সঞ্জয় ভট্টাচার্য
ত্রিলোচনের সঙ্গে যত মিশছি তত অবাক হচ্ছি, লোকটা প্রথাগতভাবে অশিক্ষিত আর বুনো হলেও যে ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন সে বিষয়ে আমার তিলমাত্র সন্দেহ নেই। সুরা ছাড়া আর একটা বিষয়ে তার আকর্ষণ অতি তীব্র সেটা হচ্ছে নারী! সে আমাকে প্রায়ই শহরের মেয়েদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে, গ্রামের মেয়েদের মধ্যে নাকি সেই জিনিসটাই নেই, যেটা আবার ওই শহুরে রমণীদের রয়েছে, আমি যতই বলি ও ব্যাপারটায় আমার অভিজ্ঞতা খুবই সামান্য ত্রিলোচন মানতে নারাজ! শেষে বানিয়ে বানিয়ে নানারকম রসালো গল্প উপস্থাপন করতে ত্রিলোচন বেজায় সন্তুষ্ট হল। লোভী স্বরে বলল—'বাবু আর দুটো বছর কোনওরকমে হু শব্দে কেটে যাক তারপর শহরে গিয়ে মৌজ করব, শহরের মাগিগুলা তো পয়সার ভুখা! তা তুই ওদের ট্যাঁক ভরে দিবিখন। আমি বিনীতভাবে জানাতেই যে এত পয়সা আমার কাছে কোনওদিন ছিল না এবং ভবিষ্যতেও কখনো হবে না, ত্রিলোচনের মুখ দেখে মনে হল সে যেন অবোধ বালকের নির্বুদ্ধিতায় বেশ মজা পেয়েছে, স্বস্নেহে বাৎসল্যে ভরা হাসি হেসে বলল—'তুর কাছে পয়সা কুথায়? পয়সা তোরে আমি দিব'। সেই বা এত পয়সা কোত্থেকে পাবে ঈশ্বর জানেন! কথায় কথায় ত্রিলোচন জানিয়েছে সে গত পাঁচ বছর ধরে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করছে, কিন্তু কি উদ্দেশ্যে সেটা কিছুতেই বলতে চায় না। কি ঘটতে চলেছে আর দু-বছর পরে ত্রিলোচনের জীবনে সেটা একটা প্রহেলিকা! পাহাড় জঙ্গল ঘেরা সভ্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন এই আদিম গ্রামে সবকিছুই যেন রহস্যময় আর এর সবথেকে বড় রহস্য খোদ ত্রিলোচন ওঝা।
আমি মাঝে মধ্যেই নরবলির বিষয়টা উত্থাপন করে ত্রিলোচনের পেট থেকে কথা বের করার চেষ্টা করতাম কিন্তু ধূর্ত লোকটা উদাসিনভাবে শুধু একটাই জবাব দিত—'উসব আগে হত শুনছি, এখন কুথায় হয় কে জানে'! বুঝতে পারছিলাম এই লোককে কায়দা করা সহজ কাজ নয় এর যতটা প্রকাশ্যে ততটাই যেন গোপনে, এত ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও সে আজ পর্যন্ত আমাকে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। কখনোসখনো অসতর্ক মুহূর্তে কিছু বলে ফেললেও তার মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গোপন তথ্যের হদিশ তাতে করতে পারছিলাম না। নেশার ঘোরে বলে ফেলা ত্রিলোচনের অসংলগ্ন কিছু কথার সূত্র ধরে একটা ধারণা ক্রমশ মনের মধ্যে দানা বাঁধছিল, যেটা শুধু একটা নির্দিষ্ট দিকেই ইঙ্গিত করছিল, রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু ত্রিলোচনের পূজিত ওই চণ্ডমন্দির! যেখানে আমি এখনো পর্যন্ত পা রাখতে পারিনি। আমার কৌতূহল ক্রমশ বাড়ছিল!
একদিন ত্রিলোচন আমাকে বলল—'বাবু মোড়লের বউ-টারে দানোয় পেয়েছে, ছাড়াতে যাব, তুই সাথে যাবি'?

ভাবলাম মন্দ কি, নতুন একটা মজা দেখা যাবে! ত্রিলোচনের সঙ্গে আমিও মোড়লের বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। এই গ্রামে যে দু-তিন ঘর অবস্থাপন্ন ব্যক্তির বাস, মোড়ল তাদের মধ্যে একজন। টালি আর খড়ে ছাওয়া ইটের দেওয়ালের ঘর।বাড়ির সামনে বারান্দা আর প্রশস্ত উঠোন। সেখানে দড়ির খাটিয়ায় বসে মোড়ল আর একজন তামাক খাচ্ছিল, ত্রিলোচনকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। উঠোনে অনেকগুলো লোক বসে, এরা গ্রামের সাধারণ সব মানুষ, মোড়লের দরকারে হাজিরা দিতে এসেছে। মোড়ল আমাদের খাতির করে খাটিয়ায় বসাল। ত্রিলোচনের দেখলাম তিরিক্ষি মেজাজ। ধমক দিয়ে জানতে চাইল এখনো চণ্ডের বলির উদ্দেশ্যে মোষের ব্যবস্থা হয় নি কেন? তা ছাড়া আজকাল মন্দিরের সেবার জন্য সিধের জোগান ঠিকমতো আসছে না কেন? মোড়ল হাতজোড় করে জানাল সবই তার দোষ, তবে কিছুদিন হল বাজার মন্দা চলাতে একটু অসুবিধে হয়ে গেছিল, ভবিষ্যতে এমন ভুল আর হবে না। ত্রিলোচন এবার একটু ঠাণ্ডা হল। খানিকটা তামাক টেনে মোড়লকে বলল রোগীকে এনে হাজির করতে। মোড়ল তাড়াহুড়ো করে বাড়ির ভিতর ছুটল আর এদিকে ত্রিলোচন নিজের কাজ শুরু করল, প্রথমেই কাধের ঝোলাটা হাতড়ে তার থেকে একটা গামছা বের করে উঠোনের নিকোনো মেঝের উপর পাতল। ঝোলা থেকে এরপর কয়েকটা লাল ফুল আর একটা তারের খাঁচা বের করে একটা একটা করে ওই গামছার উপর রাখল। দেখে চমকে উঠলাম খাঁচার মধ্যে একটা জীবন্ত খরগোস। খরগোসটা লম্বা কান দুটো খাড়া করে ভীত চোখে এদিক-ওদিক চাইছিল। খাঁচাটা এতই ছোট যে বেচারার নড়াচড়ার জায়গাও কিছু ছিল না। উপস্থিত জনতার মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠল। মোড়লের বউকে এনে হাজির করা হয়েছে। আমার অবাক হওয়ার একটা সীমা আছে যেটা এই গ্রামে আসা ইস্তক প্রতিদিনই পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে আজকেও খুব ব্যতিক্রম ঘটল না। বছর পঁয়ষট্টির বৃদ্ধ মোড়লের বউ দেখলাম বছর বাইশের এক তন্বী যুবতী! মেয়েটির পরনের বেশ আলুথালু, শাড়ির আঁচল বুকের উপর থেকে সরে গিয়ে ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে পুরুষ্টু ভাঁজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, উপস্থিত পুরুষদের কয়েকজনের মুখ দেখে মনে হল যুবতী শরীরের এই অপ্রত্যাশিত প্রদর্শন তাদের কাছে বেশ একটা ফাউ। এদিকে মেয়েটিকে সামলানোই দায়। দুজন মহিলা আর মোড়লকে সে একাই যথেষ্ট বেগ দিচ্ছে, প্রবল আক্রোশে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে এই অতিমানবী কোনওরকম ত্রুটি করছে না। ত্রিলোচন দেখলাম কৌতুকের দৃষ্টিতে ঘটনাটি দেখছে যেন শেষ কথা যা বলার সেই বলবে এখন মোড়ল নিজের ক্ষমতার দৌড়টা একটু বুঝে নিক। বেশি অপেক্ষা করতে হল না, মোড়লের কালঘাম ছুটে গেল, কাতর স্বরে মিনতি করে বলল—'দাদাঠাকুর আর যে পারছি না, কিছু একটা করো'। ত্রিলোচন দাম্ভিক হেসে বলল—'ওকে আমার সামনে ওই আসনটায় বসা'। আর একদফা সংঘর্ষ শুরু হল। এবার ভিড়ের মধ্যে থেকে আরও এক-দুজন এসে হাত লাগাল, অতিকষ্টে অনিচ্ছুক মেয়েটিকে ধরে পাকড়ে বসানো গেল। ত্রিলোচন আলখাল্লার পকেট থেকে একটা ছোট শিশি বের করে জলের মতো তরল কিছু মেয়েটির গায়ে ছিটিয়ে দিল। ভোজবাজির মতো কাণ্ড ঘটল! যে মেয়েটা এতক্ষণ বুনো মোষের মতো ছটফট করছিল সে হঠাৎ মুহূর্তমধ্যে শান্ত হয়ে পড়ল। ভালো করে দেখে বুঝলাম ও কিন্তু শান্ত হয়নি। সাপ যেমন ক্ষণিকের জন্য সাপুড়ের বশে থেকে ফণা দুলিয়ে ছোবল মারার সুযোগ খোঁজে মেয়েটিরও এখন ঠিক তেমন অবস্থা। ত্রিলোচনের নির্দেশে মোড়লের দল দূরে সরে গেল। ত্রিলোচন এবার অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা শুরু করল। প্রথমেই অদ্ভুত সুরে দুর্বোধ্য মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে একমুঠো কালো তিল ঝোলা থেকে বের করে ফুল গুলোর উপর ছড়িয়ে দিল তারপর একঘেয়ে সুরে সেইরকম মন্ত্র পরতে পরতে ফুলগুলো সুতো দিয়ে মালায় গেঁথে ফেলল, আমি এসব দেখে সেই মুহূর্তে মনে মনে ভাবছি ভণ্ডামির বহর আর কতদূর গড়াবে, তখুনি ত্রিলোচন সজোরে দু-হাতের চেটো দিয়ে তালি বাজিয়ে ফুলের মালাটা সামনে বসা মেয়েটির গলায় পরিয়ে দিল। যুবতীটি আচমকা সদ্য ডানা ছাটা মুরগির মতো কাতরাতে কাতরাতে ভয়ংকর আর্তনাদ করে উঠল। ত্রিলোচন অতি দ্রুত হাত চালিয়ে খাঁচা থেকে খরগোসটাকে বের করে মেয়েটির মুখের সামনে তুলে ধরল। দেখলাম ঝিমিয়ে পরা খরগোসটা সহসা অতিমাত্রায় চঞ্চল হয়ে পড়েছে। ত্রিলোচন যেন তাকে আর হাতে ধরে রাখতেই পারবে না এমনই তার ছটফটানি। হঠাৎ মেয়েটি কানফাটা তীব্র চিৎকার করে উঠোনে শুয়ে পড়ল আর তখুনি নিজের চোখে না দেখলে, কানে না শুনলে, হয়তো বিশ্বাস করতাম না, একটা হিংস্র অমানুষিক গর্জন যেটা শিরদাঁড়ায় হিমেল স্রোত বইয়ে দিল! শব্দটা এসেছে ত্রিলোচনের হাতে ধরা ছোট্ট খরগোসটা থেকে। কোনও অশুভ জাদুর প্রভাবে সুন্দর ছোট্ট প্রাণীটার আচমকা কুৎসিত রূপান্তর ঘটেছে। গায়ের সবকটা লোম খাড়া হয়ে ইতিমধ্যে সে একটা বিড়ালের আকারে পরিণত হয়েছে। সামনের পাটির দাঁত দুটো ঠেলে বেড়িয়ে এসে ধারাল ছুরির মতো চকচক করছে। তবে সবথেকে মারাত্মক ওর ভাবলেশহীন চোখ দুটোর বদলে যাওয়া উদ্দাম হিংস্র দৃষ্টি। ত্রিলোচন জন্তুটাকে উঠোনের মেঝেতে ছেড়ে দিল। মুক্তি পেতেই জানোয়ারটা তিন লাফে মোড়লের বাড়ির চৌহদ্দি ডিঙিয়ে বাঁশঝাড়ের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। গ্রামবাসীরা এতক্ষণ ভীত সন্ত্রস্তভাবে ভূত ওঝার খেলা দেখছিল এবারে সকলে একযোগে ত্রিলোচনের জয়ধ্বনি করে উঠল। মোড়ল বিগলিত স্বরে বলল—'দাদাঠাকুর তুই আমার বউরে বাঁচিয়ে দিলি, আর কখনও তোর কুন কথার অমান্যি করব না'। ত্রিলোচনকে স্পষ্টতই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সে গামছার খুট দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল—'কাজ এখনো বাকি আছে রে মোড়লের পো। ওই যে জানোয়ারটা জঙ্গলে ঢুকে গেল, ওর মধ্যে তোর কচি বৌয়ের প্রাণ-ভোমরা লুকিয়ে আছে, রাত কেটে সুয্যি ওঠার আগেই যে ওটাকে নিকেশ করে ফেলতে হবে, নইলে তোর বউটারে বাচায় কার বাপের সাধ্যি'! মোড়ল হাতজোড় করে বলল—'আদেশ দাও দাদাঠাকুর'? ত্রিলোচন গলার স্বর চড়িয়ে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলল—'সবাই মন দিয়ে শুন, আমার দুটো মরদ বাচ্চা চাই যারা দানোর শিকারে যাবে, একজন এই মেয়ের সোয়ামি, আর একজন কে যাবি বল? উপস্থিত পুরুষরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল, শেষমেশ কিন্তু একটা হাতও উঠল না। আমার মাথায় একটা কথা ঘুরছিল, ত্রিলোচন গা ঘেসেই দাড়িয়েছিল, চাঁপা স্বরে বললাম—'ত্রিলোচন আমি যাব'। ত্রিলোচন আমার কথায় বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে যুবকদের মধ্যে একজনের উদ্দেশ্যে হাঁক পারল—'হেই, জগনন্দনের ব্যাটা বাঁকেবিহারী, তু এদিকে আয় দিকি'। একজন বলিষ্ঠ দেহী যুবক এগিয়ে এল, ত্রিলোচন ছেলেটিকে আপাদমস্তক দেখে বলল—'দম আছে তোর? পারবি'? ছেলেটি বুক চিতিয়ে বলল—'একবার দেখোই না'! আমি এবার অধৈর্য হয়ে বললাম—'আমি শিকারে যেতে চাই আমাকেও নিয়ে চল'। ত্রিলোচন বিরক্ত হয়ে আমার দিকে ফিরল—'আমরা কি শিকার শিকার খেলতে যাচ্ছি? আজ রাতে ওই জঙ্গলে কি যে হবে, তা কে জানে? তুই বাবু ঘুরে ফিরে কলকাতায় ফেরত যা'। ত্রিলোচনের কথায় যেন বিদ্রুপের আভাস, সেই মুহূর্তে টের পেলাম চারপাশের ভিড়টার দৃষ্টি হঠাৎ আমার ওপর নিবদ্ধ হয়েছে। মোড়ল কেন জানি না হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন