রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
একবার বর্ষাকালেও তেমন বৃষ্টি হয়নি। বনের মধ্যে হাতিরা যে ডোবার কাছে থাকত, তাতে ছিল মাত্র এক হাঁটু জল। তখন সব হাতিরা মিলে তাদের দলপতিকে বলল, ‘আমরা জলের অভাবে মরতে বসেছি।’
দলপতি খুঁজে-পেতে পাহাড়ের কাছে একটা জলপূর্ণ বড়ো দিঘির খোঁজ পেল। সে সকল হাতিকে নিয়ে রোজ সেই দিঘিতে স্নান করতে আসে।
এই দিঘির চার পাড়ে ছিল খরগোশদের বাস করার গর্ত। তারা হাতিদের পায়ের চাপে মারা যেতে লাগল! খরগোশেরা পড়ল মহা বিপদে। তখন বিজয় নামে এক বুদ্ধিমান খরগোশ বলল, ‘আমি একটা উপায় বার করেছি। আমি হাতিদের তাড়াতে পারব।’
বিজয় নামে খরগোশটা চলল হাতিদের কাছে। যেতে যেতে সে ভাবল, ‘কোন ভরসায় যাচ্ছি হাতিদের কাছে। ওরা আমার কথা না-শুনে নিমেষে পায়ে পিষে আমায় মেরে ফেলতে পারে, বা শুঁড়ে তুলে দূরে ছুড়ে দিতে পারে। অতএব আমি এই ছোটো পাহাড়টার চূড়ায় বসে ওদের সঙ্গে কথা বলি। তাহলে সহজে ওরা আমার নাগাল পাবে না।’
পাহাড়-চূড়ায় বসে বিজয় হাতিদের দলপতিকে ডাকল। দলপতি কাছে আসতেই খরগোশ বলল, ‘দেখো, আমি ভগবান চন্দ্রের দূত। আমিই চন্দ্রের শশক। এজন্য চন্দ্রের নাম শশধর। চন্দ্রদেব আমায় পাঠিয়েছেন তোমাদের একটা কথা বলতে।’
হাতিদের দলপতি একটু ভয় পেয়ে বলল, ‘চন্দ্রদেবের কী আদেশ?’ বিজয় বলল, ‘তোমরা যে প্রতি রাতে গিয়ে চন্দ্র-সরোবরে স্নান করো, তাতে চন্দ্রদেব অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আজ রাতে আকাশের চন্দ্র এই সরোবরে নেমে স্নান করবেন, তোমরা সেখান গিয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে এসো, নইলে বিপদে পড়বে।’
এই বলে খরগোশ চলে এল।
সেদিন ছিল পূর্ণিমা রাত। হাতিরা দিঘির কাছে গিয়ে জলের মধ্যে কম্পমান চাঁদকে দেখল। আসলে তারা জলের মধ্যে চাঁদের ছায়াকেই দেখেছিল। হাতিরা জলের চন্দ্রদেবকে প্রণাম করে বলল, ‘আমরা না-জেনে এই দিঘিতে স্নান করতে আসতাম। আর আসব না। আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন।’ সেই দিন থেকে হাতিরা আর ওখানে আসে না। খরগোশেরা তাই বেঁচে গেল।
হংসরাজ হিরণ্যগর্ভ বলল, ‘ঠিকই বলেছে ওরা; চালাকির সাহায্যে কখনো-কখনো কার্য সিদ্ধি হয়ে বটে। …সে যা হোক—সেই বিন্ধ্যপর্বতে তোমার কী হল বলো শুনি।’
দীর্ঘমুখ বলতে লাগল, ‘আমি বললাম, আমাদের রাজা কখনও কপটতার আশ্রয় নেন না। কেননা, তিনি অতি শক্তিমান এবং ন্যায়পরায়ণ।’ ওদেশের পাখিরা বলল, ‘তাহলে অমন দেশ ছেড়ে এখানে এলি কেন? চল, তোকে আমাদের রাজার কাছে নিয়ে যাই। তিনিই তোর ব্যবস্থা করবেন।’
ওরা আমাকে ধরে ওদের রাজা চিত্রবর্ণের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘মহারাজ, এই দুষ্ট বক আমাদের দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার আপনার নিন্দাও করছে। বলছে, ও নাকি কর্পূর-দ্বীপ থেকে এসেছে দেশভ্রমণ করতে। কে জানে কী মতলব ওর।’
সে-দেশের রাজা চিত্রবর্ণের এক বিজ্ঞ মন্ত্রী হল এক শকুন। তার নাম গৃধ্র। মন্ত্রী গৃধ্র আমায় জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কী? তুমি কোন দেশে বাস করো? তোমাদের রাজার নাম কী? তোমাদের প্রধানমন্ত্রীর নাম কী?’
আমি বললাম, ‘আমার নাম দীর্ঘমুখ। আমি কর্পূরদ্বীপের অধিবাসী। আমাদের রাজার নাম হংসরাজ হিরণ্যগর্ভ। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নাম চক্রবাক।’ আমার কথা শুনে ওদেশের মন্ত্রী গৃধ্র বলল, ‘চক্রবাকের নাম আমি শুনেছি। সে অতি বিচক্ষণ মন্ত্রী।’
গৃধ্র তার রাজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মহারাজ, কর্পূরদ্বীপ এবং এমন ছোটো ছোটো রাজ্যগুলি আসলে আপনার জম্বুদ্বীপের অন্তর্গত, আপনারই অধীন।’
গৃধ্রের কথা শেষ হতেই আমি প্রতিবাদ করে বললাম, ‘যদি মুখের কথাতেই কে-কার অধীন ঠিক করা যায়, তাহলে আমি বলব জম্বুদ্বীপটা আমাদের কর্পূরদ্বীপের রাজা হিরণ্যগর্ভের অধীন।’ আমার কথা শুনে শুক নামে আর এক মন্ত্রী আমায় জিজ্ঞাসা করল, ‘তাহলে মীমাংসা কেমন করে হবে?’ আমি বললাম, ‘যদি আপসে মীমাংসা না হয়, তবে যুদ্ধ করেই মীমাংসা করতে হবে।’ আমার কথা শুনে ওদেশের রাজা চিত্রবর্ণ বলল, ‘তাহলে যাও—তোমাদের রাজাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলো।’ আমিও বললাম, ‘আপনিও প্রস্তুত হোন এবং যুদ্ধের বার্তা নিয়ে দূত পাঠান আমাদের রাজার কাছে।’
রাজা চিত্রবর্ণ বললেন, ‘তোমার সঙ্গেই যাবে দূত হয়ে এই শুকপাখি।’ শুকপাখি বলল, ‘প্রভু, আমি একা যাব। দীর্ঘমুখ-এর মতো কোনো দুর্জনের সঙ্গে যেতে চাই না। অবশ্য, কে দুর্জন, কে সুজন তা বোঝা কঠিন। তবু, দুর্জনের সঙ্গে থাকায় কী কী বিপদ হতে পারে, তার দুটি গল্প শোনাচ্ছি।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন