অষ্টাদশ অধ্যায়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

স্কুল ইনস্পেক্টরের বিনা নোটিশের ইন্সপেকশনে সেদিন টিফিন টাইমের পরের পিরিয়ডগুলো আমাদের প্রচুর ব্যস্ততার মধ্যে কাটল। ভদ্রলোককে চা-মিষ্টি খাইয়ে যতক্ষণে বিদায় করা গেল ততক্ষণে ঘড়িতে প্রায় পাঁচটা বাজে, হেডমাষ্টার মশাইয়ের মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল, ভালোয় ভালোয় ব্যাপারটা মিটে গেছে যাহোক, খানাপিনার প্রস্তাব উঠল, হেডস্যার সবার আগে চাঁদা দিলেন, বাকি টাকা-টা সবাই মিলে জোগাড় করে ফিশফ্রাই আর মাটন কাটলেটের ভোজ খেয়ে যতক্ষণে বাড়ি পৌঁছোলাম ততক্ষণে প্রায় সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। জগন্নাথদার মুখে উদ্বেগের ছাপ, আমাকে দেখে বলল—'নাতনির শরীর খারাপ, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তোমার খাবার ঢাকা রইল, খেয়ে নিও'। জগন্নাথ চলে গেল, আমি কুটুসের সঙ্গে একটু খুনসুটি করে, টিভির সুইচ অন করলাম। হঠাৎ মোবাইলটার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলাম, সারাদিনে প্রায় তেইশটা মিসড কল এসেছে, সবকটা কলই একজনের ফোন থেকেই এসেছে, রুদ্রপ্রসাদ। লজ্জিত হয়ে পড়লাম, ভদ্রলোকের কথা একদম ভুলেই মেরে দিয়েছি, উনি যেন কি একটা খুঁজতে বলেছিলেন? কীসের দলিল, কিন্তু খুঁজব কোথায়, এই ফ্ল্যাটে বেডরুম এই একটাই, এখানে কিছু লুকিয়ে রাখার জায়গাটাই বা কোথায়?

ঘরে ফার্নিচার বলতে আমার খাট, একটা আলমারি, ছোট একটা টি-টেবিল আর দুটো কাঠের চেয়ার, প্রথমেই আলমারির উপর ছাদটা হাতড়ে দেখলাম, সেখানে কিছু নেই, এবার খাটটা নিয়ে পরলাম, গদি বালিশ, খাটের তলা অনেক ঘাটাঘাটি করেও হাতে কিছুই এল না, বারান্দাটা খুবই ছোট, ওখানের সম্ভাবনা নাকচ করলে বাকি রইল কিচেন আর বাথরুম, দুটো জায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজে লাভ শুধু হল বছরখানেক আগে হারিয়ে যাওয়া এক টাকার একটা কয়েন, রান্নাঘরে গ্যাসের তলায় পড়েছিল। রুদ্রপ্রসাদের উপর একটা বিরক্তি বেশ কিছুক্ষণ হল দানা বাঁধছিল এবার সেটা চরমে উঠল, লোকটা ছিটগ্রস্থ সন্দেহ নেই, হঠাৎ দেওয়ালে চোখ পরতে মনে হল ওদিকটাও একবার দেখে নেওয়া দরকার, বছর পাঁচেক আগে ডিসটেম্পার রং করা আমার এই ম্যাড়ম্যাড়ে দেওয়ালে ঝুলছে একটা সস্তা অজন্তা ওয়াল ক্লক আর আমার লেট বাবা-মায়ের কাঠের ফ্রেমে বাধানো ছবি। ঘড়িটা নাড়াচাড়া করে কিছু পেলাম না, ওটা যথাস্থানে রেখে এবার ছবিটা হাতে নিয়ে নাড়াঘটা করতেই জিনিসটা নজরে পরল। পিচবোর্ডের ফ্রেমের পিছনে একটা কাগজের টুকরো ভাঁজ করে প্লাস্টিক টেপ দিয়ে সেটে রাখা হয়েছে। কাগজের ভাজটা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরতেই আমার নামে লেখা একটা চিঠি বের হল।

''জয়ন্ত

আমি তপন দাস তোমার বাল্যবন্ধু, চিঠির মাধ্যমে তোমাকে আমার প্রতিনিধিরুপে চণ্ডদেবের উদ্দেশ্যে বলি অর্পণ করার আহ্বান জানাচ্ছি। তোমার পূর্বপুরুষ একসময় রাজা উপাধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন, সেই সূত্রে তোমার ধমনীতে রাজরক্ত বইছে, তাই তুমি এই বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যম হওয়ার উপযুক্ত। চণ্ড সাধনার নিয়মানুসারে রাজগৃহে জন্মিত সাত বছরের বালককে উপাসক নিজের হাতে উৎসর্গ করবেন। এই কাজ নিদারুণ ঝুকিপূর্ণ, সামান্য বিচ্যুতিতে যেমন সাধকের জীবন বিপন্ন হতে পারে তেমন আবার অদ্ভুতভাবে, সফল হলেও সাধকের অনন্ত নরকবাস নিশ্চিত! তবে প্রত্যাশী ব্যক্তি আত্মরক্ষার জন্য একজন সহায়ক নিযুক্ত করতে পারেন, সহায়ককে দণ্ডদাস বলা হয়, যিনি বলির শরীরে প্রথম আঘাত হেনে রক্তপাত ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণ কর্মফলের দ্বায়িত্ত্ব গ্রহণ করবেন, বলির কর্তা পরে প্রাণনাশক অভিঘাত করবেন এবং বলির রক্ত আর প্রাণ চণ্ডদেবকে উৎসর্গ করবেন।

বলি সম্পন্ন হওয়ার ফলে আমরা দুজনে দু-রকম ফল প্রাপ্ত হব। দেবতার আশীর্বাদে বলির কর্তা অর্থাৎ আমি অপরিসীম ধনসম্পদ, পৃথিবীর উপর কর্তৃত্ব করার অপার সুখ এবং অটুট স্বাস্থ্য অর্জন করব। বলির দণ্ডদাস দায়ী থাকবে এর নেতিবাচক ফলের জন্য। অবশ্য চাইলে বলিকর্তা কোনও সহায়ক ছাড়া নিজেই কর্ম সম্পাদন করতে পারেন কিন্তু সেক্ষেত্রে এই কাজের দু-রকম প্রভাবই তাকে নিজেকেই ভোগ করতে হবে তাই একজন সহায়ক এই কার্যে বিশেষ প্রয়োজন। চণ্ডদেবের জাগরণের ফলে মহামারী, দুর্ভিক্ষ আর হানাহানির মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি ঘটবে। অসংখ্য মানুষের দুর্গতির ফলস্বরুপ যে কর্মরাশি সঞ্চিত হবে তা ভোগ করতে দণ্ডদাসকে অনন্ত নরকবাস করতে হবে, এবং এর থেকে মুক্তির কোনও উপায় নেই, এসব গোপনীয় বিষয়, বিধি পালন হেতু তোমাকে জানানো হচ্ছে। বিধি অনুযায়ী কোনও রাজপুরুষ স্বেচ্ছায় দণ্ডদাস হতে পারেন। তবে তাকে সম্পূর্ণ বিষয়ে অবহিত করার দায়িত্ব বর্তায় বলির কর্তার ওপরে। কর্তা চাইলে এ ব্যাপারে সামান্য ছলনার সাহায্য নিতে পারেন, তবে তা যেন কখনই বিধির মূল শর্তকে লঙ্ঘন না করে। তিন রকম উপায়ে এই কাজ করা যেতে পারে। সরাসরি প্রস্তাব করা। দূত মারফত আমন্ত্রণ জানানো অথবা লিখিতভাবে অনুরোধ জানানো। এক্ষেত্রে আমি কাগজে লিখে তোমার অনুমতি প্রার্থনা করছি, যদি তুমি দণ্ডদাসের ভুমিকা পালনে অনিচ্ছুক হও তাহলে এই কাগজের টুকরো ছিড়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে, এবং আজ এই মুহুর্ত থেকে ভবিষ্যতেও কখনো আমার দেওয়া কোনও খাদ্যবস্তু গ্রহণ করবে না। অন্যথায় এবিষয়ে তোমার নিষ্ক্রিয়তাকেই তোমার সম্মতি বলে গ্রাহ্য করা হবে। এই কাগজটাকে তোমার বাসগৃহে তোমার আয়ত্তের মধ্যে রাখা হল, তা সত্ত্বেও যদি তুমি গুরুত্বহীন বিবেচনা করে এর সন্ধান না করে এর পাঠ না কর, তবে সে গাফিলতি তোমার নিজস্ব এবং তার ফলও তোমাকেই ভোগ করতে হবে।''

চিঠিটা অসাড় হয়ে পরা হাত থেকে টুপ করে খসে পড়ল। পুরোনো কিছু স্মৃতি হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল। সেন্ট্রাল মডেল স্কুলে তখন আমি বোধহয় ক্লাশ এইটের ছাত্র, একটা ডাকাবুকো ধরনের ছেলে আমাদের সেকশনে ভরতি হল, নতুন ছেলেটির সঙ্গে আমার আর অরুণের ভারি বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল। আমরা তিনজনে সর্বক্ষণ একসঙ্গে সময় কাটাতাম, জীবনের প্রথম সিগারেট খাওয়া থেকে প্রথমবারের জন্য স্কুল পালিয়ে সিনেমা যাওয়া সবই ঘটেছিল এই তপনের হাত ধরেই। আমাদের মধ্যে অরুণ ছিল পড়াশোনায় ক্লাসের মধ্যে সেরা আর তপন ছিল খেলাধুলোয় চৌকস, ওদের তুলনায় আমি ছিলাম নিতান্তই সাধারণ, টেনে পড়ার সময় তপন যখন ইন্টার স্কুল বক্সিং চ্যাম্পিয়ন হল, মনে আছে আমি টিফিনের জমানো পয়সা দিয়ে মিষ্টি কিনে বিতরণ করার সময় অঙ্ক স্যার মন্মথবাবুর ধ্যাতানি খেয়েছিলাম, স্যারের কথাগুলো আজও স্পষ্ট মনে আছে, সন্দেশ মুখে পুরে পাশে বসা ভূগোল স্যার পার্থবাবুকে বলেছিলেন 'এই গাধাটা আর মানুষ হবে না' স্কুলের গন্ডি টপকে অরুণ চলে গেল সায়েন্স নিয়ে পড়তে আর আমরা দুজন কমার্স নিয়ে ভরতি হলাম সিটি কলেজে। কলেজের পর আমি এই চাকরিটা পেয়ে যখন বর্তালাম তপন ওর অ্যাডভেঞ্চারাস স্বভাবের জন্য চলে গেছে সাংবাদিকতার পেশায়। এই সেই তপন, বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাই পালটে দিয়ে গেল আমার জীবনে। মন্মথবাবুর অবজ্ঞাসূচক ব্যঙ্গোক্তির মানে এতগুলো বছর পর আজকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারলাম। কাগজের টুকরোটা যেন আমার বোকামো দেখে মুখ ভেংচাচ্ছিল, সব রাগ গিয়ে পরল ওটার ওপর, চিঠিটা দলা পাকিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলাম, হঠাৎ কোথা থেকে যেন আবার সেই বিকট আর্তনাদটা ফেরত চলে এলো, এবারে অনান্য-বারের থেকে বৃহৎ আকার ধারন করে কানের পর্দাকে যেন ফাটিয়ে দেবে মনে হল, মিনিটখানেক পরে যখন আওয়াজটা থামল, ব্যাথায় আড়ষ্ট কানে হাত দিয়ে টের পেলাম সেখান থেকে একফোঁটা রক্ত গড়িয়ে গালের ওপর পড়েছে, ভৌতিক শব্দটা তাহলে আমার অস্থির মনের কষ্টকল্পনা নয়, বরঞ্চ ঘোরতর বাস্তব! ভয়ে বিস্ময়ে এবারে আমি একপ্রকার হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%