রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
ইরাবতী নদীর তীরে একটা বটগাছে অনেক বক বাসা বেঁধে থাকত। সেই গাছের নীচের একটা গর্তে একটা বড়ো সাপের বাসাও ছিল। বকেরা নদীর জলে মাছ ধরতে গেলে সেই সাপ এসে বকের ছানাদের খেয়ে ফেলত। এসব দুঃখের কথা বকেরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত। এমন সময় অন্য কোনো এক পাখি তাদের একটা বুদ্ধি দিল।
নদীর তীর থেকে বেশ খানিকটা দূরে জঙ্গলের মধ্যে একটা গর্তে একটা বেজি থাকত। বকেরা ছোটো ছোটো মাছ ঠোঁটে করে নিয়ে সেই বেজির গর্তের মুখ থেকে সাপের গর্তের মুখ পর্যন্ত বিছিয়ে রাখল। বেজি মাছ খায়। তা ছাড়া বেজি হল সাপের ভীষণ শত্রু। গর্ত থেকে বের হয়ে বেজি মাছ খেতে খেতে সেই বটগাছের তলায় এসে পৌঁছল। তারপর বেজি সাপের গর্তটা দেখতে পেল। সে গর্ত থেকে টেনে সাপটাকে বের করে মেরে ফেলল। বকেরা ডালে বসে তা দেখে খুশি হয়েছিল। কিন্তু তাদের খুশি বেশিক্ষণের জন্য নয়। বেজি বটগাছের তলা থেকেই উপরে পাখি-ছানার কিচিরমিচির ডাক শুনল। তাই সে গাছে উঠে সব বকের ছানা খেয়ে ফেলল।

‘এজন্যই বলছি আগুপিছু ভেবে সব কাজ করতে হয়।’
কম্বুগ্রীব বলল, ‘আমি এত বোকা নই যে আকাশ-পথে যেতে যেতে মুখ খুলে নিজের মরণ ডেকে আনব।’ হাঁস দুটি বলল, ‘আমরা আগে থেকেই তোমায় সাবধান করে দিলাম। ওতে কিছু মনে করো না। চলো তবে রাত থাকতেই যাত্রা করি।’ কচ্ছপ কম্বুগ্রীব খুশি হল।
দুটি হাঁসের ঠোঁটে চেপে-রাখা একটা শক্ত কাঠিতে কম্বুগ্রীব কামড়ে ধরে ঝুলতে লাগল। হাঁসেরা উড়ে চলল। হাঁসেরা যত তাড়াতাড়ি অন্য জলাশয়ে পৌঁছোবে ভেবেছিল, তা হল না। কারণ, কচ্ছপটা বেশ ভারী ছিল।
সকাল বেলায় তারা যখন এরকমভাবে একটা মাঠের উপর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন কতকগুলো রাখাল ছেলে ওদের দেখতে পেল। রাখাল ছেলেরা নিজেদের গোরুগুলিকে ছেড়ে উড়ন্ত কচ্ছপের পেছন পেছন ছুটতে লাগল। একটি ছেলে বলল, ‘কচ্ছপটা পড়ে গেলে ওকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে রান্না করে খাব।’ কচ্ছপ এসব শুনছিল। কিন্তু সে চুপ করেই ছিল। অন্য একটি ছেলে বলল, ‘বাড়ি নিতে হবে না। এখানেই আগুন জ্বালিয়ে কচ্ছপটাকে পুড়িয়ে খাব।’ শুনে কচ্ছপের রাগ হল ভীষণ। সে বলতে গেল, ‘তোরা ছাই খাবি।’ কিন্তু তার আর কথাটা বলা হল না। সে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল!
গল্প শেষ হতেই হংসরাজ হিরণ্যগর্ভের সেই দীর্ঘমুখ নামক চর বলল, ‘মহারাজ, আমি বিন্ধ্যাচল থেকে এসেই বলেছিলাম—আপনি দুর্গ-সংস্কার করুন, সৈন্য সংগ্রহ করুন। আপনি তা করেননি। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য। দুর্গে আগুন লাগিয়েছিল মেঘবর্ণ নামে আপনার অতিথি সেই কাক। সে আসলে চিত্রবর্ণের মন্ত্রী গৃধ্রের এক গুপ্তচর।’
রাজা হিরণ্যগর্ভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘শুনেছিলাম বটে, ভালো রকম পরিচয় না-জেনে কাউকে ঘরে ঠাঁই দিতে নেই। আমি যে কাজ করেছি, তাকে বলা যায় গাছের ডালে ঘুমন্ত লোকের মতো—পড়ে-না-গেলে সে জাগে না! আমি তোমাদের কথা না-শুনে, অতিথিকে বন্ধু মনে করে তাকে দুর্গে জায়গা দিয়ে আজ এই দুর্দশায় পড়েছি। যা হোক, মেঘবর্ণ এখন কোথায় আছে?’
দীর্ঘমুখ বলল, ‘আমাদের দুর্গে আগুন লাগিয়ে দিয়ে মেঘবর্ণ সদলে চলে গেছে রাজা চিত্রবর্ণের শিবিরে। চিত্রবর্ণ খুশি হয়ে তাকে তখনই কর্পূরদ্বীপের রাজা করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু চিত্রবর্ণের মন্ত্রী গৃধ্র নিষেধ করে বলল, ‘এ কাজ করবেন না, মহারাজ। বিশ্বাসঘাতকতার কাজ যে করে তাকে সামান্য কিছু পুরস্কার দিতে পারেন; রাজা করে দেওয়া উচিত হবে না। মেঘবর্ণ যে কোনো দিন আপনার ক্ষতি করবে না, তা কে বলতে পারে? তার যা চরিত্র! এমনই এক চরিত্রবান ইঁদুর এক মুনির বরে বাঘ হয়ে একদিন সে মুনিকেই খেতে গিয়েছিল।’
চিত্রবর্ণ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘সে আবার কী রকম কথা!’ গৃধ্র বলল, ‘তবে শুনুন।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন