রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
মন্দার পর্বতে ‘দুর্দান্ত’ নামে একটা সিংহ ছিল। সে ছিল বনের পশুদের রাজা। রাজা হলে কী হবে, সিংহটা ছিল খুব নিষ্ঠুর। সে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে রোজ অনেক পশু বধ করত। একদিন সব পশু মিলে দুর্দান্তের সঙ্গে দেখা করে বলল, ‘প্রভু, এভাবে পশু বধ করতে থাকলে শীঘ্রই এই বন পশুশূন্য হয়ে যাবে। তার চেয়ে আমরা পালা করে রোজ দুপুরে একটি করে পশু পাঠাব আপনার আহারের জন্য।’ সিংহ ভেবে দেখল—ছোটাছুটি না-করেই যদি একটি করে পশু পেয়ে যাই তো মন্দ কি? সে রাজি হল।
সেদিন থেকে এই ব্যবস্থাই চালু হল। এভাবেই দিন চলছিল। এমন সময় একদিন একটা বুড়ো খরগোশের পালা এল। খরগোশ ইচ্ছা করে, হেলেদুলে, ভাবতে ভাবতে চলছিল। এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল। খরগোশ কাছে আসতেই সিংহ গর্জন করে বলল, ‘এই হতভাগা চিমসে বুড়ো, এত দেরি হল কেন?’ খরগোশের মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে বলল, ‘মহারাজ, ক্ষমা করবেন। পথে অন্য এক সিংহ আমায় খাবে বলে ধরে রেখেছিল। সে বলল—সে-নাকি এই বনের রাজা। আমি কোনো রকমে তার কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি।’

তখন সেই দুর্দান্ত নামক সিংহমশায় ভীষণ গর্জন করে বলল, ‘কী, আমার রাজ্যে আর এক সিংহ? কোথায় সেই দূর্বৃত্ত; আমায় সেখানে নিয়ে চল।’ খরগোশ গভীর জঙ্গলে একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে এল তাকে। সেখানে পরিষ্কার জল-ভর্তি একটা কুয়ো ছিল। খরগোশ বলল, ‘দেখুন মহারাজ, আপনাকে দেখে সে এই গুহায় লুকিয়েছে।’ সিংহ কুয়োর জলে নিজের ছায়া দেখে মনে করল সত্যি বুঝি ওই আর একটি সিংহ। রাজা-সিংহ রেগে কেশর ফোলাল, ছায়াও তাই করল; রাজা-সিংহ গর্জন করল, ছায়াও তাই করল। রাজা-সিংহ অপর সিংহকে ধরবার জন্য জলে ঝাঁপ দিল। কুয়োটা বেশি চওড়া ছিল না। কিন্তু গভীর ছিল। তাই রাজা-সিংহ কুয়ো থেকে আর উঠতে পারল না। কুয়োতেই সে মারা গেল।’
গল্প দুটো শেষ করে দমনক বলল, ‘আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। মনে হয়—তাতেই কাজ হবে।’ করটক বলল, ‘তোমার দুর্বুদ্ধির উপর আমার ভরসা আছে। এসো ভাই, যাতে আমাদের মঙ্গল হয়, তার ব্যবস্থা করে এসো।’
দমনক মনে মনে ফন্দি এঁটে গেল পশুরাজ পিঙ্গলকের কাছে। এমন অসময়ে দমনককে দেখে পিঙ্গলক বলল, ‘এমন অসময়ে! কী ব্যাপার?’ দমনক বলল, ‘প্রভু, একটা গোপন খবর দিতে এসেছি। আপনার বন্ধু সঞ্জীবক আর আপনার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন নয়। তার চালচলন দেখে কিছুদিন থেকেই আমার সন্দেহ হচ্ছিল। এখন তার কথা শুনে মনে হল—সে নিজেই এই বনের রাজা হতে চায়। তাতে যদি আপনাকে বধ করতে হয়, তাতেও সে পিছপা হবে না। মন্ত্রী হিসেবে আমার কর্তব্য আপনাকে আগাম খবর দেওয়া—তা-ই খবরটা দিতে এই অসময়ে এলাম।’
দমনকের কথা শুনে পিঙ্গলক কিছুক্ষণ নীরব রইল। পরে একটু চিন্তা করে বলল, ‘যদি তোমার কথাই ঠিক হয়, তবু বলি—সঞ্জীবক আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমি তার কোনো ক্ষতি করতে পারব না।’ দমনক বলল, ‘কিন্তু সঞ্জীবকের কাছ থেকে আপনার বিপদের আশঙ্কা আছে। এ কথা জেনেও যদি আপনি সাবধান না হন, তবে আর আমার কিছু করার নেই।’
পিঙ্গলক আপন মনে চিন্তা করল—পরের কথা শুনে কাউকে দন্ড দেওয়া ঠিক হবে না। যাহোক আমি সাবধানেই থাকব। পরে পিঙ্গলক মন্ত্রী দমনককে বলল, ‘তুমি ভালো করে জেনে নিয়ো—সঞ্জীবক আমার কী ক্ষতি করতে চায়।’ দমনক বলল, ‘প্রভু, আপনি ওর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিমান। কিন্তু গল্পে আছে, সামান্য টিট্টিভি পাখিও সমুদ্রকে পরাজিত করেছিল। শত্রুকে দুর্বল মনে করা ঠিক কাজ হবে না।’ পিঙ্গলক বলল, ‘শুনি, তোমার গল্পটা।’ দমনক বলতে লাগল…
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন