কৃপণের মৃত্যু

রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য

কল্যাণ নামক এক নগরের প্রান্তে ভৈরব নামে এক ব্যাধ বাস করত। সে ধনুর্বাণ নিয়ে বিন্ধারণ্যে গিয়ে পশুশিকার করত। একদিন ভৈরব একটা হরিণ শিকার করে, পিঠে হরিণটাকে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরছিল। এমন সময় বিশালদেহী এক বুনো শুয়োর তাকে আক্রমণ করল। ভৈরব তীক্ষ্ণ বাণ দিয়ে শুয়োরের বুকে আঘাত করল। বাণবিদ্ধ হয়েও শুয়োরটা এসে ভৈরবের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফলে, শুয়োর মারা গেল, ভৈরবও মারা গেল। সেই সময় ওখান দিয়ে একটা সাপ যাচ্ছিল। ভৈরব আর শুয়োরের পায়ের দাপাদাপিতে সাপটাও মারা গেল।

এমন সময় দীর্ঘরাব নামে এক শেয়াল সেখানে এসে হাজির হল। এতগুলো মৃত জীব দেখে ক্ষুধার্ত শেয়াল মনে মনে বলল—প্রাণীদের দুঃখ যেমন অভাবনীয়, হঠাৎ এসে পড়ে—সুখও তেমনি, হঠাৎ ভাগ্যে জোটে। কে জানত যে, ক্ষুধায় কাতর আমার কপালে আজ এত খাদ্য জুটবে! এই মানুষটার মাংস আমি একমাস ধরে খাব। হরিণ আর শুয়োরের মাংস খাব আরও ছ-মাস ধরে। সাপের মাংসেও একটা দিন চলবে। থাক এগুলো। আজ আমি পশুর শুকনো স্নায়ু দিয়ে তৈরি ধনুকের ছিলাটা খাই। এই বলে সে ধনুকটা তুলে ধরে ছিলাটা চিবোতে লাগল। চিবোতে চিবোতে ছিলাটা যেই ছিঁড়ে গেল, অমনি ধনুকের দন্ডের একটা প্রান্ত শেয়ালের বুকে প্রচন্ড আঘাত করল। তাতেই শেয়ালের সব খাওয়া নিমেষে শেষ হয়ে গেল।’ লঘুপতন বলল, ‘অতিসঞ্চয়ের ফলটা কিপটে শেয়াল ভালোই পেল।’

মন্থর আরও বলল, ‘প্রাণীদের জীবনে কখনও সুখ আসে, কখনও দুঃখ আসে। সুখের সময় সুখ ভোগ করবে, দুঃখের সময় দুঃখকে সহ্য করবে। সুখের সময় প্রচুর ধনের অধিকারী হয়েও গর্বিত হবে না, ধননাশ হলেও দুঃখিত হবে না। জানবে সুখের পর দুঃখ, দুঃখের পর সুখ ক্রমাগত আসে।’ মন্থরের কথা শুনে লঘুপতন আর হিরণ্যক দুজনেই খুশি হল।

এমন সময় একদিন একটা হরিণ প্রাণভয়ে ছুটতে ছুটতে মন্থরের সেই পুকুরের কাছে এসে হাঁপাতে লাগল। হরিণকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে মন্থর, হিরণ্যক আর লঘুপতন ভেবেছিল হরিণটাকে খুব সম্ভব বাঘে তাড়া করেছে। যখন দেখা গেল ওর পিছনে তাড়া করে কেউ আসছে না, তখন তিন বন্ধুই কাছে এসে তাকে বলল, ‘আমরা তিন বন্ধু তোমাকে স্বাগত জানাই। এখানে পুকুরের জল পান করে তুমি সুস্থ হও। তারপর বলো, কীসের ভয়ে তুমি এমন ছুটতে ছুটতে এলে?’

হরিণ বলল, ‘আমার নাম চিত্রাঙ্গ। আমরা বংশানুক্রমে এই বনে বাস করি। আজ ধনুর্বাণ নিয়ে এক ব্যাধ আমায় তাড়া করেছিল। আমি কোনো রকমে পালিয়ে এসেছি। আমি তোমাদের কাছে আশ্রয়প্রার্থী।’

হিরণ্যক বলল, ‘তুমি যে মুহূর্তে এখানে এসে পৌঁছেছ, তখন থেকেই আমাদের বন্ধু হয়েছ। আমি হিরণ্যক, আর লঘুপতন এখানে এসে আমাদের বন্ধু মন্থরের কাছে থাকি। আজ থেকে তুমিও আমাদের বন্ধু। তিন বন্ধু ছিলাম, এখন চার বন্ধু হলাম। এই জায়গাটা বেশ নিরাপদ। তুমি এখানে এই বটগাছের তলায় আশ্রয় নিতে পারো।’

চিত্রাঙ্গ একসঙ্গে তিন-তিনজন বন্ধু পেয়ে মহা খুশি হয়ে ওদের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা জানাল। সেই দিন থেকে চার বন্ধু একসঙ্গে থাকে। লঘুপতন আগের মতোই সকালে উঠে দূরে চলে যায় খাদ্যের খোঁজে, বিকালে ফিরে আসে। চিত্রাঙ্গও সকালে বনে গিয়ে ঘাসপাতা খেয়ে বিকালে ফিরে আসে। তখন চার বন্ধু মিলে কত গল্প করে। এভাবেই তাদের দিন কাটে।

একদিন বন থেকে ফিরে এসে চিত্রাঙ্গ বলল, ‘বনের পশুপাখিরা বলাবলি করছে—কলিঙ্গ দেশের রাজা দিগবিজয় করতে এসে চন্দ্রভাগা নদীর কাছে শিবির স্থাপন করেছেন। আগামী কাল-পরশু তিনি এই পুকুরের তীরে এসে পৌঁছোবেন। অতএব তার আগেই আমাদের অন্য কোথাও চলে যাওয়া উচিত।’

চিত্রাঙ্গের কাছে এই খবর শুনে চার বন্ধুই বেশ ভীত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভীত হয়ে পড়ল মন্থর। সে বলল, ‘কাল সকালেই আমি কোনো বড়ো পুকুরে চলে যাব। তোমরাও স্থানত্যাগ করো।’

হিরণ্যক বলল, ‘অন্য বড়ো জলাশয়ে যেতে পারলে মন্থরের ভালো হবে নিশ্চয়। কিন্তু যাবার সময় পথে কে তাকে রক্ষা করবে? কথায় আছে—জলের প্রাণীর জলই পরম-আশ্রয়স্থল, দুর্গে যারা বাস করে তাদের কাছে দুর্গই শ্রেষ্ঠ আশ্রয়; পশু আর অন্য প্রাণীদের পক্ষে নিজ নিজ বাসস্থানই পরম আশ্রয়। তা না-হলে, কর্পূরতিলকের মতো দুর্দশা ঘটতে পারে।’ লঘুপতন বলল, ‘কে কর্পূরতিলক? তার কী হয়েছিল?’ হিরণ্যক বলতে লাগল…

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%