শেয়াল আর হাতি

রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য

ব্রহ্মারণ্যে কর্পূরতিলক নামে এক মস্ত হাতি বাস করত। সেই বনের শেয়ালদের একবার খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছিল। শেয়ালেরা মনে করল—ওই হাতিটাকে মারতে পারলে অন্তত চার মাস আমাদের খাদ্যের ভাবনা থাকত না। তখন এক বুড়ো শেয়াল বলল, ‘বুদ্ধিবলে আমি এই হাতিকে বধ করব।’ এই ভেবে সেই ধূর্ত শেয়াল এক সন্ধায় কর্পূরতিলকের কাছে গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বলল, ‘অধীনের প্রণাম গ্রহণ করুন।’ হাতি ঘাড় ফিরিয়ে শেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কে তুমি? কী চাও?’ শিয়াল বলল, ‘বনের পশুরা সভা করে আপনাকে এই বনের রাজা নির্বাচিত করেছে। তারাই আমায় দূত হিসেবে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। পশুদের রাজা নেই। শাস্ত্রে আছে, অরাজক দেশে বাস করতে নেই। অতএব, আপনি যদি অনুগ্রহ করে রাজপদ গ্রহণে সম্মত হন, তবে এখুনি আমার সঙ্গে চলুন।’

রাজা হওয়ার লোভে কর্পূরতিলক সন্ধ্যার অন্ধকারে সেই ধূর্ত শেয়ালের পেছনে পেছনে চলতে লাগল। যেতে যেতে শেয়াল একটা মজা জলাভূমির উপর দিয়ে চলতে লাগল। সেই পথে চলতে গিয়ে মজা জলাশয়ের নরম মাটিতে কর্পূরতিলকের পাগুলি দেবে গেল। সে আর চলতে পারছে না। বিপদে পড়ে কর্পূরতিলক বলল, ‘এ কোন পথে আমায় নিয়ে এলে। আমি যে আর নড়তে-চড়তে পারছি না।’ শেয়াল তা-ই চেয়েছিল। তাই সে ঠাট্টা করে বলল, ‘পারলে আমার ল্যাজ ধরে উঠে আসুন।’

কর্পূরতিলক আর উঠতে পারল না। কদিন ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে সে মারা গেল। শেয়ালেরা চার মাস ধরে হাতির মাংসের মহাভোজ খেল।

গল্প শেষ করে হিরণ্যক বলল, ‘তাই বলছি বন্ধু, বুঝেসুঝে কাজ করো।’ মন্থর কিন্তু হিরণ্যকের উপদেশ শুনল না। অন্য একটা বড়ো জলাশয়ে যাবার পথ তার জানা ছিল। সে সেই পথ ধরেই চলতে লাগল।

মন্থরের বন্ধুরা বলল, ‘ওকে তো একা যেতে দেওয়া যায় না। এসো আমরাও ওকে অনুসরণ করি।’

অনেকক্ষণ ধরে হেঁটেও মন্থর বেশি দূর যেতে পারেনি। এমন সময় এক ব্যাধ মন্থরকে দেখতে পেল। ব্যাধ মন্থরকে ধরে, দড়ি দিয়ে বেঁধে, কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে চলল। মন্থরের বন্ধুরা হায়! হায়! করে উঠল।

হিরণ্যক বলল, ‘আমাদের পরম মিত্রকে কেউ আমাদের চোখের সামনে ধরে নিয়ে যাবে আর আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখব? না, তা হবে না। এই ব্যাধ বন পার হয়ে যাবার আগেই আমরা মন্থরকে ছাড়িয়ে আনব।’ লঘুপতন আর চিত্রাঙ্গ বলল, ‘আমরাও তাই চাই। একটা উপায় বলো।’

হিরণ্যক তখন তাদের কানে কানে একটা উপায়ের কথা বলল। চিত্রাঙ্গ আর লঘুপতন তা শুনে খুশি হল। তারা হিরণ্যকের পরামর্শমতো কাজ করল—চিত্রাঙ্গ বনের ভেতর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে, ব্যাধকে ছাড়িয়ে, কিছুদূরে পথের পাশে মড়ার ভান করে পড়ে থাকল। লঘুপতন তার উপর বসে এমন ঠোকরাতে লাগল যেন সে মড়া হরিণের চামড়াটাকে ফুটো করে মাংস খেতে চাইছে। মাঝে মাঝে সে আবার কা-কা করে শব্দও করছে।

এদিকে পরিশ্রান্ত ব্যাধ মন্থরকে মাটিতে নামিয়ে রেখে একটা গাছের তলায় বসে বিশ্রাম করছিল। হঠাৎ তার নজরে পড়ল মড়া হরিণটার দিকে। অমনি সে ছুটল কাকটাকে তাড়িয়ে দিয়ে হরিণের চামড়াটা রক্ষা করতে। এই অবসরে হিরণ্যক গিয়ে মন্থরের সব বাঁধন দাঁত দিয়ে কেটে দিল। সে মন্থরকে বলল, ‘এই যে পাশের ডোবাটা দেখছ, ওতেই গিয়ে লুকিয়ে পড়ো।’ মন্থর তাই করল।

ব্যাধকে খুব কাছে আসতে দেখে লঘুপতন চিত্রাদের কানে কানে বলল, ‘উঠে পালাও!’ চিত্রাঙ্গ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে এক দৌড়ে বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল!

হরিণের কান্ড দেখে ব্যাধ তো তাজ্জব হয়ে গেল! সে তখন গাছতলায় ফিরে এল কচ্ছপটাকে নিতে। এসে দেখে কচ্ছপটাও নেই। তখন সে মনে মনে বলল, পন্ডিতেরা ঠিকই বলেছেন:

হাতের-জিনিস ফেলে যেজন দূরের-জিনিস পেতে চায়।

হাতের-জিনিস হারাবে তার, দূরের-জিনিস দূরেই যায়।।

নিজের বোকামিকে ধিক্কার দিতে দিতে সন্ধ্যার আগেই ব্যাধ বন ছেড়ে নিজের বাড়ির পথ ধরল।

অনেকক্ষণ পরে হিরণ্যকের ডাকাডাকিতে মন্থর উঠে এল। বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার চোখে জল এল। ততক্ষণে চিত্রাঙ্গকে ডেকে নিয়ে এল লঘুপতন। চার বন্ধু মিলিত হয়ে আবার মন্থরের সেই পুকুরের পাড়ে গিয়ে যে-যার জায়গায় শুয়ে পড়ল, সেই থেকে তারা ওখানে সুখেই আছে।

‘মিত্রলাভ’ নামক গল্পটি শেষ হতেই রাজপুত্রেরা বিষ্ণুশর্মাকে বলল, ‘গুরুদেব, এমন নীতিপূর্ণ সুন্দর গল্প আমরা আগে কখনও শুনিনি। গল্পটি আমাদের খুব ভালো লেগেছে।’

বিষ্ণুশর্মা বললেন, ‘এসো, আমরা এই প্রার্থনা করি—দেশে দেশে সজ্জনেরা মিত্রলাভ করুন; ধর্মে অবিচল থেকে রাজারা প্রজা পালন করুন; সব দেশ ধনসম্পদে ভরে উঠুক; আর, এই গল্পের নীতিগুলি চিরদিন সকলের মনে জাগরূক থাকুক!’

রাজপুত্রেরা আবার বলল, ‘আচার্যদেব, এর পরে আমরা ‘সুহৃদ্ভেদ’ শুনতে চাই; যে গল্প হবে ‘মিত্রলাভের’ ঠিক বিপরীত।’ বিষ্ণুশর্মা বললেন, ‘বেশ, তাই হবে। কাল থেকে তোমাদের শোনাব সুহৃদ্ভেদের গল্প। যার প্রথম শ্লোকটি হল:

বনের মধ্যে হল মিতালি পশুরাজ আর বলদে।

বিভেদ তাতে ঘটিয়ে দিল ধূর্ত সে-এক শেয়ালে।।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%