নীলবর্ণ শিয়ালের কথা

রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য

কোনো এক বনে অতিচালাক এক শিয়াল বাস করত। সে মাঝে মাঝে গ্রামে ঢুকে লোকের হাঁস-মুরগি চুরি করত। এক রাতে সে গ্রামে গিয়ে ধোপাদের নীল-গোলা বিরাট একটা গামলায় পড়ে গিয়েছিল। সারারাত অনেক চেষ্টা করেও সে গামলা থেকে উঠে আসতে পারেনি।

ভোরে ধোবারা সেই গামলার কাছে আসতেই শিয়াল মড়ার ভান করে পড়ে থাকল। ধোপারাও তাকে মরা মনে করে বনের কাছে ফেলে গেল। ছাড়া পেয়ে শিয়াল বনের ভিতরে ঢুকে গেল। সেখানে একটা নালার জলে নিজের ছায়া দেখে সে চমকে উঠল। কেননা, সারারাত নীল-গোলা জলে পড়ে থেকে তার গায়ের রং নীল হয়ে গিয়েছিল। তার মনে একটা দুষ্ট বুদ্ধি জাগল। বনের পশুদের কাছে গিয়ে সে বলল, ‘দেখো ভাইসব, বনদেবী তুষ্ট হয়ে বনের পাতা-লতার রস দিয়ে আমায় অভিষিক্ত করে, তোমাদের রাজা করে দিয়েছেন। আজ থেকে আমি তোমাদের রাজা। তোমরা আমার প্রজা। পশুপাখি যা শিকার করবে রাজাকে তার একভাগ খাজনা রোজ দিয়ে যাবে।’

বাঘ সিংহ নেকড়ে হায়না শিয়াল প্রভৃতি বনের সব হিংস্র পশুই নীলবর্ণ শিয়ালকে রাজা বলে মেনে নিল। কেবল, শিয়ালদের মনে কিছু সন্দেহ থেকে গেল। একদিন এক বুড়ো শিয়াল সকলকে বলল, ‘আজ সন্ধ্যায় আমরা সকলে রাজার কাছে গিয়ে একসঙ্গে ডেকে উঠব। তখন দেখব রাজা কী করে।’

সন্ধে হতে-না-হতেই সব শিয়াল রাজবাড়ির কাছে জড়ো হয়ে হুক্কা-হুয়া ডাকতে লাগল। স্বভাববশত, সেই নীলবর্ণ রাজাও হুক্কা-হুয়া ডেকে উঠল। তখন বনের বাঘ-সিংহ এসে প্রতারক রাজাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিল।

একটু থেমে চক্রবাক আবার বলল, ‘মহারাজ, এজন্যই বলছিলাম জ্ঞাতিদের দুর্বলতা জ্ঞাতিরাই ভালো জানে। এজন্য, দূত পাঠিয়ে, শত্রুপক্ষের কাউকে বশ করে তাদের দুর্বলতা জেনে নিয়ে যুদ্ধে নামতে হয়।’

রাজা হিরণ্যগর্ভ বলল, ‘তা-ই হবে। এখন জম্বুদ্বীপের রাজা চিত্রবর্ণের দূত শুক পাখিকে, আর সিংহল দ্বীপ থেকে আসা মেঘবর্ণকে এখানে নিয়ে এসো।’ রাজার আদেশে তারা এসে সভায় বসল। বসেই শুকপাখি বলতে লাগল, ‘নষ্ট করার মতো আর সময় আমার নেই। তাই বলছি, মহারাজ হিরণ্যগর্ভ যদি প্রাণে বাঁচতে চান, তবে আমাদের জম্বুদ্বীপের রাজা চিত্রবর্ণের বশ্যতা স্বীকার করুন।’

রাজা হিরণ্যগর্ভ ঠাণ্ডা মাথায় বলল, ‘দেখো বাপু, রাজনীতির নিয়মে দূত হল অবধ্য। তাই তোমাকে বধ করার আদেশ দিচ্ছি না। কিন্তু গলাধাক্কা দিয়ে বার করে দিতে বাধা নেই। তুমি এখনি এদেশ ছেড়ে চলে যাও।’

মেঘবর্ণ বলল, ‘আমি যদিও বিদেশি, তবু মহারাজ হিরণ্যগর্ভকে অপমানসূচক কথা বলার সমুচিত শাস্তি এই শুকপাখিকে এখনি দিতে পারি।’

শুকপাখি বলল, ‘আমি এখনি এদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’

শুকপাখি জম্বুদ্বীপের বিন্ধ্যপর্বতে গিয়ে রাজা চিত্রবর্ণের সঙ্গে দেখা করে বলল, ‘মহারাজ, কর্পূরদ্বীপ স্বর্গের মতোই সুন্দর দেশ। এই দেশটি আপনার অধীন থাকা উচিত। আমি মনে করি, মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করে আপনি কর্পূরদ্বীপ অধিকার করার আয়োজন করুন।’

চিত্রবর্ণের এক প্রাজ্ঞ মন্ত্রী হল গৃধ্র নামে এক শকুন। গৃধ্রকে চিত্রবর্ণ যুদ্ধের কথা বলল। গৃধ্র বলল, ‘মহারাজ, যুদ্ধে জয় লাভ করতে হলে চাই কুশলী যুদ্ধনীতিজ্ঞ পন্ডিতদের পরামর্শ, উপযুক্ত সংখ্যক বীর সৈনিক আর প্রচুর ধনবল।’ রাজা চিত্রবর্ণ বলল, ‘ধনজন আমি দেখব, আপনি আমার সৈন্যবল পরীক্ষা করে বলুন, এই সৈন্যদল নিয়ে যুদ্ধে কতটা সাফল্য পাওয়া যাবে।’ গৃধ্র বলল, ‘সৈন্যবল ঠিকই আছে। তবে শুধু সৈন্যবল দিয়ে নয়, কূটকৌশলও চাই।’ চিত্রবর্ণ বলল, ‘সৈন্যবল ঠিক থাকলেই হল, অন্য কিছু ভাবি না।’ গৃধ্র বলল, ‘যুদ্ধের আশঙ্কা আমি আগেই করেছিলাম। তবে ওই যে বললেন, ‘অন্য কিছু ভাবি না—সেটা কতটা কার্যকরী এখনই বলতে পারছি না।’

অপরদিকে, কর্পূরদ্বীপের রাজা হিরণ্যগর্ভের চর চক্রবাক এসে বলল, ‘মহারাজ, জম্বুদ্বীপের রাজা চিত্রবর্ণ সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসছে। তার সঙ্গে আছে প্রাজ্ঞ ও যুদ্ধনীতিজ্ঞ মন্ত্রী গৃধ্র। গোপনে খবর পেয়েছি, গৃধ্র আমাদের দলের একজনকে ইতিমধ্যেই বশ করেছে। আমার মনে হয়, সিংহলদ্বীপবাসী মেঘবর্ণ নামক কাকই সেই বিশ্বাসঘাতক। তার বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।’

হিরণ্যগর্ভ বলল, ‘না, চক্রবাক। মেঘবর্ণ আমাদের বন্ধুস্থানীয়। সে কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করবে বলে মনে করি না। তাছাড়া, যুদ্ধের ঘটনা ঘটবার আগেই সে এসেছে।’

চক্রবাক বলল, ‘প্রভু, শত্রুপক্ষ এসে আমাদের দুর্গদ্বার অবরোধ করার আগেই তাদের ধ্বংস করার জন্য আমাদের সারস প্রভৃতি সেনাপতিদের এখনি পাঠানো উচিত বলে মনে করি।’

হংসরাজ হিরণ্যগর্ভের আদেশে তার বীর সেনাপতি সৈন্যদল নিয়ে অতর্কিতে আক্রমণ করে চিত্রবর্ণের সৈন্যদের একেবারে ছারখার করে দিল।

তখন ছত্রভঙ্গ সৈন্যদল নিয়ে বিমর্ষ চিত্রবর্ণ তার দূরদর্শী মন্ত্রী গৃধ্রকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মন্ত্রী, এমন কেন হল? আমাদের পরিকল্পনায় কি কিছু ত্রুটি ছিল?’ গৃধ্র বলল, ‘মহারাজ, লোকে বলে, নীতিবিদ্যা আর যুদ্ধবিদ্যা—এই দুইকে যে আশ্রয় করে সে যুদ্ধে বিজয়ী হয়। আপনি কেবল যুদ্ধবিদ্যার উপর ভরসা করেছেন, নীতিশাস্ত্রের উপর এবং নীতিজ্ঞ মন্ত্রীদের পরামর্শ নেননি, তাই এমন ফল হল।’ রাজা চিত্রবর্ণ বলল, ‘আপনাদের উপদেশ গ্রাহ্য না-করাতেই আমার এই বিপদ হয়েছে। এখন যে অল্পসংখ্যক সৈন্য আছে, তাদের সাহায্যে যাতে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারি তার উপদেশ দিন।’

গৃধ্র বলল, ‘ভয় পাবেন না। যে সংখ্যক সৈন্য আছে, তাদের দিয়েই হিরণ্যগর্ভের দুর্গদ্বার অবরোধ করার ব্যবস্থা করুন। যুদ্ধ আর তেমন করতে হবে না—সে ব্যবস্থা আমি আগে থেকেই মেঘবর্ণ নামক এক কপট দূতের সাহায্যে করে রেখেছি।’

গভীর রাতে চিত্রবর্ণের সৈন্যরা গিয়ে হিরণ্যগর্ভের দুর্গের মুখ অবরুদ্ধ করে দাঁড়াল। ঠিক সে-সময় মেঘবর্ণ এবং অন্য কাকেরা হিরণ্যগর্ভের দুর্গের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিল। আগুনের ভয়ে দুর্গের মধ্যে ভয়ার্ত চিৎকার শুরু হল। আর, কাকেরা চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘হিরণ্যগর্ভের দুর্গের পতন ঘটেছে।’

আগুন দেখে রাজা হিরণ্যগর্ভের অনেক সেনা জলে ঝাঁপ দিয়ে পালাল। এমন সময় হিরণ্যগর্ভ আর তার বিশ্বস্ত সেনাপতি সারসকে আক্রমণ করল চিত্রবর্ণের বন্য-কুক্কুটেরা। বিপদ বুঝে হিরণ্যগর্ভ তার মন্ত্রী সারসকে বলল, ‘মন্ত্রী, তুমি জলে গিয়ে প্রাণ বাঁচাও।’ সারস বলল, ‘আমি আপনার প্রধান সেনাপতি। আমাকে বধ না-করে শত্রুসৈন্য আপনার ক্ষতি করতে পারবে না।’

চিত্রবর্ণের কুক্কুট সৈন্যরা এসে হিরণ্যগর্ভের গায়ে নখের আঁচড় দিয়ে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগল। সারস ক্রমে নিজের শরীর আড়াল করে হিরণ্যগর্ভকে রক্ষা করতে লাগল। অবশেষে নিরুপায় দেখে, সারস তাদের রাজা হিরণ্যগর্ভকে ঠেলে হ্রদের জলে ফেলে দিল। হিরণ্যগর্ভ অনেক ক্ষত নিয়েও জলে নেমে বেঁচে গেল। এদিকে সারসের লম্বা ঠোঁটের আঘাতে অনেক কুক্কুট-সেনা মারা যেতে লাগল। তখন চারদিক থেকে রাজা চিত্রবর্ণের অন্য সৈনিকরা একসঙ্গে আঘাত করে সেনাপতি সারসকে মেরে ফেলল।

রাজা চিত্রবর্ণ এখন আহত ও পলায়িত রাজা হিরণ্যগর্ভের দুর্গে ঢুকে দুর্গের সব জিনিস অধিকার করে নিল। দুর্গবাসীরা সকলে চিত্রবর্ণের সৈন্যদের হাতে বন্দি হল।

‘বিগ্রহ’ নামক গল্প শেষ করে বিষ্ণুশর্মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘কেমন লাগল গল্পটা?’’ রাজপুত্রেরা একসঙ্গে বলে উঠল, ‘খুব ভালো। যুদ্ধ করতে হলে কী কী নীতি অনুসরণ করতে হয়, তা-ও বুঝলাম। আমাদের মনে হয়—এই যুদ্ধে ‘সেনাপতি সারস’ই প্রকৃত বীর। কেননা, সে প্রাণ দিয়েও তার প্রভুকে বাঁচিয়েছে।’

বিষ্ণুশর্মা বললেন, ‘বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে যে বীর প্রাণ দেয়, সে অক্ষয় স্বর্গ লাভ করে। আমি এই আশা করি—রাজারা যেন নীতি এবং মন্ত্রণাকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে শত্রুদের গিরিগুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য করেন।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%