সিংহ ও ইঁদুর

রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য

উত্তরদেশে এক পর্বতে ‘মহাবিক্রম’ নামে এক সিংহ বাস করত। যেমন নাম, তেমনি ছিল তার বিক্রম। কিন্তু একবার এক ইঁদুরের জ্বালায় সে উত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। মহাবিক্রম যখন তার গুহায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ত, সে-সময় পাহাড়ের ফাটলের ভেতর থেকে একটা নেংটি ইঁদুর এসে সিংহের কেশর কেটে দিত। সিংহ বলবান হয়েও ক্ষুদ্র ইঁদুরের সঙ্গে পেরে উঠত না। তাকে ধরতে গেলে পাহাড়ের অসংখ্য ফাটলের মধ্যে কোনো একটাতে সে ফুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ত। তখন সিংহ ভাবল:

শত্রু যদি ক্ষুদ্র হয়, ধরতে পারা শক্ত।

আনতে হবে সৈন্য এক তারি উপযুক্ত।।

তখন মহাবিক্রম, দধিকর্ণ নামে একটা বিড়ালকে এনে গুহায় পুষতে লাগল। সিংহ রোজ রোজ যত প্রাণী শিকার করে, তারই কিছু মাংস এনে বিড়ালটাকে খেতে দিত।

এখন ফাটলের ভিতর থেকে ইঁদুরটা কিচকিচ শব্দ করে, কিন্তু বিড়ালের ভয়ে সে আর গুহাতে ঢুকতে সাহস পায় না। মহাবিক্রম এখন সুখে ঘুমোতে পারে। ইঁদুরে এসে তার কেশর কেটে দিতে পারে না। এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। সিংহ তখন আর ইঁদুরের কিচকিচ শব্দ শুনতে পায় না। সিংহ ভাবল, বিড়াল সম্ভবত ইঁদুরটাকে মেরে খেয়েছে। তাহলে আর বিড়ালটাকে পুষি কেন? এই ভেবে সিংহ সেদিন থেকে বিড়ালটাকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিল। বেচারা বিড়াল মনের দুঃখে আর খিদের জ্বালায় গুহা ছেড়ে চলে গেল।’

গল্প শেষ করে দমনক আবার বলল, ‘বুঝলে ভাই, প্রভুর কাছে তোমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই তিনি তোমায় তাড়িয়ে দেবেন। অতএব প্রভুর ভয়ের কারণটা যতদিন থাকবে ততদিন আমাদের আদরযত্ন থাকবে।’ করটক হেসে বলল, ‘বেশ, তোমার কথাতেই আমি রাজি। চলো, সেই বলদের কাছে যাওয়া যাক।’

দমনক আর করটক গেল সঞ্জীবকের কাছে। কিছুদূরে একটা গাছের তলায় করটককে পায়ের উপর পা রেখে বসিয়ে রেখে দমনক একাই গেল সঞ্জীবকের কাছে। সে সঞ্জীবককে বলল, ‘রাজা পিঙ্গলক নামক সিংহ যাকে এই বন-রক্ষার ভার দিয়েছেন, সেই সেনাপতি করটক আদেশ করেছেন—আপনি শীঘ্র এসে তার সঙ্গে দেখা করুন। নইলে সমূহ বিপদ।’ সঞ্জীবক বলল, ‘কে বনের রাজা, কে তার সেনাপতি—আমি তা জানি না। আমায় কী করতে হবে বলো। বনে যখন থাকব, তখন বনের রাজা আর তার সেনাপতিকে তুষ্ট রেখেই থাকতে হবে।’ দমনক বলল, ‘কোনো ভয় নেই। সেনাপতি করটক আমার ভাই ও বন্ধু। আমার নাম দমনক। আমি মহারাজ পিঙ্গলকের প্রধানমন্ত্রী। মহারাজ আমাদের কথামতোই কাজ করে থাকেন। আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন পিঙ্গলকের কাছে। আমরা তার সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দেব। বন্ধুত্ব করিয়ে দেব। রাজার বন্ধু হলে বনের সব প্রাণী আপনাকে সমীহ করে চলবে। আসুন।’

সঞ্জীবককে সঙ্গে নিয়ে দমনক আর করটক গেল পিঙ্গলকের আস্তানার কাছাকাছি। ওরা সঞ্জীবককে বলল, ‘আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন। আমরা রাজামশায়কে আপনার আগমন বার্তা দিয়ে আসি।’ দমনক আর করটক গিয়ে পিঙ্গলককে বলল, ‘মহারাজ, সেই ভয়ংকর প্রাণীকে আমরা নিয়ে এসেছি। সে ভয়ংকর বটে, তার গর্জনও ভয়ংকর। তাহলেও আপনি তার গর্জন শুনে মিছামিছি ভয় পাবেন না। একটা গল্পে আছে—একটা ঘণ্টাধ্বনি শুনে এক দেশের সকলে ভয় পেত। অবশেষে এক বুড়ি সেই ঘণ্টাবাদককে আবিষ্কার করে অনেক পুরস্কার পেয়েছিল।’ পিঙ্গলক বলল, ‘তবে তোমার গল্পটা শুনেই যাই দেখা করতে।’ দমনক বলল, ‘শুনুন মহারাজ…’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%