নিরীহ ভারুই পাখি

রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য

একবার পাখিরা তাদের দেবতা গরুড়-এর উৎসব করতে সমুদ্রের তীরে যাচ্ছিল। একটা কাক আর একটা ভারুই পাখিও সেই দলে ছিল। ভারী দেহ নিয়ে ভারুই ভালো উড়তে পারে না বলে সে সকলের পিছনে উড়ে আসছিল।

এদিকে এক গোয়ালা মাথায় করে এক হাঁড়ি দই নিয়ে যাচ্ছিল। দুষ্ট কাকটা মাঝে মাঝেই গোয়ালার হাঁড়ি থেকে দই খেয়ে পালাচ্ছিল। অবশেষে গোয়ালা বিরক্ত হয়ে দই-এর হাঁড়ি মাটিতে নামিয়ে উপর দিকে তাকাল। কাক দ্রুত উড়ে অন্য পাখিদের দলে মিশে গিয়েছিল। ততক্ষণে ভারুই পাখি গোয়ালার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। গোয়ালা মনে করল ভারুই পাখিটাই বারে বারে তার হাঁড়ি থেকে দই খাচ্ছিল। তাই সে একটা ঢিল মেরে ভারুই পাখিটাকে মেরে ফেলল।

শুকপাখির গল্প শুনে আমি বললাম, ‘ভাই, তুমি এমন কথা বলছ কেন? আমি ভিন-দেশি হতে পারি, কিন্তু আমি মহারাজ চিত্রবর্ণকে যেমন শ্রদ্ধা করি, তেমনি তোমাকেও শ্রদ্ধা করি। তবে তোমার যখন আমার সঙ্গে যাওয়া পছন্দ নয়, আমি বিদায় নিচ্ছি। এই বলে আমি চলে এলাম। প্রভু, আমার মনে হয় সম্ভবত দু-এক দিনের মধ্যেই শুকপাখি যুদ্ধের বার্তা নিয়ে আপনার কাছে আসবে। এখন আপনার যা করণীয় তা করুন।’

দীর্ঘমুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই হিরণ্যগর্ভের মন্ত্রী চক্রবাক বলল, ‘মহারাজ, দীর্ঘমুখ বিদেশে গিয়ে, বিপদে পড়েও নিজের দেশের আর রাজার গুণগান করেছে। এজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু, এভাবে একটা যুদ্ধ আহ্বান করাটা মোটেই ভালো নয়; এটা তার মূর্খতার পরিচয়।’

মহারাজ হিরণ্যগর্ভ বলল, ‘দীর্ঘমুখ হয়তো কাজটা ভালো করেনি। কিন্তু এখন আমাদের কী কর্তব্য তাই ঠিক করো।’ চক্রবাক বলল, ‘মহারাজ, এখন যা কর্তব্য সে বিষয়ে গোপনে পরামর্শ করতে চাই। কেননা, গোপন-কথা অন্যে জানলে আর গোপনীয়তা থাকে না।’ রাজার আদেশে সকলে সভাঘর ছেড়ে চলে গেল। তখন মন্ত্রী চক্রবাক বলল, ‘জম্বুদ্বীপে একজন দক্ষ গুপ্তচর পাঠানো হোক। প্রয়োজন হলে সে অন্য একজন বিশ্বস্ত গুপ্তচরকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। শত্রুর দেশের যাবতীয় খবর তারা সংগ্রহ করে আপনাকে জানাবে। কারণ, শত্রুর কত ক্ষমতা আর কোথায় তার দুর্বলতা—এসব জানলে যুদ্ধ করা সহজ হবে।’

হিরণ্যগর্ভ বলল, ‘আমার একজন বিশ্বস্ত ও দক্ষ গুপ্তচর আছে।’ চক্রবাক বলল, ‘তা হলে জম্বুদ্বীপের রাজা চিত্রবর্ণের সঙ্গে যুদ্ধে আমাদের জয় সুনিশ্চিত।’

এমন সময় রাজা হিরণ্যগর্ভের এক প্রতিহারী এসে বলল, ‘মহারাজ, জম্বুদ্বীপ থেকে শুক নামে এক দূত এসেছে আপনার সঙ্গে দেখা করতে।’ রাজা কিছু বলার আগেই মন্ত্রী চক্রবাক বলল, ‘আমাদের দূতাবাসে তার বিশ্রামের সুব্যবস্থা করা হোক। পরে রাজা মশায় তাকে ডেকে নেবেন।’ প্রতিহারী সেই ব্যবস্থাই করতে গেল।

চক্রবাক আবার বলল, ‘যুদ্ধ না-করাই ভালো, বিশেষত চিত্রবর্ণের মতো শক্তিমান রাজার বিরুদ্ধে। তবে যুদ্ধ উপস্থিত হলে বীরের মতো যুদ্ধ করাই মহতের লক্ষণ। প্রকৃত নীতিবিদ-বীর, প্রবল শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধের সময়, বিপদ বুঝে কচ্ছপের মতো দেহ গুটিয়ে নেয়। আবার সুযোগ বুঝে হিংস্র সাপের মতো গর্জে উঠে। তাই বলছি—যতদিন না আমাদের দুর্গ তৈরি হচ্ছে, এবং সৈন্য সংগ্রহ করে, খাদ্য মজুত করে, দুর্গ সুরক্ষিত করা হচ্ছে, ততদিন জম্মুদ্বীপের দূত ওই শুকপাখিকে সেবাযত্ন করে, স্বর্ণ-মণি-মুক্তা উপহার দিয়ে, ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করায় বিলম্ব করুন…ততদিনে আপনার গুপ্তচরের কাছ থেকে আমরা খবর পেয়ে যাব।’

রাজা হিরণ্যগর্ভ সেনাপতি সারসকে দুর্গ নির্মাণ করতে আদেশ দিলেন। তিনি বললেন, ‘নিয়মমতো দুর্গ যেন সুরক্ষিত হয়। দুর্গে প্রবেশের এবং নির্গমনের জন্য গুপ্ত দরজা রাখতে হবে। তাছাড়া দুর্গমধ্যে সকলের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করবে।’ ‘যথা আজ্ঞা’, বলে সারস চলে গেল।

এমন সময় এক প্রতিহারী এসে খবর দিল, ‘মহারাজ, মেঘবর্ণ নামে এক কাক কয়েকজন অনুচর নিয়ে এসে আপনার দর্শন প্রার্থনা করছে।’ হিরণ্যগর্ভ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওরা কোন দেশ থেকে এসেছে? কী চায়?’ প্রতিহারী বলল, ‘ওরা বলছে সিংহল দ্বীপ থেকে এসেছে। মেঘবর্ণ সম্ভবত কিছুদিন আপনার রাজ্যে বাস করার অনুমতি চাইবে।’

রাজা হিরণ্যগর্ভ বলল, ‘কাক হল অভিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান পাখি। সুতরাং সে এসে দেখা করতেই পারে। আর, থাকতে চাইলে কিছুদিন থাকতেও পারে।’ মন্ত্রী চক্রবাক বলল, ‘মহারাজ, কাক হচ্ছে স্থলচর পাখি, অর্থাৎ আমাদের বিরুদ্ধ পক্ষের পাখি। অতএব, বিশেষ বিচার-বিবেচনা করে তাকে গ্রহণ করবেন। সে বুদ্ধিমান পাখি ঠিকই, তবে নিজপক্ষ (অর্থাৎ স্থলচর পাখির পক্ষ) ছেড়ে এখানে এসময় কেন এসেছে? বুদ্ধিমান এক শিয়াল নিজপক্ষ ত্যাগ করে অবশেষে দুরবস্থায় পড়েছিল।’

রাজা হিরণ্যগর্ভ বলল, ‘চক্রবাক, তোমার গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। কেননা, এগুলি নীতিমূলক গল্প। তা, শিয়ালের গল্পটা কী?’ চক্রবাক বলতে লাগল…

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%