সঞ্জয় ভট্টাচার্য
২৬ জানুয়ারি ২০১৯
২০১৩ নভেম্বর থেকে ২০১৪ জানুয়ারির মাঝের সেই ঝোড়ো দিনগুলির পরে কেটে গেছে আরও পাঁচটা বছর। জীবনে কিছু স্মৃতি কখনো ভুলে যাওয়া সম্ভব হয় না, উচিতও নয়! আর এখানে আমি চাইলেও ভুলতে পারব না, কখনো-সখনো অন্যমনস্কভাবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আগুনে পোড়া নিজের কুৎসিত মুখটা দেখে নিজেই আঁতকে উঠি। আগুনে গলা আর মুখের চামড়া বিশ্রীভাবে পুড়ে গেছে, ঘা শুকোলেও জীবনের মতো দাগ রেখে গেছে। রাজাসাহেব প্লাস্টিক সার্জারির কথা বলেছিলেন, কিন্তু আমার মন চায়নি অহেতুক দান গ্রহণ করতে, তার থেকে এই বেশ ভালো আছি।
আজ ছাব্বিশে জানুয়ারি, প্রতিবছরের মতো এবারেও আমি রেনি পার্কে এসেছি রুদ্রপ্রসাদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ জানাতে, দেবপ্রসাদ আর অরিন্দম খুব ধরে বসল আজকের দিনটা ওদের সঙ্গে কাটিয়ে যেতে কিন্তু সেটা সম্ভব নয়, গেস্ট হাউসে আজ ভিড় উপছে পড়েছে, কুণাল একা সামলাতে পারবে না, ওদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বর্ধমানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, ও হ্যাঁ বলাই হয়নি, নৃপতিপুরের রাজবাড়িকে আমরা একটা গেস্ট হাউসে পরিণত করেছি। তা ছাড়া কুণাল তীক্ষ্ন ব্যবসাবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে বাড়ির পিছনের জমিটায় চিংড়ি চাষের ব্যবস্থা করে ফেলেছে, অপ্রত্যাশিত- ভাবে আমাদের এই উদ্যোগগুলো লাভের মুখ দেখেছে। সারা বছরই ওখানে যাত্রীদের আনাগোনা লেগে থাকে আর শীতের মরশুমে তো কথাই নেই। মোটের উপর খরচখরচা বাদ দিয়েও যা বেঁচে থাকে তাতে আমাদের ভালোই চলে যাচ্ছে। প্রায় দু-বছর হল স্কুলের চাকরি আর কলকাতার পাট চুকিয়ে আমিও বর্ধমানেই পাকাপোক্ত আসন গেড়েছি। এর মধ্যে আমার আবার নতুন একটা বাতিক গজিয়েছে, লেখালেখি করা। দু-বছর আগে যখন খাতা-কলম নিয়ে যুদ্ধ শুরু করি তখন মুখে কিছু না বললেও কুণাল মুচকি হেসেছিল, আবার সেই বইয়েরই যখন বেশ একটা ভালোমতো কাঁটতি হল, কুণালই আমাকে নতুন কিছু লেখার জন্য উৎসাহিত করতে লাগল। এবারের লেখাটা তাই ওকেই প্রথম পড়তে দিয়েছি। দুপুর নাগাদ আমাদের বাড়ি কাম গেস্ট হাউসে পৌঁছে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। রাতে খাবার টেবিলে দেখা হতে কুণাল বলল—'তোর লেখাটা পড়ে শেষ করলাম, কিন্তু পাঠকেরা কি এসব অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করবে'? বললাম—'বিশ্বাস না করলেও চলবে, গল্প হিসেবে পড়লেও তো ক্ষতি নেই'। মুরগির ঠ্যাং চিবুতে চিবুতে কুণাল বলল—'উপন্যাসটার নাম কি রাখবি ভাবছিস'? বেদনাদায়ক কিছু ঘটনাপ্রবাহ মনের কোণে উঁকি দিল, ফুটফুটে সুন্দর একটা শিশু, ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে যাকে গবাদি পশুর অধম জীবনযাপন করে অকালে ঝড়ে যেতে হল পৃথিবীর বুক থেকে শুধুমাত্র কয়েকজন নরপিশাচের বিকৃত স্বার্থপূরণের উদ্দেশ্যে, চরম সংকটের মুহূর্তে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যার দিকে বিন্দুমাত্র সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারিনি, এই উপন্যাস হোক তার বিষণ্ণ স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমার অনুতপ্ত হৃদয়ের আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।
একমুহূর্ত চুপ করে থেকে উত্তর দিলাম
—'চণ্ডরাজার বলি'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন