রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
দক্ষিণ ভারতে সুবর্ণবতী নামে একটি নগর ছিল। সেখানে বর্ধমান নামে এক বণিক বাস করতেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করে বর্ধমান খুব ধনবান হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ধনবান বণিকদের ধনলাভের আকাঙ্ক্ষা থাকে খুব বেশি। ‘যে-ধন উপার্জন করেছি, তা যথেষ্ট’—এমন কথা কোনো বণিকই ভাবেন না। কোনো বণিক ভেবে দেখেন না যে, তাঁর চেয়েও কম-ধনবান বণিক আছেন। বণিকেরা উপরের দিকে নজর করে দেখেন কে কে তাঁদের চেয়েও ধনবান। অতএব, তাঁরাও আরও ধনলাভের ইচ্ছা করেন। বর্ধমানও তাই চাইলেন। তিনি আপন মনে বলতেন—যে ধন অর্জিত হয়েছে, তাকে সযত্নে রক্ষা করা চাই; অধিকতর ধনবান হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া চাই; পর্যাপ্ত ধনলাভ হলে কিছু ধন সৎপাত্রে বা সৎকাজে দানও করা চাই।
এসব ভেবে বর্ধমান বিদেশে গিয়ে বাণিজ্য করে অধিকতর ধনবান হতে ইচ্ছুক হলেন। ‘নন্দক’ আর ‘সঞ্জীবক’ নামে বর্ধমানের দুটি বলিষ্ঠ বলদ ছিল। এই দুটি বলদে-টানা গাড়িতে প্রচুর পণ্যদ্রব্য বোঝাই করে, সঙ্গে দুজন পাহারাদার নিয়ে, বর্ধমান কাশ্মীর দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন।
অনেক দিনের পথ। কখনও মাঠের মাঝখান দিয়ে, কখনও গভীর বনের ভিতর দিয়ে গাড়ি চলতে লাগল। এভাবে চলতে চলতে ‘সুদুর্গ’ নামে এক বিশাল বনের মধ্যে এসে সঞ্জীবকের একটা পা বেশ রকম মচকে গেল। বর্ধমান ভেবে দেখলেন, সঞ্জীবকের পা সারতে অনেক দিন সময় লাগবে। ততদিন এই বনে বসে থাকলে পণ্যদ্রব্যগুলি নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে, লাভ তো হবেই না, বরং লোকসান হবে। তখন তিনি লোক পাঠিয়ে ধর্মধুর নগর থেকে একটা বলিষ্ঠ বলদ কিনে এনে, গাড়িতে জুড়ে, কাশ্মীরের দিকে চলে গেলেন।
সঞ্জীবক একা পড়ে থাকল ‘সুদুর্গ’ বনের মধ্যে। খিদের জ্বালায় সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কয়েক পা হেঁটে বনের ঘাসপাতা খেয়ে বেঁচে থাকল। ক্রমে তার পা সেরে গেল। এখন সে সারা বনে ঘুরে ঘুরে তাজা ঘাসপাতা খায়। নদীতে গিয়ে জল পান করে। রাতে একটা বটগাছের তলায় শুয়ে ঘুমোয়। কিন্তু একা থাকতে যখন তার মন খারাপ লাগে, তখন সে বিরাট রকম গর্জন করে উঠে।
এই ‘সুদুর্গ’ বনের রাজা ছিল পিঙ্গলক নামে এক দুর্দান্ত সিংহ। বনের সিংহ নিজের বলেই রাজা হয়; কেউ তাকে অভিষেক করে সিংহাসনে বসায় না। পিঙ্গলকের শক্তি আর সাহসের পরিচয় পেয়ে বনের পশুরা তাকেই রাজা বলে মেনে নিয়েছিল।
রাজা পিঙ্গলকের দুই মন্ত্রীপুত্র ছিল। তারা হল দুই ধূর্ত শিয়াল। একজনের নাম ‘করটক’, অন্য জনের নাম ‘দমনক’। মন্ত্রী মারা গেলে, বনের নিয়মে, মন্ত্রীর পুত্রদেরই মন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো কারণে পিঙ্গলক তার মন্ত্রীপুত্রদের ভালো চোখে দেখতেন না। তাই তাদের মন্ত্রী করলেন না। এদিকে ‘করটক’ আর ‘দমনক’ মনের দুঃখে কাল কাটায়। তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। রাজা পিঙ্গলকের কাছে তারা সাহস করে যায় না বটে, কিন্তু পিঙ্গলকের পিছনেই ঘোরাফেরা করে। তাদের আশা, যদি কখনও তারা পিঙ্গলককে তুষ্ট করতে পারে, তবে হয়তো কোনো দিন মন্ত্রী হতেও পারে। একদিন তেমন একটা সুযোগ তারা পেয়ে গেল!
বনের পশুরা রাতের একটা নির্দিষ্ট সময়ে নদীতে জলপান করতে যায়। এক রাতে, রাজা পিঙ্গলক নদীতে নেমে জলপান করবে—ঠিক তখনি সঞ্জীবক মহাগর্জন করে উঠল। রাজা পিঙ্গলক এমন ভয়ংকর গর্জন আগে কোনোদিন শুনেনি। তাই, ভয়ে না জলপান করেই চিন্তিতভাবে সে চলে এল।
দূর থেকে করটক আর দমনক তা লক্ষ করল। গর্জন শুনে তারাও অবশ্যই ভয় পেয়েছিল। তবে তারা জানত যে এই বিশাল বনে পিঙ্গলকের চেয়ে বলশালী কেউ নেই। তখন দমনক বলল করটককে, ‘ভাই, ব্যাপারখানা দেখলে! গর্জন শুনে ভয় পেয়ে রাজামশায় জলপান না করেই চলে এলেন।’ করটক বলল, ‘এমন ভীতু রাজার মন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করছি আমরা, ছি: ছি:। এই রাজা, যিনি এতদিন আমাদের অবজ্ঞা করে এসেছেন—তার জলপান করা বা না-করা নিয়ে আমাদের মাথা না-ঘামালেও চলবে। আমরা স্বাধীন আছি, স্বাধীনই থাকব। মন্ত্রিত্বের কোনো প্রয়োজন নেই। ‘মন্ত্রী’ মানে তো রাজার কথায় ওঠা-বসা, মানে পরাধীন। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকাই সার্থক। যারা পরাধীন তাদের যদি ‘জীবিত’ বলতে হয়, তবে মৃত কারা?’
দমনক বলল, ‘দূর মূর্খ! রাজা তুষ্ট হলে সেবকের সকল মনোবাসনা পূরণ করেন; তবে রাজসেবা করব না কেন? অন্যভাবে দেখো, সেবকের সেবা না-পেলে রাজারও কাজ চলে না। রাজার চাই বুদ্ধিমান ‘মন্ত্রী’, আর আমাদের মতো সেবকের চাই সেই ‘মন্ত্রিত্ব’। রাজা তো হতে পারব না, মন্ত্রী হওয়াও কী কম কথা?’ করটক বলল, ‘তবু রাজারাজড়াদের ব্যাপারে নাক না-গলানোই ভালো। পিঙ্গলক কি গর্জন শুনেই জলপানে বিরত হলেন, না অন্য কোনো কারণ আছে কে জানে? অ-ব্যাপারকে ব্যাপার করতে গিয়ে সেই বাঁদরের অবস্থা না-হয়।’ দমনক বলল, ‘কী হয়েছিল বাঁদরের?’ করটক বলল, ‘শোনো তবে…’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন