সঞ্জয় ভট্টাচার্য
মোমবাতিটা জ্বলতে জ্বলতে একসময় নিঃশেষ হয়ে গেল। রাত যে কত গভীর হয়েছে এই দমবন্ধ করা পরিবেশে তা বোঝা যাচ্ছে না, আমি গভীর চিন্তানিমগ্ন অবস্থায় খাটের উপর বসে পরিস্থিতি তলিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি। মাঝে মধ্যেই ভারী পায়ের শব্দ ঘুরে ফিরে আসছে। আমাকে শুধু ঘরে বন্দি করেই তপন ক্ষান্ত হয়নি, রাত জেগে রীতিমতো নজরদারিও চালাচ্ছে। খেলা শেষ হওয়ার আগে ও তা হলে ঢিলে দিতে রাজি নয়! কাল বলি দেওয়ার পর নিশ্চয়ই তপন তার কুকর্মের সাক্ষী রাখবে না, নিজেকে আর ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য ঝুঁকি আমাকে নিতেই হবে, মনে মনে তৈরি হলাম।
বাথরুমে এক বালতি জল তখনও অবশিষ্ট ছিল। সেটা তুলে এনে দরজার সামনে মেঝেতে ঢেলে দিলাম। চৌকাঠ ডিঙিয়ে জল দরজার বাইরে গড়িয়ে গেল। সামান্য পরে একটা পায়ের শব্দ দ্রুত বারান্দার অন্য প্রান্তে চলে গেল, বুঝলাম বৃন্দাবন তপনকে ডেকে আনতে গেল। একটু পরে জোড়া পায়ের ব্যস্ত পদশব্দ শোনা গেল, তারপর তপনের রুক্ষ স্বর কানে এল—'জয়ন্ত জল কোথা থেকে আসছে'? আমি অ্যালুমিনিয়ামের বালতিটা শক্ত হাতে ধরে দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। তপন আবার জিগ্যেস করল—'জয়ন্ত উত্তর দে'! আমি সাড়াশব্দ না করে তেমনি দাড়িয়ে রইলাম। এবার টের পেলাম কেউ চাবি ঘুরিয়ে তালা খুলছে, আমি বালতিটা শক্ত হাতে ধরে তৈরি হলাম। দরজা খুলে গেল। একমুহূর্ত ইতস্তত করে একটা ছায়ামূর্তি ভিতরে প্রবেশ করল। যথাসম্ভব জোরে হাতের বালতিটা দিয়ে ছায়ামূর্তির মাথায় আঘাত করলাম। লোকটি বিকট শব্দ করে মেঝেতে চিৎপাত হয়ে পড়ল। যদিও ছুটে বের হতে বাধা পেলাম। তপন দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, ওর হাতের উদ্যত পিস্তলটা সোজা আমার দিকে তাগ করা। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে বালতিটাকে বোঁ করে ঘুরিয়ে তপনের মাথায় আঘাত হানলাম। তপন সতর্কই ছিল সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নিল। ঠাণ্ডা গলায় বলল—'পাগলামি করিস না জয়ন্ত, ট্রিগারে চাপ পরে গেলে কি হত বলত'? আমি ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম—'তপন তুই বিশ্বাসঘাতক? বন্দুক দেখিয়ে আমাকে দিয়ে মার্ডার করাতে চাস? এত নীচ তুই'? তপন সামান্য হাসল—'উপরে উঠতে গেলে তো একটু নীচে নামতেই হয়! তবে তোর আক্ষেপ রাখব না, বন্ধুত্বের খাতিরে ফেয়ার ডিল হবে! যদি আমাকে ঘায়েল করে সিঁড়ি পর্যন্ত যেতে পারিস তাহলে কথা দিচ্ছি তোর পথ কেউ আটকাবে না'। তপন পিস্তল পকেটে পুরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তপন একসময়ের বক্সিং চ্যাম্পিয়ন। ওকে পরাস্ত করা মুশকিল। তবে কোনওরকমে যদি পিস্তলটা কবজা করতে পারি তা হলে অবশ্য বাজি আমার। একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে মেঝে থেকে বালতিটা তুলে তপনের দিকে ছুড়ে মারলাম। বালতিটা তপনের মুখের উপর আছড়ে পরল। তপন এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না, মুখ থুবড়ে সশব্দে বারান্দার উপর পরল। আমি তপনের উপর ঝাঁপিয়ে পরলাম। উদ্দেশ্য যে করে হোক ওর পকেট থেকে পিস্তলটা হাতিয়ে নেওয়া, তবে এবারে আর সুবিধা করে উঠতে পারলাম না। তপন সামলে উঠেছে। মুষ্টিযোদ্ধার কায়দায় জোরালো ঘুষি সোজা চালিয়ে দিল আমার থুতনির নীচের অংশটায়। দারুণ যাতনায় মনে হল চোয়ালের হাড়টা বুঝি ভাঙল। পরের ঘুষিটা তপন আড়াআড়ি চালাল নাকের ঠিক নীচে, দুই মাড়ির সন্ধিস্থলে, চোখে সর্ষেফুল দেখা কাকে বলে সেদিন বুঝলাম। হুরমুড়িয়ে মেঝেতে পরে গেলাম। প্রাণপণ চেষ্টা করে উঠতে যাচ্ছিলাম, তপনকে বলতে শুনলাম—'অনেক হয়েছে জয়ন্ত আর দরকার নেই'। কষের দুটো দাঁত মাড়ি থেকে ঝুলছিল, জিভেরও খানিকটা কেটে গেছিল, মুখে তাজা রক্তের বুনো গন্ধ যতটা কষ্ট দিচ্ছিল তার থেকেও বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিল তপনের হাতে ঠ্যাঙানি খাওয়ার লজ্জা। মাথা নীচু করে বৃন্দাবনের কাধে ভর দিয়ে সেই পুরোনো ঘরে ফিরত এলাম। সামান্য পরে তপন এল, হাতে একটা সিরিঞ্জ। তপন বলল—'ইনজেকশনটা নিলে রাতে ঘুমোতে পারবি, ব্যাথায় কষ্ট পেতে হবে না'। আমি প্রতিরোধ করলাম না। তপন সিরিঞ্জটা হাতের শিরায় ফুটিয়ে খালি করে দিল।
ইনজেকশনের প্রভাব কাটিয়ে যখন ঘুম ভাঙল টের পেলাম আমি সেই ঘরে বিছানার উপরে শুয়ে, মাথাটা অসহ্য রকম ভারী লাগছিল। হাত ঠেকিয়ে বুঝলাম নাক আর মুখ থেকে প্রচুর রক্ত গড়িয়ে শার্টের উপর জমাট বেঁধে শুকিয়ে গেছে। তৃষ্ণায় শুকিয়ে গলা যেন কাঠের মতো লাগছিল। এখন বোধহয় দিনের সময়, কারণ দরজার ফাঁক দিয়ে আলোর রেখা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছিল। এখন একটু জলের ভীষণ দরকার। খাট ছেড়ে উঠতে গিয়ে বুঝতে পারলাম শরীর অসম্ভব দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোনওরকমে উঠে অন্ধকারের মধ্যে হাতড়াতে লাগলাম যদি কোথাও একটা জলের জগ কি কুঁজো পাওয়া যায়। এদিক-ওদিক হাতড়াতে হাতড়াতে হাতে কি যেন একটা ঠেকল। ধাতুর কোনও জিনিস হাতে ঠেকতেই ঠং করে শব্দ উঠল। তেপায়ার উপর ষ্টীলের একটা গ্লাশ রাখা ছিল সেটা মেঝেতে গড়িয়ে পড়েছে। আওয়াজটা বাইরে অপেক্ষমাণ বৃন্দাবনের কানে গেছে, সে দরজা খুলে আমার দিকে চাইল। ইঙ্গিতে জল চাইলাম। বৃন্দাবন দরজাটা খোলা রেখেই চলে গেল। ওরা বোধহয় বুঝে গেছে, নিজের পায়ে হেটে পালানোর শক্তি আর আমার নেই। একটু পরে বৃন্দাবন জলের গ্লাস নিয়ে এল। জলটা ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিলাম। তেষ্টা মিটল না। আবার জল চাইলাম, বৃন্দাবন উত্তর না দিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে চলে গেল। সামান্য পরে ঘরে তপন এল সঙ্গে বৃন্দাবন, একটা থালায় ডাল-ভাত টেবিলের উপর রেখে তপন বলল—'খেয়ে নে জয়ন্ত'। তপনের হাত থেকে খাবার নিতে ঘৃণা হচ্ছিল, বললাম—'খিদে নেই'। তপন মৃদুস্বরে বলল—'কালকে যা কিছু ঘটল তার জন্য ক্ষমা করে দিস ভাই, এসবের প্রয়োজন কিছুই ছিল না, তুই আমার দিকটা একটু ভেবে দ্যাখ, কতবড় ঝুঁকি আমি নিয়েছি, গত দেড়-দু বছর ছেলেটাকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আমার জীবনের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে, প্রতিদিন নিজের হাতে ওর মলমূত্র পরিষ্কার করছি, আমার সাংবাদিকতার কেরিয়ার চুলোয় গেছে। ব্যাংক ব্যালান্স সামান্য যা ছিল এই দেড় বছরে ডেবিট কার্ড ঘসে ঘসে সব গেছে। এখন শুধু একটাই ভরসা চণ্ডরাজার কৃপায়, যা গেছে যদি ফেরত পাওয়া যায়'। মুখ অন্যদিকে ঘুড়িয়ে বললাম—'যত সব কুসংস্কার'। তপন কিছু বলতে গিয়ে যেন সামলে নিল তারপর ধীরে ধীরে বলল—'ঠিক আছে তাই সই, তোর বিশ্বাস তখন হবে যখন নিজের চোখে দেখবি, আর কোনও আপত্তি না করে একটু কো-অপারেট করে দে ভাই'। বললাম—'তপন আমার মনে আর কোনও ভয় নেই, তুই চাইলে তোর ওই পিস্তলের একটা গুলি খরচা করতেই পারিস কিন্তু আমি একটা অসহায় বাচ্চার গলায় ছুরি বসাচ্ছি না, নেহাত দরকার থাকলে তুই নিজেই করে নে, আমার বিশ্বাস নামে রাজার থেকে যে ভবিষ্যতে রাজা হতে চলেছে, তোর ওই দেবতাটি তার হাতের কাজেই বেশি খুশি হবে'। তপন দীর্ঘশ্বাস ফেলল, বলল—'এখন আড়াইটে বাজে, হাতে আর মোটে তিন ঘন্টা সময় আছে, স্যরি জয়ন্ত বোঝাবার সময় নেই, আমার তাড়া আছে। তুই স্বেচ্ছায় সাহায্য করলে ভালো লাগত, কিন্তু উপায় যখন নেই'। তপন বৃন্দাবনকে ইঙ্গিত করল, দুজনেই এবারে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল, আর দরজাও আগের মতো বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেল। দেওয়ালের কোণে কাঠের জানলাটা বাইরে থেকে পেরেক দিয়ে আঁটা ছিল। সেখানে এবার উপুর্জপরি হাতুড়ির বারি পড়তে লাগল, বারকয়েক ঠোকার পর পাল্লাদুটো আলগা হয়ে খুলে পরল। জানলার বাইরে এবার বৃন্দাবনের মুখ দেখতে পেলাম। ও যেন ওখানে কিছু এনে জড়ো করছে। হঠাৎ গলগল করে ধোয়া ঘরের মধ্যে ঢুকতে শুরু করল, অসহ্য কটু গন্ধে ঘর কানায় কানায় ভরে উঠতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চোখ, গলা তীব্রভাবে জ্বলতে শুরু করল। এটা তপনের আর একটা শয়তানি বুদ্ধির নমুনা, জানলার বাইরে খড় আর শুকনো লংকা পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করছে। বিষাক্ত ধোঁয়ার বৃত্তে নিঃশ্বাস নেওয়া দুরূহ হয়ে পড়ল। প্রচণ্ড কাশির দমকে বুকের ভিতর থেকে এবার দলা দলা কফ আর রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল সেইসঙ্গে থিকথিকে কালো একটা পর্দা যেন অস্থির চোখ দুটোকে ঢেকে দিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন