সঞ্জয় ভট্টাচার্য
অনেকটা পথ এভাবে ছোটার পর জলকাদায় পা পিছলে মুখ থুবড়ে পড়লাম। চোয়ালে দারুণ আঘাত লাগল, মনে হল মুখটা যেন ফেটেই গেছে। হাত ঠেকিয়ে বুঝলাম থুতনি চিড়ে রক্ত ঝরছে। একরাশ কাদা মেখে যখন উঠে দাঁড়ালাম দেখলাম একটা ন্যাড়া জায়গায় এসে হাজির হয়েছি। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাটার মতো গায়ে ফুটছিল। কয়েক মিটার এগিয়ে গেলে আবার জঙ্গলের ঘনত্ব বাড়ছে সেদিকে গেলে হয়তো কোনও গাছের তলায় আশ্রয় পেতে পারি ভেবে হাঁটা থামালাম না। এবার হঠাৎ বৃষ্টিটা যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবেই থেমে গেল। জলে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে নাম না জানা বুনো ফুলের সুগন্ধ মিশে আশেপাশের পরিবেশটাকে যেন মাতিয়ে দিচ্ছিল। অন্যরকম পরিস্থিতি হলে জঙ্গলের এমন মোহিনী রূপ দেখে এই আমিই হয়তো ধন্য হয়ে যেতাম, কিন্তু আজকের এই রাতে অস্তিত্ব রক্ষা ছাড়া বাকি সব কিছুই আমার কাছে অর্থহীন।
হাটতে হাটতে একটা ঢালু জমির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, এখানে জমা জলে চাঁদের প্রতিকৃতিটা গোল চাকতির মতো পড়েছিল। সেদিকে নজর পড়তেই ঘাবড়ে গেলাম! একজন বলিষ্ঠদেহী আদিবাসী যুবকের প্রতিকৃতিও ওই আয়নার মতো জলে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে, ছেলেটি রোষকষায়িত দৃষ্টে সোজা আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। চকিতে পিছন ঘুরে কাউকে দেখতে না পেয়ে ফের ওই জলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অদ্ভুত মূর্তিটি অদৃশ্য হয়েছে! আজ রাতে বোধহয় নতুন করে কিছুতেই আর অবাক হওয়ার সুযোগ নেই। মনে হচ্ছিল কাল সকাল পর্যন্ত মাথা ঠিক রাখাটাই এখন আমার সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ, এই রাতের শেষে মাত্র দুটো সম্ভাবনার কথাই আমার মাথায় ঘুরছে। এই জঙ্গলের কোনও অদ্ভুত জীবের হাতে যদি বেঘোরে মারা না পরি তাহলে মস্তিকের বিকল হওয়াটা একপ্রকার অবধারিত।
হাটছি তো হাটছি! মনে হচ্ছে পথ আর ফুরাবে না। হাতের ঘড়িটা বৃষ্টির জলে ভিজে আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে যদ্দুর মনে হয় রাত দেড়টা-দুটো তো হবেই, বাবুলালের টিলা আর কতদূর? ক্লান্ত শরীরটা আর চলতে চাইছে না, কিন্তু মাঝ রাস্তায় থেমে গিয়ে বিপদের বোঝা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনও উপকার হবে বলে তো মনে হল না, ধীর পায়ে চলতে চলতে নিজেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম, আর কিছু না হোক অন্তত পেছু নেওয়া অশরীরীটা বিদায় নিয়েছে, এবারে কোনওরকমে টিলা অবধি পৌঁছোতে পারলে যদি বিপদ কাটে। এই মনোভাব অবশ্য বেশিক্ষণ টিকল না, আমার মনে অকারণ গজিয়ে ওঠা স্বস্থির আমেজটাকে দুরমুশ করে কেউ হঠাৎ যেন আমার দিকেই ছুটে আসতে শুরু করল, কাঁদামাখা ভিজে মাটির ওপর তার লম্বা লম্বা পায়ের ছাপগুলো আমার বিস্ফারিত চোখের পলক ফেলার আগেই একেবারে কাছে চলে এলো, এরপর হাওয়ার প্রচণ্ড একটা বেগ আমাকে বুনো ঘাসজমির ওপর আছড়ে ফেলে দিল, অদৃশ্য শত্রু আমার বুকের উপরে বসে এবারে সাঁড়াশির মতো হাত দিয়ে গলা টিপে ধরল, প্রচণ্ড চাপে দম আঁটকে এলো, মনে হচ্ছিল শেষ সময় বুঝি উপস্থিত! কিন্তু জীবন রক্ষার তাগিদে মানুষ অনেক সময় অসম্ভবকেও সম্ভব করে ফেলে, অমানুষিক চেষ্টায় থাবাটাকে ঠেলে নিজেকে মুক্ত করলাম, ম্যাজিকের মতো অশরীরী দুশমন আবার অদৃশ্য হয়ে গেল! পালটা হামলা করল না। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে এদিক-ওদিক চাইছি তক্ষুনি নজরে পড়ল খরগোসটা আমার পায়ের কাছে ঘাসের উপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, মুহূর্তটাক সময় নষ্ট না করে ছুরিটা তুলে খরগোসটাকে লক্ষ্য করে আঘাত হানলাম। জন্তুটাও দ্রুত লাফ দিল তবে ততক্ষণে ছুরির ফলাটা ওর পিঠের খানিকটা মাংস উপড়ে ফেলেছে। বীভৎস অপার্থিব হাহাকারে জঙ্গল কেঁপে উঠল। দানবটার কাতর আর্তনাদ আমার কানে যেন মধুর সংগীতের মতো উপভোগ্য মনে হল। উৎকট আনন্দে আমিও গলা ফাটিয়ে হেসে উঠলাম।
রাতভর অজ্ঞাত বিভীষিকার সঙ্গে যুঝতে যুঝতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পরেছিলাম। পূবের আকাশে নজর পড়তে দেখলাম অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে, রাত শেষ হতে চলল। হাতে আর বিশেষ সময় নেই। শ্রান্ত ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে টানতে টানতে এগিয়ে নিয়ে চললাম।
শেষমেশ একটা রুক্ষ পাথুরে জমির উপর এসে পৌঁছোলাম। জমিটার মাঝ বরাবর একটা পাথুরে ঢিপি, এটাই বোধহয় সেই বিখ্যাত বাবুলালের টিলা।
ত্রিলোচন আর মোড়ল দেখলাম টিলার একপাশে বসে গাঁজায় দম দিচ্ছে, বুঝলাম ওরা অনেক আগেই পৌঁছে গেছে। দুজনে আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। ত্রিলোচন উৎফুল্ল স্বরে বলল—'বাবু তোকে জ্যান্ত দেখে ভালো লাগছে, সবই রাজার ইচ্ছে। দে ফুল দে, মাটি দে'? রুমালটা বের করে ত্রিলোচনের হাতে তুলে দিলাম, ত্রিলোচন সবার আগে রুমালের ভিতর হেঁজে যাওয়া ফুল আর মাটিটাকে আলাদা করল। তিনজনের নিয়ে আসা মাটির তিনটে দলা একসাথে করে পিণ্ড বানিয়ে মন্ত্র পড়ে সেটার পুজো করল তারপর দু-হাতের অঞ্জলিতে পুড়ে এগিয়ে গেল বাবুলালের টিলার দিকে। টিলার উপর খানিকটা মাটি হাত দিয়ে সরিয়ে গর্ত মতো করে সেখানে পিণ্ডটা চেপে ধরল, আর তখুনি যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে ছিটকে পরল।
বিস্ময়ের ঘোর কাটতে দেখলাম ত্রিলোচন টিলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বিড়বিড় করে কিসব যেন বলছে, সেইমুহূর্তে আতংঙ্কের যে ছাপ ওর মুখে দেখতে পেলাম তা আমার চেনা বেপরোয়া লোকটার চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
এরকম প্রায় একনাগাড়ে মিনিট পাঁচেক চলার পরে ত্রিলোচন টিলার পাথরের উপর কান পাতল। এসব যে কি হচ্ছে, তা ত্রিলোচন বলে না দিলে আমার বোঝার উপায় অবশ্য নেই। চোখের সামনে যা কিছু ঘটে চলেছে দেখে যেতে লাগলাম। অকস্মাৎ ত্রিলোচনের মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন হল, সে হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে প্রচণ্ড চিৎকার করে বলল—'এই মোড়লের বাচ্চা, সত্যি কথা বল ওই লাশ ওখানে কে পুতেছে'? মোড়লের দিকে চোখ পড়তে অবাক হয়ে দেখলাম, লোকটার মুখ যেন অকস্মাৎ রক্তশূন্য হয়ে পড়েছে, ঘর্মাক্ত কপালের বলিরেখাগুলো অস্থিরভাবে ওঠা নামা শুরু করেছে, জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে মোড়ল কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল—'আমি কি করে জানব দাদাঠাকুর'? ত্রিলোচন হিংস্র স্বরে বলল—'বাবুলালের টিলার সামনে মিছে বলার সাজা জানিস? তবে তোর হ্যাঁপা তুইই সামলা, আমি এই চললাম'। ত্রিলোচন কাঁধে ঝোলা তুলে নিয়ে পা বাড়াবার উদ্যোগ করতেই মোড়ল ত্রিলোচনের পায়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মোড়ল কাঁতর কণ্ঠে বিলাপ করতে লাগল—'হ্যা দা-ঠাকুর ও পাপ আমিই করেছি, কিন্তু না করেই বা কি করতাম, কুন মরদের বাচ্চা এমন আছে যে নিজের বিহা করা বউরে অন্য মরদের সঙ্গে শুতি দেখেও চুপ করে থাকে, আমিও তাই মেরে হিসেব চুকিয়েছি'। ত্রিলোচন মোড়লকে ঠেলে পা ছাড়িয়ে নিল, খানিক পরে মোড়ল ধাতস্থ হয়ে বলল—'শাওনির সঙ্গে বিহা হওয়ার পর ও যখন যা চেসে সব দিসি, এমনকী আগের দুই বউরেও অবজ্ঞা করেসি অরি জন্যি কিন্তু দা-ঠাকুর এ বড়ই বেইমানের জাত, একদিন শুনতে পেলাম শাওনি চুপি চুপি পাশের গেরামের কোন জোয়ান মদ্দের সঙ্গে দেখা করে, পিথমে এ খবর বিশ্বাস করি নাই কিন্তু পরে মনে হল একবার বুঝেই নি, ঠিক কি আর ভুলই বা কি। একদিন ওরে লুকিয়ে ধাওয়া করি জঙ্গলের রাস্তা ধরলাম, দেখি কি না চৌরি গ্রামের মানিক সাহুর জোয়ান ছেলে ওই রাখহরির সঙ্গে মাগি ল্যাংটো শুয়ে আমার মুখে, আমার বাপ চোদ্দোগুষ্টির মুখে চুনকালি লাগাসে। মাথায় রক্ত উঠে গেল দা-ঠাকুর, হাতের রাম-দা দিয়ে মারলাম হারামজাদার মাথায় এক বাড়ি, এক কোপেই শেষ। মাগিকে চুলের মুঠি ধরে ঘরে এনে বন্ধ করলাম, আর রেতের দিকে আমার ভাইরে সঙ্গে নিয়া জঙ্গলের মধ্যে লাশ গেড়ে দিলাম, কেউ কুথাও জানতে পারল না। কিন্তু হারামজাদা রাখহরি মরেও শান্তি দিল না, বদলা নিতে ভূত হয়ে মাগির শরীরে ভর করল, সে এবার শাওনিকে নিয়ে যেতে চায়। এর বেশি আর কিছু নেই দা-ঠাকুর, এবার তুমিই আমার বিচার করো'! পোরখাওয়া জাঁদরেল লোক মোড়ল শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। আমি অবাক হয়ে মধ্যরাত্রির এই অদ্ভুতুড়ে নাটকের শেষ অধ্যায় দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, আজ রাতটা যদি এই অর্ধসভ্য বুনো লোকগুলোর মধ্যে এভাবে বনেবাঁদারে ঘুরে না কাটাতাম তাহলে মরার আগে জানতেও পারতাম না আমার জ্ঞানের পরিধি কত ক্ষুদ্র। ত্রিলোচন গুম হয়ে বসেছিল, কিছুক্ষণ পরে বলল—'তুই যা করেছিস মোড়লের ব্যাটা তা হয়তো ন্যায্য, কিন্তু আমারে সব কথা না বলে ভুল করেছিস, যদি আজ রাতে কারও একটা ক্ষেতি হত তাহলে কি হত সে ভেবেছিস'? মোড়ল মাথা নীচু করে বসে রইল, একথার কোনও উত্তর দিল না। ত্রিলোচনই ফের বলল—'যা এবার বাবুলালের সামনে গিয়ে ছমা মাগ, তবেই তর ওই মাটি উ লিবে, নচেৎ নয়'। মোড়ল ত্রিলোচনের নির্দেশমতো নতজানু হয়ে টিলার সামনে বিশ্রুম্ভালাপ করতে লাগল আর আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম মোড়লের বাকি জীবনটা বোধহয় যুবতী স্ত্রীকে পাহারা দিতেই চলে যাবে।
কিছু পরে ত্রিলোচন বলল—'চলে আয় রে মোড়ল, বাবুলাল তোরে মাপ করসে কি না এবার বুঝা যাবে! সব আগে আগুন জ্বালবার ব্যবস্থা দ্যাখ দেখি'।
মোড়ল কয়েকটা শুকনো ডাল জোগাড় করে আগুন ধরিয়ে দিল, আর ওদিকে ত্রিলোচন মাটির দলাটা ফের একবার টিলার গায়ে লেপে দিল, তবে এবারে আর কোনওরকম বিপত্তি ঘটল না। কাঠের চিতাটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে একসময় জ্বলে উঠতেই ত্রিলোচন মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে একটা একটা করে ফুল তাতে নিক্ষেপ করতে লাগল। প্রতিটা ফুলের আহুতিতেই জঙ্গল কাঁপিয়ে ভুতুড়ে মরাকান্না আমাদের শরীরের রক্ত হিম করে দিচ্ছিল। ত্রিলোচন শেষ ফুলটা কপালে ঠেকিয়ে অঞ্জলি করে জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রদান করা মাত্র কান্নার শব্দটা থেমে গেল। মোড়ল কিছু বলতে যাচ্ছিল ত্রিলোচন ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ইঙ্গিত করে সামনের দিকে দেখাল। দেখে চমকে উঠলাম, সেই খরগোসটা হঠাৎ যেন একহাত দূরে মাটি ফুড়ে গজিয়েছে। প্রাণীটার শেষ সময় উপস্থিত। ধুঁকতে ধুঁকতে মুখে ফেনা তুলে ছোট্ট দেহটা থরথর করে কেঁপে উঠল। সামনের আর পিছনের পা দুটো টান টান করে ছড়িয়ে উলটে পড়ল, আর তখুনি ক্লান্ত, নির্জীব চোখের পাতাদুটো শেষবারের মতো বন্ধ হয়ে গেল। তখন আমরা তিনজন সেই রুক্ষ জমির উপর, বাবুলালের টিলার সামনে নিস্তব্ধ নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে রয়েছি, আমার মনে তখন ঝড় উঠেছে। এই বত্রিশ বছরের জীবনে আজকের রাতটা নিঃসন্দেহে সবথেকে অবিস্মরণীয়। ত্রিলোচনের ডাকে হুশ ফিরল—'চল বাবু ঘরে চল'। ত্রিলোচনের নির্দেশে মোড়ল মৃত প্রাণীর শবটা হাতে তুলে নিল, ওটা সূতা নদীর জলে ভাসিয়ে দিলে কাজ শেষ হবে। সেদিন শ্রান্ত শরীরটা টানতে টানতে কোনওরকমে গ্রামে ফিরে এসেছিলাম, শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়লেও মন কিন্তু ছিল আশ্চর্যরকমের সতেজ আর উদ্দীপ্ত। ভাগ্যক্রমে এমন একটা জগতের সন্ধান আমি পেয়ে গেছি, যেটা এতদিন শুধু রূপকথার বইয়েই পড়ে এসেছি, তবে দুঃখের বিষয় হল আমার এমন দুর্দান্ত সব অভিজ্ঞতা শিক্ষিত মানুষের কাছে পাগলের প্রলাপ ছাড়া অন্য কিছুই বিবেচিত হবে না। সাংবাদিকতার পেশায় আমার উন্নতির সম্ভাবনা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন