রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
বারাণসীতে কর্পূরঘটক নামে এক ধোপা ছিল। কাপড়ের বোঝা বইবার জন্য ধোপা একটা গাধা পুষেছিল। গাধাটা যেমন খাটিয়ে তেমনি ছিল প্রভুভক্ত। এই ধোপার একটা পোষা কুকুরও ছিল। কুকুরটা দিনরাত ধোপার বাড়ি পাহারা দিত। তাই, চোর-ডাকাত ধোপার বাড়িতে ঢুকতে পারত না। কাজকর্ম বেশি থাকাতে ধোপা আজকাল আর কুকুরটাকে তেমন আদরযত্ন করার সময় পেত না। কুকুরটা প্রভুভক্ত হলেও আদরযত্ন না-পেয়ে সে তার প্রভুর উপর বেজায় চটেছিল।
এক রাতে ধোপার বাড়িতে চোর ঢুকে সিঁদ কাটছিল। সব দেখেও কুকুরটা চুপচাপ শুয়েই ছিল। তখন গাধা বলল, ‘বন্ধু, চোর সিঁদ কাটছে। প্রভু ঘুমিয়ে পড়েছেন। তুমি চিৎকার করে চোরকে তাড়াও, প্রভুকে জাগাও।’ কুকুর বলল, ‘যে-প্রভু আদরযত্ন করে না, তার সব চুরি হয়ে যাক। আমি দেখেও দেখব না।’ গাধা বলল, ‘এ অন্যায়। তুমি তোমার কর্তব্য করবে না?’ কুকুর বলল, ‘আমার কর্তব্য আমি বুঝব। তোমার তাতে নাক গলাবার দরকার নেই।’
কুকুরের কথা শুনে গাধা ভাবল, তবে আমিই চিৎকার করে প্রভুকে জাগিয়ে দিই। জেগে উঠে তিনিই চোর তাড়াবেন। এই মনে করে গাধা জোরে চিৎকার করতে লাগল। তার বিকট চিৎকারে ধোপার ঘুম ভাঙল বটে, কিন্তু রাতদুপুরে চিৎকার করে ঘুম ভাঙাবার অপরাধে একটা লাঠি দিয়ে গাধাটাকে প্রচন্ড প্রহার করল।’
গল্প শেষ করে করটক বলল, ‘তাই বলি ভাই দমনক, যার কাজ সেই করুক। পশুরাজ পিঙ্গলক আমাদের কোন কাজ দিয়েছেন যে তা পালন করব?’ দমনক বলল, ‘ভাই করটক, অতি সামান্য সৎকাজের ফলে উচ্চতর কাজের যোগ্য হওয়া যায়। নিজের গুণে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। অবশ্য, গুণের সম্মান পেতে অনেক সময় লাগে, দোষী হতে বেশি সময় লাগে না।’
করটক জিজ্ঞাসা করল, ‘এখন আমাদের কী করা উচিত বলে তুমি মনে করো? পিঙ্গলক কোন কারণে চুপচাপ বসে আছেন তার কারণটা কি তুমি আন্দাজ করতে পেরেছ?’ দমনক বলল, ‘আন্দাজ না-করার কোনো কারণ নেই। কথায় বলে—আকার, ইঙ্গিত, চলন-বলন আর চোখ-মুখের বিকৃতি দেখেই কারও মনের ভাব বোঝা যায়। কারণটা জানি বলেই আমি আমার বুদ্ধির বলে প্রভুর মন জয় করব। বুদ্ধিমানেরা অন্যের মনোভাব বুঝেই তার অন্তরে প্রবেশ করে তাকে বশীভূত করে।’ করটক বলল, ‘এখন, এই অসময়ে, তুমি যদি মহারাজ পিঙ্গলকের কাছে যাও, তবে তিনি অসন্তুষ্ট হতে পারেন।’ দমনক বলল, ‘অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি তিরস্কার করতে পারেন জেনেও আমি যাব। কারণ, তার এত ভীত হয়ে পড়ার কারণটা দূর করতে পারলে আমরা নিশ্চয় মন্ত্রিত্ব পাব।’ করটক ঠাট্টা করে বলল, ‘তুমি গিয়ে বলবে, ‘‘প্রভু ভয় পাবেন না।’’ আমরা তো আছি, নাকি?’ দমনক বলল, ‘ঠিক এভাবে নয়। আমায় দেখে তিনি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট তা সহজেই বুঝতে পারব। তা বুঝেই নানা কথার পর তার ভয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করব।’ করটক সাবধান করে দিল, ‘দেখো ভাই, প্রসঙ্গ না-উঠলে রাজার ভয়-ডরের কথা বলতে যেয়ো না।’ দমনক বলল, ‘তুমি আমার উপর ভরসা রাখতে পারো। আর দেরি না-করে, আমি রাজদর্শনে চললাম।’ তখন দমনক, যেন সে কিছুই জানে না, তেমনিভাবে পিঙ্গলকের কাছে এসে প্রণাম করে বলল, ‘মহারাজের জয় হোক!’ পিঙ্গলক বলল, ‘তোমায় অনেক দিন পরে দেখলাম। এসো, বসো। হঠাৎ কী মনে করে এলে, বলো।’ দমনক বসে বলল, ‘মহারাজ, অপরাধ নেবেন না। আমি লক্ষ করেছি—আপনি জলপান করতে গিয়েও জলপান না-করে, কেমন হকচকিয়ে ফিরে এলেন!’ পিঙ্গলক বলল, ‘তুমি বুদ্ধিমান, তাই লক্ষ করেছ। এই গোপন ব্যাপারটা বিশ্বাসী কারো কাছে ছাড়া বলতে পারছি না। তুমি আমার মন্ত্রীপুত্র, তোমাকে বিশ্বাস করেই বলতে ভরসা পাচ্ছি। জলপান করতে গিয়ে আমি কোনো জন্তুর বিকট এক গর্জন শুনলাম। আমাদের এই ‘সুদুর্গ’ বনে আমি জীবনে এমন ভয়ংকর গর্জন শুনিনি। নিশ্চয় কোনো দুর্দান্ত প্রাণী এই বনে এসেছে। ভাবছি এই বন ত্যাগ করব কি-না। তুমি কী বলো?’
দমনক অভয় দিয়ে পিঙ্গলককে বলল, ‘মহারাজ, যতক্ষণ করটক আর আমি বেঁচে আছি, ততক্ষণ কোনো কারণেই আপনাকে এই বন ত্যাগ করতে হবে না। সেই গর্জনকারী প্রাণীটি কে, কেমন সে বলবান—এসব সংবাদ আমি শীঘ্রই আপনাকে এনে দেব। প্রভু, এসব কাজ একা করতে যাওয়া ঠিক নয়। আপনার অনুমতি পেলে আমি করটককে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই।’ পিঙ্গলক অনুমতি দিল।
পিঙ্গলকের কাছ থেকে এসে দমনক সব বলল করটককে। করটক বলল, ‘ভাই দমনক, যার ভয়ে প্রভু ভীত হয়েছেন, তাকে তুমি কেমন করে খুঁজে বার করবে। কে সে, কোথায় থাকে, কেমন শক্তিমান সে—এসব কি তুমি জানো?’ দমনক বলল, ‘জানি, ওটা একটা তৃণভোজী হৃষ্টপুষ্ট সিংওয়ালা বলদ।’ করটক বলল, ‘যদি সব জানো, তবে পিঙ্গলককে বললে না কেন?’ দমনক বলল, ‘আরে বোকা, একথা তখনি বলে দিলে তোমার-আমার কদর থাকবে না প্রভুর কাছে। একটা গল্পে আছে—প্রভুকে কখনও ভয়শূন্য করতে নেই। প্রভুকে ভয়শূন্য করলে আমাদের অবস্থা সেই বিড়ালের মতো হবে।’ শোনো গল্পটা…
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন