রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
চিত্রগ্রীব বলল, ‘একটা বাঘ বুড়ো হয়ে গিয়েছিল। সে আর দৌড়ঝাঁপ করে হরিণ বা খরগোশও শিকার করে খেতে পারত না। তখন সে মানুষ ধরার একটা ফন্দি করল। বনের ধারে একটা কাদা-পুকুরের পাড়ে রোজ সকালে সে এক ধার্মিকের মতো বসে থাকত। একবার সে একজন মানুষকে খেয়ে, মানুষের হাতের সোনার বালাখানি রেখে দিয়েছিল। কাদা-পুকুরের ওপারে একটা পায়ে-চলা সরু পথ। ওই পথে কোনো পথিককে যেতে দেখলেই সে সবিনয়ে বলত, ‘পথিক মশাই, আমি এই সোনার বালাটা আপনাকে দান করব; এসে নিয়ে যান।’ কিন্তু বাঘের ভয়ে কেউ বালা নিতে রাজি হত না।
একদিন এক লোভী পথিক রাজি হল। তবু সে বলল, ‘তোমার মতো হিংস্র বাঘকে বিশ্বাস করি কী করে?’ বাঘ বলল, ‘হায় কপাল! দেখছেন না, আমি বুড়ো হয়েছি, দাঁত সব পড়ে গেছে, নখ ভোঁতা হয়ে গেছে। আমাকে ভয় কী। অন্য কেউ আসার আগে আপনিই নিয়ে যান। দান নেবার আগে আপনাকে স্নান করে আসতে হবে। এই পুকুরে একটা ডুব দিয়ে আসুন।’
বাঘের কথায় বিশ্বাস করে লোভী পথিক পুকুরে ডুব দিতে নামল। পুকুরে সামান্য জলের নীচে ছিল একগলা এঁটেল মাটির কাদা। পুকুরে নেমে পথিক আর নড়তে-চড়তে পারছে না। বাঘ বলল, ‘আপনি বোধহয় কাদায় আটকে গেছেন। এর আগেও কেউ কেউ এমনি করে আটকে গিয়েছিল। তারা সব আমার পেটে গেছে। আপনিও এখনি যাবেন।’ এই বলে বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলল। —তাই বলছি, ভায়েরা, এই চালের নীচে কী আছে কে জানে। লোকে বলে—লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।’
পায়রাগুলি বলল, ‘অত ভাবলে কোথাও আমাদের খাবার জুটবে না।’ তারা চিত্রগ্রীবের কথা না-শুনে নীচে নেমে চাল খেতে লাগল। কিছু পরেই তারা টের পেল যে—জালে তাদের পা আটকে গেছে। তারা করুণভাবে বলল, ‘দলপতি, তোমার উপদেশ না-শুনে আমাদের সকলের পা জালে আটকে গেছে।’ এই বলে সকলে মিলে হুটোপাটি লাগিয়ে দিল।
চিত্রগ্রীব বলল, ‘এবার আমার কথা শোনো। হুটোপাটি বন্ধ করো। এখনি কোনো পাখি-শিকারি এসে আমাদের ধরবে। তার আগে এসো আমরা সকলে একসাথে পাখা মেলে জালটাকে নিয়ে উড়ে যাই।’ দলপতির কথায় রাজি হয়ে পায়রাগুলি একসঙ্গে পাখা মেলে জালটা নিয়েই বেশ উঁচুতে উড়ে গেল।
শিকারি ছুটে এসে আর পায়রাদের নাগাল পেল না। এমন বুদ্ধিমান পায়রা সে জীবনে দেখেনি!
এদিকে গাছে বসে লঘুপতন সবই দেখছিল। সে পায়রাদের বুদ্ধির তারিফ করল। আবার ভাবল, পায়রাগুলি জাল থেকে ছাড়া পাবে কেমন করে? এই ভেবে সে পায়রাদের পিছনে পিছনে উড়ে যেতে লাগল।
পায়রাগুলি জাল নিয়ে উড়তে উড়তে অনেক দূরে একটা পাহাড়ে গিয়ে থামল। চিত্রগ্রীব বলল, ‘এখানে আমার এক বন্ধু আছে—হিরণ্যক নামে জ্ঞানী এক ইঁদুর। তাকে ডাকলে সে এসে আমাদের জাল থেকে মুক্ত করে দেবে।’ চিত্রগ্রীব পাথরের একটা ফাটলের কাছে গিয়ে ডাকতে লাগল, ‘বন্ধু হিরণ্যক, বাড়ি আছ?’ এমন সময় সোনালি রঙের একটা ইঁদুর ফাটলের কাছে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল। তারপর পায়রাদের দলের মধ্যে চিত্রগ্রীবকে দেখে বলল, ‘বন্ধু চিত্রগ্রীব! অনেক দিন পরে এলে। কেমন আছ?—এ কি, তোমরা জালে বদ্ধ কেন?’
চিত্রগ্রীব বলল, ‘এ হল আমার পূর্বজন্মের পাপের ফল।’ হিরণ্যক বলল, ‘এসো, আগে তোমায় বন্ধন-মুক্ত করি।’ চিত্রগ্রীব বলল, ‘না। আগে আমার সঙ্গীদের মুক্ত করবে। আমি দলপতি হয়ে আগে বিপদ-মুক্ত হব—এমন কাজ আমি হতে দেব না। এরা আমার সকল-সময়ের সাথি। এরা সকলে মুক্ত হয়েছে দেখে তবে আমি মুক্ত হব।’ চিত্রগ্রীবের কথা শুনে হিরণ্যক বলল, ‘ধন্য আমি, তোমার মতো বন্ধু পেয়েছিলাম। তোমার কথা শুনে আমার যেমন গর্ব হচ্ছে, তেমনি তোমার দলের সকলের নিশ্চয় গর্ব হচ্ছে। তুমি উপযুক্ত দলপতির মতো কথা বলেছ। এসো, আমার দাঁত দিয়ে জাল কেটে সকলকে মুক্ত করি।’
হিরণ্যক সকলকে মুক্ত করে দিয়ে বলল, ‘বন্ধু চিত্রগ্রীব, তুমি মনে করো না যে তোমার জন্যই তোমার বন্ধুদের সঙ্গে তুমি বিপদে পড়েছিলে। বিপদ যে কখন কোন দিক থেকে আসে কে বলতে পারে।’ তখন চিত্রগ্রীব আর তার দলের অন্য পায়রারা হিরণ্যককে ধন্যবাদ দিয়ে তাদের গন্তব্যের দিকে উড়ে গেল। হিরণ্যকও পাহাড়ের ফাটলে তার ঘরে চলে গেল।
বিষ্ণুশর্মা বললেন, ‘তোমরা জাতপাত বা ছোটো-বড়ো না-ভেবে যত গুণীজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে তত উপকার পাবে। দেখলে তো, ছোট্ট ইঁদুর হিরণ্যক কেমন করে চিত্রগ্রীব আর তার দলের পায়রাদের উপকার করল।’ রাজপুত্রেরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
লঘুপতন একটু দূরে থেকে সবই দেখছিল। সবই শুনছিল। সে তখন সেই ফাটলের কাছে এসে বলল, ‘ভাই হিরণ্যক, আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই।’ হিরণ্যক ফাটলের মধ্যে থেকেই জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কে, ভাই?’ লঘুপতন বলল, ‘আমি এক কাক, আমার নাম লঘুপতন।’ হিরণ্যক হেসে বলল, ‘এ কীরকম কথা। এই পৃথিবীতে যে যার যোগ্য সে তার সঙ্গেই বন্ধুত্ব করে। আমি হলাম তোমার খাদ্য, তুমি হলে ইঁদুর-খাদক। তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হবে না, হতে পারে না। খাদ্য-খাদকের মধ্যে বন্ধুত্ব হলে বিপদের কারণ হয়। যেমন হয়েছিল শিয়ালের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এক হরিণের।’ লঘুপতন জানতে চাইল, কী হয়েছিল হরিণের?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন