রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
গোদাবরী নদীর তীরে এক নির্জন মাঠে একটা বিশাল শিমুলগাছ ছিল। বিকেল হতেই চারদিক থেকে যত পাখিরা, বিশেষত কাকেরা, এসে এই গাছে আশ্রয় নিত। এই গাছেই লঘুপতন নামে একটি বুদ্ধিমান কাক বাসা বেঁধে বাস করত। লঘুপতন খুব ভোরে জেগে উঠে কা-কা করে ডেকে অন্য পাখিদের জাগিয়ে দিত। পাখিরা জেগে উঠে দূর দূর বনে বা গ্রামে চলে যেত খাদ্যের খোঁজে।
একদিন অতিভোরে জেগে লঘুপতন দেখতে পেল—দূরে বনের কাছে ঘাসে-ঢাকা মাঠে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই সেই লোকটি ঘাসের উপর সূক্ষ্ম একটা পাখি-ধরা জাল বিছিয়ে দিল। তারপর সে সেই জালের উপর মুঠো মুঠো চাল ছড়িয়ে দিয়ে বনের মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল।
লঘুপতনের বুঝতে কষ্ট হল না যে, লোকটি হল পাখি-শিকারি ব্যাধ। লঘুপতন তখন কা-কা করে ডেকে সব পাখিকে জাগিয়ে দিয়ে বলল, ‘শোনো, ওই মাঠটায় এক শিকারি জাল বিছিয়ে তার উপর চাল ছড়িয়ে রেখেছে। তোমরা কেউ ওখানে চাল খেতে যেয়ো না।’ পাখিরা বলল, ‘না সর্দার, আমরা ওখানে চাল খেতে যাব না।’ এই বলে তারা দূর-দূরান্তে চলে গেল।

লঘুপতন একা সেই শিমুলগাছে বসে থাকল। সে ভাবল, ভুল করে যদি কোনো কাক ওখানে চাল খেতে যায়, তবে তাকে সাবধান করে দিতে হবে।
এমন সময় একঝাঁক পায়রা উড়তে উড়তে ওই দিকেই যাচ্ছিল। পায়রাগুলি দেখতে পেল নীচে অনেক চাল পড়ে আছে। পায়রাগুলি তাদের দলপতিকে বলল, ‘দ্যাখো, নীচে কত চাল পড়ে আছে। আমাদের খিদেও পেয়েছে। আমরা নীচে নেমে চাল খাব।’ পায়রাদের দলপতির নাম চিত্রগ্রীব। চিত্রগ্রীব বলল, ‘আমার সন্দেহ হচ্ছে। এই নির্জন মাঠে এত চাল আসবে কোথা থেকে। এর মধ্যে নিশ্চয় কোনো বিপদ লুকিয়ে আছে। তাই ওখানে না-নামাই সংগত মনে করি।’
পায়রাগুলি বলল, ‘এত সন্দেহ করলে, আমরা খিদের জ্বালায় মারা পড়ব।’ চিত্রগ্রীব বলল, ‘খিদেয় কিছু কষ্ট পাওয়া আর শিকারির ফাঁদে ধরা পড়া—এর মধ্যে কোনটা ভালো? আমাদের অবস্থা সেই লোভী পথিকের মতো না-হয়।’ পায়রাগুলি বলল, ‘কী হয়েছিল লোভী পথিকের?’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন