সঞ্জয় ভট্টাচার্য
জগন্নাথ-দা আমার সঙ্গে বাবার সময় থেকেই আছেন, রান্নাবান্না তিনিই সব করেন, তবে রাতে থাকেন না, কাজ মিটিয়ে সন্ধের পর মেয়ের বাড়ি চলে যান। আমাকে দেখছেন ছোট বয়েস থেকেই তাই মাঝে মধ্যে কিঞ্চিৎ অভিভাবকত্ব ঝালিয়ে নেন। হাতের খাঁচাটা দেখে বললেন—'এ আবার কি এনে হাজির করলে'। বললাম—'সস্তায় পেয়েছি, পুষব'।—'পুষবে মানে'? জগন্নাথ-দা চোখ কপালে তুলে বলল—'তুমি তো হুটহাট বাইরে চলে যাও তখন এটার দেখাশোনা কে করবে'? বললাম—'কেন তুমি তো আছো, তুমিই নাহয় একটু খেয়াল রাখবে'। জগন্নাথ-দা বিরক্ত হয়ে গজগজ করতে করতে কিচেনের দিকে চলে গেল।
এরপর দু-তিনটে দিন কেটে গেল। সংসারে নতুন সদস্য কুটুস আসার পর থেকে বাড়ির পরিবেশটাই যেন পালটে গেছে, সবসময় একটা হুলুস্থুল ভাব। খরগোশের খাদ্যাভাস সম্বন্ধে আমি যে নিতান্তই অজ্ঞ তার প্রমাণ ইতিমধ্যে পেয়েছি। গাজর, বাঁধাকপি, শাকপাতার মতো একঘেয়ে খাবার খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে মুখের স্বাদ পালটানোর জন্য কুটুস এরমধ্যে আমার ডায়েরির কয়েকটা পাতা চিবিয়ে খেয়েছে। খবরের কাগজটা দেখলাম প্রথম পাতা থেকেই ঝাঁজরা, হজম হয়েছে কি না অবশ্য জানি না! তবে যা খেয়ে সে দারুণ উত্তেজিত আর আমি মুহ্যমান সেটা ড্রয়ারের উপর পেপার-ওয়েটে চেপে রাখা আমার পাঁচশ টাকার নোট-টা। জগন্নাথ-দা অবশ্য দেখলাম আমারই দোষ ধরল, বলল—'বাড়িতে খরগোশ পুষছ আর নিজের জিনিসপত্র টাকাপয়সা সামলে রাখতে পারো না'। ঠিক কথা! এবার থেকে কাগজপত্র, টাকাপয়সা সব যে ওর নাগালের বাইরে রাখতে হবে, কিঞ্চিৎ মূল্য চুকিয়ে সেটা মাথায় ঢুকল। পুরোনো একটা টেলিফোন ডিরেক্টরি বাড়ির এক কোণে পরেছিল, সেটাকে ওর দাঁতের ব্যায়ামের জন্য খাটের তলায় রেখে দিলাম। কুটুসের শোবার জন্য একটা প্লাইউডের ঘর মতো ব্যবস্থা করা গেছে, বাক্সটার মধ্যে বালিশ পেতে চমৎকার বিছানা তৈরি হল। সমস্যা এখন একটাই কুটুসকে কিছুতেই পটি ট্রেনিং দেওয়া যাচ্ছে না, ঘরের সর্বত্র বিষ্ঠা ত্যাগ করে সে আমাদের কাজ বাড়িয়েছে তবে আশ্চর্যের বিষয় জগন্নাথ-দা হাসিমুখেই সেসব পরিষ্কার করছে, বোঝা যাচ্ছে প্রথমে বিরক্ত হলেও ছোট্ট এই প্রাণীটাকে এখন সেও বেশ স্নেহের চোখেই দেখছে।
অ্যান্টি ডিপ্রেশান্ট খেয়ে বিশেষ কাজ হয়নি, অবশ্য আগের দুরাত্রি স্বপ্নটা দেখিনি তাই ঘুমটা মোটামুটি ভালোই হয়েছিল, কিন্তু আজ রাত্রে আবার সেই বিশ্রী স্বপ্নে ঘুমের দফারফা হয়ে গেল। আজ নতুন কিছু দেখলাম! প্রতিবারে স্বপ্নটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে থমকে যেত। এতদিন শুধু জঙ্গল আর খড়ের ছাওনি দেওয়া ঘর দেখে এসেছি, কিন্তু আজকে প্রতিদিনের মতো নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ানোর পর দৃষ্টি ঘুরে গিয়ে পড়ল একটা পুরোনো মন্দিরের উপর। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা মন্দিরটার অবস্থান জঙ্গল আর গ্রামের মাঝামাঝি একটা মাঠের মধ্যে। সাদামাঠা মামুলি মন্দিরটার মধ্যে কি যেন অদ্ভুত আকর্ষণ রয়েছে! আমি নির্নিমেষে সেদিকে চেয়ে রইলাম। পাঁচিলের গায়ে সদর দরজাটা হঠাৎ নিজে থেকেই খুলে গেল আর আমিও সম্মোহিতের মতো সেদিকে চলতে লাগলাম। চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে দেখলাম মূল মন্দিরটা পাঁচিল থেকে দশ বারো পা দূরে, মাঝখানে প্রশস্ত চাতালটা পেরিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। মূল মন্দিরের দরজা হাট করে খোলা, আমি গর্ভগৃহে প্রবেশ করলাম, এখানে জমাট বাঁধা অন্ধকার, মনে হল হঠাৎ কোনও গুহায় ঢুকে পরেছি, একটা বিশ্রী গন্ধ নাকে আসতেই তীব্র বমির ভাব জেগে উঠল, কিন্তু বমি হল না, ধীরে ধীরে দুর্গন্ধ আর অন্ধকার দুটোই সয়ে যেতে লাগল। আমি সেই গাঢ় আধারের বৃত্তের মাঝে ভূতগ্রস্থের মতো বসে রইলাম। হঠাৎ একটা নীলচে আলোর জ্যোতি ওই জমাট অন্ধকারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, আমি হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে সেদিকে চেয়ে রইলাম।
এবার একটা অপার্থিব স্বর ভেসে এল, কেউ আমার নাম ধরে ডাকল, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো যেন আদেশের অপেক্ষা করছি, সেই অমানুষিক কণ্ঠস্বর বলল—'জয়ন্ত, সহস্র বৎসরের প্রতীক্ষা কি অসহনীয়, আমার এই জঠরের ভিতরে যে কি নিদারুণ দহন যন্ত্রণা! তোমার জিহ্বার দ্বারা কি আমার ক্ষুৎপিপাসার পরিতৃপ্তি হবে না'? আমার চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছে, কন্ঠস্বরের মালিকের সামনে আত্মসমর্পন করেও যেন সুখ, বললাম—'গ্রহণ করুন'।
—'এভাবে নয়, সশরীরে তুমি এই ক্ষেত্রে উপস্থিত হও, অবসান ঘটুক অনন্ত প্রতীক্ষার'। আমি সম্মোহিতের মতো বললাম—'কোথায় আসব'? কণ্ঠস্বরটা মিলিয়ে যেতে যেতে অনেক দূর হতে ভেসে এল —'ভগীরথপুর'।
ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকার ঘরে বিছানার উপর বসে নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম। স্বপ্নের এমন অদ্ভুত অগ্রগতি আমাকে দারুণ উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিল, তবে কি আমি জটিল মনোরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি? শীতের রাতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে মনে হল। ধীরে ধীরে সম্বিৎ ফিরে এল। কোলের উপর নরম মাংসপিণ্ডের স্পর্শে টের পেলাম কুটুস জড়সড় হয়ে আমার গায়ের সঙ্গে লেপ রয়েছে। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে, কিছু বুঝতে না পেরে ওর গায়ে হাত বোলাতে লাগলাম, এবারে ঘরের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম, অগুনতি গোলাপি রঙের জ্বলন্ত ফুটকিতে ঘরের মেঝে যেন থই থই করে ভাসছে। দ্রুত হাতে বেডসুইচ অন করে ফ্লুরোসেন্টের ফিকে আলোয় যা দেখলাম তাতে গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল! আর তখুনি কুটুসের ভয়টা চালান হয়ে আমার মধ্যেও ঢুকে পড়ল।
যেদিকে চোখ যাচ্ছে শুধু বিশাল বিশাল মেঠো ইঁদুর, এসব ইঁদুর ড্রেনে, মাঠে, চাষের খেতে বাস করে, গৃহস্থ বাড়ি এদের চড়ে বেড়ানোর জায়গা নয়। ইঁদুরের সংখ্যা অন্তত একশো তো হবেই। আর অত্যন্ত অদ্ভুত এদের আচরণ। সবকটা ইঁদুর একসঙ্গে ঘরের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কিন্তু এদের সবার চোখের দৃষ্টি সোজা আমার দিকেই তাক করা। এতগুলো ইঁদুর আমার বেডরুমে কি করছে? বিছানার উপর গুটিয়ে বসে হুস হুস শব্দ করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করলাম, ইঁদুরগুলোর মধ্যে পেছু হটার কোনও লক্ষন দেখলাম না, এবারে আর কিছু না পেয়ে টিপয়ের উপর রাখা জলের জগটা ছুড়ে মারলাম ইঁদুরগুলোকে লক্ষ্য করে, এবারে কাজ হল, ইঁদুর গুলো পিছু হটল, সারিবদ্ধভাবে ইঁদুরের দল রান্নাঘরের দিকে যেতে শুরু করল। সর্বশেষ ইঁদুরটা যখন রান্নাঘরে ঢুকে গেল, সাহস করে খাট থেকে নেমে ওদের গতিবিধি লক্ষ করার চেষ্টা করলাম। কিচেনের মেঝেতে নিকাশির জায়গায় লোহার জালটা কিছুদিন হল ছিড়ে গেছে, সেখান দিয়েই দেখলাম ইঁদুরের দল নেমে গেল। ইঁদুরের এমন আচরণ বড়ই অদ্ভুত! জন্তুগুলো যেন অপেক্ষা করছিল কখন আমার ঘুম ভেঙে ওদের দিকে চাইব, আর এরকম শৃঙ্খলা মেনে চলা কি ইঁদুরের মতো কোনও প্রাণীর পক্ষে সম্ভব! এসব যে কি ঘটছে! সে রাতে আর ঘুমোতে ইচ্ছে করল না, চেয়ারে বসেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলাম। সকালে মর্নিং ওয়াকে বেরোনো যেতে পারত কিন্তু কুটুসের কথা ভেবে আর গেলাম না, যদি ইঁদুরগুলো আবার ফিরত আসে? আটটার সময় জগন্নাথ এল। আমি স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে নিলাম, যাওয়ার পথে একবার রাজমিস্ত্রিকে খবর দিতে হবে, প্লাস্টার করে ওই ফাটলটা এখুনি বন্ধ করা দরকার।
স্কুলের পর, রাসবিহারী মোড়ের এন জি মেডিকেয়ারে সিটি স্ক্যান করে ফিরতে প্রায় বিকেল পাঁচটা বেজে গেল। কাল রিপোর্ট পেলে আবার ডাক্তার নন্দীর সঙ্গে দেখা করতে হবে। বাড়ি পৌঁছে প্রথমেই জগন্নাথকে জিগ্যেস করলাম—'মিস্ত্রি এসেছিল'? জগন্নাথ অবাক হয়ে বলল—'কই না তো'! বিরক্তি চরমে উঠল, লোকটা তো বেজায় দায়িত্বহীন, ঠিক আছে কাল ঘাড় ধরে এনে কাজ করাব, জগন্নাথ আমাকে আশ্বস্ত করে বলল—'ও নিয়ে তুমি ব্যস্ত হোয়ো না, আমি ইটের টুকরো দিয়ে গর্ত বুজিয়ে দেব'।
—'তুমি পারবে'?
—'দেখোই না, তুমি শুধু সিমেন্ট বালির জোগাড় করো'।
আমি আর সময় নষ্ট না করে পাড়ার হার্ডওয়ারের দোকান থেকে একটা ইট আর পরিমাণ মতো বালি-সিমেন্ট এনে হাজির করলাম। জগন্নাথ লোহার হাতুড়ি দিয়ে ইটটাকে মাপে কেটে বালি-সিমেন্টের মিক্সচার দিয়ে ফাটলটা বুজে দিল, আর আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম, আশা করি আজ রাতে আর ইঁদুরগুলো উৎপাত করতে আসবে না, তাও সাবধানের মার নেই, বাতিগুলো সব জ্বেলেই শোব ঠিক করলাম, ডিনারের সময় টিভি চ্যানেলে খবর শোনা আমার পুরোনো অভ্যাস, টিভির সুইচ অন করে রাতের মেনু ডিমের কারি আর রুটি নিয়ে সবেমাত্র টেবিলে বসেছি হঠাৎ দরজায় বেলটা বেজে উঠল, দরজা খুলে যাকে দেখলাম তাতে বিরক্তি চরমে উঠল। সেদিনের সেই ছোড়াটা আবার এসে হাজির হয়েছে, ছেলেটি আমাকে দেখে সংকোচের সঙ্গেই বলল—'আমার জেঠু এসেছেন, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান'।
বিরক্তি গোপন করে বললাম—'কোথায় উনি'?
ছেলেটির পিছনে একজন দীর্ঘদেহী মানুষ দাঁড়িয়েছিল, খেয়াল করিনি। ভদ্রলোক এগিয়ে এসে নমস্কার করে বললেন—'আমার নাম রুদ্রপ্রসাদ মিত্র, আপনাকে বিরক্ত করলাম, তবে বেশি সময় নেব না, যদি পাঁচ মিনিট সময় দেন তাহলে প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলতে চাই। ভদ্রলোকের বয়স হলেও দেহ সুঠাম এবং ঋজু, উচ্চতা ছ-ফুটের মতো, মাথা ভরতি ধবধবে সাদা চুল। মুখের অভিব্যক্তি দেখে সামান্য রোগক্লিষ্ট মনে হলেও সেটা এর ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলেনি। লোকটার চেহারা আর ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন কিছু আছে যা সম্ভ্রম আদায় করে নেবেই। দরজা খুলে ভিতরে আসার আহ্বান জানালাম কিন্তু ভদ্রলোক ফ্ল্যাটের ভিতর চেয়ে কেমন যেন আঁতকে উঠলেন তারপর সামলে বললেন—'এত রাতে আর আপনার অসুবিধে বাড়াতে চাই না, তার থেকে নীচে একটা চায়ের দোকান খোলা দেখলাম, আমরা তো সেখানে গিয়ে বসতে পারি। আমি আর কথা না বাড়িয়ে দরজা বাইরে থেকে লক করে নীচে নেমে এলাম, ভদ্রলোক আমার সঙ্গে কি কথা বলতে চাইছেন বোধহয় একটু শোনা দরকার।
হরির চায়ের দোকানের একটা কর্নার বেঞ্চে বসে চায়ের অর্ডার দিয়ে, রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'জয়ন্তবাবু সবার আগে একটা জিজ্ঞাস্য আছে, সম্প্রতি আপনি কি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, এই যেমন ধরুন কোনও জঙ্গল টঙ্গলে'। অবাক হয়ে বললাম—'তেমন কিছু তো ভাবিনি'। ভদ্রলোক যেন একটু খুশি হয়ে বললেন—'ঠিক আছে এবারে কয়েকটা ছবি দেখাব, একটু ভেবেচিন্তে বলুন তো এরকম কিছু রিসেন্টলি ঘটেছে কি না'? ভদ্রলোক এবার হাতের ব্যাগটা থেকে একটা খাম বের করলেন। খাম থেকে কয়েকটা সাদা-কালো স্কেচ টেবিলের উপরে ছড়িয়ে দিয়ে তুলতে ইঙ্গিত করলেন। প্রথম যে ছবিটা হাতে তুলে নিলাম সেটা হাতির পিঠে বসে থাকা কোনও একটা লোকের, রাস্তা দিয়ে হাতি চলেছে, দু-পাশে কিছু লোক সারিবদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে স্কেচটা টেবিলে রেখে দিলাম। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভদ্রলোক আমার দিকে নজর রাখছিলেন, বললেন—'পরের স্কেচটা দেখুন প্লিজ'। পরের স্কেচটা আরও অদ্ভুত, একটা বেদীর ওপরে একটা ছোট্ট গুলির মতো পাথর যেটা থেকে বোধহয় আলোর রেখা ঠিকরে বের হচ্ছে, বেদীর সামনে একজন লোক হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে, ভঙ্গিটা যেন আত্মনিবেদনের। পেটের ভিতর খিদেটা বিলক্ষণ জানান দিচ্ছে, আমার অপেক্ষায় বসে থাকা ডিমের কারির কথা ভেবে বিরক্ত হয়ে বললাম —'আর কতগুলো ছবি বাকি আছে'? রুদ্রপ্রসাদ আমার কথার সোজা উত্তর না দিয়ে বললেন —'জয়ন্তবাবু এই ছবিটার সঙ্গেও স্মৃতির যোগসূত্র যখন খুঁজে পাচ্ছেন না তার মানে হাতে এখনো সময় আছে'। পরের স্কেচটা হাতে তুলে নিলাম। এটাতে দুধারে ঘন গাছপালার মাঝখানে এক চিলতে রাস্তার ওপর একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তা যেখানে শেষ হচ্ছে সেখানে একটা ভাঙাচোড়া মন্দির। ছবিটা গভীর ভাবে দেখছিলাম, রুদ্রপ্রসাদের ডাকে হুঁশ ফিরল —'ছবিটা কি চেনা লাগছে'। ইতস্তত করে বললাম —'ঠিক বলতে পারব না তবে এরকম কিছু একটা বোধহয় স্বপ্নে দেখে থাকতে পারি'। রুদ্রপ্রসাদ তীক্ষ্ন স্বরে বললেন —'ওটা যদি স্বপ্ন হয় তাহলে এটা নিশ্চয়ই বাস্তব হবে, কি বলেন জয়ন্তবাবু'? হাতবদল হয়ে যে স্কেচটা এবার আমার হাতে এসে উঠল সেটা দেখে শিউড়ে উঠলাম। বিছানার ওপর পাজামা, গেঞ্জি পরে একটা লোক কুঁকড়ে বসে আছে আর তার চারপাশে ঘর জুড়ে অসংখ্য ইঁদুর। স্কেচটা আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে রুদ্রপ্রসাদ বললেন —'এই বিশ্রী অভিজ্ঞতাটা যে আপনার হয়েছে তা আর মুখে বলে দিতে হবে না, আমার কাছ আরও কয়েকটা স্কেচ আছে তবে সেগুলো আর দেখাচ্ছি না, এবারে আপনাকে একটা ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করব, দয়া করে আপনার বংশ পরিচয়টা যদি বলেন'?
—'মানে'? প্রশ্নটা বড় অদ্ভুত! আমি অবাক হয়ে ভদ্রলোকের দিকে চাইলাম, রুদ্রপ্রসাদ বললেন —'মানে আপনার পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কি জমিদার বা কোন অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন'?
উত্তর দেওয়ার আগেই অবশ্য হরিদা এসে উপস্থিত হয়েছেন, বললেন—'এবার দোকান বন্ধ হবে'। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'হ্যা তাইতো'! আর পাঁচ মিনিট ব্যাস, ততক্ষণে ভাই তুমি আরও দু-কাপ চা আর গোটাকয়েক ক্রিম দেওয়া বিস্কুট দাও দেখি'। হরিদা অপ্রসন্ন স্বরে বললেন—'এখন আর চা বানানো যাবে না, বিস্কুট দিচ্ছি, কিন্তু আপনারা তাড়াতাড়ি করুন, আমায় বাড়ি যেতে হবে'। হরিদা চলে যেতে আমি বললাম—'অনেক আগে নৃপতিপুরের রাজারা আমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন'। রুদ্রপ্রসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—'নিউজ পেপারে আপনার খবরটা ফলাও করে বেরিয়েছিল, আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরেছিলাম আর টিভিতেও দেখেছিলাম তবে আসল খবরের হদিশ কেউই বের করতে পারেনি, অবশ্য আমার যা বোঝার তখনি বোঝা হয়ে গেছিল। জয়ন্তবাবু এক্ষুনি সবকিছু আপনাকে খুলে বললে আপনি ধরতে পারবেন না, একটু হোমওয়ার্ক দরকার, একটা বই আপনাকে দিচ্ছি, আমারই লেখা, একটু সিরিয়াসলি পরবেন, পারলে এখুনি, আজ রাতেই, পুরো বইটা পড়তে হবে না, শুধু এর চৌত্রিশ থেকে একচল্লিশ নম্বর পাতা পর্যন্ত পড়লেই হবে, পড়া শেষ হলে আপনি যে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইবেন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত, আমার নম্বর ওই বইয়ের পাতায় লেখা রইল, আমি রাতে জেগে পড়াশোনা করি, সুতরাং যখন খুশি ফোন করতে পারেন'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন