সঞ্জয় ভট্টাচার্য
ঘড়িতে মোটে সোয়া আটটা বাজে কিন্তু শীতের সন্ধেয় অন্ধকারাচ্ছন্ন এই বাড়ির মধ্যে এখনই যেন মধ্যরাত্রির অনুভূতি হচ্ছে। একটা চাকাওয়ালা ট্রলি টেবিলের উপর স্টিলের থালায় রুটি আর চিনেমাটির পাত্রে খাসির মাংসের ঝোল সাজিয়ে বৃন্দাবন চলে গেল। তপন ওর খাবারের থালা নিয়ে উলটোদিকের চেয়ারে পা তুলে বসল, আর আমিও হাত ধুয়ে খেতে বসলাম। খিদেটা ভালোমতোই চেগেছিল, হাতে গড়া রুটির বড়সড় একটা টুকরো একখণ্ড মাংস সমেত ছিড়ে মুখের ভিতর চালান করে দিলাম।
বৃন্দাবনের রান্নায় ঝাল আর নুনের কিছুটা বাড়াবাড়ি থাকলেও খেতে নেহাত মন্দ লাগল না। তপনকে দেখলাম খুবই সামান্য পরিমাণে খেল, নামমাত্র মুখে দিয়েই বৃন্দাবনকে এঁটো বাসন নিয়ে যেতে বলল, আমি স্বপ্রশ্ন দৃষ্টে চাইতে বলল—'পেটপুরে খেলে ঘুম পেয়ে যাবে, আর আজ রাতে কিছু দরকারি কাজ আছে জেগে থাকতে হবে'। আমি আর কথা না বাড়িয়ে রুটি-মাংসে মন দিলাম। আমার সবেধন নীলমণি, জগন্নাথের রান্না অতি অখাদ্যি, যে খেয়েছে সে বুঝবে, সে তুলনায় বৃন্দাবনের রাঁধা মাংস তো অমৃত সমান, তপন বলল—'জয়ন্ত স্যালাড দিতে বলি, আর বৃন্দাবন বলছিল বাজার থেকে ফ্রেস কাঁচাগোল্লা নিয়ে এসেছে'। বিরক্ত হয়ে বললাম—'জিগ্যেস করার কি আছে, যা আছে তাড়াতাড়ি নিয়ে আয়'। তপন ব্যস্ত হয়ে—'হ্যা আসছি' বলে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেল আর তিন মিনিটের মধ্যেই ফেরত চলে এল তার দু-হাতে ধরা দুটো প্লেটের একটাতে কয়েকটা শসার টুকরো অন্যটায় খান চারেক মাখা সন্দেশ। শসাগুলোতে বৃন্দাবন যত্ন করে নুন, গুড়ো লংকা মাখিয়ে দিয়েছে সেগুলো গলাধঃকরণ করে মিষ্টির প্লেটটা হাতে তুলে নিলাম, তপনের দিকে চাইতে ও হেসে বলল—'তুই খা আমার জন্য রাখা আছে'। ভালো কথা, নৈশভোজ সাঙ্গ হল। এঁটো হাত ধুয়ে চেয়ারে এসে বসলাম।
তপন খাটের উপর আয়েশ করে বসে মুখে একচামচ মৌড়ি ফেলে চুষতে চুষতে আবার বলতে শুরু করল—'সুশীলবাবুই সব ব্যবস্থা করে দিলেন, ভগীরথপুরে কিছুদিন আগে মাটি খুঁড়ে একটা প্রাচীন মন্দির আবিষ্কার হয়েছে তাই ওখানে আজকাল সংখ্যায় খুব কম হলেও ট্যুরিস্টের যাতায়াত শুরু হয়েছে, আমিও রিপোর্টার কাম গবেষক সেজে রওনা দিলাম।
ভগীরথপুর গ্রাম একেবারেই অজ-পাড়াগাঁ। না আছে ইলেকট্রিসিটি না পাকা রাস্তাঘাট, সন্ধের পর পুরো গ্রামটাই অন্ধকারে ডুবে যায়। আধুনিক যুগের অগ্রগতির ঢেউ এখানে চরমপন্থি আন্দোলনের ধাক্কায় একেবারেই থমকে গেছে। সুশীলবাবু সতর্ক করেই দিয়েছিলেন, এখানে মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা ব্যবহার করা যাবে না, অন্যথায় নকশালদের নজরে পরে যাওয়ার সম্ভাবনা। আমিও সেইমতোই ব্যবস্থা করলাম, মোবাইলটাকে সুইচ অফ করে ব্যাগের এক কোণে ঢুকিয়ে রাখলাম। আমার থাকার ব্যবস্থা হল সনাতন হাঁসদার বাড়িতে, নামমাত্র ভাড়ায় থাকার জন্য একটা খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘর আর খাওয়ার ব্যবস্থাও ওনার সঙ্গেই হবে স্থির হল, যাকে শহরে বলে পেয়িং গেস্ট, সেই আর কি। যে মন্দিরটা দেখার অজুহাতে এসেছি, সেটা নেহাতই মামুলি একটা পোড়া মাটির মন্দির, কোনও গ্রাম্য জমিদারের খেয়ালে গড়া হিসেবি নির্মাণ, প্রত্নতত্ত্বে আমার সামান্য যেটুকু জ্ঞান আছে তাতে হলপ করে বলতে পারি, ইতিহাসের কোনও খেয়ালি পড়ুয়াও এর পিছনে বাড়তি সময় খরচ করবে না। আমি দুটোদিন ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস হাতে নিয়ে মন্দিরের দেওয়ালগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম আর নোটবুকের পাতাগুলো হিজিবিজি লিখে ভরিয়ে ফেললাম। সমস্যা হল এই অজ-পাড়াগাঁয় বেশিদিন থাকলে স্থানীয় লোকের সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে, যদিও কপাল জোরে সেইসময় সনাতনের মেয়ের বিয়ের তোড়জোড় চলছিল, সুযোগ বুঝে সনাতনের সামনে আহ্লাদে গদগদ হয়ে কথাটা পারলাম, আদিবাসী বিয়ের অনুষ্ঠান দেখাটা আমার জীবনের স্বপ্ন, সনাতন খুশি মনেই আমাকে নেমন্তন্ন করল আর আমিও হাতে দুটো সপ্তাহ বাড়তি সময় পেয়েই গেলাম। সনাতনের একটা ভাগ্নে আছে বৃন্দাবন, যাকে আমার সঙ্গে দেখছিস, ছেলেটির বাবা-মা ওর খুব ছোট বয়সেই গত হয়েছেন, বৃন্দাবনের মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি তেমন কিছু নেই, মামা-মামির গলগ্রহ বিশেষ, উদয়াস্ত খেটেও এই সংসারে সে যে মূল্যহীন তা বলাই বাহুল্য। ছেলেটা খুব সহজেই আমার নেওটা হয়ে পড়ল, অজ-পাড়াগাঁর এই পরিবেশ থেকে শহরের জাঁকজমক বৃন্দাবনকে খুব বেশিরকমের আকর্ষণ করে, ওর ধারণা সেখানে একবার গিয়ে পড়তে পারলেই জীবনের সব ইচ্ছা পূর্ণ হতে বাধ্য, ওর মন রাখার জন্য একদিন বললাম ওকে শহরে নিয়ে যাব যেখানে আমি থাকি।
গ্রামের শেষ প্রান্তে জঙ্গলের মধ্যে অনার্য দেবতা চণ্ডদেবের মন্দির। মন্দিরটা অত্যন্ত প্রাচীন, স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস সেটা নাকি সৃষ্টির আদিকাল থেকেই ওখানে আছে, তবে বাজে কথায় কান না দিয়েও স্থাপত্যের ধরন দেখে বলা যায় মন্দিরটা আর কিছু না হোক অন্তত তিনশো বছরের পুরোনো তো হবেই। সুশীলবাবুর কথামতো এখানেই নরবলি হয়ে থাকে। মন্দিরটায় চেষ্টা করেও ঢুকতে পারিনি, স্থানীয়েরা তো মন্দিরের দশ হাত দূর থেকেই প্রণাম করে পালায়, বিশেষ দিন ছাড়া এই মন্দিরে ঢুকলে নাকি দেবতার কোপে সর্বনাশ হতে বাধ্য। আমি অবশ্য গ্রাম্য সংস্কারে মাথা ঘামাই না কিন্তু যখনি ওদিকে গেছি, মন্দিরের পাহারাদার সুরকি হাতে তেড়ে এসেছে। মন্দিরটা সারাদিন পাহারা দেয় দুজন গাঁট্টাগোট্টা আদিবাসী যুবক, রাতের দিকে অবশ্য কোনও পাহারা থাকে না, তখন মন্দিরে থাকে ওখানকার পুরোহিত।
কয়েকটা দিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে কেটে গেল। মন্দির আর তার দেবতার ব্যাপারে কয়েকটা খবর এর মধ্যে জোগাড় হয়েছে। চণ্ডদেব জাগ্রত দেবতা, ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে তিনি সর্বদা উদারহস্ত তবে পাল্লা দিয়ে তার রক্ত লোলুপতাও যেন লাগামছাড়া। গ্রামের লোকেরা হাঁস, মুরগি, পায়রা, মহিষ যার যেমন সামর্থ মানসিক করে আর বছরের একটা বিশেষ দিনে, দেবতার উদ্দেশ্যে বলির জন্য সেগুলিকে হাজির করানো হয়। রক্তের স্রোতে মন্দিরের চাতাল যখন থইথই করে তখন নাকি চণ্ড বিশেষ প্রসন্ন হন। এই মন্দিরে আপামর জনসাধারণের প্রবেশাধিকার বছরের শুধু ওই একটি বিশেষ দিনের জন্যই বরাদ্দ। মাঘ মাসের অমাবস্যা তিথির রাত যেটা এই অঞ্চলে ''চণ্ডের রাত'' বলে বিখ্যাত, ঠিক তার পরের দিন সূর্যোদয়ের পর। ওই বিশেষ দিনটি বাদ দিলে বাকি বছরভর শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিরই চণ্ডের সেবার অধিকার আছে আর সে হচ্ছে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিলোচন, এমনকী গ্রামের যে দুজন যুবক পালা করে মন্দির পাহারা দেয় তাদেরও নাকি সদর দরজা ঠেলে চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশাধিকার নেই। পুরোহিত ত্রিলোচন সম্পর্কেও অদ্ভুত সব কথা কানে এল। লোকটা নাকি কপাল দেখে ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান বলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, ইচ্ছেমতো যেকোনও লোককে সম্মোহনের দ্বারা বশীভূত করাটাও তার কাছে ছেলেখেলা তবে সবথেকে যেটা মারাত্মক সেটা হল যাকে তাকে বাণ মেরে পঙ্গু করে দিতে সে নাকি সিদ্ধহস্ত।
তপন যেন শ্বাস নেওয়ার জন্য থামল আর সুযোগ পেয়ে আমি বললাম—'যতসব মধ্যযুগীয় কুসংস্কার'। তপন সামান্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর গভীর স্বরে বলল।—'শুরুর দিকে আমারও তেমন কিছুই মনে হয়েছিল, যাইহোক এই মুহূর্তে শুধু এটাই বলতে পারি ত্রিলোচনের অদ্ভুত ক্ষমতার পরিচয় আমি শীঘ্রই পেয়েছিলাম। এরপরের ঘটনা বলি'।
'ত্রিলোচনকে দেখলাম গ্রামের লোকজন যমের মতো ভয় করে আর নেহাত দরকার না পড়লে ধারকাছ মাড়ায় না। আমি খোঁজখবর করে বুঝলাম আর কিছু না হোক দুটো জিনিসের প্রতি ওর আকর্ষণ দুর্নিবার! মদ আর গাঁজা। মনে হল ওদুটো জিনিস প্রয়োজনমতো জুগিয়ে গেলে লোকটার বন্ধুত্ব অর্জন করা সম্ভব। বাস্তবে হলও তাই। সম্পাদকের কাছ থেকে পাওয়া টাকার কিছুটা দেশি মদ আর গাঁজা কিনতে খরচ হয়ে গেল। ফলও মিলল হাতেনাতে, ত্রিলোচনের কপালে এমন উপুড়হস্ত বন্ধু আগে কখনও জোটেনি, যে না চাইতেই মদ, গাঁজার ভেট এনে মুখের সামনে হাজির করে। আমি অচিরেই ত্রিলোচনের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলাম। তারপর থেকে আমার দিনের বেশিরভাগ সময় ত্রিলোচনের সঙ্গেই কাটতে লাগল। গাঁজার কল্কেতে দম দিয়ে আমরা দুজনে গ্রামের মাঠে-ঘাটে, শ্মশানে মশানে পরে থাকতাম, ত্রিলোচনের কাছে ছিল পাহাড়-জঙ্গলের অদ্ভুত সব কাহিনির অফুরন্ত স্টক, আর মাঝেমধ্যে শোনাত চণ্ডদেবের নানা অলৌকিক ক্ষমতার কাহিনি। এহেন ত্রিলোচন আবার নাকি মারাত্মক রকমের উচ্চাকাঙ্ক্ষী! তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন হল জনৈক বাবুলাল ওঝার মতো নাম-যশ-প্রতিপত্তি অর্জন করা, এই জঙ্গলদেশে নেহাত আনাড়ি আমি, তাই ত্রিলোচনের উচ্চাশার পরিমাপ করতে পারলাম না। জঙ্গলের ভিতরে একটা বিশেষ স্থানে বাবুলালকে সমাধি দেওয়া হয়েছে, সেই জায়গাটাকে স্থানীয়েরা বাবুলালের টিলা বলে অভিহিত করে, এই টিলাটির নাকি আবার বিশেষ মাহাত্ম্য আছে, ত্রিলোচন বলল একদিন আমাকে সেখানে নিয়ে যাবে।
এই ত্রিলোচন লোকটি বড়ই জটিল প্রকৃতির, সময় সময় বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করলেও ওর চরিত্রের সব থেকে বড় দোষ ছিল ওর আত্মভরিতায়, আমার জীবনে এত উদ্ধত আচরণের প্রদর্শন আগে কখনো দেখিনি, গ্রামের সাধারণ লোকজনকে তো সে মনুষ্যপদবাচ্য বলে মনেই করত না, আমাকে হয়ত কিছুটা অন্য চোখে দেখত, সেটা আমার শহুরে ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য হতে পারে, তবে পান থেকে চুন খসলেই আর রক্ষে ছিল না! সামান্য বিষয়েও যাচ্ছেতাই ভাষায় অপমান করে খেঁদিয়ে দিত, পরে আবার মাথা ঠাণ্ডা হলে ডেকে গল্প জুড়ত। আমি দাঁত চিপে সব সহ্য করছিলাম কেননা আমার অবচেতন মন যেন আমার মস্তিষ্ককে ক্রমাগত সংকেত দিচ্ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন এই আদিম গ্রামটার মধ্যে এমন কিছু আছে যেটা এই ছন্নছাড়া রিপোর্টারের জীবনের ধারা বদলে দিতে পারে, অতীতে মনের নির্দেশে গুরুত্ব না দিয়ে ঠকেছি, এবারে সিদ্ধান্ত নিলাম একটু ধৈর্য ধরে দেখব কি ঘটে?
একদিন ভরপেট চোলাই মদ আর শুয়োরের মাংস খেয়ে ত্রিলোচনের মনে বড় ফুর্তি জাগল, দরাজ কণ্ঠে বলল—'বাবু তুদের শহরের লোকগুলা বড় হারামি, আর মাগি-গুলো মুখে স্নো-পাউডার ম্যাখে নিজেরে হিরোনি ভাবে! আমাদের গেরামের ঘর-গেরস্থদের মানুষ বলেই মান্যি করে না, যত্ত শালা হারামজাদা হারামজাদির দল। তবে বাবু তুই উদের মতো না রে, তু শালা ভালো মানিষ আছিস, আয় তোরে আজ চেলা বানাই লি'। মহা মুশকিল হল! ত্রিলোচনের চেলা হওয়ার কোনও বাসনাই আমার নেই, কিন্তু সে কথা মুখে বললে বেমক্কা গালাগালি খাবার সম্ভাবনা, যতই এড়ানোর চেষ্টা করি ত্রিলোচনের জেদ ততোই বাড়ে, শেষে উপায়ন্তর না দেখে রাজি হতেই হল, ত্রিলোচন খুশি হয়ে বলল—'আয় তবে তোরে একটা শুকনো বাণ মারা শ্যাখায় দি, এতে করে তুই শত্তুরে জব্দ করতে পারবি তবে জানে কিন্তু মারতে পারবি না, জানে মেরে দিতে চাইলি কিন্তু অন্য জিনিস আছে, সে তোরে আমি পরে শিখায়া দিব'।
ত্রিলোচন এরপর আমাকে একটা মন্ত্র আর তার প্রয়োগ শিখিয়ে দিল, এই ক্রিয়ার জন্য যেসব জিনিসপত্র দরকার সেসবও বলে দিল, মনে প্রচুর অবিশ্বাস সত্ত্বেও ত্রিলোচনের সন্তুষ্টির জন্য আমি মন্ত্রটা মুখস্থ করে নিলাম। ত্রিলোচন এবার গুরুদক্ষিণা চাইল, মানিব্যাগটা প্যান্টের পকেট থেকে বের করা মাত্র ওর ভিতরে যা ছিল হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিয়ে দূর দূর করে খেঁদিয়ে দিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন