়।
একদিন তিন অনুচর বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে একটা উটের দেখা পেয়েছিল। বনে সাধারণত উট থাকে না। তাই উট দেখে তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুমি কে? কোথা থেকে আসছ?’
উট বলল, ‘আমার নাম চিত্রকর্ণ। বনের ওপাশে আছে একটা মরুভূমি। আমরা ওখানেই থাকি। আমি আমাদের দলের সঙ্গে আসছিলাম। হঠাৎ দল-ছুট হয়ে এই বনে এসে আর পথ পাচ্ছি না মরুভূমিতে ফিরে যাবার।’ কাক-বাঘ-শেয়াল বলল, ‘তুমি আমাদের প্রভু সিংহের কাছে চলো।’ ওরা উটকে সিংহের কাছে নিয়ে গেল। সিংহের সঙ্গে উটের এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল যে সে আর বন ছেড়ে মরুভূমিতে যেতে চাইল না।
একবার সিংহ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাছাড়া, মাস খানেক ধরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। এ অবস্থায় সিংহের শিকার মিলছে না। তাই সিংহ আর তার তিন সেবকের অনাহারে দিন কাটতে লাগল। কেবল তৃণভোজী উটের খাদ্যের অভাব হল না। খিদের জ্বালায় কাক-বাঘ-শেয়াল মিলে পরামর্শ করল: প্রভু যদি উটকে বধ করেন, তাহলে আমরা খেয়ে বাঁচি। কিন্তু উট এখন প্রভুর বন্ধু। কী করা যায়? প্রভু কি বন্ধুকে বধ করার মতো অধর্ম করবেন? কাক বলল, ‘চলো আমরা উটকে সঙ্গে নিয়ে প্রভুর কাছে যাই। তারপর, আমি প্রভুকে যা বলব, তোমরাও তাই বলবে। দেখো না কী হয়!’
উটকে সঙ্গে নিয়ে কাক-বাঘ-শেয়াল সিংহের কাছে গেল। সিংহ ভেবেছিল—কোনো শিকারের সন্ধান হয়তো ওরা পেয়েছে। তাই সে জিজ্ঞাসা করল, ‘শিকারের সন্ধান পেলে?’ সেবকেরা বলল, ‘প্রভু, সারাদিন চেষ্টা করেও কিছু পাইনি।’ কাক বলল, ‘প্রভু, আপনি আমাকে খেয়ে প্রাণ বাঁচান।’ সিংহ বলল, ‘না, আমি কখনও তা করতে পারব না।’ বাঘ বলল, ‘তবে আমাকে খান।’ সিংহ বলল, ‘এমন কথা বলো না। না খেয়ে মরব, তবু তোমাকে খাব না।’ তখন শেয়াল বলল, ‘প্রভু, এই অধম সেবককে খেয়ে প্রাণ রক্ষা করুন।’ সিংহ বলল, ‘আমি তা কখনোই করতে পারব না।’ উট ভেবেছিল সিংহ তাকেও একই উত্তর দেবে। তাই সকলের দেখাদেখি সেও বলল, ‘বন্ধু, তবে আমাকেই খাও।’ শুনে, সিংহ কিছু বলার আগেই বাঘ এক থাবায় উটকে মেরে ফেলল। সেদিন সকলে পেটপুরে খেল।
‘এজন্যই বলছিলাম ধূর্ত আর বিশ্বাসঘাতক—এদের ছলের অভাব হয় না।’
ময়ূররাজ চিত্রবর্ণ বলল, ‘মেঘবর্ণ, তুমি এতদিন কীভাবে শত্রুর মধ্যে বাস করলে, কীভাবে তাদের মন জয় করলে জানতে ইচ্ছা হয়।’ মেঘবর্ণ বলল, ‘মহারাজ, কার্যসিদ্ধির জন্য প্রাণীরা কী না-করতে পারে!’ এই গল্পটা শুনুন…
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন