ষড়বিংশ অধ্যায়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

কটক পেরিয়ে গাড়ি যত এগিয়ে যেতে লাগল ততোই রাস্তার অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল, মাঝে মধ্যেই গাড়ি লাফিয়ে উঠছে আর মনে হচ্ছে আমাদের শরীরের নাট-বোল্টগুলো সব তাতে এক একটা করে খুলে পরবে, যদিও রুদ্রপ্রসাদ ড্রাইভারকে স্পষ্ট বলে দিলেন স্পিড কমানোর কোনও প্রয়োজন নেই, তিনটের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারলে ডবল বখশিশ দেওয়া হবে। এরপর যেটা শুরু হল সেটা ভাষায় বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই, শুধু মনে হচ্ছিল এ যাত্রা যদি বেঁচে যাই তাহলে অন্তত সাতদিন লাগবে গায়ের ব্যথা সাড়তে। রুদ্রপ্রসাদের মধ্যে এবার একটা অদ্ভুত ভাবান্তর দেখা গেল, সে তার সহজাত রসবোধ, অফুরন্ত কথা বলার আগ্রহ সব যেন হঠাৎই হারিয়ে ফেলেছে, লক্ষ করলাম হাতের নখগুলো চিবিয়ে শেষ করার পর আঙুল মটকাতে শুরু করেছে, বুঝতে পারছিলাম চণ্ডরাজ্যের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব যত কমছে, উত্তেজনাই হোক বা আতঙ্ক ততই অসমসাহসী লোকটাকেও একটু একটু করে কব্জা করে ফেলছে, আমার মনের অবস্থাও এককথায় বলতে গেলে শোচনীয়, রাজাসাহেব বলছিলেন আমরা নাকি চণ্ডের শিকার করতে যাচ্ছি! হাস্যকর! এখন চণ্ড কিভাবে আমাদের শিকার করে সেটাই হচ্ছে লাখ টাকার প্রশ্ন! সোনালির কথাও ভাবছিলাম, অবশেষে মনের মতো পাত্রী জুটল, কিন্তু বিয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল। গাড়ি শহর থেকে গ্রামের সীমানা পেরিয়ে যে ধীরে ধীরে মহারণ্যের দিকে এগোচ্ছে তা ভালোই বুঝতে পারছিলাম, রাস্তার দু-ধারে গাছপালার ঘনত্ব ক্রমশ বাড়ছে। মানুষের সংখ্যা কমছে। একটা জায়গায় দেখলাম একপাল হনুমান রাস্তার সিংহভাগ জুড়ে বসে আছে, চলন্ত গাড়ি দেখেও ওদের নড়েচড়ে বসার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না, ড্রাইভার খুব সাবধানে স্পিড কমিয়ে রাস্তা বের করে গাড়ি ছোটাল। বেলা প্রায় তিনটে নাগাদ আমরা আধা গ্রাম আধা জঙ্গল মার্কা একটা জায়গায় এসে পৌঁছোলাম, গ্রামটার নাম চৌরি। রুদ্রপ্রসাদের নির্দেশে ড্রাইভার গাড়ি থামাল। পিচ রাস্তা থেকে খানিক দূরে ঘন ঝোপের মধ্যে একটা মন্দিরের শতচ্ছিন্ন পতাকা দেখা যাচ্ছে, রুদ্রপ্রসাদ সেদিকে দেখিয়ে বললেন—'ওই যে মা জংলা-চণ্ডীর মন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছে, চল আমরা আমাদের কর্মের সাফল্যের জন্য মায়ের কাছে শক্তি প্রার্থনা করি'। মন্দিরটা নিতান্তই সাধারণ। বড় বড় পাথরের টুকরো গেঁথে একটা উপাসনাস্থলের রূপ দেওয়া হয়েছে, পাথরের বেদির উপর মা কালী চামুণ্ডা রূপে পূজিত। প্রতিমার গলায় বুনো ফুলের মালা, পরনের বেশবাস চটের কাপড় দিয়ে তৈরি, দু-তিনজন গ্রাম্য আদিবাসী গোছের নারী-পুরুষ মন্দিরের সামনের চাতালে বসে সুর করে কালী-কীর্তন করছে, বুঝলাম এখানে আড়ম্বরের অভাব থাকলেও ভক্তির অভাব নেই। সামনে একটা ফুল কাম চা কাম মুদির দোকান ছিল, সেখানে কষ্টে-সৃষ্টে একটা জবার মালা জুটল, বাকি যা আছে সবই বুনো ফুল, রুদ্র জবার মালাটা কিনে নিলেন, আর একঝুড়ি ফুল তৈরি রাখতে বললেন। মন্দিরে এখন পুরোহিতকে দেখা যাচ্ছে না, রুদ্র মূর্তির পায়ের কাছে মালা রেখে হাতজোড় করে প্রার্থনা করলেন তারপর হাড়িকাঠ থেকে তেল সিঁদুর আঙুলের ডগায় তুলে নিজের আর আমার কপালে টিকা দিলেন। গাড়িতে ফিরে রুদ্র আমাকে জিগ্যেস করলেন—'মায়ের কাছে প্রার্থনা করলে'? —'নাঃ, যা হওয়ার তা হবেই'। রুদ্রপ্রসাদ কিছুক্ষণ পরে বললেন—'চণ্ডকে মাৎ দিতে গেলে চণ্ডীর কৃপা ছাড়া যে হওয়ার নয়, যাকগে তুমি ঠিকই বলেছ, যা হওয়ার তা হবেই'। দোকানি এসে এক ঝুড়ি ফুল দিয়ে গেল, রুদ্র ড্রাইভারকে ঝুড়িটা গাড়ির ডিকিতে রাখার নির্দেশ দিলেন, অবাক হয়ে বললাম—'ফুল মন্দিরে চড়াবেন না'। রুদ্র স্মিতহাস্যে বললেন—'এটা অন্য কাজে লাগবে'।

আরও মিনিট দশেক চলার পর গাড়ি মোরাম পাতা রাস্তা দিয়ে যে জায়গাটায় এসে দাঁড়াল রুদ্রপ্রসাদ জানালেন সেটাই নাকি ভগীরথপুর, আমার সর্বাঙ্গ দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল, এই সেই চণ্ডের রাজধানী! রূপকথার রাজ্য ভগীরথপুর গ্রাম? জায়গাটাকে জঙ্গলাকীর্ণ বললে কমই বলা হবে! এত ঘন গাছপালার সমাহার এত উঁচু উঁচু নাম না জানা মহীরুহ আমার জীবনে আগে কখনো দেখিনি। কাঁচা রাস্তার দু-ধার দিয়ে কয়েকটা খড়ের চাল চোখে পড়ল, এখান থেকেই বোধহয় গ্রামের শুরু যদিও সেখানে মানুষজন কাউকে দেখা গেল না, কয়েক পা এগোলেই ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা মিলিটারি চেক পোস্ট, সৈনিকের উর্দিধারি লোকজন ছড়িয়ে- ছিটিয়ে বসেছিল তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে জিগ্যেস করল—'আমরা মিঃ মিত্র অ্যান্ড পার্টি কি না'। রুদ্রপসাদ উত্তর দিতে ওয়ারলেসে খবর চলে গেল, একটু পরে একজন অফিসার এসে আমাদের কাগজপত্র দেখতে চাইলেন, এরপর কিছুসময় ধরে চলল প্রমাণপত্র পরীক্ষা করার পালা, অবশেষে সন্তুষ্ট হয়ে ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন—'আমি ক্যাপ্টেন বিকাশ সবরহাল, হোম ডিপার্টমেন্ট থেকে অর্ডার ইস্যু করা হয়েছে যাতে এই অঞ্চলের দুটো গ্রাম জানুয়ারির ২৫ আর ২৬ তারিখ দু-দিনের জন্য এভাকুয়েট করে দেওয়া হয়, সে ব্যবস্থা হয়ে গেছে'। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'শুধু এইটা, অন্য অর্ডারটা কি আপনারা পাননি'? সবরহাল এবারে কাটা কাটা ইংরেজি উচ্চারণে বললেন—'হোম ডিপার্টমেন্ট হ্যাভ অ্যাডভাইজড দ্যাট মিঃ মিত্রা উইথ হিজ অ্যাসিসটেন্ট উইল বি দ্য অনলি পারসনস টু হ্যাভ অ্যান অ্যাকসেস টু দিস ফরেস্ট এরিয়া বিফোর নর্মালসি ইজ রিস্টোর্ড অন এইট পি এম টুয়েন্টি সিক্সথ অফ জানুয়ারি'। রুদ্রপ্রসাদ মাথা নেড়ে বললেন—'হ্যাঁ এবার ঠিক আছে'। সবরহাল চেড়া চোখে চেয়ে বললেন—'এরকম অদ্ভুত অর্ডারের মানে বুঝে উঠতে পারছি না, আপনাদের জানিয়ে রাখি সাতকোশিয়ার কোর ফরেস্ট থেকে মাঝে মধ্যেই একটা দুটো বাঘ এদিকে চলে আসে, বাঘ ছাড়া অন্য হিংস্র জন্তুও কিন্তু এসব জঙ্গলে আছে, যেমন নেকড়ে, লেপার্ড, আবার হাতির পালও কিছু কম ডেঞ্জারাস নয়, তবে সব কিছুর ওপরে রয়েছে মাওবাদি, যদিও এরিয়া এখন আমাদের কন্ট্রোলে তা হলেও কিছু নকশালপন্থী যে গা ঢাকা দিয়ে নেই সে গ্যারান্টি কেউ দেবে না'। রুদ্রপ্রসাদ শুধু বললেন—'ইনফরমেশনের জন্য ধন্যবাদ'।—'হোল্ড অন'! সবরহাল বললেন—'আরও কিছু বলা বাকি আছে, নীলু মাজির নাম আপনি শুনে থাকতে পারেন, নটোরিয়াস ক্রিমিনাল, মধুসূদনপুরের কাঠগোলায় ডাকাতি করে পালানোর সময় পুলিসের গুলি খেয়ে মরেছে, গ্যাংটাকে আমরা প্রায় শেষ করেই এনেছিলাম, সামান্য ভুলে নীলুর ভাই দিবাকর আর ওর কয়েকটা সঙ্গী আমাদের হাত ফস্কে এই জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়েছে, এখন অবধি ট্রেস করা যায়নি। বাই চান্স যদি ওদের সামনে পড়ে যান তাহলে মনে রাখবেন, বনের বাঘের থেকে হয়তো একটু দয়ামায়া আশা করতে পারেন, বাট নট ফ্রম দিস হুলিগানস'। রুদ্রপ্রসাদ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়িয়ে বললেন—'ঠিক আছে আশা করব না'। সবরহাল অবাক দৃষ্টে রুদ্রপ্রসাদের মুখের দিকে চেয়ে বললেন—'শেষ কথাটা শুনে যান, আমাদের উপর নির্দেশ আছে দশ কিলোমিটার রেডিয়াসের বাইরে থাকতে, আপনাদের কোনও বিপদ হলে, এমনকী খবর পেলেও ছাব্বিশ তারিখ রাত আটটার আগে কিন্তু আমরা এই সার্কেলের ভিতর আসব না'। রুদ্রপ্রসাদের গলায় এবার বিরক্তির আভাষ, বললেন—'ফাইন অফিসার, এসব কিছুই আমার অনুরোধে সাড়া দিয়ে হোম ডিপার্টমেন্ট করেছে, এবার দয়া করে বলুন আমি যে জঙ্গলের মধ্যে একটা বিশেষ জায়গায় কিছু অ্যারেঞ্জমেন্ট রিকোয়েস্ট করেছিলাম তার কি ব্যবস্থা হয়েছে'? সবরহাল মাথা নাড়লেন—'হ্যাঁ হয়েছে'। —'ধন্যবাদ, তাহলে সেখানে আমাদের পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত করুন'। —'এখান থেকে আড়াই কিলোমিটার রাস্তা মোটর সাইকেল যাবে, তারপরে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই'। রুদ্রপ্রসাদ ব্যাস্ত হয়ে বললেন—'শীতের বিকেল, ঝুপ করে অন্ধকার নেমে যাবে, তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ'।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%