রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
কাক বলল—শোনো গল্পটা। ভাগীরথী নদীর কাছে একটা পাহাড়ের উপর ছিল বিশাল এক পাকুড় গাছ। ওই গাছে অনেক পাখি বাসা বেঁধে বাস করত। আর, ওই গাছের এক কোটরে প্রায়-অন্ধ একটা বুড়ো শকুন বাস করত। তার নাম জরদগব। অন্য পাখিরা দয়া করে নিজেদের আহার থেকে কিছু বাঁচিয়ে জরদগবকে খেতে দিত। কথা ছিল, জরদগব সারাদিন পাখির ছানাদের যাতে কোনো বিপদ না-হয় তার ব্যবস্থা করবে।
এমন সময় একদিন একটা বিড়ালের পাখিছানা খাবার খুব লোভ হল। বিড়াল গাছে উঠতেই জরদগব টের পেয়ে গেল। ওদিকে পাখির ছানারাও বিড়াল দেখে ভয়ে চেঁচামেচি শুরু করল। জরদগব কোটর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘কে ওখানে?’ শকুনের ভয়ে বিড়ালের প্রাণ শুকিয়ে গেল। তবু সে ভাবল, এখন তো আর আমার নামারও উপায় নেই। অতএব মিষ্টি কথায় এই বুড়ো শকুনকে শান্ত করতে হবে। বিড়াল বিনীতভাবে বলল, ‘আমি বিড়াল, আমার নাম লম্বকর্ণ।’ শকুন বলল, ‘কোন সাহসে তুই এখানে এলি। আমি তোকে চিরে টুকরো করে দেব।’

বিড়াল বলল, ‘আগে আমার কথা শুনুন, পরে মারতে হয় মারবেন।’ শকুন বলল, ‘বলো, কী বলতে চাও।’ বিড়াল বলল, ‘আমি এই ভাগীরথীতে রোজ স্নান করি, তীরে বসে পূজা করি। এই গাছের পাখিদের কাছে আমি শুনেছি যে আপনার মতো একজন ধার্মিক বৃদ্ধ শকুন এখানে বাস করেন। তাই কিছু ধর্মকথা শুনতে এসেছি।’
জরদগব বলল, ‘বিড়ালেরা মাংস ভালোবাসে। আর, এখানে পাখিছানা অনেক। আমি তাদের রক্ষক। এজন্যই তোমাকে তাড়াতে চেয়েছিলাম।’ লম্বকর্ণ তার দু-কানে হাত দিয়ে বলল, ‘এসব কথা আমায় বলবেন না, কেননা আমি জানি যে অহিংসা পরমধর্ম। আমি জীবহত্যা করি না।’ জরদগব বলল, ‘তাহলে তুমি আমার কোটরেই থাকো। রোজ তোমাকে ধর্মকথা শোনাব।’
এদিকে পাখিরা টের পেল—কে যেন এসে রোজ তাদের ছানাগুলিকে খেয়ে যাচ্ছে। ওরা হট্টগোল লাগিয়ে দিল। লম্বকর্ণ সেই সুযোগে গাছ থেকে নেমে পালিয়ে গেল। পাখিরা খুঁজতে খুঁজতে জরদগবের কোটরে পাখি-ছানার কচি হাড়, কচি পালক দেখতে পেল। তারা জরদগবকেই দোষী মনে করে তাকে মেরে ফেলল।
কাকের কথা শুনে শেয়ালের বড়ো রাগ হল। সে বলল, ‘আপনি আমাকে অজানা-অচেনা বলছেন। এই হরিণের সঙ্গে যেদিন আপনার প্রথম পরিচয় হয়েছিল, সেদিন আপনারাও একে অন্যের অজানা-অচেনা ছিলেন। তা ছাড়া, নীচু মন যার, সে-ই আপন-পর বিবেচনা করে। যার মন উদার তার কাছে জগতের সবাই কুটুম্ব, সবাই বন্ধু। এই হরিণ যেমন আমার বন্ধু, আপনিও তেমনি আমার বন্ধু।’ হরিণ বলল, ‘এত কথা কাটাকাটির দরকার নেই। তিন বন্ধু মিলেমিশে থাকব।’ কাক বলল, ‘তাই হোক।’
একদিন শেয়াল হরিণকে বলল, ‘বন্ধু, বনের ঠিক পরেই চাষিদের ফসলের খেত। সেখানে সবুজ ঘন ফসলের চারাগাছ। তুমি রোজ গিয়ে কিছু খেয়ে এলেও কেউ টের পাবে না। চলো, দেখিয়ে দিচ্ছি।’
সেদিন থেকে হরিণ রোজ ফসলের জমিতে গিয়ে ফসল খেয়ে আসত। একদিন চাষিরা একটা মোটা জাল পেতে রাখল। হরিণ সেখানে ফসল খেতে গিয়ে জালে আটকে পড়ল। প্রাণের ভয়ে সে শেয়ালকে ডেকে বলল, ‘বন্ধু তোমার দাঁত দিয়ে জালটা ছিঁড়ে দাও। নইলে চাষিরা এসে আমায় মেরে ফেলবে।’ শেয়াল বলল, ‘এই জালটা পশুর শুকনো তন্তু দিয়ে তৈরি। আজ রবিবার। আজ তো আমি মাছ-মাংস ছোঁব না। কাল সকাল হলেই আমি ছুটে এসে জাল কেটে দেব।’ এই বলে শেয়াল পাশের একটা ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকল। সে মনে মনে ভাবল, চাষিরা এসে হরিণটাকে মেরে মাংস খাবে। আর, রক্তমাখা হাড়গুলো এখানেই ফেলবে। ওইসব হাড়ে মাংস লেগে থাকবে। আমি আরামে বসে হরিণের টাটকা মাংস খাব।
সেদিন বিকালে কাক বাসায় ফিরে এসে দেখে হরিণ তখনও ফেরেনি। কী ব্যাপার, হরিণ তো তার আগেই ফিরে আসে। দেখি তো, কোথায় আছে সে আর তার নতুন বন্ধু। কাক অনেক উপরে উঠে, চারদিকে তাকিয়ে দেখল—হরিণ ফসলের খেতে জালে ধরা পড়েছে। কাক তখনি সেখানে গিয়ে হাজির হল। কাককে দেখে হরিণ বলল, ‘বন্ধু, আমায় বাঁচাবার একটা উপায় করো।’ কাক বলল, ‘তোমার নতুন বন্ধুটি কোথায়?’ হরিণ বলল, ‘সে আমার মাংস খাবার আশায় কাছেই কোথাও লুকিয়ে বসে আছে।’ এমন সময় কাক দেখল—চাষিরা মোটা মোটা লাঠি আর মুগুর নিয়ে আসছে। কাক বলল হরিণকে, ‘তুমি মড়ার ভান করে পড়ে থাকো। নিশ্বাস বন্ধ রাখবে। চাষিরা মনে করবে তুমি মরে গেছ। এই মনে করে তারা যেই জালটা গুটিয়ে নেবে, অমনি আমি ‘কা-কা’ করে সংকেত করব। তুমি ছুটে বনে চলে যাবে।’ তা-ই হল। হরিণ এভাবে ফাঁকি দিয়ে পালাচ্ছে দেখে চাষিরা হাতের লাঠি-মুগুর ছুড়ে মারল তার দিকে। হরিণের গায়ে লাঠি বা মুগুর লাগল না। তবে একটা মুগুর গিয়ে ঝোপে বসে-থাকা শেয়ালের মাথায় লাগল। তাতেই সে অক্কা পেল।
নিজেদের আস্তানায় ফিরে এসে কাক বলল, ‘একটা কথা বলি, মনে রেখো—দুষ্ট জন অঙ্গারের মতো, জ্বলন্ত অবস্থায় সে তোমার হাত পোড়াবে; শীতল অবস্থায় সে তোমার হাত কালো করবে।’
এসব গল্প শুনিয়ে হিরণ্যক লঘুপতনকে বলল, ‘এজন্যই বলছি ভক্ষক আর ভক্ষ্যে বন্ধুত্ব করা বিপজ্জনক।’ লঘুপতন বলল, ‘দেখো বন্ধু, তোমার মতো একটি ইঁদুরকে মেরে আমার একবেলার পেটও ভরবে না। তোমায় খেতে যাব কেন? বরং তোমার মতো বন্ধু বেঁচে থাকলে, চিত্রগ্রীব যেমন উপকৃত হয়েছে, তেমনি উপকৃত হব। তাই আমি ঠিক করেছি—হয় তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে, নয় আহার ত্যাগ করে আমি এখানেই আত্মঘাতী হব।’
হিরণ্যক বলল, ‘আমি তোমার কথায় সন্তুষ্ট হয়েছি। বেশ, আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু।’
সেই থেকে লঘুপতন প্রতিদিন একবার করে হিরণ্যকের কাছে এসে গল্প শোনে। কত নীতি উপদেশ শোনে। এভাবে অনেক দিন কেটে গেল। একদিন লঘুপতন বলল, ‘বন্ধু, দেশে অনাবৃষ্টির ফলে ফল-ফুলের গাছপালা, শস্যের চারা সব শুকিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। তাই আমি অন্য দেশে চলে যাব ঠিক করেছি।’ হিরণ্যক বলল, ‘একটা কথায় আছে—মানুষ এক পায়ে চলে, এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায়, দেখেশুনে চলে। তুমি যে দেশে যাবে ভাবছ—সে-দেশের খোঁজখবর ভালো করে নিয়ে তবে এদেশ ছাড়বে।’ লঘুপতন বলল, ‘তোমার উপদেশ খুবই মূল্যবান। তবে, আমি সে-দেশের খবর নিয়ে এসেছি। দন্ডক বনে এক জায়গায় একটা ছোটো পুকুর আছে। সেখানে থাকে আমার ছোটোবেলার বন্ধু। সে একটি কচ্ছপ। তার নাম মন্থর। সে-ও প্রায় তোমারই মতো জ্ঞানী।’
হিরণ্যক বলল, ‘তবে আমাকেও সেখানে নিয়ে চলো।’ লঘুপতন বলল, ‘সে যে অনেক দূরের পথ, তুমি কী করে যাবে, বন্ধু!’ হিরণ্যক বলল, ‘বন্ধুহীন হয়ে আমি একা থাকব নাকি! তুমি পথ দেখিয়ে উড়ে উড়ে যাবে, আমি ঠিক তোমায় অনুসরণ করে করে যেতে পারব। কাল সকালেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।’
চলতে চলতে অবশেষে একদিন হিরণ্যক আর লঘুপতনের চলার শেষ হল। লঘুপতন বলল, ‘আমরা এসে গেছি! ওই সেই পুকুর। ওই দেখো, বন্ধু মন্থর পড়ন্ত বেলায় পুকুর-পাড়ের রোদে বসে আছে।’
মন্থর এগিয়ে এসে লঘুপতন আর হিরণ্যককে অভ্যর্থনা করল। সামাজিক নীতি হল, অতিথি হিসাবে কেউ ঘরে এলে—ছোটো হোক বা বড়ো হোক, এগিয়ে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা করতে হয়। লঘুপতন তখন হিরণ্যকের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘হাজার মুখে বললেও আমাদের এই বন্ধু হিরণ্যকের সঠিক পরিচয় দেওয়া সম্ভবপর নয়। এর মতো গুণীজন আর হয় না।’
হিরণ্যক বিনীতভাবে বলল, ‘এত প্রশংসা করার প্রয়োজন নেই। আমার পুণ্যফলে লঘুপতনের মতো বন্ধু পেয়েছি। আবার তার সাহায্যেই আপনার মতো গুণীজনের বন্ধুত্ব পেলাম। এর বেশি আর কী চাই।’
মন্থরের পরামর্শে পুকুরপাড়ের বটগাছটায় লঘুপতন বাসা বাঁধল। গাছটার নীচে একটা ফাটলের মধ্যে হিরণ্যক বাস করতে লাগল। খাওয়ার সময়টুকু ছাড়া সারাদিন হিরণ্যক আর মন্থর নীতিরীতি বিষয়ে নানা আলোচনা করে। লঘুপতন মুগ্ধ হয়ে শোনে। এভাবেই সুখে তাদের দিন কাটতে লাগল।
একদিন হিরণ্যক বলল, ‘ধনহীন হয়ে আত্মীয়দের ঘরে বাস করার চেয়ে বনবাস করা অনেক ভালো। এখানে বনের ফল-শস্য খাও, পুকুরের জল খাও, বড়ো গাছের নীচে তৃণশয্যায় শুয়ে নিশ্চিন্তে গল্প করো, নয়তো ঘুমাও।’ মন্থর বলল, ‘গৃহীদের পক্ষে প্রতিদিন অল্প করে সঞ্চয় করা উচিত। বিপদের দিনে এই সঞ্চয় কাজে আসবে। তবে অতিসঞ্চয় করা ভালো নয়। অতিসঞ্চয় বা অতিধন থেকে আসে গর্ব, তা থেকে অধার্মিকতা। বেশি সঞ্চয় হলে তা গরিবদের দান করে দেওয়া উচিত। দেখো, লোকে পুকুর কাটে, কিন্তু বর্ষায় পুকুরের জল উপচে গিয়ে ঘরবাড়ি নষ্ট করতে পারে। এজন্য পুকুরের একপাশে একটা নালা কাটা থাকে। বেশি জল সঞ্চয় হলে ওই নালা দিয়ে বেরিয়ে যাবে। একেই বলা যায় দান করা। তবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন যে দান করে না, বা নিজেও ভোগ করে না, সে এক মূর্খ। আবার অতিকৃপণ যে, সেও মূর্খ। তাই বলি—বেশি সঞ্চয় করতে গিয়ে গল্পের সেই শেয়ালের অবস্থা যেন কারো না-হয়।’ লঘুপতন বলল, ‘গল্পটা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে।’ মন্থর বলল…
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন