সঞ্জয় ভট্টাচার্য
রুদ্রপ্রসাদ সামান্য একটু বিরতি নিয়ে বললেন—'এরপর দেখতে দেখতে প্রায় দশটা বছর কেটে গেল, সোমবংশীয়দের উপর আমার লেখা বইটার প্রথম এডিশনের পর দ্বিতীয় এডিশন বাজারে চলে এসেছে, আর কটকের স্মৃতিও ততদিনে আমার মন থেকে অনেকটাই ফিকে হয়ে পড়েছে, প্রতিদিনের মতো সেদিনেও কলেজ থেকে ফিরে স্নান সেরে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তখন রাত আটটা কি সাড়ে আটটা হবে, দারোয়ান কিশোরীলাল এসে জানাল, কেউ একজন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, সাধারণত অ্যাপয়েন্টমেন্ট না থাকলে বাড়িতে আমি দেখা সাক্ষাত করি না, বিরক্ত হয়ে আগুন্তুককে ভাগিয়ে দেওয়ার কথাই বলতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু কিশোরীলালের হাতে ধরা চিরকুটে লেখা নামটায় চোখ আটকে গেল, 'সমীরণ মাহাতো'। পুরোনো স্মৃতি তাজা হয়ে উঠল, তা ছাড়া সমীরণকে যে একবার দেখেছে সে বোধহয় জীবনে আর ভুলতে পারবে না, আমি কৌতূহলী হয়ে নীচে চলে এলাম, দেখলাম সমীরণই বটে, গায়ে সামান্য মেদ জমা ছাড়া চেহারার বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি। ওকে সোজা এনে বসালাম এই ঘরে, ঠিক ওই কাউচটাতেই এসে বসল যেখানে এখন তুমি বসে আছো। সমীরণ জানাল ইউনিভার্সিটি থেকে বিতারনের পর সে আর পড়াশোনা করার সুযোগ পায়নি, সেদিন গণ্ডগোলের সময় যা কিছু ঘটেছিল তা ক্ষণিকের উত্তেজনায় হয়ে গেছিল, সে আক্ষেপ তার জীবনভর থাকবে, ও আরও জানাল রাজনীতির সঙ্গে সমস্ত সংশ্রব ত্যাগ করে এখন পারিবারিক ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে। এরপর সমীরণ হাতের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে টেবিলে রাখল, আমার লেখা সেই বইয়ের একটা কপি গতকাল তুমি পড়েছ, যাইহোক আমাদের মধ্যে ইতিহাস নিয়ে আড্ডা জমে উঠতে দেরি হল না, দেখে খুশি হলাম এত কিছুর পরেও সমীরণের হিস্ট্রির প্রতি আগ্রহ আগের মতোই রয়ে গেছে। কথায় কথায় সমীরণ জিগ্যেস করল, আমি কি সত্যিই বিশ্বাস করি রাজা শিবদত্ত আর চণ্ডদেবের কাহিনিটা নির্ভুল নাকি এর মধ্যে কোনও গোঁজামিল থাকতে পারে, আমি জোর গলায় বললাম, এর মধ্যে কোনও সন্দেহই থাকতে পারে না যে ঘটনাটা ঘটেছিল, অন্যথায় এত প্রাচীন শিলালিপিতে ঘটা করে এসবের উল্লেখ থাকত না, এরপর যে কাজটা আমি করলাম সেটার জন্য আমার আপশোস জীবনের শেষদিন পর্যন্ত থাকবে, আমার ব্যাক্তিগত সংগ্রহে থাকা দুটো শিলালিপি আলমাড়ি থেকে বের করে সমীরণকে দেখালাম, শিলালিপি গুলো অবশ্য সমীরণের সাহায্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল ভগীরথপুরের মন্দির থেকে। মন খুলে সেদিন সমীরণের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম চণ্ড পক্রিয়া সম্মন্দে, কোন বিষয় বাদ গেলে সমীরণ জিগ্যেস করে নিচ্ছিল, আমিও খুশি মনে জবাব দিতে কসুর করিনি, সমীরণের সাহায্য ছাড়া এই প্রোজেক্ট কখনই শেষ করতে পারতাম না, সুতরাং তার কিছুটা অধিকার নিশ্চয়ই রয়েছে বিষয়টা জানার, তাছাড়া যে কাজের পিছনে এতোটা শ্রম আর সময় ব্যায় করেছিলাম অন্তত একজন মানুষের সামনে হলেও তার সাফল্য প্রকাশ তো হল, কেউ একজন তো রুদ্রপ্রসাদ মিত্রের এলেম কিছুটা টের পেল। নিজের ঢাঁক নিজে পিটিয়ে যে বোকামো করে ফেলেছি সেটা টের পেতে দেরি হল না। আমাকে অবাক করে সমীরণ শিলালিপি গুলো দাবী করে বসল, সেগুলো নাকি সে কটকের মিউজিয়ামে জমা করবে। ধাক্কা সামলে আমি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলাম সেটা করার হলে আমি নিজেই করতে পারতাম, এসব গুহ্য জিনিস লোকচক্ষে প্রদর্শন করা ঘোরতর অনুচিৎ। লিপির মর্মোদ্ধার করে যদি কেউ ওই শক্তিকে জাগিয়ে তোলে তাহলে যে বিপর্যয় নেমে আসবে তার দ্বায়িত্ত্ব কে নেবে? সমীরণ এবার অমার্জিত স্বরে বলল যে এই শিলালিপি গুলো ওড়িশার ঐতিহাসিক সম্পদ এবং এর সম্পুর্ন স্বত্ব একমাত্র ভূমিপুত্রদেরই হতে পারে, কলকাতায় বসে থাকা একটা বাঙালির কোন অধিকার নেই এসব জিনিস নিজের কুক্ষিগত করে রাখার। আমি জবাবে বললাম, শিলালিপি তো দেবই না, উল্টে নষ্ট করে দেব, লিপির রহস্য আমার সাথেই চলে যাবে। এরপর আরও কিছু উত্তপ্ত কথা কাটাকাটির পর সেরাত্রে সমীরণ বিদায় নিয়েছিল, এককালের প্রিয় ছাত্রের দুর্ব্যাবহারে মনে এমন দাগ পড়ে গেল, যে সিদ্ধান্তই নিয়ে বসলাম ভবিষ্যতে ছেলেটাকে আর কখনো প্রশ্রয় দেব না, তবে আমার বোধোদয়ের অবশ্য কিঞ্চিৎ বাকি ছিল! যেটা ঘটল পরদিন বিকেলে।
কলেজ শেষ করে যথারীতি বাড়ি ফিরছি দেখলাম একটা পুলিসের ভ্যান আমাদের গেটের সামনে দাড়িয়ে রয়েছে! একজন উর্দিধারি অফিসারের সঙ্গে কিশোরীলাল কথা বলছিল, আমি স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে এগিয়ে যেতে ও আমাকে দেখিয়ে ভদ্রলোককে বলল —'ইনিই আমাদের বাবুজি আছেন'। অফিসার আমার দিকে ফিরে অত্যন্ত রুক্ষস্বরে বললেন —'আপনিই রুদ্রপ্রসাদ মিত্র'?
—'হ্যা, কি ব্যাপার'?
—'চলুন আমার সঙ্গে'।
—'কোথায়'?
—সেটা গেলেই দেখতে পাবেন। লোকটার কথা বলার ধরনে অবশ্য ভদ্রতার লেশমাত্রও ছিল না।
—'কি হয়েছে'?
—'ভদ্রভাবে যাবে নাকি কলার ধরে গাড়িতে তুলব'? লোকটা দেখলাম আপনি থেকে তুমিতে নামতে সময় নিল না। পুলিস কর্মচারীটির সঙ্গে আরও কিছু সময় ধরে তীব্র বাদানুবাদ চলল, লোকটা দেখলাম কোনও কথাই কানে তুলতে রাজি নয়, হঠাৎ কেন যে আমাকে থানায় হাজিরা দিতে হবে সে বিষয়েও স্পষ্ট করে বলতে তার ভীষণ আপত্তি, এদিকে আশেপাশের বাড়ির বারান্দাগুলোতে ততক্ষণে প্রতিবেশীদের ভিড় জমা হতে শুরু করে দিয়েছে। এই রেনি পার্ক অঞ্চলে আমরা দীর্ঘদিনের বাসিন্দা, পুলিশের দারোগাটি যদি কোনও বাড়াবাড়ি করে বসে তা হলে পাড়ায় হাস্যস্পদ হতে দেরি হবে না, দেবুকে খবর দিতে বলে ঘোর অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রিজন ভ্যানে উঠে বসলাম, একজন সেপাই মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দিল। বদ্ধ ভ্যানে হতবুদ্ধির মতো বসে রইলাম, কলকাতা শহরের বুকে আমার সঙ্গে এমন কিছু যে ঘটতে পারে তা অকল্পনীয়! গাড়ি পার্কসার্কাস মৌলালি হয়ে থামল সোজা লালবাজারে। এখানে আমার ঠাই হল সেন্ট্রাল লক-আপে, কিছু মার্কামারা ক্রিমিনালের সঙ্গে একই গারদের চার দেওয়ালের মধ্যিখানে, অবশ্য তখনও পর্যন্ত আমি যে অন্ধকারে ছিলাম সেই অন্ধকারেই রয়েছি, যতবারই এভাবে আটক করার কারণ জিগ্যেস করেছি, জবাবে গালাগাল খেয়েছি। ভরসা একটাই কিশোরীলাল এতক্ষণে নিশ্চয়ই দেবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরো ঘটনা জানিয়ে দিয়েছে, আর খবর পেলে দেবু ব্যবস্থা নিতে দেরি করবে না, সেটা জানি। ব্যবস্থা অবশ্য হল এবং তাড়াতাড়িই, যে সেপাইটা একটু আগে আমাকে বিশ্রী গালমন্দ করেছিল সেই লোকটাই বিনয়ের অবতারের মতো গারদের দরজা খুলে বলল —'স্যার আপনাকে ডাকছেন'। সেপাইয়ের পিছন পিছন গিয়ে একেবারে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানের ঘরে হাজির হলাম। ভদ্রলোক উঠে দাড়িয়ে বললেন—'ছিঃ ছিঃ কি বিশ্রী ব্যাপার ঘটে গেল বলুন তো? আপনার মতো মানুষকে এভাবে হেনস্থা হতে হল, প্রদীপ তুমি জানো ইনি একজন খ্যাতনামা হিস্টোরিয়ান, তা ছাড়া বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার দেবপ্রসাদ মিত্রের দাদা, হোম সেক্রেটারি নিজে ফোন করে রিকোয়েস্ট করেছেন যেন এনার সঙ্গে সবরকম সহযোগিতা করা হয়। প্রদীপ দাস সেই অফিসারটার নাম যে আমাকে বাড়ি থেকে ধরে এনেছে, আরও একজন অফিসারের সঙ্গে ভদ্রলোক ডিসির টেবিলের অন্য প্রান্তের চেয়ারে বসেছিল। লোকটা চোয়াড়ের মতো ঘাড় গোঁজ করে বসে রইল, বুঝলাম হাতের শিকার ফসকে যাওয়াটা এর বিশেষ পছন্দ হয়নি। অ্যাথলেটের মতো চেহারার অল্পবয়েসি অন্য যে অফিসার এই ঘরে বসেছিল, সে এসে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল—'বসুন'। ধপাস করে বসে বললাম—'আপনাদের এই অদ্ভুত আচরণের মানে কিন্তু এখনও বুঝতে পাচ্ছি না'? অল্পবয়েসি অফিসারটা যার নাম বলল প্রসূন রায়, পালটা প্রশ্ন করল—'কাল সন্ধে সাতটা থেকে রাত সাড়ে ন-টা পর্যন্ত আপনি কোথায় ছিলেন'।
—'বাড়িতে, আবার কোথায়'?
—'কি করছিলেন'?
—'সামনের মাসে একটা কনফারেন্স আছে হায়দ্রাবাদে, তার স্পিচ রেডি করছিলাম'। প্রসূন তীক্ষ্ন স্বরে বলল—'আর কিছু ঘটেনি'?
—'আমার একজন এক্স স্টুডেন্ট দেখা করতে এসেছিল, তার সঙ্গে কথা বলেছি'।
—'স্টুডেন্টের নাম'?
—'সমীরণ, সমীরণ মাহাতো'।
—'সমীরণ এখন কোথায় আছে, জানেন'?
—'সেটা আমি জানব কিভাবে, সে তো আমাকে বলে যায়নি'। পরের পনেরো মিনিট প্রসূন নানারকম প্রশ্ন করল, যার সবটাই সমীরণকে কেন্দ্র করে। সমীরণের গতিবিধি সম্পর্কে বাস্তবিকই কোনও ধারণা ছিল না তাই কোনও প্রশ্নেরই সোজা উত্তর দিতে পারলাম না। পুলিশের মুখে সেদিন সমীরণের বিষয় যা শুনলাম তাতে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হল, আমার একসময়ের প্রিয় ছাত্র সমীরণ মাহাতো এখন পুলিশের খাতায় একজন মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল, নকশাল আন্দোলনের প্রথম সাড়ির নেতা, ইতিমধ্যে খুনজখম, দেশদ্রোহিতার প্রচুর অভিযোগ ওর বিরুদ্ধে রুজু হয়েছে, চারটে রাজ্যের পুলিস নাকি ওর উৎপাতে তটস্থ। ডিসি বললেন—'আমাদের সোর্স ঠিক সময়ে ইনফরমেশন কালেক্ট করতে পারেনি, ডিলে হওয়ার আরও কারণ, এগজ্যাক্ট কোনও বাড়িটায় ভিজিট করেছিল সেটা নিয়ে আননেসেসারি কনফিউশান তৈরি হয়েছিল, অবশেষে যতক্ষণে লোকেট করতে পারলাম সমীরণ হাত থেকে ফস্কে গেছে, তবে যাবে কোথায়, সর্বত্র চেকিং চলছে, যেখানেই ঘাপটি মেরে বসে থাকুক না কেন, পুলিশ ঠিকই খুঁজে বের করবে'। প্রদীপ দাস রাগে গজগজ করতে করতে বলল—'আর যারা বাস্টার্ডটাকে সাহায্য করছে তাদের কপালেও কিন্তু দুঃখ আছে'। মনে হল ইঙ্গিতটা যেন আমার দিকেই। ডিসি মৃদু ধমক দিয়ে বললেন—'আঃ প্রদীপ, আমাদের হাতে কোনও প্রমাণ নেই খেয়াল রেখো'। এরপর পুলিস আরও দু-চারটে অবান্তর প্রশ্ন করল, যার সঙ্গে আমার কোনও যোগসূত্রই নেই। উপর মহলের চাপ ছিল বলেই বোধহয় মনে সন্দেহ পুষেও শেষ পর্যন্ত পুলিস আমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। পরের দিন থেকেই টের পেলাম কিছু লোক আমাকে সর্বক্ষণ ফলো করে চলেছে, বুঝলাম পুলিস আমাকে নজরে রেখেছে, তাতে অবশ্য আমার উদ্বেগের কিছু নেই, কিন্তু অন্য একটা দুশ্চিন্তা ততক্ষণে আমাকে গিলে খেতে শুরু করেছে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সমীরণ কীসের জন্য বালিগঞ্জের মতো জায়গায় হাজির হয়েছিল, অনেক ভেবে চিনতে যেটা মাথায় এল তাতে শরীরের রক্ত হিম হয়ে এল, সমীরণ নির্ঘাৎ চণ্ডের উত্থানের পরিকল্পনা নিয়েছে। শিলালিপিগুলো অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার হওয়া থেকে বাঁচানোর একটাই উপায় মাথায় এল, আমি আর দেরি করলাম না, আলমারি থেকে ওগুলো বের করে ভেঙে গুড়িয়ে ফেললাম, তারপর সেই ভাঙা পাথরের টুকরো বস্তায় পুরে জঞ্জালের ভ্যাটে ফেলে দিয়ে এলাম। রুদ্রপ্রসাদ এতটা বলে এবারে একটু থামলেন, পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বুঝলাম কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে, গলা খাকড়ে জিগ্যেস করলাম—'কিন্তু এর পরেও ত্রিলোচনের কাছে প্রণালিটা পৌঁছোল কিভাবে'? উত্তরে রুদ্রপ্রসাদ ম্লানভাবে হাসলেন, বললেন—'ইংলিশ ডিকশনারিতে ফটোগ্রাফিক মেমোরি বলে একটা শব্দ আছে শুনেছ হয়ত! লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের মধ্যে একজন দুজনের এমন শক্তিশালী মস্তিষ্ক থাকে, সমীরণ ছিল সেই বিরল প্রজাতির মানুষদের মধ্যে একজন, ও যদি সৃষ্টির পথে চলত তাহলে হয়ত ওর মধ্যে আমরা একজন অসামান্য প্রতিভাধর ব্যাক্তিত্বের খোঁজ পেতাম কিন্তু ও ধ্বংসের পথটাই বেছে নিয়েছিল তাই এই পরিনতি, এটা আন্দাজ করতে আমার বিশেষ অসুবিধে হয়নি যে দেখামাত্র সমীরণ শিলালিপির পুরো সারবস্তুটাই নিজের মাথায় কপি করে নিয়েছিল, আর লিপির পাঠ করা তো ওকে আমি নিজে হাতেই শিখিয়েছি'।
রুদ্রপ্রসাদ এবার বললেন—'তবে একটা হিসেব কিন্তু এখনও মিলছে না, এই যে তোমার ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলিটা চালানো হল তারও কিছু বাঁধাধরা নিয়ম আছে, তোমার বন্ধু কি তোমাকে এই কাজের ঝুঁকি সম্বন্ধে কিছুই বলেনি? সেটা কি করে সম্ভব'? আমার এবার একটু রাগ হল, ক্ষুন্নভাবে বললাম—'আপনাকে তো আমি সবকিছুই খুলে বলেছি তারপরেও যদি আমাকে মিথ্যেবাদী মনে হয় তাহলে আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি! রুদ্রপ্রসাদ সামান্য হেসে বললেন—'তোমার কথায় অবিশ্বাস করছি না, প্রথমবার দেখেই বুঝেছি, তুমি ছেলেটা ভালো তবে তেমন চালাক নও, তবে আবার এতটা নির্বোধও নও নিশ্চয়ই যে জেনেবুঝে ফাঁদে পা দেবে। কিন্তু তা হলেও হিসেবটা যে মিলছে না'!—'ঝুঁকি বলতে কি আপনি পুলিসের দিকটা বলছেন, হ্যাঁ সেটা তো ছিলই'।
—'উঁহুঃ সেসব কিছু নয়, এই ক্রিয়ায় সহায়তা করার ফলে যে অপার্থিব প্রভাব তোমার উপর পড়বে আমি সেই বিপদের কথা বলছি'।
—'তেমন কিছু আমার জানা নেই'। রুদ্রপ্রসাদ এবার যেন নিজের মধ্যে ডুবে গেলেন, কিছু পরে স্বগতোক্তি করার মতো বললেন—'অবশ্য অপশক্তির উপাসনায় শঠতার ব্যবহার অস্বাভাবিক নয়, এখানেও নিশ্চয়ই তেমন কিছুই ঘটেছে'।
ঘড়ির দিকে চোখ পরল, এবারে বেড়িয়ে পরা দরকার, স্কুলের সময় হয়ে এসেছে প্রায়, ভাবছি ভদ্রলোককে বলে উঠে পড়ব, তখুনি রুদ্রপ্রসাদ উত্তেজিত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—'জয়ন্ত ঘটনার শুরুতে তোমার অনুপস্থিতিতে ছেলেটি তোমার ফ্ল্যাটে নিজেই এসেছিল, তাই তো'?
—'হ্যাঁ'।
—'সেসময় ও কি ঘরে একাই ছিল'?
—'হতে পারে, তবে সেটা জগন্নাথদাই বলতে পারবে'। ভদ্রলোক অধীরভাবে বললেন—'জয়ন্ত, বাড়ি যাও এক্ষুনি, জিনিসটা খোঁজ ওটা ওখানেই কোথাও আছে'। -'কিন্তু খুঁজবটা কি'?
—'দলিল! পাতি কথায় জাহান্নামের লাইফটাইম মেম্বারশিপ কার্ড, সেটা কাগজ, চামড়া এমনকী কাপড়েরও হতে পারে। এখানে মনে হয় কাগজেরই হবে'। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম—'ঠিক আছে স্কুল থেকে ফিরে খুঁজব নাহয়'।
—'স্কুল'! রুদ্রের মুখ দেখে মনে হল তিনি বোধহয় এখুনি হার্টফেল করে বসবেন, উৎকণ্ঠিত স্বরে বললেন—'তুমি এখনো বুঝতে পারছ না, কত বড় বিপদ আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, কত মানুষের জীবন বিপন্ন হবে, জয়ন্ত প্লিজ যেটা বললাম, সেটা আগে করো, আর হ্যাঁ জিনিসটা হাতে আসা মাত্র আমাকে ফোন করবে'। মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই রুদ্রপ্রসাদ অরিন্দমকে ডেকে নিলেন আর আমার আপত্তি সত্ত্বেও ফের একবার ওই গাড়িতে সওয়ার হতে হল।
গাড়ি হাজরা মোড়ে এসে পৌঁছোতে নেমে পড়লাম, এখান থেকে বাস ধরে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেব, অরিন্দম অবাক হয়ে বলল—'কিন্তু জেঠু যে বলল, আপনি বাড়ি যাবেন'? বললাম—'স্কুলে না গেলে কি চাকরি থাকবে ভাই! কিন্তু তোমার জেঠুকে সেসব বলতে গেলে উনি হয়তো পিড়াপিড়ি করতেন, বয়স্ক মানুষ, তুমি একটু ওনাকে বুঝিয়ে বোল'। অরিন্দম চলে গেল আর আমিও বাসে উঠে পড়লাম, একটা কথা অবশ্য আমার মাথায় ঢুকছে না, সেদিন ছেলেটিকে চণ্ডের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার আগেই পুলিসের আক্রমণে, চণ্ডের পৃষ্ঠপোষকরা সবাই তাদের ইষ্টদেবের সাধের নরকে গিয়ে ভিড় জমিয়েছে, তা হলে চণ্ডরাজা এই পৃথিবীতে আর কার উপর ভর করবেন? তা ছাড়া ছেলেটিকে বলিই বা দেওয়া গেল কোথায়? সে তো মারা গেল হার্টফেল করে! রুদ্রপ্রসাদ অকারণ দুশ্চিন্তা করে আমাকে টানাহ্যাঁচড়া করছেন। মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠতে দেখলাম রুদ্রপ্রসাদ ফোন করেছেন, মহা মুশকিল! এখন কি যে বলি, হ্যান্ডসেট-টাকে সাইলেন্ট করে ব্যাগে রেখে দিলাম, এবারে যত ইচ্ছে ফোন করুক!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন