ষষ্ঠ অধ্যায়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

কি ভয়ংকর নির্জন আর নিস্তব্ধ সাতকোশিয়ার এই জঙ্গল, অরণ্যপ্রেমী, যারা ঘড়ির অ্যালার্ম বাজলে পরে বিছানা ছেড়ে উঠে, সফট ড্রিঙ্কের বোতল হাতে নিয়ে হাতির পিঠে চড়ে বা জিপে সওয়ার হয়ে অরণ্য ভ্রমণে অভ্যস্ত তারা গহন গভীর বনাঞ্চলের এমন বীভৎস রূপ কল্পনাও করতে পারবেন না। রক্ষে রাতটা পূর্ণিমা, মাঝ আকাশে একটা গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। সেটাকে দেখে মনে জোর আনার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাধিয়ে গেল সেইসঙ্গে বাজ পড়ার করকড়াত শব্দ। মনে হল বুঝি বৃষ্টি হবে। দু-পাশে ঘন শাল, শিমূলের সমারোহ, মাঝখানে এক চিলতে সরু মেঠো জঙ্গুলে পথ যার উপর শুকনো গাছের পাতা ঝরে ঝরে কার্পেটের মতো সৃষ্টি করেছে। প্রতি পদক্ষেপে নিজের পায়ের খসখসে শব্দে নিজেই চমকে উঠছিলাম। কিছুটা পথ এভাবে চলার পর যেখানে পৌঁছোলাম সেখানে জঙ্গল আরও গভীর আরও ঘন আকার ধারণ করেছে এখানে আর শুধু পায়ের তলায় কার্পেট নয় মাথার উপর চাঁদোয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে দেখলাম। দু-ধারের বড় বড় গাছের শাখা-প্রশাখা গুলো জড়াজড়ি করে ছাতা মতো তৈরি করেছে। এবারের পথ কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন, মাঝেমধ্যে অবশ্য ডালপালার ফাঁকফোকর দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো ঠিকরে পড়ছিল, নাহলে হয়তো এগিয়ে চলাটাই দায় হয়ে পরত। হঠাৎ ঘাড়ের পাশটাতে কার গরম নিঃশ্বাসের ছোঁয়া লাগল। ভয়ংকর চমকে পিছন ফিরে চাইলাম। যতদূর চোখ যায় দেখলাম, কেউ কোথাও নজরে পড়ল না। হয়তো মনের ভুল! ফের চলা শুরু করলাম। মনে একটা অসন্তোষ ক্রমশ দানা বাঁধছিল। আমার ধারণা হয়েছিল ত্রিলোচনের সঙ্গে অভিযানে গিয়ে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হবে। কোথায় তির-ধনুক, বল্লম হাতে খরগোসের শিকার করব, সেখানে একাকী এই মহারণ্যে উন্মাদের মতো অনির্দিষ্টের যাত্রা করছি। সব কথা খোলাখুলি না জানিয়ে ত্রিলোচন আমাকে ঠকিয়েছে! ত্রিলোচনের ওপর দারুণ রাগে হাতের ছুরিটা আড়াআড়ি ভাবে বা থেকে ডান দিকে চালিয়ে দিলাম, অদ্ভুত কাণ্ড! ছুরিটা হাওয়া কেটে অদৃশ্য কোন দেহধারীর শরীরে গেঁথে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে আর্তচিৎকার করে সেই দেহহীন জীবটা ছুটে পালাল। তার ভারী পায়ের চাপে মাটিতে পরে থাকা শুকনো ডালপালার টুকরো মট মট করে ভেঙ্গে যেতে লাগল। আমি হতভম্বের মতো দাড়িয়ে রইলাম! এসব যে কি ঘটছে? চোখে দেখা যাচ্ছে না অথচ জিনিসটার অস্তিত্ব বেশ টের পাচ্ছি। সম্বিৎ ফিরতে ফের জোরকদমে হাটা দিলাম। এই জঙ্গলটাকে আমার হঠাৎ অতি ভয়ানক জায়গা বলে মনে হতে শুরু করেছে। বেশ কিছুটা চলার পর টের পেলাম একটা অস্পষ্ট আওয়াজ আমার পেছু নিয়েছে, সেটা কারও পায়ে চলার, সাবধানে পেছু তাকিয়ে অবশ্য কাউকে দেখতে পেলাম না, আমি চললে সেটা চলে, আমি থমকে দাড়িয়ে গেলে সেটাও দাড়িয়ে যাচ্ছে। একবার কায়দা করে চলার মাঝে হঠাৎ নিথর হয়ে থেমে যেতেই আমার অনুসরণকারী ফাঁদে পরল। অসতর্ক পদক্ষেপ ফেলে সে বুঝিয়ে দিল, এসব আর যাই হোক আমার মনের কষ্টকল্পনা নয়। জীবটাকে চোখে দেখা না গেলেও, চোট আঘাত যে সেটার বেশ গায়ে লাগে সেটা একটু আগেই বুঝতে পেরেছি, মনে জোর এনে আমি চলার গতি আরও বাড়িয়ে দিলাম, কিছুটা পথ এভাবে যাওয়ার পর তিরবেগে ঘুরে ছুরি দিয়ে আঘাত হানলাম। এবারে ছুরি আর কিছুতে ঠেকল না শুধু বনবন করে খানিক হাওয়া কেটে ফেরত চলে এল। আমি প্রাণপণ অস্ত্রটা এদিক-ওদিক শুন্যে আছড়াতে লাগলাম তবে আমার অদৃশ্য শত্রু এবারে বেশ সতর্ক হয়েই রয়েছে। সে যেন আমার মূর্খামি দেখে মজা পেয়ে হেসে উঠল, কি বিশ্রী চেড়া সেই শব্দ! এই পৃথিবীর কোনও মানুষ এভাবে হাসতে পারবেই না। ভয়ে আতঙ্কে এবার আমার কালঘাম ছুটে গেল। দারুণ ত্রাসে দিগ্বদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করলাম, গাছের উপর থেকে ঝুলে থাকা ডালগুলো চাবুকের মতো গায়ে, মুখে আছড়ে পড়তে লাগল। গালের একপাশটা ফেটে ঝরঝর করে রক্ত পড়তে লাগল। কতক্ষণ এভাবে ছুটেছি জানি না, একসময় হয়তো ভীষণ ক্লান্ত হয়ে দাড়িয়েছি একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য, এলোপাথাড়ি পদশব্দটা একেবারে কাছে চলে এল, আওয়াজটা এবারে আরও স্পষ্ট আরও নির্ভুলভাবে শুনতে পাচ্ছি, অশরীরী অনুসরণকারী নিজেকে লুকিয়ে রাখার আর কোনও তোয়াক্কা করছে না। বিশ্রাম মাথায় উঠল! ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল ''পালাও''! আবার দৌর লাগালাম। কতটা পথ এভাবে ছুটে পার হলাম কে জানে, একসময় বুকে প্রচণ্ড হাঁপ ধরে গেল, মুখ দিয়ে ফেনা ঝড়ছিল, শরীরের ভিতরে যে ব্যাটারিটা আছে তার চার্জ এতক্ষণে পুরোপুরি ফুরিয়ে এসেছিল, মাথা ঘুরে ঘাসবনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম।

ছোটার ক্ষমতা আর একদমই ছিল না, একটা ঝাঁকড়া গাছের গোঁড়ায় বসে হাপাতে লাগলাম। খানিক ধাতস্থ হতে অনুভব করলাম পিছনের অদৃশ্য বিভীষিকাটা অন্তত এই মুহূর্তে আমার ধারেকাছে নেই। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম জঙ্গল এখানে খানিকটা হালকা হয়ে এসেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিল, যদি কোথাও এক বিন্দু জলও পেতাম? সামনে কোথাও যদি একটা পুকুর ডোবা কিছু খুঁজে পাওয়া যায়! বিশ্রামের ফলে তেষ্টার বেগ খানিকটা কমল। পথ চলা শুরু করব ভাবছি, অকস্মাৎ মিষ্টি সুরেলা একটা স্বর কানে এল। মেয়েলী কণ্ঠে কেউ গুনগুন করে গানের কলি ভাঁজছে। ভয়ে ভয়ে দুর্বল স্বরে—'কে'? বলতেই গানটা থেমে গেল। এরপর কিছুক্ষণ কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম কিন্তু অরণ্যের নিজস্ব কিছু আওয়াজ ছাড়া অন্য কিছুই কানে এল না। কাছাকাছির মধ্যে একটা প্যাঁচার তীক্ষ্ন কর্কশ ডাক আর কোন একটা বিবস প্রাণীর মরণপণ আর্তনাদে আঁতকে উঠলাম! প্যাঁচাটা বোধহয় শিকার ধরেছে। পরের কিছু মুহূর্ত অসহায় জন্তুটার ছটফটানি আর আর্তচিৎকারের বেগ ক্রমশ কমতে কমতে শেষে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ লক্ষ করলাম একটা লম্বা কালো ছায়া মাথার ওপর চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করেছে, উপর দিকে চেয়ে দেখলাম ডানাওয়ালা একটা রোমশ বাদুড় মাথার উপর পাঁক খেয়ে ক্রমশ নীচে, আমার দিকেই এগিয়ে আসছে, ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে এবার একটা ঘৃণার অনুভূতিও আমাকে গ্রাস করল, মাটির উপর থেকে একটা পাথর তুলে বাঁদুড়টাকে তাক করে ছুড়ে মারলাম, পাথরটা জানোয়ারটার ডানা ঘেসে চলে গেল, এক চুলের জন্য লাগল না, ডানা ফড়ফড়িয়ে জন্তুটা অন্যদিকে উড়ে গেল, আর আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। হঠাৎ নারীকণ্ঠের অপ্রত্যাশিত আহবান কানে এল—'বাবু'! আওয়াজটা কয়েক হাত দূরের বুনো ঝোপটার দিক থেকে এসেছে। ভয়ে বিস্ময়ে সেদিকে তাকালাম। মুহুর্তখানেক বিরতির পর আবার স্বরটা ভেসে এল—'বাবু আমি শাওনি, তোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি'।—'কে শাওনি'? হাতের ছুরিটা শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়ালাম। নারীকণ্ঠ তাড়াতাড়ি বলে উঠল—'এদিক পানে আসিস নে বাবু, মোর গায়ে কাপড় নাই'। চমকের ওপর চমক! বলে কি? নারীকণ্ঠ ফের বলল—'আমি মোড়লের বউ শাওনি, আজ তুই আমাদের ঘরে এলি যে'। একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে বললাম—'তুমি এখানে কিভাবে এলে? তোমার তো এখন ঘরে থাকার কথা'? নারীকণ্ঠ বলল—'তুই বুঝিস নাই বাবু! এসব ওই ওঝা আর আমার মরদের চালাকি! গেরামের লোকগুলোকে না ঠকালে কি ওদের চলে'? আমার সংশয় প্রবল আকার ধারণ করল, বললাম—'তোমার কথা বিশ্বাস করিনা। তুমি এখনি বাইরে এসে দাড়াও'। লাস্যময়ী কণ্ঠস্বরটা প্রলুব্ধ করা সুরে বলল—'বাবু তু বড় লুচ্চা দেখি, মোরে ন্যাংটো দেখতি তোর মনে সাধ জেগেছে, তাই না রে? তবে দ্যাখ'। ঝোপের আড়াল থেকে এবার একটি পুর্নাবায়ব নারী শরীর প্রকাশিত হল। যুবতীটি পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত অবিশ্বাস্যভাবে নগ্ন। মেয়েটির সুঠাম গড়ন নিটোল স্বাস্থ্য। মুখশ্রী সুশ্রী, ভারী নিতম্ব, বুকের উপর পুরুষ্টু স্তনগুলো যেন ভরা বেলুনের মতো ফুলে উঠেছে। এক মাথা ঢেউ খেলানো অবিন্যস্ত চুল কাধে পিঠে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বুভুক্ষু দু-চোখ দিয়ে যুবতী শরীরের গোপন ভাঁজগুলো গিলে খাচ্ছিলাম। মেয়েটি রহস্যময় হ্যাঁসি হেসে বলল—'মোরে দেখতে সুন্দর না রে বাবু'! অস্ফুট স্বরে বললাম—'হ্যাঁ'। যুবতীটি দু-হাত সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে আমন্ত্রণের সুরে বলল—'তবে আয় বাবু মৌজ করি'! কিছুক্ষণের জন্য যেন শরীরের ভিতর হরমোনের গতিবেগ প্রচণ্ড বৃদ্ধি পেয়ে মস্তিষ্কের দখল নিয়ে ফেলেছিল, কামভাব এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পায়ে পায়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। একসময় রহস্যময়ী নারীমূর্তির একেবারে কাছে চলে এলাম, এতটাই যে ওকে এবার হাত দিয়ে ধরতে পারব। এতটা বলে তপন যেন শিউরে উঠল তারপর চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—'তারপর কি হল'। তপন সামান্য চুপ করে শান্ত স্বরে বলল—'আমি বেঁচে গেলাম, সেদিনের পরও আমার বেঁচে থাকা ছিল, হয়তো বৃহৎ কোন প্রাপ্তির জন্য, তা ছাড়া আর কোনও যুক্তি নেই, যাইহোক ততক্ষণে মেয়েটার একদম কাছে এসে পড়েছি, আর তর সইছিল না, ওর উপর ঝাঁপিয়ে পরতেই যাচ্ছিলাম এমন সময় তীব্র আলোর ঝলকানি আর কান ফাটানো বাজ পড়ার শব্দ, বাজটা খুব কাছেই পড়েছে একটা বুনো ঝোপের উপর, ঝোপটা দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল আর প্রচণ্ড কম্পনে আমিও হাতখানেক দূরে ছিটকে পড়লাম। সামলে উঠে যে দৃশ্য দেখলাম তা এখনো মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন হয়ে আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। দেখলাম সুশ্রী যুবতীটি একটা কুৎসিত ডাইনির রূপ নিয়েছে, জীবটা যেন আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজের দেহের সবকটা অংশকে একজায়গায় ধরে রাখতে কিন্তু পারছে না। একটু একটু করে তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব গলে ধোঁয়া হয়ে গেল। এবার দেখা গেল খরগোসটাকে, আমার হাতের নাগালের মধ্যে, ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে, তার লাল চোখের স্থির দৃষ্টি সোজাসুজি আমার উপর নিবদ্ধ। দুর্বল, কাঁপা হাতে ছুরিটা মাটি থেকে তুলে নিলাম। কিন্তু দু-পা এগোতেই ওটা ছুটে পালিয়ে গেল। এমন সময় আকাশ ভেঙে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামল। ততক্ষণে আমার শিরায় শিরায় ভয়ের কাঁপন শুরু হয়েছে, আমি ঝড়-বৃষ্টির পরোয়া না করে জঙ্গলের কাদামাখা পথ দিয়ে ছুটে চললাম।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%