রমেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য
সমুদ্রের তীরে বালির মধ্যে দুটি টিট্টিভি পাখি বাসা বেঁধে বাস করত। কিন্তু যতবার টিট্টিভি তার বাসায় ডিম পাড়ে, ততবার সমুদ্রের ঢেউ এসে ডিমগুলি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাই, টিট্টিভি বলল, ‘এবার চলো আমরা অন্য কোথাও বাসা বাঁধি। এখানে থাকলে এবারও সমুদ্র এসে ডিমগুলি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।’ টিট্টিভি বলল, ‘না। আমাদের এই পুরোনো বাসা ছেড়ে আমরা কোথাও যাব না। এবার সমুদ্র এসে ডিম নিলে আমি তা সহ্য করব না।’ কিন্তু এবারও তাদের ডিমগুলি সমুদ্রের ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। টিট্টিভি মনের দুঃখে কাঁদতে লাগল।
তখন টিট্টিভি অন্য সব পাখিদের খবর দিল। সব পাখি এসে বলল, ‘এটা কিন্তু সমুদ্রের অন্যায় হচ্ছে। চলো আমরা আমাদের রাজা গরুড় পাখির কাছে গিয়ে সমুদ্রের নামে নালিশ করি। সকল পাখি গিয়ে গরুড়ের কাছে নালিশ জানাল। গরুড় পাখি হল ভগবান নারায়ণের বাহন। গরুড় গিয়ে নারায়ণকে সব কথা বলে বিচার চাইল। নারায়ণ তখনি সমুদ্রকে আদেশ দিলেন, ‘টিট্টিভির সব ডিম ফিরিয়ে দাও।’ নিরুপায় হয়ে সমুদ্র তখন সব ডিম ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হল।’
গল্প শেষ করে দমনক আবার বলল, ‘মহারাজ, তাই বলছি—বন্ধু যদি শত্রু হয়, সে বড়ো ভয়ানক হয়।’ পিঙ্গলক মনে মনে ভয় পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘সঞ্জীবক কখন আমার ক্ষতি করতে আসবে কেমন করে বুঝব?’ দমনক বলল, ‘যখন দেখবেন যে সে তার শিং বাগিয়ে আপনার দিকে আসছে, তখন বুঝবেন তার উদ্দেশ্যটা কী?’ এই বলে দমনক বিদায় নিল।

পিঙ্গলকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দমনক গেল সঞ্জীবকের কাছে। সঞ্জীবক তাকে বসতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘সব কুশল তো? এই অসময়ে আপনাকে আসতে দেখে ভাবনা হচ্ছে।’ দমনক বলল, ‘আমাদের মতো রাজভৃত্যের আর কুশল কোথায়? দেখুন, সমুদ্রের জলে ডুবে যেতে যেতে কেউ যদি সামনে একটা সাপ দেখে, তবে তাকে ধরেই বাঁচবে কিনা ভেবে বিচলিত হয়। আমার অবস্থাও তেমনি। আমিই প্রভু পিঙ্গলকের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। আমার কাছে আপনারা দুজনই সমান সম্মানের পাত্র। আজ মহারাজ আপনার সম্বন্ধে যে কথা বললেন, তাতে আমি খুবই বিচলিত। মন্ত্রী হিসেবে রাজার গোপন কথা অন্যকে বলা অনুচিত। কিন্তু আপনাকে না-বলে পারি না। তাই এই অসময়ে ছুটে এলাম। মহারাজ পিঙ্গলক কোনো কারণে আপনার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। পারলে তিনি এখনি এসে আপনাকে বধ করতেন। কিন্তু ‘বন্ধু হত্যা মহাপাপ’ বলে তাকে আপাতত শান্ত করে এসেছি। আমার উপদেশ যদি শোনেন, তবে এখনি আপনি এই বন ছেড়ে চলে যান।’
সঞ্জীবক মনে মনে ভাবল, ‘এসব ধূর্ত শিয়ালের চালাকি কিনা কে জানে।’ মুখে বলল, ‘পিঙ্গলকের ব্যবহার দেখে তো আমার এসব মনে হয়নি কখনও। যা হোক, সংবাদটা দেবার জন্য ধন্যবাদ। কী বিপদেই না-পড়লাম। দেখো, ক্ষমতার লোভে বা সমানে সমানে শত্রুতা হয়। আমার তো কোনো লোভ নেই। বনের রাজা পিঙ্গলকের সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতাও নেই। তবে তিনি আমায় বধ করবেন কেন?’
দমনক কোনো উত্তর দিল না। সঞ্জীবক আবার বলল, ‘দেখো ভাই দমনক আমি এই বন ছেড়ে পালাব না। কেননা, শাস্ত্রে আছে—যুদ্ধে মৃত্যু হলে স্বর্গলাভ, জয় হলে মহাগৌরব।’
দমনক বলল, ‘ঠিকই বলেছেন—মৃত্যু অথবা জয়—এই হল বীরের কাম্য। তাই হোক।’ সঞ্জীবক জিজ্ঞাসা করল, ‘বনের নিয়ম আমার জানা নেই। আচ্ছা, কেমন করে বুঝব যে পিঙ্গলক আমায় আক্রমণ করতে চাইছে?’ দমনক বলল, ‘যখন পশুরাজ পিঙ্গলক ল্যাজ উঁচুতে করে, সামনের দু-পা তুলে হাঁ করে গর্জন করে উঠবে, তখন আপনি বুঝবেন যে আপনার মৃত্যু অনিবার্য। ওইটুকু সময়ের মধ্যে যা করার করবেন। আমি বিদায় নিচ্ছি।’
দমনক আবার ফিরে এল পিঙ্গলকের কাছে। বলল, ‘মহারাজ, আমি সঞ্জীবককে বন ছেড়ে চলে যাবার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি যাবেন না। বরং আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন। সম্ভবত অন্য দিনের মতো রাত পোহালেই তিনি এসে হাজির হবেন।’
পরদিন সকালে সঞ্জীবক এল। পশুরাজ পিঙ্গলক প্রস্তুত হয়েই ছিল। সঞ্জীবক কাছে আসতেই পিঙ্গলক তাকে আক্রমণ করল। তৃণভোজী সঞ্জীবক সিংহের এক আঘাতেই মারা গেল।
গল্প শেষ করে বিষ্ণুশর্মা রাজকুমারদের বললেন, ‘দেখলে তো দুর্জনেরা নিজেদের স্বার্থে কেমন করে বন্ধুদের বা সুহৃদদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়।’ রাজপুত্রেরা বলল, ‘চমৎকার গল্পটি। এ থেকে আমরা লোকচরিত্র সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পারলাম।’
বিষ্ণুশর্মা বললেন, ‘এসো, আমরা এই প্রার্থনা করি বন্ধুতে বন্ধুতে যেন বিচ্ছেদ না-ঘটে। দেশের লোক যেন সুখে বাস করে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন