সঞ্জয় ভট্টাচার্য
এতটা শুনে আমি বললাম—'তপন তাড়াতাড়ি একটা সিগ্রেট ছাড় দেখি'। তপন অবাক হয়ে বলল—'সেকি বললি যে আর খাবি না'। হেসে বললাম—'তোর এই গাঁজাখুরি গপ্পো হৃদয়ঙ্গম করতে হলে খানিকটা ধোয়ার সাহায্যের বিশেষ প্রয়োজন অন্যথায় মাথায় গোলযোগ বাধতে পারে'। তপন সিগারেট বের করে আমাকে দিল আর নিজেও একটা ধরিয়ে বলল—'অবশ্য তোর বিশ্বাস না হওয়াটাই স্বাভাবিক, তবে গল্পের পরের অংশটায় আমাদের কাজের বিষয় আছে, আর এবারে প্রমাণ হাতেনাতে পাবি'। কৌতূহলী হয়ে বললাম—'সেটা কিরকম'? তপন মুচকি হাসল, বলল—'একটু ধৈর্য ধরে শোন না, কথা দিচ্ছি আর বেশি বোর করব না'। তপন আবার বলতে শুরু করল।
সেদিন বিকেলে মোড়ল এলাহি ভোজের আয়োজন করল। গ্রামের লোকেদের পেটপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা তো রইলই, ত্রিলোচনের জন্য আলাদাভাবে আস্ত একটা ছাগল ঝলসে পাঠিয়ে দেওয়া হল সেইসঙ্গে আতপ চালের ভাত আর চোলাই করা মদের হাড়ি। ত্রিলোচন স্বাভাবিক- ভাবেই খোশ-মেজাজে ছিল। গত রাতের কেরামতির পর এলাকায় তার প্রভাব প্রতিপত্তি যে অনেকগুণ বেড়ে গেছে, সে আনন্দে মাত্রাছাড়া মদ্যপান করতে লাগল। একসময় ত্রিলোচন হুশ হারিয়ে পুরোপুরি মাতাল হয়ে পড়ল।
সে রাতে নেশার ঘোরে মত্ত ত্রিলোচন তার গোপন কথা আমার কাছে প্রকাশ করে ফেলল। যা শুনলাম তাতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি পাঁচ বছরের শিশুকে কয়েদ করে রাখা হয়েছে। ছেলেটির যখন ছ-মাস বয়স তখনই নাকি তাকে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছিল। ছেলেটি এলেবেলে কেউ নয়, ওড়িশার একটি বিখ্যাত রাজপরিবারের সন্তান, যাদের প্রভাব প্রতিপত্তি আজকের দিনেও যথেষ্টই রয়েছে। নরবলি চণ্ডরাজার অতীব প্রিয় আর সে বলি যদি রাজবংশের কারও হয়, তাতে এই দেবতা বিশেষ প্রীত হন। বলির দাতাকে চণ্ডরাজা অলৌকিক শক্তি প্রদান করেন। সে অপরিমিত ধনসম্পদের অধিকারী হয়, একশো বছরের জীবদ্দশায় ভোগ-বিলাস আর অপর্যাপ্ত ক্ষমতার অধীশ্বর হয়ে সেই ব্যক্তি নাকি চূড়ান্ত পদ অর্জন করে। ত্রিলোচন নিজে অবশ্য বাচ্চা চুরি করেনি করেছে অন্য লোকে। এতবছর ধরে ত্রিলোচন সেই রহস্যময় ব্যক্তির আদেশ পালন করে চলেছে, আর বছর দেড়েক ব্যস তারপর শিশুটিকে বলি দিয়ে ত্রিলোচনের রেহাই। মনিব কথা দিয়েছে নিজের সৌভাগ্যের ভাগ সে সহযোগীকে দেবে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাকি খবরগুলো জেনে নিলাম। ত্রিলোচন দিনে একবার একা গিয়ে ছেলেটিকে খাইয়ে আসে, অন্য কাউকে কখনো ওর সামনে যেতে দেওয়া হয়নি তাই দ্বিতীয় কোনও মানুষের মুখ ইতিমধ্যে ছেলেটি দেখেও নি। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী চণ্ডদেবের উদ্দেশ্যে বিশেষ নরবলি এভাবেই উৎসর্গ করা হয়। ত্রিলোচন এযাবৎ ছেলেটির সঙ্গে কখনও একবারের জন্যেও বাক্যালাপ করেনি অতএব ছেলেটির পৃথিবীর কোনও ভাষার সঙ্গেই পরিচয় ঘটেনি। আগাগোড়া অন্ধকূপে জীবন কাটানোর ফলে স্বাভাবিকভাবেই ছেলেটির বুদ্ধিরও কিছুমাত্র বিকাশ ঘটে নি। স্বল্প পরিসরে আবদ্ধ থেকে থেকে চলাফেরা করার ক্ষমতাও তার নেই। বলি দেওয়ার কায়দা আর দরকারি মন্ত্রগুলো একটা কাগজে নোট করে নিলাম। এরপর ত্রিলোচন ডমফাই করে তার মনিবের নাম আমার সামনে উল্লেখ করল। নামটা শোনামাত্র আতঙ্কের স্রোত শরীরের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেল। সামনে ভয়ংকর বিপদ! 'মদের নেশা কেটে যাওয়ার পর ত্রিলোচনের যদি আমাকে বলা কথা সব মনে পড়ে যায়, তা হলে পিতৃদত্ত প্রাণটি নিয়ে আর ফিরত যেতে হচ্ছে না। অনেক ভেবে স্থির করলাম বোকা সাজব, ত্রিলোচনের গুপ্ত রহস্য যে জেনে ফেলেছি ঘুণাক্ষরেও তার ইঙ্গিত দেব না। তারপর দেখা যাক কি হয়'!
'এরপর দু-তিনটে দিন কেটে গেল, আজকাল ত্রিলোচন আমাকে দেখলে এড়িয়ে চলে, মৌতাতে মজে সে যে বেফাঁস কিছু বলে ফেলেছে সে হুশ তার হয়েছে, তবে ঠিক কতটা? তা সে এখনো ভালোমতো ঠাহর করে উঠতে পারেনি। ত্রিলোচন কায়দা করে আমার পেট থেকে কথা বের করার চেষ্টা করেছিল, আমি না বোঝার ভান করে গা বাঁচিয়েছি, তাতে অবশ্য ওর সন্দেহ মেটেনি, আমি বিপদের গন্ধ পেতে শুরু করলাম, ত্রিলোচন ঘোট পাকাচ্ছে! সে যে তার রহস্যের অবাঞ্ছিত অংশীদারকে টিকিয়ে রাখতে চায় না, সেটা বোঝবার মতো বোধবুদ্ধি আমার ছিল। ভগীরথপুর থেকে তিন কিলোমিটার হেঁটে গেলে বাস রাস্তা, সকাল ন-টায় সেখান থেকে কেওনঝাড়ের বাস পাওয়া যায়, আমি গ্রামের একটা ছেলেকে দিয়ে ত্রিলোচনের কাছে খবর পাঠালাম, জানালাম এক আত্মীয়ের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তড়িঘড়ি কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হয়েছে, এক ফাঁকে বৃন্দাবনকে ডেকে কয়েকটা জরুরি নির্দেশ দিয়ে গেলাম। ভগীরথপুর থেকে কেওনঝাড় বাসে করে পৌঁছোন গেল, সেখান থেকে গাড়ি পালটিয়ে সোজা ভদ্রক। গলায় একটা সোনার চেন ছিল। ওটা বেঁচে হাতে কিছু নগদ এল, এবার একটা সস্তার হোটেলে দিন সাতেকের জন্য ঘাপটি মেরে পরে থাকা। ত্রিলোচন যার এজেন্ট তার হাতের নাগাল টপকে এই ভদ্রক শহরেও আমি তিলমাত্র নিরাপদ নই, তবে ভরসা একটাই! ত্রিলোচন ধুরন্ধর লোক, সে যে মৌতাতে মজে মনিবের গুপ্তরহস্য ইয়ার-দোস্তদের কাছে ফলাও করে জাহির করেছে, সেটা আবার বড় মুখ করে বলে নিজের বিপদ ডেকে আনবে, এতটা মূর্খ ওকে ভাবতে পারছিলাম না।
আমার মাথায় তখন অন্য চিন্তা। পিছনের সাড়িতে পরে থাকা নগণ্য একটা সংবাদপত্রের অস্থায়ী নিউজ রিপোর্টারের এই চাকরিটা ছাড়া আমার সম্বল আর কিছুই নেই। জীবনে উন্নতির স্বপ্ন নেহাতই দুরাশা। অন্যদিকে, ত্রিলোচনের কথা যদি সত্য হয় আর যদি বাচ্চাটাকে একেবারে কলকাতার মাঝে এনে ফেলা যায় তাহলে কত বড় ব্রেকিং নিউজ তৈরি হবে, সেটা ভাবতেও রোমাঞ্চ হল। রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার এমন সুযোগ জীবনে আর হয়তো পাওয়া যাবে না। বলা বাহুল্য এতে ঝুকিটাও কিছু কম নয়, একেবারে যাকে বলে প্রাণ হাতে নিয়েই এই অভিযানে নামতে হবে, উচ্চাশার সামনে ভয় বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারল না। ঠিক করলাম পরিস্থিতির মোকাবিলা করব, হয় জিতব না হয় তো মরব। পরিকল্পনা মতো পুরো দুটো সপ্তাহ অপেক্ষা করলাম, বৃন্দাবনকে বলা ছিল ওদিকে নজর রাখতে আর কোনও খবর পেলে যেন আমাকে জানায়, এই দু-সপ্তাহে শুধু একবার মাত্র বৃন্দাবনের ফোন এসেছে, যা শুনলাম তাতে চিন্তার পরিমাণ বাড়ল। ত্রিলোচন সাবধান হয়ে গেছে, আগে মাঝে মধ্যে পাহারায় ঢিলেমি দিলেও এখন প্রায় সর্বক্ষণ সে কড়া নজর রেখে চলেছে। দারোয়ান দুজন সন্ধের পর চলে গেলে আজকাল ত্রিলোচন নিজেই রাতভর জেগে নজর রাখছে। বুঝলাম আমার কাজ কঠিন থেকে দুরূহ হতে চলেছে। আর বেশি সময় কোনওভাবেই নষ্ট করা যাবে না, ভদ্রক মফঃস্বল শহর, বেশিদিন এখানে বসে থাকলে স্থানীয় লোকের সন্দেহ হতে পারে, ঠিক করলাম, আপাতত কলকাতায় ফেরত যাব তারপর নাহয় মাসদুয়েক পরে ফের দেখা যাবে। হঠাৎ সেদিনই বৃন্দাবনের ফোন এল, গত রাতে নাকি ত্রিলোচন গলা অবধি মদ খেয়ে প্রচুর মাতলামি করেছে, সে নিজে দেখেছে, বুঝলাম ত্রিলোচন ঢিলে দিয়েছে, পাঁড় মাতাল কি আর বেশিদিন মদ ছেড়ে থাকতে পারে! যে জিনিসগুলো আমার দরকার সেগুলো তাড়াতাড়ি জোগাড় করে নিলাম, একটা বড় সাইজের ট্র্যাভেল লাগেজ, একটা সাত সেলের টর্চ আর প্রচুর পরিমাণে টয়লেট প্যাড। ভদ্রকের বেহেরা ট্র্যাভেলসকে বলে একটা টাটা সুমো গাড়ির ব্যবস্থা করা গেল। বেলা গড়িয়ে গেলে গাড়িটা নিয়ে ভগীরথপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ভগীরথপুর গ্রামে গাড়ি ঢোকবার মতো রাস্তা নেই, তাই সেটাকে বাস রাস্তার একপাশে রেখে, হাতে স্যুটকেশটা নিয়ে পায়ে হেঁটে গ্রামে প্রবেশ করলাম। তবে ঠিক যেদিকে গ্রামের জনবসতি সেদিকটা এড়িয়ে জঙ্গলের ভিতর একটা ঝাঁকড়া গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। সন্ধে সাতটা পর্যন্ত এখানে লোক চলাচল করে, চাইছিলাম না তাদের কারও নজরে পরে যাই ওদিকে আবার গাড়িতে বসে থাকলে ড্রাইভারের মনে সন্দেহ জাগতে পারে তাই দুদিক বাঁচাতে এমন ব্যবস্থা নিতে হল। রাত ন-টা অবধি আত্মগোপন করার পরে নিশ্চিত হলাম, গ্রামে আজ রাতে আর কেউ জেগে বসে নেই, এবার সাবধানে বেড়িয়ে পরলাম। নিস্তব্ধ নির্জন চেনা গ্রাম্য পথ দিয়ে বৃন্দাবনের বাড়ির সামনে চলে এলাম। বৃন্দাবন গোয়ালে খাটিয়া পেতে শুয়েছিল, আমি শিষ দিতে বাইরে বেড়িয়ে এল। ওর কাছে খবর পেলাম, কয়েকদিন মদ, গাঁজা কিছু না ছুয়ে ত্রিলোচন সজাগ থেকে মন্দির পাহারা দিয়েছে, তবে বিগত দুদিন হল সে আবার তার পুরোনো অভ্যাসে ফিরত গেছে। বুঝলাম ভাগ্য আমার সহায়, মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে মন্দিরের দিকে হাটা দিলাম, এবারে সঙ্গে বৃন্দাবন চলল।
বৃন্দাবনকে মন্দির থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়াতে বলে আমি একাই ভিতরে ঢুকলাম। মন্দিরে পৌঁছে সে রাতে যা দেখলাম আগেও অনেকবার দেখেছি।
ত্রিলোচন আকণ্ঠ মদ গিলে বেহুশ হয়ে চাতালে এলিয়ে পড়ে আছে, আমি ওর কোমর থেকে সাবধানে চাবির গোছা বের করে মন্দিরের দরজা খুলে সটান ঢুকে পরলাম। গর্ভগৃহের ভিতরে আলোর কোন ব্যবস্থাই নেই একেবারে নিকষ্যি অন্ধকার। পায়ে কয়েকটা চলন্ত মাংসপিণ্ডের ছোঁয়া লাগতেই আঁতকে উঠলাম। টর্চলাইটটা এখানে খুব কাজে এল, আলো ফেলে দেখলাম মেঝের উপর অসংখ্য মেঠো ইঁদুর কিলবিল করছে, গামবুটের গুঁতো দিয়ে ঠেলে সেগুলোকে একদিকে সরিয়ে দিলাম, এবার বেদির উপর চণ্ডরাজার মূর্তিতে আলো ফেলতেই বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। দেবতার অবয়বটা বড়ই অদ্ভুত? কি হিংস্র লোলুপ চোখের দৃষ্টি, বড় বড় দাঁত বের করে যেন গিলে খেতে চাইছে আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় বড় অদ্ভুত রকমের জীবন্ত। মূর্তিটার চোখে চোখ রাখতে অস্বস্তি হচ্ছিল, অন্যদিকে চোখ সরালাম, এবারে তাকে খুঁজে বের করতে হবে যার জন্য এই অভিযান। টর্চের আলোয় ঘরটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে বুঝতে পারলাম এখানে তেমন কিছু নেই, এবারে মূর্তির পিছনের দেওয়ালে গিয়ে হাতড়ে একটা বন্ধ দরজা দেখতে পেলাম। সামান্য ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল, ঘরের ভিতর থেকে মৃদু অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ কানে আসছিল। ঘর না বলে ওটাকে অবশ্য চোরকুঠুরি বলাই ভালো, অত্যন্ত নীচু ছাদ, আর দুদিকে সংকীর্ণ পাথুরে দেওয়াল, কোনওরকমে মাথা বাঁচিয়ে ঢুকে দেখলাম, তক্তপোষের ওপর কঙ্কালসার চেহারার একটা ছেলে বেঁকেচুরে শুয়ে, ছেলেটিকে টেনে হিঁচড়ে কোনওরকমে বাইরে এনে ফেললাম। হঠাৎ কি মনে হতে মূর্তির তলায় বেদিটা হাতড়ে দেখলাম, বুনো ফুল দিয়ে ঢাকা একটা ছোট সাইজের গোলাকৃতি পাথরে হাত ঠেকল। অনুমান করলাম এটাই এই দেবতার প্রতিষ্ঠা করা প্রাণ ভোমরা আর উপরের মূর্তিটা নিছক আবরণ। কোনও কিছু না ভেবেই শিলাখণ্ডটা রুমালে জড়িয়ে পকেটে পুরে নিলাম। ছেলেটাকে কাঁধে তুলে সদর দরজা ঠেলে বের হতে গিয়ে এবারে ত্রিলোচনের মুখোমুখি হয়ে পরলাম, নেশার ঘোর কিছুটা কাটার ফলে সে তখন টলতে টলতে এদিকেই এগিয়ে আসছিল, টর্চের জোরালো একটা ঘা মেরে ওকে মাটিতে শুইয়ে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পরলাম। সবার আগে ছেলেটাকে স্যুটকেশে ভরে ফেললাম, তারপর দেড় কিলোমিটার রাস্তা গ্রামের ভিতর দিয়ে বাক্সটা বহন করে এনে গাড়িতে তুললাম। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চলার পর ভোর রাতের দিকে গাড়ি এসে পৌঁছোল কসবা নারায়ণগড়ে। মফঃস্বল শহরটা বাংলা ওড়িশার বর্ডারে। আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম, আমার পরিচিত একজনের গেস্ট হাউসে, আমরা স্যুটকেশ সমেত উঠলাম। এখান থেকে হলদিয়া ধরে কলকাতা যেতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার, কিন্তু সঙ্গে থাকা বাচ্চাটার জন্য বিরতি নেব ঠিক করলাম, গাড়ি আর ড্রাইভার পালটানোও জরুরি, তা ছাড়া লং-জার্নির ধকল ছেলেটা নিতে পারবে না, জন্মাবধি চোরকুঠুরিতে বন্দি থাকার ফলে ছেলেটার চোখ কোনওরকম আলো সহ্য করতে পারবে না মোটামুটি আন্দাজ করে নিয়েছিলাম, তাই যে ঘরে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল তার জানলাগুলো পর্দায় ঢেকে দিলাম, কিন্তু তাতেও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় ওকে লাগেজের মধ্যেই রেখে দেওয়া স্থির করলাম।
বেলার দিকে প্রভাসদাকে ফোন করলাম।
প্রভাসদা তো একেবারে আকাশ থেকে পরলেন। প্রশ্নে প্রশ্নে একেবারে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন। এতদিন কোথায় ছিলাম? সমীরণের ইন্টারভিউয়ের কি হল? কোনওরকমে প্রভাসদাকে থামিয়ে বললাম, কাল কলকাতায় ফিরছি, উনি যেন বিরাট একটা খবরের জন্য তৈরি থাকেন। আসল ব্যাপারটা যে কি সেটা আর ভাঙলাম না। কাল যখন ছেলেটাকে প্রকাশ্যে এনে হাজির করব তখন চোখের সামনেই দেখতে পাবে। এবার সমস্যা হল ছেলেটিকে নিয়ে, নতুন পরিবেশে ঘাবড়ে গিয়ে মুখ দিয়ে অদ্ভুত সব শব্দ বের করতে শুরু করল। আপাতত আফিম গোলা জল খাইয়ে ওকে শান্ত করলাম। দিনের বেলায় ওকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করা অনুচিত, বাক্সসমেত ধরা পরলে যে ছেলেধরা বিবেচনায় গণধোলাই নিশ্চিত প্রাপ্য সেটা সহজেই অনুমেয়। গাড়ির ব্যবস্থা করলাম সেদিন মাঝরাতে।
হোটেলের ম্যানেজার নির্মল সাধুখাঁর সঙ্গে আগে থেকেই আলাপ ছিল পেশার সূত্রে, ভদ্রলোক বেশ খাতিরযত্ন করলেন। আগেভাগে জানিয়ে রাখলাম আমাদের কামরায় রুম সার্ভিসের প্রয়োজন নেই, আমার অনুমতি বিনা যেন ওঘরে কেউ না ঢোকে। ভদ্রলোক কথায় কথায় বললেন হোটেলের বাগানে তিনি একটি শখের চিড়িয়াখানা গড়ে তুলেছেন, এবং সেটা আমাকে দেখাতে চান, এইমুহূর্তে ঘর থেকে বেশিক্ষণ বাইরে থাকাটা অনুচিত কাজ তাই একটা অজুহাত দিয়ে আবার ঘরেই ফেরত এলাম।
সেদিনটা ছেলেটার দিকে নজর রাখতে রাখতেই কেটে গেল। যদিও আফিমের প্রভাবে ওর হুশ প্রায় ছিলই না তা হলেও সতর্কতায় ঢিলে দিলাম না, যতক্ষণ না কলকাতায় পৌঁছতে পারছি, বিপদের আশঙ্কা থাকছেই। গাড়ি আসবে রাত বারোটায়, ছেলেটাকে ফেনা ভাত আর পেঁপে সেদ্ব খাইয়ে, নিজেও ডিনার সেরে একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিলাম, বোধহয় তখন রাত দশটা হবে, হঠাৎ পেটে একটা ব্যথা অনুভব করলাম। তপন তলপেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলল—'এখানে'! ব্যথাটা ক্রমশ বাড়তে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করলাম। বৃন্দাবন ভয় পেয়ে ম্যানেজারকে ডাকতে যাচ্ছিল আমি বারণ করলাম, এই ঘরে কাউকে আসতে দেওয়া যায় না, আর আমি নিজে একমুহূর্তের জন্যেও ওই বাক্সটা ছেড়ে যেতে পারি না। আমার মোবাইলে ডাক্তার চ্যাটার্জির নম্বরটা সেভ করা ছিল, মোবাইলটা খুঁজতে প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই ছ্যাঁকা খেলাম! কি কারণে বা সুতির কাপড় ভীষণ তেঁতে উঠেছে। পকেট ঝেড়ে যা বেরোল সেটা আর কিছু নয়, রুমালে জড়ানো চণ্ডরাজার পাথর যেটা আমি একদিন আগে ভগীরথপুরের মন্দির থেকে তুলে এনেছি। পাথরটা থেকে একটা অদ্ভুত নীল আলো ঠিকড়ে বেরোচ্ছিল। আমি তাড়াতাড়ি পাথরটা রুমালে জড়িয়ে ড্রয়ারে রেখে দিলাম, এসব জিনিস বৃন্দাবনের চোখে পড়লে মুশকিল হতে পারে। আমি বৃন্দাবনকে কাজের অছিলায় বাইরে পাঠিয়ে দিলাম। এবারে ভালো করে পাথরটা চেক করা দরকার, অদ্ভুত একটা বিষয় নজরে পড়ল, পাথরটা যতই তেঁতে থাকুক না কেন এর দাহিকা শক্তি কিন্তু একেবারেই নেই, অন্যথায় প্যান্টের কাপড়ে এতক্ষণে আগুন লেগে যেতে বাধ্য। অথচ শিলাটায় হাত দিলেই ছ্যাঁকা খাচ্ছি, ত্রিলোচনের বলা কয়েকটা কথা হঠাৎ মনে পরল, চণ্ডরাজার যখন তেষ্টা পাবে সে তেষ্টা মেটাতে না পারলে পূজারির সর্বনাশ। চণ্ডরাজার তৃষ্ণা কিসে মিটবে? রক্তে! ব্যথাটা আর সহ্য করা যাচ্ছিল না, দরজায় খিল এঁটে ব্যাগ থেকে দাড়ি কামানোর ব্লেডটা বের করলাম। ব্লেডটা আড়াআড়িভাবে ডান হাতের তর্জনীর উপর চালিয়ে দিলাম। তীক্ষ্ন যন্ত্রণার সঙ্গে একটা অগভীর ক্ষতের সৃষ্টি হতেই তাজা রক্তের ধারা ক্ষতস্থান থেকে বুরবুরি দিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি আঙুলটা চণ্ডরাজার পাথরের উপর মেলে ধরলাম। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত শিলাখণ্ডের মাথায় গড়িয়ে পড়তে লাগল। নীল আলোটাও অকস্মাৎ স্থিমিত হয়ে এল। পাথরটা ছুয়ে দেখলাম সেটা খানিক ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। পেটের যন্ত্রণা খানিকটা কমল কিন্তু পুরোপুরি সেরে গেল না। ত্রিলোচনের কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করলাম, কিছু কিছু মনে পড়ল, চণ্ডরাজার নৈবেদ্যে রক্তের সঙ্গে প্রাণও অর্ঘ, অন্যথায় সেবা অসম্পূর্ণ। স্থির করলাম তবে প্রাণও উৎসর্গ করব। 'সে রাত্রে যে কি কষ্ট করে সাধুখাঁর সাধের চিড়িয়াখানা থেকে একটা গিনিপিগ চুরি করেছিলাম সে শুধু আমিই জানি'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন