রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
বর্ণানুক্রমে উদ্ধৃত হিতোপদেশ-এর কতক শ্লোক
সংস্কৃত ভাষার নিয়মে—শ্লোকের মধ্যে সন্ধি নিত্য, অর্থাৎ সন্ধি করতেই হবে। সন্ধিবদ্ধ পদ দিয়েই সংস্কৃত শ্লোকের ‘অক্ষর’ (syllable) এবং ছন্দ রক্ষা করা হয়। তাছাড়া, বিশেষত সংস্কৃত শ্লোকের মধ্যে (বাক্যের) পদগুলি বসাবার নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। একটা উদাহরণ দেখো:
বরমেকো গুণী পুত্রো ন চ মূর্খশতান্যপি।
একশ্চন্দ্রস্তমো হন্তি ন চ তারাগণে পি চ।। প্র/১৭
সন্ধি: বরম-একঃ। মূর্খশতানি-অপি। একঃ-চন্দ্রঃ-তমঃ।
তারাগণঃ-অপি।
গদ্য: একঃ গুণী পুত্রঃ বরম, ন চ মূর্খশতানি অপি।
একঃ চন্দ্রঃ তমঃ হন্তি, তারাগণঃ অপি ন চ।।
অর্থাৎ: শত মূর্খ পুত্রের চেয়ে একজন গুণী পুত্র থাকাও ভালো।
একটি চাঁদই অন্ধকার দূর করে, তারাসমূহ তা পারে না।
সংস্কৃত শ্লোকের উচ্চারণ-কঠিন সন্ধিবদ্ধ পদগুলিকে (হাইফেন দিয়ে) বিযুক্ত করে লেখা হল:
অঞ্জনস্য ক্ষয়ং দৃষ্ট বস্মীকস্য চ সঞ্চয়ম।
অবন্ধ্যং দিবসং কুর্যাদ দান-অধ্যয়ন-কর্মসু।। সু/১০
—চোখের কাজল (আমাদের অজান্তে) মুছে যায়, উইঢিবি অলক্ষিতেই বেড়ে যায়—এসব বিবেচনা করে, দান, অধ্যয়ন, আর (শুভ) কাজ করে দিনগুলিকে সফল করবে।
অয়ং নিজঃ পরো বেতি গণনা লঘুচেতসাম।
উদারচরিতানাং তু বসুধা-এব কুটুম্বকম।। মি/৭১
—এ আমার, ও হল পরের—এরকম চিন্তা লঘু (নীচু) মনের পরিচায়ক। যাঁদের মন উদার (অর্থাৎ যাঁরা আপন-পর ভেদ করেন না) তাঁরা এই পৃথিবীর সকলকেই আত্মীয় (কুটুম্ব) জ্ঞান করেন।
অরৌ-অপি-উচিতম কার্যম-আতিথ্যম গৃহম-আগতে।
ছেত্তু: পার্শ্বগতাং ছায়াং ন-উপসংহরতে দ্রুমা:।। মি/৫৯
—শত্রুও যদি বাড়িতে আসে, তাকে আতিথ্য দেওয়া অর্থাৎ, আপ্যায়ন করা উচিত। যে-লোক গাছটিকে কাটছে, গাছ কিন্তু লোকটির উপর থেকে নিজের (গাছের) ছায়াটা সরিয়ে নিচ্ছে না।
অলব্ধং চ-এব লিপ্সেত লব্ধং রক্ষেত-অবেক্ষয়া।
রক্ষিতং বর্ধয়েৎ সম্যগ বৃদ্ধং তীর্থেষু নিক্ষিপেৎ।। মি/৭১
—যা (যে শুভকর জিনিস এখনও) পাওনি, তা পেতে চেষ্টা করে যাবে; যা পাওয়া গেছে তা সযত্নে রক্ষা করবে। এই রক্ষিত (ধন) আরও বাড়াবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন সৎপাত্রে (বা তীর্থস্থানের উন্নতিকল্পে) দান করবে।
অহিত-হিত-বিচারশূন্য-বুদ্ধে:
শ্রুতিসময়ৈ:-বহুভি:-তিরস্কৃতস্য।
উদর-ভরণ-মাত্র-কেবল-ইচ্ছো:
পুরুষ-পশোশ্চ পশোশ্চ কো বিশেষঃ।। সু/৪৫
—কোনটা হিতকর, কোনটা অহিতকর, এ বিষয়ে যার বোধ নেই; যে বেদবিধি মানে না, যে কেবল পেটপুরে খেয়েই জীবন কাটাতে চায়—এমন পশুতুল্য লোক আর পশুতে প্রভেদ কী?
আকারৈ:-ইঙ্গিতৈ:-গত্যা চেষ্টয়া ভাষণেন চ।
নেত্র-বক্ত্র-বিকারেণ লক্ষ্যতে:-অন্তর্গতং মনঃ।। সু/৫০
—আকার, ইঙ্গিত, চলন (গতি), কাজ (চেষ্টা), কথা (ভাষণ) আর চোখ-মুখের বিকৃতি দেখেই (মানুষের) মনোভাব ধরা পড়ে। [বক্ত্র = মুখ]।
আত্মনঃ-চ পরেষাং চ যঃ সমীক্ষ্য বলাবলম।
অন্তরং ন-এব জানাতি স তিরস্ক্রিয়তে-অরিভি:।। সু/৮
—যে ব্যক্তি নিজের বল এবং পরের (শত্রুর) বলাবলের পার্থক্য বুঝতে পারে না, সে ব্যক্তি শত্রুর দ্বারা পরাভূত (তিরস্কারপ্রাপ্ত) হয়।
ঈর্ষ্যী ঘৃণী তু-অসন্তুষ্টঃ ক্রোধনো নিত্য-শঙ্কিতঃ।
পরভোগ্যঃ উপজীবী চ ষট-এতে দুঃখভাগিনঃ।। মি/২৫
—পরশ্রীকাতর (ঈর্ষাপরায়ণ), ঘৃণাপরায়ণ, (সকল বিষয়ে) অসন্তুষ্ট, অতি রাগী (ক্রোধপরায়ণ), সর্বদা আশঙ্কাপরায়ণ এবং পরের খেয়ে জীবনধারণ করে যে—এই ছ-রকম (চরিত্রের) লোক চিরকাল দুঃখ ভোগ করে থাকে।
উৎসবে ব্যসনে চ-ইব দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবে।
রাজদ্বারে শ্মশানে চ যঃ তিষ্ঠতি স বান্ধবঃ।। মি/৭৪
—(কারও) আনন্দ-উৎসবে, বিপদে (ব্যসনে), দুর্ভিক্ষের সময়ে, (দেশে) রাজনীতিক বিপ্লবের সময়ে, (আদালতে বিচারের সময়ে) রাজদ্বারে এবং (আত্মীয়-বিয়োগের সময়) শ্মশানে যে-জন (সর্বদা) উপস্থিত থাকে সেইজন হল প্রকৃত বন্ধু (বান্ধব)।
উদ্যমেন হি সিদ্ধন্তি কার্যাণি ন মনোরথৈ:।
ন হি সুপ্তস্য সিংহস্য প্রবিশন্তি মুখে মৃগা:।। মি/৩৬
—উদ্যম এবং যথোচিত চেষ্টার ফলেই সকল কার্য সিদ্ধ হয়—কেবল মনে মনে ইচ্ছা করলে কার্য সম্পন্ন হয় না। ঘুমন্ত (সুপ্ত) সিংহের মুখে আপনা-আপনি তার খাদ্যযোগ্য কোনো পশু এসে ঢুকে যায় না (অর্থাৎ সিংহকে যথেষ্ট উদ্যমী হয়ে পশু শিকার করে খেতে হয়)। [মৃগা: = পশুগুলি]
উদ্যোগিনং পুরুষ-সিংহম-উপৈতি লক্ষ্মী:।
দৈবেন দেয়ম-ইতি কাপুরুষা বদন্তি।। মি/৩১
—যে ব্যক্তি সিংহের মতো অতি উদ্যমশীল, লক্ষ্মী তাকেই আশ্রয় করেন (অর্থাৎ সেই ব্যক্তিই লক্ষ্মীর বর লাভ করেন)। দৈবই ধনসম্পদ দিয়ে থাকেন—এমন কথা কাপুরুষেরা বলে।
ক্ষুদ্রশত্রু:-ভবেৎ-যঃ-তু বিক্রমাৎ-ন-এব-লভ্যতে।
তম-আহন্তুম পুরস্কার্যঃ সদৃশঃ-তস্য সৈনিকঃ।। সু/৮৪
—শত্রু যদি এতই ক্ষুদ্র হয় যে তাকে বিক্রমের দ্বারা ধরাই যাচ্ছে না, তা হলে তাকে বধ করার জন্য (আহন্তুম) ওর যোগ্য কোনো সৈনিককে নিযুক্ত (পুরস্কার্য) করা উচিত।
জলবিন্দু-নিপাতেন ক্রমশঃ পূর্যতে ঘটঃ।
স হেতু: সর্ব-বিদ্যানাং ধর্মস্য চ ধনস্য চ।। সু/১১
—বিন্দু বিন্দু জল পড়ে ঘট জলপূর্ণ হয়; এভাবেই (একটু একটু করে) বিদ্যা, ধর্ম, ধন ইত্যাদি লাভ করতে হয় (অর্থাৎ, এসব অল্প দিনের চেষ্টায় লাভ করা যায় না।)
তাবৎ ভয়স্য ভেতব্যং যাবদ-ভয়ম-অনাগতম।
আগতং তু ভয়ং বীক্ষ্য প্রহর্তব্যম-অভীতবৎ।। সু/১৭
—যতক্ষণ ভয় (বা ভয়ের কারণ) উপস্থিত না হয়, (মনে) ততক্ষণই ভয় থাকে (ভয় থাকা সঙ্গত); ভয় এসে উপস্থিত হয়েছে দেখলে সাহসী (অ-ভীতবৎ) হয়ে তাকে প্রত্যাঘাত করা উচিত।
তৃণানি ন-উন্মূলয়তি প্রভঞ্জনো
মৃদুনি চৈ: প্রণতানি সর্বতঃ।
সমুচ্ছিতান-এব তরূন প্রবাধতে
মহান মহত্যেব করোতি বিক্রমম।। সু/৪
—(স্বভাবে) কোমল এবং নমনীয়ভাবে সবদিকে নত-হওয়া তৃণকে প্রবল ঝড়বায়ু উচ্ছেদ করে না; (বায়ু) কেবল উচ্চ বৃক্ষকেই আঘাত করে। যে প্রবল, সে প্রবলের প্রতিই বিক্রম দেখায়।
দক্ষঃ শ্রিয়ম-অধিগচ্ছতি পথ্যাশী কল্যতাং সুখম-অরোগী।
উদ্যুক্তঃ বিদ্যান্তং ধর্ম-অর্থ-যশাংসি চ বিনীতঃ।। বি/১১৩
—দক্ষ লোক (দক্ষতার গুণে) সমৃদ্ধি লাভ করে; উত্তম (সুষম) আহার করলে রোগ হয় না; নীরোগ লোক সুখী হয়। উদ্যোগী লোক সকল বিদ্যা আয়ত্ত করে (এবং) বিনয়ী হয়ে ধর্ম-অর্থ-যশ অর্জন করে।
দুর্জনঃ প্রিয়বাদী চ ন-এতৎ বিশ্বাসকারণম।
মধু তিষ্ঠতি জিহ্বাগ্রে হৃদি হলাহলং বিষম।। সু/৮৩
—প্রিয়বাদী (অর্থাৎ স্তাবক) হলেও দুর্জনকে বিশ্বাস করার কারণ নেই। কেননা, তার মুখে মিষ্ট কথা, কিন্তু মনে তীব্র বিষ।
দুর্জন-দূষিত-মনসঃ সুজনেষু-অপি নাস্তি বিশ্বাসঃ।
বালঃ পায়স-দগ্ধো দধি-অপি ফুৎকৃত্য ভক্ষয়তি।। স/১০৮
—দুর্জনের ব্যবহারে একবার যার মন দূষিত হয়েছে (অর্থাৎ যে একবার ঠকেছে) সে আর সুজনকেও বিশ্বাস করে না। গরম পায়স খেয়ে যে বালকের জিভ পুড়েছে, সে দই খেতেও ফু দিয়ে (ঠাণ্ডা করে) খায়!
দুর্জনেন সমং সখ্যং প্রীতিং চ-অপি ন কারয়েৎ।
উষ্ণো দহতি চ-অঙ্গারঃ শীতঃ কৃষ্ণায়তে করম।। মি/৮১
—দুর্জনের সঙ্গে কখনো বন্ধুত্ব করতে নেই। (যেমন) উষ্ণ অঙ্গারকে ধরতে গেলে হাত পোড়াবে, শীতল অঙ্গারকে ধরলে সে (তোমার) হাত কালো করবে। (এই হল দুর্জনের লক্ষণ)।
ধনবান-ইতি হি মদঃ-তে কিং গতবিভবো বিষাদম-উপযাসি।
কর-নিহত-কন্দুক-সমা: পাতোৎপাতা মনুষ্যাণাম।। মি/১৭৭
—ধন আছে বলে গর্বের কারণ নেই। ধনহীন হলেও মনস্তাপের কারণ নেই; কেননা মানুষের উত্থান-পতন ঠিক যেন হাতের বল (কন্দুক) মাটিতে ছোড়াছুড়ির মতো (একবার উঠে, একবার মাটিতে পড়ে)।
ধনানি জীবিতং চ-এব পরার্থে প্রাজ্ঞঃ উৎসৃজেৎ।
সন্নিমিত্তং বরং ত্যাগো বিনাশে নিয়তে সতি।। বি/১০০
—প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ‘ধন’ এবং ‘প্রাণ’ পরের জন্য উৎসর্গ করবেন। (কেননা) দেহের ধ্বংস যখন অনিবার্য তখন সৎকাজের জন্য (সন্নিমিত্তং) দেহত্যাগ করাই ভালো।
ন কশ্চিৎ কস্যচিৎ-মিত্রং ন কশ্চিৎ কস্যচিৎ-রিপু:।
ব্যবহারেণ মিত্রাণি জায়ন্তে রিপবঃ-তথা।। মি/৭২
—কেউ কারও বন্ধু নয়, কেউ কারও শত্রু (রিপু) নয়; ব্যবহারের (আচরণের) কারণে একে অন্যের বন্ধু অথবা শত্রু হয়ে থাকে।
ন-অভিষেকঃ ন সংস্কারঃ সিংহস্য ক্রিয়তে মৃগৈ:।
বিক্রম-অর্জিত-রাজ্যস্য স্বয়ম-এব মৃগেন্দ্রতা।। সু/১৯
—বনের পশুরা সিংহকে অভিষেক করে (বা অন্য কোনো রাজকীয় অনুষ্ঠান করে) সিংহাসনে বসায় না। সিংহ নিজ বিক্রমের দ্বারা অর্জিত রাজ্যের মৃগরাজ পদ লাভ করে।
পয়ঃ-পানং ভুজঙ্গানং কেবলং বিষ-বর্ধনম।
উপদেশো হি মূর্খাণাং প্রকোপায় ন শান্তয়ে।। বি/৪
—সাপকে দুধ পান করালেও (যেমন) তার বিষই বাড়ে, (তেমনি) সদুপদেশ দিলেও মূর্খদের ক্রোধ কমে না (বেড়েই যায়)।
পরোক্ষে কার্য-হন্তারং প্রত্যক্ষে প্রিয়বাদিনম।
বর্জয়েৎ তাদৃশং মিত্রং বিষকুম্ভং পয়োমুখম।। মি/৭৮
—অসাক্ষাতে (গোপনে) তোমার কাজের ক্ষতি করে, সাক্ষাতে মিষ্ট কথা বলে—এমন বন্ধুকে ত্যাগ করো। কেননা এ হল—ভিতরে বিষ-ভরা উপরে (সামান্য) দুধ-রাখা (মাটির) হাঁড়ির মতো।
বালাৎ-অপি গ্রহীতব্যং যুক্তম-উক্তম মনীষিভি:।
রবে:-অবিষয়ে কিং ন প্রদীপস্য প্রকাশনম।। মু/৭৯
—যুক্তিপূর্ণ হলে বালকের কথাও মনীষীরা গ্রহণ করেন। সূর্য যখন থাকে না তখন প্রদীপের আলো কি সব দেখায় না? [এখানে বালকের যুক্তিযুক্ত কথার সঙ্গে প্রদীপের আলোর তুলনা করা হয়েছে। (অবিষয়ে = অনুপস্থিতির সময়)।]
বালো বা যদি বা বৃদ্ধো যুবা বা গৃহম-আগতঃ।
তস্য পূজা বিধাতব্যা সর্বত্র-অভ্যাগতঃ গুরু।। মি/১০৮
—বালক হোক, বৃদ্ধ হোক বা যুবক হোক—(অতিথি হয়ে) যে (বাড়িতে) আসে, তাকে অভ্যর্থনা (পূজা) করা কর্তব্য; (কেননা) অভ্যাগত (অতিথি) মাত্রই গুরু (পূজনীয়)।
বিদ্যা দদাতি বিনয়ং বিনয়াদ যাতি পাত্রতাম।
পাত্রত্বাৎ-ধনম-আপ্নোতি ধনাৎ-ধর্মং ততঃ সুখম।। প্র/৬
—বিদ্যা বিনয় দান করে; বিনয় থেকে সকল কাজের যোগ্যপাত্র হওয়া যায়? যোগ্যপাত্র হলে ধন অর্জন করা যায়; ধন থাকলে ধর্ম অর্জন করা যায় এবং এই ধর্ম থেকেই (পরিণামে) সুখ লাভ হয়।
মনসি-অন্যৎ-বচসি-অন্যৎ কার্যম-অন্যৎ-দুরাত্মনাম।
মনসি-একং বচসি-একং কর্মণি-একং মহাত্মনাম।। মি/১০২
—দুরাত্মাদের মনে এক, কথায় আর এক এবং কাজকর্মে অন্য আর এক হয়; কিন্তু মহাত্মাগণের মনে, কথায় এবং কাজে একই হয়ে থাকে। [দুরাত্মা আর মহাত্মার এই পার্থক্য]
মাতৃবৎ পরদারেষু পরদ্রব্যেষু লোষ্টবৎ।
আত্মবৎ সর্বভূতেষু যঃ পশ্যতি স পন্ডিতঃ।। মি/১৪
—যিনি অন্যের স্ত্রীকে মায়ের মতো দেখেন, পরের জিনিসকে মাটির ঢেলার মতো দেখেন (অর্থাৎ পরের দ্রব্যে লোভ করেন না), এবং সকল মানুষকে (জীবকে) ঈশ্বরের জীব মনে করেন, তিনিই প্রকৃত পন্ডিত। [লোষ্টবৎ যার লোষ্ট্রবৎ একই কথা]
মূর্খঃ-অপি শোভতে তাবৎ সভায়াং বস্ত্রবেষ্টিতঃ।
তাবৎ-চ শোভতে মূর্খো যাবৎ কিঞ্চিৎ-ন ভাষতে।। প্র/৪০
—মূর্খ লোকও পরিপাটি পোশাকে সজ্জিত হয়ে (গুণীদের) সভায় ততক্ষণই বসতে পারে, যতক্ষণ সে কিছু কথা না বলে। (কেননা, কথা বললেই তার মূর্খতা ধরা পড়বে)।
যঃ স্বভাবো হি যস্য-অস্তি স নিত্যং দুরতিক্রমঃ।
শ্বা যদি ক্রিয়তে রাজা তৎ কিং ন-অশ্নাতি-উপানহম।। বি/৫৮
—যার যা স্বভাব তা অতিক্রম করা তার পক্ষে অসাধ্য। (উদাহরণস্বরূপ বলা যায়) কুকুরকে যদি ‘রাজা’ করা হয়, তাহলেও সে কি (চামড়ার) জুতো চিবোবে না? [উপানহ = জুতা]
যথা মৃৎ-পিন্ডতঃ কর্তা কুরুতে যৎ-যৎ-ইচ্ছতি।
এবম-আত্মকৃতং কর্ম মানবং প্রতিপদ্যতে।। প্র/৩৪
—কর্তা (এখানে কুম্ভকার) যেমন মাটির তাল (মৃৎপিন্ড) দিয়ে যেমন ইচ্ছা তেমন তেমন জিনিস গড়ে, তেমনি (অন্য) মানুষও নিজের কর্ম অনুসারেই ফল পেয়ে থাকে (প্রতিপদ্যতে)।
যস্য নাস্তি স্বয়ং প্রজ্ঞা শাস্ত্রং তস্য করোতি কিম।
লোচনাভ্যাং বিহীনস্য দর্পণঃ কিং করিষ্যতি।। বি/১১৯
—যার নিজের জ্ঞানবুদ্ধি নেই, শাস্ত্র তার কী (উপকার) করবে? (তেমনি) যার চোখদুটি নেই (অর্থাৎ অন্ধ) তার আয়নায় কী কাজ?
যস্য মিত্রেণ সংভাষা যস্য মিত্রেণ সংস্থিতি:।
যস্য মিত্রেণ সংলাপঃ ততঃ নাস্তি-ইহ পুণ্যবান।। মি/৩৯
—এ জগতে তার মতো সৌভাগ্যবান (পুণ্যবান) আর কেউ নেই—যার (সর্বদা) বন্ধুর সঙ্গে কথা হয়, বন্ধুর কাছাকাছি থাকা হয়, বন্ধুর সঙ্গে নিভৃতে মনের ভাব বিনিময় হয়।
যঃ-অধিকাৎ-যোজনশতাৎ পশ্যতি-ইহ-আমিষম।
স এব প্রাপ্তকালঃ-তু পাশবন্ধং ন পশ্যতি।। মি/৫০
—যে পাখি শত যোজন দূর (উঁচু) থেকেও নিজের খাদ্যবস্তু দেখতে পায়, মৃত্যুকাল উপস্থিত হলে সেই পাখি (কাছে থেকেও) পাখি-ধরা জালটি (পাশবন্ধটি) দেখতে পায় না। [আমিষ = মংস, খাদ্যপ্রাণী]
যো ধ্রুবাণি পরিত্যজ্য অধ্রুবাণি নিষেবতে।
ধ্রুবাণি তস্য নশ্যন্তি অধ্রুবং নষ্টমেব হি।। মি/২১২
—যে (ব্যক্তি) নিশ্চিত-প্রাপ্য বস্তুকে (=ধ্রুবাণি) ছেড়ে দিয়ে অনিশ্চিত বস্তুকে পেতে চায়, সে তার নিশ্চিত-প্রাপ্য বস্তুকে তো হারাবেই, অনিশ্চিত বস্তুকেও হারাবে।
ষড় দোষা: পুরুষেণ-ইহ হাতব্যা ভূতিম-ইচ্ছতা।
নিদ্রা তন্দ্রা ভয়ং ক্রোধ আলস্যং দীর্ঘসূত্রতা।। মি/৩৪
—যে ব্যক্তি নিজের মঙ্গল চায়, সে—নিদ্রা, তন্দ্রা (ঘুমঘুম ভাব), ভয়, ক্রোধ (রাগ), আলস্য এবং দীর্ঘসূত্রতা (কাজে অহেতুক বিলম্ব করা) এই ছ-টি দোষ পরিত্যাগ করে চলবে। [হাতব্য = বর্জনীয়]
সহসা বিদধীত ন ক্রিয়াম-অবিবেকঃ পরম-আপদাং পদম।
বৃণতে হি বিমৃশ্য-কারিণং গুণলুব্ধা: স্বয়ম-এব সম্পদঃ।। স/১০৩
—হঠাৎ (অর্থাৎ বিশেষ বিবেচনা না করে) কোনো কাজ করবে না; বিবেচনাহীনতা সকল অনর্থের কারণ। যারা বিচার-বিবেচনা করে কাজ করে সম্পদলক্ষ্মী স্বয়ং তাদের বরণ করেন।
সেবিতব্যো মহাবৃক্ষঃ ফলচ্ছায়া-সমন্বিতঃ।
যদি দৈবাৎ ফলং নাস্তি চ্ছায়া কেন নিবার্যতে।। বি/১০
—ফল এবং ছায়া দেয় এমন বিশাল (বা উপকারী গাছকে সেবাযত্ন করা উচিত। যদি দৈববশত (সেই গাছ) ফল না দেয়, (তার) ছায়াটাকে কে বাধা দেবে?
স্বেদিতো মর্দিতঃ-চ-এব রজ্জুভি: পরিবেষ্টিতঃ।
মুক্তো দ্বাদশভি:-বর্ষৈ: শ্ব-পুচ্ছঃ প্রকৃতিং গতঃ।। সু/১৩৬
—কুকুরের ল্যাজকে বারো বছর ধরে গরম সেঁক দিলে বা (তেল) মাজলে বা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার পর ছেড়ে দিলেই, সে তার স্বভাববশত বেঁকেই থাকবে। অর্থাৎ কারো স্বভাব জোর করে বদলানো যায় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন