লোভী বকের মৃত্যু

রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য

মালব দেশে পদ্মগর্ভ নামে একটা পুকুর ছিল। এই পুকুরে ছোটো ছোটো মাছ আর কাঁকড়া ছিল। পুকুরের কাছেই ছিল একটা বকের বাসা। বকটা এই পুকুর থেকেই মাছ ধরে রোজ খেত। কিন্তু এখন সে বুড়ো হয়ে গিয়েছে। তাই সে মাছ ধরার তেমন চেষ্টাই আর করতে পারে না।

একদিন এই বক পুকুরের এক হাঁটু জলে নেমে, এক পায়ে, খুব দুঃখিতভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। একটা কাঁকড়া তা লক্ষ করে বককে বলল, ‘ভাই, সারাদিন এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছ কেন? খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিলে নাকি?’ বক বলল, ‘শোনো বন্ধু, মাছেরাই আমার প্রাণ। আমি মাছ খেয়ে বেঁচে থাকি বটে, কিন্তু তাদের বিপদের কথা শুনে আমি তো খাওয়া-দাওয়া ছেড়েই দিয়েছি। আজ সকালেই শুনলাম, জেলেরা এসে বলাবলি করছিল—কয়েকদিনের মধ্যেই তারা এসে এই পুকুরের সব মাছ ধরে নেবে। তা হলেই দ্যাখো, খাদ্যের অভাবে আমাকে মরতেই হবে। তাই প্রাণীবধে, আহারে, আমার আর রুচি নেই।’

কাঁকড়া তখনি গিয়ে মাছেদের এই খবরটা দিল। মাছেরা পরামর্শ করে ঠিক করল যে বক অবশ্যই তাদের উপকারী বন্ধু। জেলেদের হাত থেকে কী করে বাঁচা যায়, তাকেই গিয়ে জিজ্ঞাসা করি। মাছেরা তাই করল। বক বলল, ‘তোমাদের অন্য জলাশয়ে চলে যাওয়া উচিত; এ ছাড়া, বাঁচার আর উপায় নেই।’ মাছেরা বলল, ‘আমরা হেঁটেও যেতে পারি না, উড়েও যেতে পারি না। কেমন করে অন্য জলাশয়ে যাব?’ বক বলল, ‘আমি তোমাদের বহুদিনের বন্ধু। তাই তোমাদের উপকার করতে চাই। তোমরা যদি রাজি থাকো—তবে তোমরা এক-একজন করে এসো আমার কাছে, আমি ঠোঁটে করে তোমাদের অন্য জলাশয়ে রেখে আসব।’ মাছেরা রাজি হল। সেই থেকে বক দিনে দশ-বিশটা করে মাছ নিয়ে যায়। একদিন, সেই কাঁকড়াটা এসে বলল, ‘চলো, আজ আমায় নিয়ে যাও। আমি তোমার গলা জড়িয়ে থাকি, তুমি আমায় অন্য জলাশয়ে নিয়ে চলো।’ বক তখন কাঁকড়াকে নিয়ে কিছুদূর গিয়ে মাটিতে নামল। কাঁকড়া দেখল সেখানে প্রচুর মাছের কাঁটা পড়ে আছে। তাই সে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখানে মাছের এত কাঁটা কেন?’ বক বলল, ‘রোজ যেসব মাছ আনি, এখানে বসেই তাঁদের খাই।’ বকের কথা শুনে, কাঁকড়া তার দুটি দাঁড়া দিয়ে বকের গলা এমন চেপে ধরল যে শ্বাস বন্ধ হয়ে বক মারা গেল!

গল্পটা শেষ হতেই মহারাজা চিত্রবর্ণ বলল, ‘মন্ত্রী গৃধ্র, আমার ইচ্ছের কথা বলি: মেঘবর্ণকে কর্পূরদ্বীপের রাজা করলে, সে সেখানকার অনেক ধনদৌলত আমায় উপহার দেবে। সেসব পেলে আমি সুখে রাজত্ব করতে পারব।’ মন্ত্রী গৃধ্র ঈষৎ হেসে বলল, ‘মহারাজ, আপনি অনেক কিছু আশা করতে পারেন, অনেক কিছু ইচ্ছে করতে পারেন—সেগুলো ফলবতী হবে কী না-হবে জেনেই। এ বিষয়ে একটা ছোট্ট গল্প বলি।’ চিত্রবর্ণ বলল, ‘তোমার নীতিগল্পগুলি আমার অতি প্রিয়। শুনি তোমার গল্পটা।’ গৃধ্র বলতে লাগল…

এক নগরে একজন গরিব ব্রাহ্মণ বাস করতেন। কোনো এক পার্বণ উপলক্ষ্যে তিনি দূরের এক গ্রামে গিয়ে এক ভাঁড় ছাতু পেয়েছিলেন। সেই ছাতু নিয়ে দুপুর রোদে বাড়ি আসার পথে ব্রাহ্মণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখন তিনি এক কুমোরের বাড়ির আঙিনায় অসংখ্য হাঁড়িকুড়ির আড়ালে ছায়ায় শুয়ে পড়লেন। পাখি বা কুকুর এসে যদি তাঁর ছাতুতে মুখ দেয়, সেই ভয়ে তিনি হাতে একটা মোটা লাঠি রেখেছিলেন।

শুয়ে শুয়ে ব্রাহ্মণ ভাবতে লাগলেন, ‘এই ছাতু বিক্রি করে যা পয়সা পাব, তা দিয়ে এই কুমোরের কাছ থেকে অনেক হাঁড়িকুড়ি কিনে নেব। হাঁড়িকুড়িগুলো বিক্রি করলে দশগুণ পয়সা পাব। সেই পয়সায় সস্তায় সুপারি কিনে বিক্রি করলে আরও দশগুণ টাকাপয়সা পাব। সেই পয়সায় কাপড়ের ব্যাবসা করে লাখপতি হব। তখন তিন-চারটে বিয়ে করব। আর বউগুলো যখন ঝগড়া করবে তখন এইভাবে তাদের লাঠিপেটা করব।’

কীভাবে লাঠিপেটা করবেন তা অনুমান করে ব্রাহ্মণ এমন জোরে লাঠি চালালেন যে কুমোরের অনেক হাঁড়িকুড়ি ভেঙে গেল, তাঁর ছাতুর ভাঁড়টাও ভেঙে গেল। হাঁড়ি ভাঙার শব্দ পেয়ে কুমোর এসে ব্রাহ্মণকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল।

গল্প শেষ করে গৃধ্র বলল, ‘মহারাজ, কাউকে পুরস্কৃত করার সময় এখন নয়। যুদ্ধে জিতেছি বটে, কিন্তু এটা শত্রুর দেশ, তা ছাড়া বর্ষা নামল বলে! বর্ষাকালে শত্রুর দেশে থাকা নিরাপদ নয়। আমার পরামর্শ হল—কর্পূররাজ হিরণ্যগর্ভের সঙ্গে সন্ধি করে বিজয়ীর বেশে সসম্মানে নিজ রাজ্যে ফিরে যান। শত্রুকে পরাজিত করে কীর্তি লাভ করেছেন—আর কী চাই! শাস্ত্রে আছে—দুর্বল শত্রুর সঙ্গে, সমবল শত্রুর সঙ্গে আর অধিকতর বলবান শত্রুর সঙ্গে সন্ধি করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে রাজা-প্রজা সকলেই সুখে থাকে। যুদ্ধ বড়োই বিপজ্জনক কাজ; যুদ্ধে লোকক্ষয় হয়, ধনক্ষয় হয়, শান্তি নষ্ট হয়।’

রাজা চিত্রবর্ণ বলল, ‘এমন পরামর্শ আমায় আগে দাওনি কেন?’

গৃধ্র বলল, ‘আমার পরামর্শ ছাড়াই আপনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। আমি কেবল আপনাকে রক্ষা করার জন্য মেঘবর্ণকে পাঠিয়েছিলাম কর্পূরদ্বীপের রাজদরবারে অতিথি হয়ে সময়মতো শত্রুর দুর্গে আগুন লাগিয়ে দিতে। আমি জানি—হংসরাজ হিরণ্যগর্ভকে তার প্রজারা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। যে রাজাকে তার প্রজারা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, সেই রাজাকে আপনি বেশিদিন দমন করে রাখতে পারবেন না। অচিরে সন্ধির জন্য দূত পাঠান।’

প্রাজ্ঞ মন্ত্রীর পরামর্শে রাজা চিত্রবর্ণ সেই শুকপাখিকে দূত করে পাঠাল রাজা হিরণ্যগর্ভের দরবারে সন্ধির প্রস্তাব করে। কপূর্রদ্বীপের রাজা হিরণ্যগর্ভের প্রধানমন্ত্রী চক্রবাক সন্ধির জন্য কতকগুলি শর্তের কথা বলল শুককে। শুক বলল, ‘আমি গিয়ে আমাদের রাজাকে আপনাদের শর্তের কথা জানাব। তিনি কী বলেন তা জানাতে আবার আসব।’ চক্রবাক বলল, ‘আমরাও সন্ধি করতে আগ্রহী—তোমাদের রাজাকে এই কথাটাও বলো।’ শুক চলে গেল। রাজা হিরণ্যগর্ভ জিজ্ঞাসা করল, ‘মন্ত্রী চক্রবাক, বলো দেখি কাদের সঙ্গে সন্ধি করতে নেই।’ চক্রবাক বলল, ‘শুনুন মহারাজ, শাস্ত্রে আছে এবং আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি—বালক, বৃদ্ধ, চিররোগী, জ্ঞাতিদের দ্বারা বিতাড়িত, ভীরু, লোভী, যার প্রতি নিজের প্রজারা অসন্তুষ্ট, অলস এবং ভোগী, অস্থিরমস্তিষ্ক, ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত, যথেষ্ট সংখ্যক উপযুক্ত সৈন্যহীন, যার অনেক শত্রু, উপযুক্ত সময়ের জ্ঞান যার নেই, যিনি নীতিজ্ঞ লোকের পরামর্শ গ্রহণ করেন না, যিনি সত্যধর্ম থেকে বিচ্যুত—তেমন রাজাদের সঙ্গে সন্ধি করতে নেই।’

ওদিকে জম্বুদ্বীপের ময়ূররাজ চিত্রবর্ণ ডেকে পাঠাল সেই মেঘবর্ণ নামক কাককে। রাজা বলল, ‘মেঘবর্ণ, তুমি তো অনেক দিন ছিলে কর্পূরদ্বীপের রাজা হিরণ্যগর্ভের আশ্রয়ে। বলো তো—ওদের রাজা হিরণ্যগর্ভ আর মন্ত্রী চক্রবাক কেমন প্রকৃতির?’ মেঘবর্ণ বলল, ‘মহারাজ, উপমা দিয়ে বলতে গেলে হিরণ্যগর্ভ মহাভারতের যুধিষ্ঠিরের মতো মহান—ধীর, স্থির, অতিথিবৎসল এবং সত্যধর্মে আস্থাবান। তার মন্ত্রী চক্রব্রাকের মতো বিচক্ষণ মন্ত্রী আমি কোথাও দেখিনি। চক্রবাক কিন্তু প্রথম দর্শনেই আমায় গুপ্তচর বলে দৃঢ় অনুমান করেছিল।’ চিত্রবর্ণ বলল, ‘যারা এত ভালো, তাদের প্রতি তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করলে কেন?’ মেঘবর্ণ বলল, ‘মহারাজ, আমার কাজ গুপ্তচরগিরি করা। আর প্রয়োজনে বিশ্বাসঘাতকতা করা। রাজা হিরণ্যগর্ভের অতি সরল মন। এই সুযোগে তার বিচক্ষণ মন্ত্রীকে ঠকাতে পেরে গর্ববোধ করছি। আপনি সেই সরল ব্রাহ্মণের গল্পটি শোনেননি?’ রাজা চিত্রবর্ণ বলল, ‘না শোনাও তবে।’ মেঘবর্ণ বলতে আরম্ভ করল…

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%