সঞ্জয় ভট্টাচার্য
মুখের উপর ঠাণ্ডা জলের ঝাপটায় জ্ঞ্যান ফিরত এল। কেউ বালতি ভরে জল গায়ে মাথায় ঢেলে দিয়েছে। ঝাপসা দৃষ্টি মেলে দেখলাম সৈনিকের পোশাক পরা একজন লোক সামনে দাঁড়িয়ে। লোকটা আমার দিকে চেয়ে কাকে যেন হুকুমের সুরে কিসব বলল। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এরা আবার কারা? ধীরে ধীরে চেতনা ফেরত এল। ঘরের ভিতর চোখ চালিয়ে যা দেখলাম তা বেশ অপ্রত্যাশিত। আমাকে এরা আবার একতলার সেই স্টোর রুমটায় নিয়ে এসেছে। ঘরের একটা কোনে তপন চিত হয়ে পরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ওর জামাকাপড় তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তলপেটের কাছটায় গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, বোধহয় ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করেছে। ওদিকে ঘরের অন্য প্রান্তে একটা কাঠের তক্তামতো দিয়ে বেদি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একটা পাথর বসিয়ে তাতে ফুল জল ঢেলে আলখাল্লা পরা একটা লোক পুজো করছে। সৈন্যবেশি লোকটা তীক্ষ্ন চোখে আমাকে জরিপ করছিল। এবারে কৌতুকপূর্ণ কণ্ঠস্বরে বলল—'রাজা মশাইয়ের জ্ঞান ফিরেছে দেখছি। অপদার্থ বন্ধুটির কল্যাণে ফালতু কষ্ট ভোগ করতে হল। তবে যার তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে পস্তাতে তো হবেই'। লোকটা এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমার কতকালের চেনা বন্ধু, অনেকদিন পর হঠাৎ দেখা হয়েছে, জিগ্যেস করলাম—'আপনি কে' লোকটি বিনয় দেখিয়ে বলল—'আমি সামান্য মানুষ, জঙ্গলের একজন জংলিও বলতে পারেন, আপনার বন্ধুর কেরামতি আর নিজের গাফিলতিতে এই শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অধমের নাম সমীরণ মাহাতো'। চমকে উঠলাম! একি সেই কুখ্যাত নকশাল নেতা? সমীরণ মুচকি হেসে বলল—'মনে হচ্ছে রাজামশাই আমার নাম শুনেছেন'। গত চব্বিশ ঘণ্টায় যা কিছু ঘটেছে নতুন করে অবাক হওয়ার ক্ষমতাটাই দেখলাম হারিয়ে ফেলেছি, তপন আমাকে দিয়ে জঘন্য অপরাধ করাতে চাইছিল এখন এই লোকটা বোধহয় আমাকেই খুন করতে চাইবে, আমি চুপ করে পরে রইলাম। সমীরণ হেসে বলল—'তা হলে রাজামশাই বন্ধুর জন্য যে কাজটা করতে যাচ্ছিলেন সেটা এবার একটু আমাদের জন্য করতে হবে যে'।
-'যদি না বলি'।
সমীরণ হাসল, ক্রুর নির্দয় হাসি, বলল—'তা হলে সেটাকে হ্যাঁ করতে আমার লাগবে ঠিক সাড়ে চার মিনিট, আমার প্যান্টের বা পকেটে একটা লোহার প্লাস আছে যেটা দিয়ে প্রথমে আপনার হাতের নখগুলো উপড়ে ফেলব, তাতে যদি কাজ না হয় তাহলে আবার ওই প্লাসের টানেই চোখের পাতা দুটো খুবলে নেব, এরপরেও যদি আপনি হ্যাঁ বলতে দেরি করেন তাহলে, আমার ডান পকেটে একটা ধারালো ক্ষুর আছে সেটা বের করব, ক্ষুরটা আপনার শরীরের বিশেষ অংশে বুলিয়ে সেটাকে কাটছাঁট করব, আর বিশ্বাস করুন এসব কিছু করতে আমার কিন্তু ওই সাড়ে চার মিনিট সময়ের বেশি লাগবে না'। বিশ্বাস করতে অসুবিধে হল না, এই ভয়ংকর লোকটা যা বলল তা নিশ্চয়ই করবে। হতাশায় মনোবল তলানিতে ঠেকল। আর সামান্য কিছু পরে যে আমি, ওই ছেলেটা, তপন কেউই প্রাণে বাঁচব না সেটা একপ্রকার নিশ্চিত, শুধুশুধু প্রতিরোধ করে জীবনের শেষ মুহূর্তটাকে নৃশংস করে তুলতে মন সায় দিল না। নির্জীবের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। সমীরণ করুণার সুরে বলল—'সরি রাজামশাই, নিরপরাধ ব্যক্তির উপর জুলুমবাজি আমাদের নীতি বিরুদ্ধ কিন্তু এখানে সব দোষ আপনার অপদার্থ বন্ধুটার, তা ছাড়া লাস্ট মোমেন্টে একটা জলজ্যান্ত রাজার ছেলে কোথায় পাই বলুন'? সমীরণ এবারে আলখাল্লা পরা লোকটার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল, ভাষা না বুঝলেও, সমীরণ যে লোকটাকে ত্রিলোচন বলে সম্বোধন করছিল সেটা শুনতে পাচ্ছিলাম, এই লোকটাই কি তবে তপনের গল্পের ত্রিলোচন! হবে হয়তো! তপনের নাটকের সবকটা চরিত্রই আজ এখানে হাজির হয়েছে দেখছি। জীবনের শেষ মুহূর্ত নিজের দুর্ভাগ্যের কথা চিন্তা করছিলাম, রাজ বংশের উত্তরাধিকার হিসেবে আমার প্রাপ্য হয়েছে শুধু গোটাকয়েক ভাঙা ইট আর একফালি জমির টুকরো যার বখরা নিয়ে মামলা টানতে টানতে জীবন বরবাদ হতে চলেছে। কেরানির চাকরি করি, মাইনে যা পাই তাতে কষ্টেসৃষ্টে ডাল-ভাত জুটে যায়। রাজভোগ চোখে না দেখলেও, রাজদ্রোহ দেখা অদৃষ্টে ঘটে গেল।
বাড়ির ছাদে এদের একটা লোক বোধহয় মোতায়েন ছিল, লোকটা সিঁড়ি দিয়ে ছুটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে ঝড়ের বেগে কিসব বলতে লাগল, সমীরণ আর তার শাগরেদরা হঠাৎ যেন বেশ চঞ্চল হয়ে পড়ল। আন্দাজ করলাম, পুলিশ বোধহয় কাছাকাছি এসে পড়েছে। সমীরণ ত্রিলোচনকে তাড়া লাগাল—'আর কতক্ষণ বাকি'? ত্রিলোচন শুকনো মুখে বলল আর দশ মিনিট ব্যাস। ফের শুরু হল একঘেয়ে সুরে ত্রিলোচনের মন্ত্রের জপ। মিনিট চারেক এভাবে কাটার পর একটা গমগমে শব্দ বাড়ির আধখসা ইটগুলোকে যেন কাঁপিয়ে দিল। বাইরে থেকে রাশভারী পুরুষকণ্ঠ মাইকে ঘোষণা করতে শুরু করল—'সমীরণ আমরা এই বাড়ি ঘিরে ফেলেছি, পালানোর কোনও পথ নেই। যদি আত্মসমর্পণ কর তাহলে কথা দিচ্ছি প্রানে মারব না'। সমীরণের মুখ দেখে মনে হল না সে বিশেষ বিচলিত হয়েছে। রাইফেল হাতে বন্ধ জানলার সামনে গিয়ে চিৎকার করে বলল—'আমি সমীরণ মাহাতো বলছি, আমরা আত্মসমর্পণ করব, কথা দিচ্ছি গোলাগুলি চলবে না শুধু কুড়ি মিনিট সময় দিন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানানোর জন্য'। সামান্য বিরতির পর বাইরে থেকে আওয়াজটা ফের শোনা গেল—'দশ মিনিট সময় দেওয়া যাবে, কিন্তু কোনওরকম চালাকি করলে গুলি চলবে'। এত কষ্টের মধ্যেও দেখে শ্রদ্ধা হল, সমীরণের মুখে হাসি? এই ঘোর সংকটেও! সমীরণের ইঙ্গিতে আমার হাত, পায়ের বাঁধন কেটে ফেলা হল। বিছানার উপর থেকে ছেলেটাকে দুজন রক্ষী মিলে মেঝেতে একটা চাদর পেতে শুইয়ে দিল। ছেলেটির ভাবলেশহীন চোখে অসীম ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে, ও কিছু বুঝছে কি না কে জানে? ত্রিলোচন দুর্বোধ্য সব মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ছেলেটির কপালে কালো টিপ আর গলায় লাল ফুলের একটা মালা পড়িয়ে দিল। গাঢ় লাল টিপের ফোটা এবার আমার আর সমীরণের কপালেও দেগে দিল। এবারে একটা শান দেওয়া ধারাল ছুরি আমার হাতে তুলে দিয়ে ত্রিলোচন ছেলেটির গলায় কোপ দিতে ইঙ্গিত করল। ছুড়িটা ছেলেটির গলায় হালকা ঠেকিয়ে ধরলাম তবে চাপ দিতে পারলাম না, ত্রিলোচন আমার হাতের উপর নিজের হাত রেখে সামান্য চাপ দিল। ছেলেটি যাতনায় কঁকিয়ে উঠল, একটা অগভীর ক্ষতের সৃষ্টি হল, মাথা নীচু করে চোখ সরিয়ে নিলাম। রক্তের ধারা ছেলেটির গলার ক্ষত থেকে চুইয়ে পড়তে লাগল। ত্রিলোচন একটা হলুদ ফুলে রক্তটা ধরে চণ্ডরাজার পাথরের উপর রেখে সমীরণের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টে চাইল। দু-হাত দিয়ে লম্বা তলোয়ার উঁচিয়ে সমীরণ ছেলেটার দিকে এগিয়ে যেতেই ত্রিলোচন সামনে থেকে সরে গেল। সমীরণ ছেলেটির গলা লক্ষ্য করে তলোয়ার উঁচিয়ে ধরল, ঠিক এসময়েই গুড়ুম করে কানফাটানো শব্দ হল! গুলির আঘাতে সমীরণের একজন স্যাঙাত ধরমড়িয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল, আর এলোপাথাড়ি গুলি ঘরের সর্বত্র বৃষ্টির মতো পড়তে লাগল। পুলিশ বাড়ির কোনও ফাঁকফোঁকর খুঁজে ঢুকে পড়েছে, সমীরণের হাতে গুলি লেগে তলোয়ারটা ছিটকে পরে গেছে, যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে সমীরণ রাইফেলটা তুলতে গেল কিন্তু সুযোগ পেল না, একটা গুলি কপাল ভেদ করে পিছনের দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো ফোটো ফ্রেমটাকে চুরমার করে দিল। সর্দারের আকস্মিক পতনে হতবুদ্ধি স্যাঙাতের দলের এলোমেলো প্রতিরোধ, পুলিশের ঝোড়ো আক্রমণের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। একে একে সমীরণের দলের শেষ যোদ্ধাও ধরাশায়ী হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন