একত্রিংশ অধ্যায়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

হাটছি তো হাটছি, জঙ্গল যেন গোলকধাঁধা! এদিকে রুদ্রপ্রসাদের গতি ক্রমশ শ্লথ হচ্ছে, মুখে না বললেও তার শরীরের মধ্যে যে অসোয়াস্তির মাত্রা বাড়ছে বুঝতে পারছিলাম, হঠাৎ একটা অশ্বত্থ গাছের গোঁড়ায় রুদ্র হাঁটু ভেঙে বসে পড়লেন, মুখে যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল। আমি ধরতে চেষ্টা করতে রুদ্র আমার উপর এলিয়ে পড়লেন, রুদ্রের মাথা কোলে তুলে বললাম—'শরীর খারাপ লাগছে'? প্রচণ্ড হাঁপাতে হাঁপাতে রুদ্র বললেন—'এরকম আগেও হয়েছিল, ওষুধটা ছিল, প্রাণ বেঁচে গেছিল, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে'। রুদ্র নিজের কথা শেষ করতে পারলেন না, মুখ থেকে দমকা ফেনা রক্ত বেড়িয়ে এল, গভীর জঙ্গলের মধ্যে এই পরিস্থিতিতে কি করা উচিত আমার মাথায় এল না, কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো বসে রইলাম, সামান্য পরে রুদ্র বিকৃতস্বরে বললেন—'তোমাকে বিপদের মাঝে এভাবে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না জয়ন্ত, কিন্তু সময় ফুরিয়েছে, আর্শীবাদ করি ...।'

রুদ্রপ্রসাদ আর নিজের কথা শেষ করতে পারলেন না, বিস্ফারিত চোখের দৃষ্টি মেলে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।

প্রখ্যাত হিস্টোরিয়ান রুদ্রপ্রসাদ মিত্রের নিথর দেহটা পরে আছে একটা বট গাছের গোঁড়ায়, রুদ্রের মাথা কোলে নিয়ে আকাশপাতাল ভেবে চলেছি, বেশিদিনের আলাপ নয় তা হলেও এর মধ্যেই ওর সঙ্গে একটা আলাদা রকমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, রুদ্র আমাকে স্নেহের চোখে দেখতেন আর আমিও ওনাকে শ্রদ্ধা করতাম। অজ্ঞাত অতীতের প্রতি লাগাছাড়া কৌতূহলেই শেষমেশ ভদ্রলোকের এমন পরিণতি ঘটল। এই জঙ্গলপুরীতে রুদ্রপ্রসাদই ছিলেন আমার একমাত্র আশা ভরসা, সম্পূর্ণরূপে একা আমি কি করে রুদ্রের মিশন সফল করব তার কোনও ধারণা অবশ্য আমার নেই। অনেকটা সময় গড়িয়ে গেল, হয়তো দু-ঘণ্টা হবে কি তার থেকেও বেশি! মেঘ কেটে গিয়ে হালকা রোদ ফুটেছে, এ আলো পড়ন্ত সূর্যের, বিকেল হয়ে গেছে। রুদ্রের মৃতদেহে এরমধেই কাঠিন্যের লক্ষন দেখা দিয়েছে, চোয়ালের হাড় সামান্য হলেও বেঁকে গেছে। কোথা থেকে লাল পিঁপড়ের ঝাঁক এসে মৃত শরিরের সর্বত্র ঘোরাফেরা শুরু করল। আমি হাত দিয়ে পিঁপড়েগুলোকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম, সাময়িক পিছু হটলেও কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দার মতো লেগেই রইল, একটু পরে আবার এসে জুটল। মনে জোর আনার চেষ্টা করলাম, যে উদ্দেশ্যে রুদ্রপ্রসাদ প্রাণ দিলেন সেটাকে বিফলে যেতে দেওয়া যায় না, অন্তত একটা শেষ চেষ্টা আমাকে করতেই হবে। রুদ্রপ্রসাদের দেহটা একটা গাছের ডালের সঙ্গে লতানে কিছু শিকড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধলাম, এতে দেহটা অন্তত হিংস্র জন্তুর হাত থেকে রক্ষা পাবে আশা করি, যদি জ্যান্ত ফিরত আসতে পারি তবে সসম্মানে রুদ্রের সৎকারের ব্যাবস্থা করব আর যদি হিংস্র এই অরণ্যের বলি হতেই হয় তাহলে অসমবয়সী প্রিয় বন্ধুকে এটাই আমার অন্তিম প্রণাম।

কোণাকুনি হাঁটছিলাম, বিদায়ী সূর্যের ঠিক উলটো দিকে, জঙ্গলের ঘনত্ব এবারে কমতে শুরু করেছে, আধঘন্টা মতো এভাবে চলার পর ঘাসজমি চোখে পড়ল, মাঝে মধ্যে অবশ্য মেহগনি গোছের গাছ একটা দুটো দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা চড়াইয়ের মতো উচ্চতা ডিঙাতেই চোখের সামনে অভীষ্টপূরণ! আন্দাজ প্রায় দুশো মিটার দূরে সরু খালের মতো বয়ে চলেছে সূতা নদী! যথাসম্ভব দ্রুত ছুটে গিয়ে নদীর পারে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আঁজলা ভরে জল মুখে চোখে দিয়ে, আকণ্ঠ জল পান করে দেহমনে নতুন শক্তির জোয়ার বইল। সামান্য বিশ্রামের পর নদীর দুটো প্রান্ত ভালো করে দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম। দক্ষিণ দিকে প্রকাণ্ড সব গাছের সাড়ি, অবশ্য উত্তর দিকের জঙ্গল এদিকের তুলনায় অনেকটাই হালকা, বোধহয় ওদিকটায় জনবসতি থাকতে পারে, ফের আমি হাঁটা শুরু করলাম। এবার দিশা উত্তরমুখি, ভগীরথপুর গ্রাম।

সূর্য ডোবার মুহূর্তে যে জায়গাটায় এসে হাজির হলাম সে এলাকাটা আমার পরিচিত, এখানে আমি আগেও এসেছি, তবে সজ্ঞানে নয় স্বপ্নে। গোলাকৃতি মাঠটার ওপারে গ্রামের শুরু আর যেদিকে আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি এদিকটায় জঙ্গলের রাজ্য, মাঝখানে বর্ডারে মাথা তুলে দণ্ডায়মান চণ্ড রাজার মন্দির। মন্দিরটা ঠিক তেমনই যেমনটা স্বপ্নে দেখেছি। পা দুটো যেন পাথরের মতো জমাট বেঁধে মাটির সঙ্গে সেঁটে গেল, এত ঠাণ্ডার মধ্যেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে টের পেলাম, হঠাৎ দমকা হাওয়ার একটা বেগ উঠল মন্দিরের সামনে থেকে, শুকনো কাঠকুটো গাছের পাতা, দলা পাকিয়ে এসে যেন অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে ধরল, কি ভীষণ সেই দমবন্ধ করা অবস্থা, কে যেন আখ মাড়াই কলে পিষে শরিরের হাড়গুলো গুড়িয়ে দেবে মনে হচ্ছিল, কানের কাছে ফিসফিস করে অমানুষিক একটা কণ্ঠস্বর আমার নাম ধরে ডাকল, আতংকে চিৎকার করে উঠলাম, অকস্মাৎ হাওয়ার বেগটা বিদায় নিল, কিন্তু ততক্ষণে দারুণ ভয় আমার শিরায় শিরায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। সন্ধের কালো ছায়া চণ্ডমন্দিরের উপর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। চণ্ডের রাজত্বে রাত নামছে, চণ্ডের রাত! আর অপেক্ষা করা একেবারেই চলে না, যে কাজের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি তা সম্পূর্ণ করতে হবে। দ্রুতহাতে গাছের ভাঙা ডাল কাঠকুটো জোগাড় করে মন্দিরের পাঁচিলের সামনে জড়ো করতে শুরু করলাম। একসময় কাঠকুটোর একটা ছোটখাটো স্তূপ মতো হয়ে গেল, এবার দরকার এটাতে অগ্নিসংযোগ করা, একবার আগুনটা জ্বালিয়ে নিতে পারলে সেই আগুনে মন্দিরের ভিতরে বেদি আর পাথরটাকে জ্বালিয়ে দেওয়া সহজ হবে।

ভাবা সহজ, করা নয়! কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল কাঠের টুকরোগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে ন্যাতা হয়ে গেছে, তার থেকেও বড় কথা আগুন ধরানোর জন্য যে দেশলাই বা লাইটারের প্রয়োজন সেটাই আমার কাছে নেই! রুদ্রপ্রসাদের প্যান্টের পকেটে লাইটার ছিল, কিন্তু আমার ভুলে সেটা ওখানেই রয়ে গেছে। আশেপাশে অনেক নুড়িপাথর পরেছিল, শুনেছি চকমকি পাথর ঠুকলে নাকি আগুন জ্বলে। দুটো পাথর তুলে একে অপরের সঙ্গে ঘষতে লাগলাম। পাথরে পাথরে ঘষা খেয়ে শুধু খড়খড়ে শব্দ হল, আগুন কিছুই জ্বলল না। পাথর দুটো ফেলে দিয়ে অন্য দুখানা তুলে নিলাম, এবারও শব্দই সার, পরের আধঘন্টা শ-খানেক পাথর ঘষে ঘষে হাতে দারুণ ব্যথা ধরে গেল কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। হঠাৎ পিছনে পায়ের শব্দে ফিরে দেখলাম দিবাকর আর গুঙ্গা যেন মাটি ফুঁড়ে এসে হাজির হয়েছে।

দিবাকরের চোখ দুটো হিংস্র কুকুরের মতো জ্বলছিল, রাইফেল আমার দিকে তাগ করে বলল—'শুয়োরের বাচ্চা অনেক ছুটিয়েছিস, বুড়োটা কোথায়'? দিবাকরের রাইফেল দেখে আমার আর ভয় করল না, শান্তস্বরে বললাম—'তুমি সরবিট্রেটের শিশিটা ফেলে দিলে কেন? ওতে তোমার কোনও লাভটা হয়েছে'? দিবাকর রাইফেলের সেফটি ল্যাচ থেকে আঙুল সরিয়ে ট্রিগারে রেখে কাটা কাটা স্বরে বলল—'বুড়োটা কোথায়'?

—'উনি মারা গেছেন'। দিবাকর একমুহূর্তের জন্য চুপ করে তারপর বলল—'নিশ্চয়ই তোকে বলে গেছে, সোনা কোথায়'?

—'হ্যাঁ, মন্দিরের ভিতরে'। দিবাকর হুকুম জারি করল—'যা ভিতরে গিয়ে বের কর, খবরদার চালাকি করলে কিন্তু মরবি'। মনে মনে কর্তব্য স্থির করে ফেলেছি, মুখে বললাম—'সুড়ঙ্গে ভীষণ অন্ধকার সঙ্গে একজনের থাকা প্রয়োজন'। দিবাকরের ভ্রু কুঁচকে উঠেছে, বলল—'কীসের সুড়ঙ্গ'? আমি নির্বিকারে বললাম—'মন্দিরের ভিতর যে সুড়ঙ্গটা আছে তার দরজা চৌরি গ্রামের কালী মন্দিরের পিছনের জঙ্গলে আছে, রুদ্রপ্রসাদ আমাকে নকশা বুঝিয়ে দিয়েছেন'। দিবাকর সংশয় ভরা স্বরে বলল—'এমন কিছু তো আগে শুনিনি'?

—'ঠিক আছে তবে আমি একাই যাচ্ছি'। সামান্য ইতস্তত করে এবার দিবাকর বলল—'আমিও যাব তোর সঙ্গে, তুই আগে থাকবি আমি পিছনে'। মনে মনে হাসলাম, ইঁদুর শেষ পর্যন্ত ফাঁদে পড়ল! দিবাকর পা বাড়াতেই গুঙ্গা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল, আকার ইঙ্গিতে আর অবরুদ্ধ স্বরে কিসব বলতে শুরু করল, বুঝতে পারলাম ও দিবাকরকে ভিতরে যেতে নিষেধ করছে। দিবাকর বিরক্ত হয়ে বলল—'ফালতু জিনিস নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নয় এখন, ভিতরে কিছু থাকলে আগে ও মরবে, আমাদের কিছু হবে না'। গুঙ্গা এবার মরিয়া হয়ে দিবাকরের পা চেপে ধরল, কোনও কিছুর বিনিময়েই যে ও মন্দিরের ভিতর ঢুকবে না সেটা বুঝে বেশ মজা লাগছিল, দিবাকর গায়ের জোরে গুঙ্গাকে ঠেলে সপাটে ওর পাঁজায় লাথি ঝেড়ে বসল, লাথি খেয়ে গুঙ্গা মেঝেতে গড়িয়ে পড়েছিল, সামলে উঠেই পাইপাই করে ছুট লাগাল জঙ্গলের দিকে আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘন গাছপালার আড়ালে মিলিয়ে গেল। নিষ্ফল আক্রোশে সেদিকে চেয়ে দিবাকর আমার পিঠে রাইফেলের কুঁদো দিয়ে ঠ্যালা দিল।

কাঠের সদর দরজা ঠেলে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। বড়সড় চাতালের ওপারে মূল মন্দির, মাঝখানে মোরাম ফেলা পথের দু-পাশে ঘন আগাছার ঝাড়। দেখে মনে হল দীর্ঘকাল এই মন্দিরে কেউ পা রাখেনি। গর্ভগৃহের সামনে এসে দিবাকর ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে পড়ল, সংকটের মুহূর্তেও হাসি পেল, ভয় দেখানোটাই যার পেশা, সে নিজেই কিনা ভয়ে হাঁসফাঁস করছে। বললাম—'তুমি এই থামটার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকো আমি ডাকলে ভিতরে আসবে'। দিবাকর বাধ্য ছেলের মতো কোনও প্রতিবাদ না করে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। মন্দিরের ভিতর নিকষ্যি অন্ধকার, কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছিল না, কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর চোখ কিছুটা সয়ে যেতে হাতড়ে হাতড়ে বেদিটা খুঁজে পাওয়া গেল। প্যান্টের পকেট থেকে চণ্ডের প্রাণভোমরা বের করে বেদীর ওপর স্থাপন করতেই শরিরটা হঠাৎ ঝনঝন করে উঠল। মেঝেতে ছিটকে পরেছিলাম, সামলে উঠে দেখলাম পাথরটা ঘিরে একটা অপার্থিব নীল আলোর বৃত্ত তৈরি হচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যে সে আলোর বলয় সম্পুর্ন হল। গমগমে অপার্থিব কণ্ঠস্বর ভেসে এলো —'জয়ন্ত সিংহ রায় সৌভাগ্যবান তুমি, এজীবনে চণ্ডের সেবার সুযোগ পেয়েছ, বলো তোমার ইচ্ছে কি'?

—'আপনার ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে, আত্মসমর্পণ করছি'।

—'স্বাগত জয়ন্ত, সংশয় ত্যাগ করে পৃথিবীর বুকে অপার কর্তিত্ব আর রাজসুখ ভোগ করার জন্য তৈরি হও'। আমি হাতজোড় করে বললাম— 'আপনার অসীম দয়া প্রভু, আপনার অহেতুক কৃপাবর্ষণে এই অধম সেবক ধন্য, বিনিময়ে কিছু দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই তবে সামান্য একটা উপহার এনেছি, কৃপা করে গ্রহণ করুন'। চণ্ডের তরফ থেকে প্রত্যুত্তর না পেয়ে ফের বললাম—'নিটোল স্বাস্থ্যের অধিকারী একটি মানব সন্তানকে আপনার শ্রীচরণে অর্পণ করতে হাজির করেছি, তাজা মাংস আর গরম রক্তের বলি গ্রহণ করুন প্রভু'। চণ্ডের অট্টহাসিতে এবার মন্দির কাঁপতে শুরু করল —'তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি, তবে শুধু কি ওই রক্ত মাংসের নৈবেদ্য চণ্ডের তেষ্টা মিটবে'?

—তা কেন! রক্ত, মাংসের দেহর মধ্যে যে আত্মার আধিপত্য, সেটাকেও অনন্তকালের জন্য আপনার নরকের কুণ্ডে অর্পণ করার অনুমতি দিন প্রভু'। চণ্ডের হাসিতে এবারে মনে হচ্ছিল মন্দিরের ছাদটা বোধহয় ভেঙেই পরবে, গমগমে স্বরটা বলল—'গ্রহণ করলাম আমি গ্রহণ করলাম'। দিবাকর আর থাকতে না পেরে লাফিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকল, রাইফেল তাগ করে হিংস্র স্বরে বলল—'অ্যাই হারামি এসব কি নাটক হচ্ছে রে এখানে? কার সঙ্গে তুই কিসের ডিল করছিস'? হেসে বললাম—'ডিল শেষ দিবাকর এবার কর্মফল ভোগ করার জন্য তৈরি হও'। দিবাকর রাইফেলের নল আমার কপালে ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপে দিল কিন্তু অদ্ভুতভাবে তা থেকে গুলি বের হল না। একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে তুলে শুন্যে ছুড়ে দিল, দেখে মনে হল মন্দিরের সিলিঙের সঙ্গে দিবাকরের পেল্লায় দেহটা কেউ যেন আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে, দিবাকরের কাতর আর্তচিৎকার মন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরত আসতে লাগল। কিছু মুহূর্তের ব্যবধানের পরে যখন দিবাকরের প্রাণহীন দেহটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল, দেখে মনে হল অজস্র জোঁকে যেন ওর শরীরের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও চুষে ফেলেছে। দিবাকরের ঠিকরে বেড়িয়ে আসা চোখ দুটোতে আতঙ্ক আর যন্ত্রণার যে ছাপ ফুটে উঠেছে তা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। গমগমে স্বরটা বলল—'অন্তিম বিধি পালন করো জয়ন্ত'। মাথা নত করে বললাম—'আমি প্রস্তুত'।

—'সন্ধ্যা মল্লিকার বৃক্ষে আজকের তিথিতে কৃষ্ণবর্ণ ফুল ফোটে সেই ফুল আর তোমার শরীরের দু-ফোঁটা রক্ত দিয়ে চণ্ডের অর্ঘ প্রস্তুত কর'।

—'করছি দেবতা'। চণ্ডের নির্দেশে গর্ভগৃহ থেকে বেড়িয়ে এলাম, মন্দিরের চৌহদ্দির মধ্যে আগাছার জঙ্গলের মধ্যে প্রচুর কালো রঙের ফুল ফুটে আছে, এরকম ফুল আগে কখনো দেখিনি, এটাই বোধহয় চণ্ডের সন্ধ্যামল্লিকা! ফুলে হাত দিতেই তীক্ষ্ন খোঁচা লাগল, এ ফুলের পাপড়িগুলোতে কেমন যেন রোয়া ওঠা ধারালো লোম ভরতি, অনেকটা শুঁয়োপোকার গায়ের সুঙের মতো। সাবধানে ফুল তুলে জড়ো করতে লাগলাম, হঠাৎ একটা তীক্ষ্ন কণ্ঠের ডাক শুনে চেয়ে দেখলাম সামনে একটা গাঢ় ছায়াশরীর এসে উপস্থিত হয়েছে, এ সেই কালকে দেখা বাবুলালের প্রতিচ্ছায়া। বাবুলাল ভর্ৎসনার স্বরে বললেন—'এমন নির্লজ্জের মতো বশ্যতা স্বীকারই যদি করার ছিল তবে আমার বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটিয়েছ কেন'? ভয় আর সংকোচের অনুভূতিগুলো এতক্ষণে আমার ভিতর থেকে পুরোপুরি হটে গেছে টের পেলাম, বেপরোয়া উত্তর দিলাম—'এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনি? চণ্ডের বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, যা হওয়ার তা হবেই'। বাবুলাল বললেন—'এই ভয়ংকর ইষ্টবিরোধী যজ্ঞের হোতা হোয়ো না জয়ন্ত, যে লাঞ্ছনা আর দুঃখের চরম পর্ব আজ ভোগ করেছ তাতে তোমার সঞ্চিত কর্মরাশি ক্ষয় হয়েছে, কষ্টের আগুনে পুড়ে তোমার আত্মা শুদ্ধ, পবিত্র ভাব ধারণ করেছে, আত্মবলিদানের এটাই প্রকৃষ্ট সময়'। আকস্মিকভাবে চোখের সামনে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। যে ভেজা কাঠের স্তূপে আমি অনেক চেষ্টা করেও আগুন ধরাতে পারিনি সেটাই কোনও অদ্ভুত মন্ত্রবলে লেলিহান শিখার উৎগার করতে লাগল। বাবুলালের যন্ত্রণাকাতর স্বর ভেসে এল—'শীঘ্র কর জয়ন্ত, চণ্ডের শক্তি আমাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে, এরপর আর কিছু করার থাকবে না'। মনের মধ্যে জমে থাকা হতাশার ভাব হঠাৎ কেটে গেল, যুদ্ধ তাহলে এখনও শেষ হয়নি। ঊর্ধ্বশ্বাস ছুট দিলাম আগুনের কুণ্ড লক্ষ করে, তারপর অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে ঝাঁপ দিলাম সেই জ্বলন্ত চিতার মধ্যে।

কি অসহ্য এই দহন যন্ত্রণা! সুতির কাপড়ে আগুন ধরতে দেরি হল না, আগুনের শিখা শরীরের চামড়া পুড়িয়ে, মাংসে ছড়িয়ে পরল, উন্মাদের মতো দু-হাত মেলে ছুটলাম চণ্ডের গর্ভগৃহের দিকে, গর্ভগৃহের ভিতর তখন ছোটখাটো একটা ঘুর্ণিঝড় বইছে, অমিত শক্তিধর দুটো অদৃশ্য শক্তি যেন মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত। আগুনের ছটায় চণ্ডের বীভৎস মূর্তিটা চোখে পড়ল। সর্বশক্তি দিয়ে ওটাতে লাথি মারতেই মাটির কাঠামো ভেঙে দু-টুকরো হয়ে পড়ল। বেদি লক্ষ করে ঝাঁপিয়ে, জ্বলন্ত হাতে চণ্ডের পাথর চেপে ধরলাম, মুহূর্তের মধ্যে ঝড় থেমে গেল আর গর্ভগৃহের অন্দর আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল, মন্দিরের দেওয়ালগুলো যেন কোনও ম্যাজিকের প্রভাবে দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করল। চণ্ডের বিকৃত স্বর মন্দিরের দেওয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল—'বিশ্বাসহন্তা সহস্র বৎসরের প্রতীক্ষা ব্যর্থ করে দিলি, তবে নরকের ফুটন্ত কুণ্ডের কারাগারই হোক তোর নিয়তি'। হঠাৎ অনুভব করলাম আমি একটা কুপকুপে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে চলেছি, ঠিক যেন পায়ে হেঁটে নয় কেমন ভেসে ভেসে, একটা সাঁড়াশির মতো কঠিন হাত বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর আমি যেন মহাসমুদ্রের অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি, নীচে আরও নীচে। চিন্তাভাবনার শক্তি এখনো কিছুটা আছে, পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, ভীষণ আতঙ্কে চিৎকার করে প্রার্থনা করলাম—'মা কালী আমাকে বাঁচা মা, এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর, দয়া কর জগজ্জননী'। মা কালী কি শুনলেন! অকস্মাৎ স্নিগ্ধ শ্বেত বর্ণের আলোয় চতুর্দিক ছেয়ে গেল, যে বজ্রমুষ্ঠি এতক্ষণ আমাকে কয়েদ করে নিয়ে যাচ্ছিল সেটা শিথিল হতে শুরু করল। কি শুচিশুভ্র আর পবিত্র ওই আলোর বলয়! চুম্বকের টানের মতো আমি ধীরে ধীরে ওই উজ্জ্বল আলোক বৃত্তের মধ্যে ডুবে যেতে লাগলাম।

সিক্সটি পারসেন্ট বার্ন নিয়ে কটকের শ্রীরাম মেডিকেল কলেজের বেডে যখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম তখন আমার থেকে বিস্মিত বোধহয় আর কেউ হয়নি। তিনমাসে এই নিয়ে দুবার সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ফাঁকি দিলাম, প্রথমবার শয়তানের পরিকল্পনায় আর এবারে বোধহয় ঈশ্বরের কৃপায়! অবাক হওয়ার অবশ্য এখনো অনেকটাই বাকি ছিল, কুণাল যেভাবে আমার দেখাশোনা করছিল তাতে দারুণ লজ্জায় পড়ে গেলাম, ওর মুখে শুনলাম ওর ছেলে বাবু বিপদ কাটিয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে, একফাঁকে দু-দিনের জন্য সময় বের করে কুণাল চেন্নাইয়ে গিয়ে ওর ছেলেকে কলকাতার হাসপাতালে শিফট করে নিয়ে এল। রাজাসাহেবও নিয়মিত আসছেন, ওর মুখে শুনলাম চণ্ডের মন্দির আগুনের দাবানলে পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে গেছে। রুদ্রপ্রসাদের মৃতদেহ কলকাতায় তার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানেই তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আরও জানলাম যে দুরারোগ্য সাদা জ্বরে অসংখ্য মানুষ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সেটা যেন জাদুমন্ত্রে উধাও হয়েছে, রোগিরা সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। শেষের এই খবরে মনটা দারুণ ভালো হয়ে গেল। যেখানেই থাকুন রুদ্রপ্রসাদ জেনে খুশি হবেন তার নিঃস্বার্থ বলিদান বৃথা যায়নি। রাজাসাহেব আর কুণাল মিলে এবারে আমাকে কলকাতার হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা করল। কিছুদিনের মধ্যে আমার ঠাই হল কলকাতার একটি নামী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে, এই হাসপাতালেরই অন্য ডিপার্টমেন্টে বাবুর চিকিৎসা চলছে। এরপর একটা মাস বিছানায় শুয়েই কেটে গেল, কুণাল আর আমার মধ্যে আর কোনও মনোমালিন্যের অবকাশ নেই, আমরা দুজনে মিলে বর্ধমানের রাজবাড়ি নিয়ে একটা পরিকল্পনা ছকেছি, দেখা যাক সেটা কদ্দুর সফল হয়! কয়েকদিনের আগে-পরে আমি আর বাবু দুজনেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলাম। ফের একবার আমি জীবনের মূলস্রোতে ফিরত এলাম।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%