একবিংশ অধ্যায়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

বিকেল চারটে নাগাদ ঘরের বাইরে থেকে রুদ্রপ্রসাদের স্বর পেলাম, রুমাদিকে বলছিলেন 'এই যে কাটলেটগুলো দেখছিস এসব কিন্তু যেখানে-সেখানে পাবি না, আমি শ্যামবাজারে গাড়ি থামিয়ে নিয়ে এসেছি, তোরা খা আর আমাদের দে, সবার আগে ভালো করে কফি বানা দেখি' রুদ্রপ্রসাদ এবার ঘরে প্রবেশ করলেন, ভদ্রলোক বোধহয় এখুনি স্নান করেছেন, মাথার ভিজে চুল পরিপাটি করে ব্যাকব্রাশ করা, পাঞ্জাবি পায়জামার উপর শাল জড়িয়ে কাউচে বসে বললেন—'এই যে ইয়ংম্যান কেমন আছ? হেসে বললাম—'একদম ফিট! শুনলাম আপনি ভুবনেশ্বরে গেছিলেন'?

—'ওই একটা দরকারি কাজ টুক করে সেরে এলাম, তা এখানে তোমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো'?

—'অসুবিধে! কি বলছেন? আপনাদের আতিথ্যের তুলনা হয় না তবে এবারে অনুমতি দিন বাড়ি যেতে হবে'। রুদ্রপ্রসাদ যেন হাত দিয়ে আমার কথা উড়িয়ে দিয়ে বললেন—'হবে হবে, আগে শ্যামবাজারের বিখ্যাত মামার দোকানের কাটলেট নিয়ে এসেছি সেটা চেখে দেখবে না'। এবারে রুদ্র হাঁক পাড়লেন—'কি হল রে রুমা তোর কফির আর কত দেরি'। বলতে বলতেই রুমাদি খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে ঢুকলেন। রুদ্রপ্রসাদ ট্রে-টা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বললেন—'ব্রেকফাস্টের পরে আর কিছু খাওয়া হয়নি বুঝলে, খিদেটা বেশ চাগার দিয়ে উঠেছে'। আমাকে খেতে ইঙ্গিত করে উনি নিজেও কাটলেটে বড়সড় একটা কামড় বসালেন। আমি কাটলেট হাতে তুলে বললাম—'আপনার হ্যারিকেন আর প্রদীপের ধাঁধাটা বোধহয় ধরতে পেরেছি'।

—'আচ্ছা, কি ধরেছ শুনি'?

—'এসব বোধহয় কোনও শক্তিশালী নেগেটিভ এনার্জিকে ঠেকিয়ে রাখার বন্দোবস্ত'।

—'রাইট', রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'তুমি এতক্ষণে কিছু কিছু বুঝতে শুরু করেছ, খারাপ কিছু যে এখনও এ বাড়ির চৌহদ্দির ভিতর থাবা বসাতে পারেনি সেটা কিছুটা ওই আগুনের শক্তিতেই বলতে পারো'।

—'কিন্তু আপনারা তো বাড়ির বাইরে যান! তখন'?

—সে ব্যবস্থাও আছে, রুদ্রপ্রসাদ শাল সরিয়ে ফতুয়ার কলার টেনে ধরতেই কবচের মতো কিছু দেখা গেল। বললেন—'এটা ধূমাবতীর কবচ, বিশেষভাবে মন্ত্রপূত'। আমি একটু অবাক হয়েই বললাম—'আপনাকে কিন্তু ঠিক কবচ টাইপের লাগে না'! রুদ্রপ্রসাদ সামান্য হেসে বললেন—'উপায় নেই ভায়া, জানো তো ক্রিকেট খেলতে হলে প্যাড গ্লাভস পড়তেই হয়'।

—'কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার হচ্ছে না, বলিটা হল কিভাবে? ছেলেটাকে বলি দেওয়ার আগেই তো ওর মৃত্যু ঘটল! একদম নর্মাল ডেথ? রুদ্রপ্রসাদের খাওয়া হয়ে গেছিল, ন্যাপকিনে মুখ মুছতে মুছতে বললেন —'বলি যথাযথই হয়েছে, আর হয়েছে তোমার হাত দিয়েই, ছেলেটি হার্টফেল করার আগে তুমি ওর রক্তপাত করেছিলে, তারপরে অন্য কেউ কিছু করে ওঠার আগেই অকুস্থলে পুলিশের আবির্ভাব আর দলবল সমেত সমীরণের মহাপ্রস্থান। চণ্ডরাজা তোমার মাধ্যমে নিজের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বলি গ্রহণ করে নিয়েছে'। কথাটির অর্থ উপলদ্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে আমার বাক্যস্ফুর্তিই যেন বন্ধ হয়ে গেল, রুদ্রপ্রসাদ এবার থমথমে স্বরে বললেন—'ওই যে কাণ্ডজ্ঞানহীন ছেলেটি তপন না কি যেন নাম, কত বড় একটা আহাম্মক সেটা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে শুধু লোভে পরে নিষিদ্ধ গুপ্তবিদ্যার সাধন করতে গেছিল, অনধিকারী হয়ে যেদিন ও চণ্ডের গ্রাসে হাত দেওয়ার ধৃষ্টতা করেছিল সেদিনই নিজের ভাগ্যে ভয়ংকর পরিণতি আহ্বান করে ফেলেছিল, মৃত্যু তো সামান্য ব্যাপার, আমি নিশ্চিত ওর দেহাতীত আত্মা এই কুকর্মের ফলে অনন্তকাল কষ্ট ভোগ করবে'।

—'তাহলে সমীরণের মৃত্যুটা কি নেহাত দুর্ঘটনা'?

—'সমীরণ সংকল্প করে চণ্ডের বলির দায়িত্ব নিয়েছিল, কিন্তু নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি, ওর সেবার মধ্যে অবহেলাজনিত ত্রুটি ছিল। চণ্ড তাই ওর প্রাণ কেড়ে নিয়ে শাস্তি দিয়েছে, আর বলি গ্রহণ করেছে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থাৎ তোমার হাত থেকে। তা ছাড়া জয়ন্ত, এটা অবিদ্যার সাধন, খুব কঠিন কাজ, আজ থেকে হাজার বছর আগে বলভদ্রের মতো কিছু অদ্ভুতকর্মা ব্যক্তি ছিল যারা এইসব লুপ্ত বিদ্যায় চূড়ান্ত পারদর্শী, কিন্তু মাঝখানে হাজার বছরের ধুলো জমে যোগসূত্রটাই খোয়া গেছে, শুধু গোটাকয়েক শিলালিপি পড়ে এ পথে এগোনো নিতান্তই পাগলামি'। আমি বললাম—'কিন্তু সমীরণ তো আর পাগল ছিল না, আপনার কথামতো সে তো জিনিয়াস ছিল'! রুদ্রপ্রসাদ ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললেন—'সেইজন্যই তো মরল, একটা কথা আছে না অতি চালাকের গলায় দড়ি, ভেবেছিল একটু পরীক্ষা করেই দেখা যাক, বাস্তবে লাভ হলে ভালো, নাহলে কি আর হবে! কিন্তু ও যদি সবদিক খতিয়ে দেখত তাহলে বুঝত যেদিন এই কাজে হাত দিয়েছিল সেদিন থেকেই ওর পায়ের তলার জমি সরতে শুরু করেছিল, নতুবা জঙ্গলমহলের রাজা সমীরণকে কলকাতার রাস্তায় এমন কুকুরের মতো মরতে হয়'?

আমি পুরো বিষয়টাকে ছকে ফেলার চেষ্টা করছিলাম, হঠাৎ একটা ছবি যেন স্পষ্ট হতে হতে ফের কুয়াশার আড়ালে চলে গেল, বললাম—'আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? যদি সবকিছু তেমনই ঘটে থাকে যেমনটা আপনি বলছেন তাহলে তো আমার এতদিনে বিরাট কিছু প্রাপ্য ছিল, কিন্তু তেমন কিছু পেয়েছি বলে তো মনে পরছে না'! রুদ্রপ্রসাদ শান্ত কণ্ঠে বললেন—'কিছু পাওনি বলছ'?

—'অবশ্যই, স্কুলে কেরানিগিরি করি, মাইনে সামান্যই, এর মধ্যে কোনও ইনক্রিমেন্টও হয়নি, আর কোনও লটারিতে প্রাইজও ওঠেনি'। রুদ্রপ্রসাদ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—'একমিনিট বসো আসছি'। একমিনিট নাহলেও পাঁচমিনিটের মধ্যেই হাতে একটা বোতল নিয়ে ভদ্রলোক ফিরত এলেন, ছিপি খুলে দুটো গ্লাসে তরল পানীয় ঢেলে, একটা আমার দিকে এগিয়ে বললেন—'নাও হে'। অবাক হয়ে বললাম—'আমি মদ খাই না'। রুদ্রপ্রসাদ মৃদু হেসে বললেন—'মদ নয় ব্র্যান্ডি, খেলে নার্ভ স্ট্রং থাকে, এইমুহূর্তে এটা তোমার দরকার, আমি বলছি তুমি খাও'। বিশ্রী ঝাঁজাল স্বাদ তাও রুদ্রের অনুরোধে পুরো গ্লাসটা শেষ করতে হল। পানীয়ের প্রভাবেই বোধহয় মেজাজটা হঠাৎ হালকা লাগতে শুরু করল। রুদ্র আলমারি থেকে একটা পত্রিকা বের করে সামনে রাখলেন। পত্রিকাটির প্রচ্ছদপটে মুদ্রিত ''জার্নাল, ইন্ডিয়ান একাডেমী অফ ক্লিনিক্যাল মেডিসিন'' রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'এটা নিশ্চয়ই তোমার চোখে পরে নি, অরিন্দম মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসেছে, ওটার বারো নম্বর পাতায় একটা আর্টিকেল ছাপা হয়েছে, বেশ ইন্টারেস্টিং, প্রায় দু-মাস আগে, তারিখটা ৯ নভেম্বর, পিজি হসপিটালে একজন মরণাপন্ন যুবককে আশংকাজনক অবস্থায় ভরতি করা হয়, আহতের হৃৎযন্ত্রের একটা ধমনী, বন্দুকের গুলিতে মারাত্মক রকমের ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পরেছিল, এমন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি হওয়াটাই স্বাভাবিক তারপর ঠিক এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যে ব্রেন ডেথ হওয়াটা অনিবার্য, কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটনার প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে ক্লিনিকাল ট্রিটমেন্ট চালু হওয়ার সময় দেখা গেছিল হৃৎযন্ত্র কোনও অদ্ভুত উপায়ে ক্রিয়া করছিল। মেডিক্যাল জার্নালে এই বিশেষ কেসটাকে মিরাকাল সার্ভাইভালের আওতায় নথিভুক্ত করেছে'। রুদ্রপ্রসাদ পত্রিকাটি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন—'নিজের ছবি নিশ্চয়ই চিনতে পারবে'। ডাক্তারদের মুখে এমন কিছু কথা হাসপাতালে থাকতে শুনেছি কিন্তু গুরুত্ব দিইনি, আজকে ছাপার অক্ষরে সেসব দেখে হঠাৎ মাথা বোঁ করে ঘুরে উঠল, তবে কি! উলটোদিকের সোফায় বসে থাকা রুদ্রপ্রসাদের শানিত কণ্ঠস্বর চাবুকের মতো গায়ে আছড়ে পড়ল।—'তোমার মৃত্যু সেই দশ নভেম্বরের বিকেলেই হয়ে গেছে জয়ন্ত সিংহ রায়! জীবন ধারণের প্রতিটা নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের জন্য আজকের এই তুমি, চণ্ডরাজার ঋণী, তা ছাড়া তোমার জীবনের অন্যতম যে সমস্যা তার রহস্যও লুকিয়ে আছে এই ধাঁধার মধ্যেই, চণ্ড তোমাকে পৃথিবী আর পরলোকের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ মিডিয়ামে রূপান্তরিত করেছে, ওপারের অতৃপ্ত আত্মারা তোমার দেহের সেতু অতিক্রম করে জীবনের স্বাদ চাঁখবার জন্য অধীর হয়ে পড়েছে, তাদের হুড়োহুড়ি আর হতাশ আস্ফালন, আর্তনাদের আকারে তোমার কানে কিন্তু এরমধ্যে কয়েকবার ধরা পড়েছে।

হাতে তেলের বোতল নিয়ে রুমাদি ঘরে আসতে আমাদের কথাবার্তায় ছেদ পড়ল, এক এক করে সব-কটা হ্যারিকেনে তেল ভরে শিখাগুলো একটু জোরালো করে মহিলা চলে যাচ্ছিলেন, রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'রুমা আর এক কাপ কফি খাওয়াবি'। মহিলা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বিদায় নিলেন রুদ্রপ্রসাদ মোলায়েম স্বরে বললেন—'জয়ন্ত আমাকে ভুল বুঝো না। তোমার উপর কোনও কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি না, আমি শুধু চাই তুমি পুরো বিষয়টা ভালো করে বুঝে নাও তারপর যে সিদ্ধান্তই নেবে সেটা তোমার স্বাধীন ইচ্ছে'। মনের মধ্যে একটা উথালপাথাল শুরু হয়েছে এবার সেটা ঠেলে বাইরে আসতে চাইল, রুক্ষ স্বরে বললাম—'হেঁয়ালি না করে, বলুন তো আপনার মনের মধ্যে কি আছে'? রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'বেশ তবে শোন, চণ্ডরাজা তোমার মাধ্যমে আগামী সাতষট্টি বছরের জন্য পৃথিবীর বুকে নিজের ধ্বংসলীলা চালাবেন, যেটা আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে'। আমি অধৈর্য হয়ে বললাম—'তপন চিঠিতে লিখেছে দণ্ডদাসের আত্মাকে নরকে কষ্ট ভোগ করতে হবে সেটা কি ঠিক'? রুদ্রপ্রসাদ নেতিবাচকভাবে মাথা নেড়ে বললেন—'অন্তত এখানে ভুল কিছু নেই। তা ছাড়া এই অপশক্তির উত্থানে দুর্ভিক্ষ, খরা আর মহামারীতে প্রচুর জীবন ক্ষয় হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী, মহামারী তো ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে'! আমার ভ্রু দুটো বোধহয় কুঁচকে উঠেছিল, দেখে রুদ্র বললেন—'একরকম অসুখে যেটাকে সাদা জ্বর বলছে যার ফলে অনেক লোক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে খবর পাওনি'?

—'সেটাও কি এই কারণে'? আমার বিস্মিত প্রতিক্রিয়া দেখে রুদ্র ম্লান হাসলেন, বললেন—'তবে এখনও পর্যন্ত কেউ যে এই রোগে মারা যায়নি, সেটা অনেকটা এই শর্মার তৎপরতার জন্য বলতে পারো।

—'সেটা কিরকম'?

—'দশ নভেম্বরের বিকেলে, পুলিস নাগের বাজারের ওই বাড়িটা থেকে যা কিছু উদ্ধার করেছিল সেসব জমা আছে থানার মালখানায়, এর মধ্যে একটা গুলির আকারের পাথর যেটা চণ্ডরাজার প্রাণভোমরা, সেটার সামান্য অদলবদল হয়েছে, রাস্তার একটা নুড়ি-পাথর ওই গুদামে রেখে আসলটার জায়গা হয়েছে ত্রিপুরেশ্বরি কালী মন্দিরে মায়ের বেদির তলায়, চণ্ডরাজাটি যে এখনও অবধি তেমন দাঁত ফুটিয়ে উঠতে পারেন নি সেটা শুধুমাত্র এই একটি কারণেই'। আমার বিস্ময় চরমে উঠল, বললাম—'এটা কিভাবে সম্ভব হল'? রুদ্রপ্রসাদ দুর্বোধ্য ভাবে হাসলেন, বললেন—'টাকার জোরে কি না হয়! বাকিটা বুঝে নিতে তোমার অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, আর মন্দিরের পুরোহিত আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত'।

—এই নরকের রাজাটিকে কোনওভাবে ঠেকানো যায় না? রুদ্রপ্রসাদ চিন্তিত স্বরে বললেন—'অত্যন্ত কঠিন কাজ, শয়তানের সঙ্গে লড়াই করার মতো আত্মিক শক্তি কি আমাদের মধ্যে আছে? ঝড়ের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যাব, তবে হ্যাঁ একটা ক্ষীণ উপায় হয়তো আছে, আর সেটাও যে কতটা সফল হবে জানি না, রাজগুরু অনঙ্গদেব চণ্ডবিজয় পুঁথিতে এ ব্যাপারে স্পষ্ট দিকনির্দেশ করে বলেছেন, চণ্ডের শক্তির ত্রিকোণ যদি নষ্ট করে দেওয়া সম্ভব হয় তাহলে চণ্ড পৃথিবীর বুক হতে বিদায় নিতে বাধ্য হবে'।

—'ত্রিকোণ! সেটা আবার কি'?

—'ত্রিকোণের প্রথম কোণটা হচ্ছে চণ্ডরাজার প্রাণ পাথর, যেটা এখন মন্দিরের বেদির তলায় পোতা রয়েছে, দ্বিতীয়টা হচ্ছে ভগীরথপুরের চণ্ড মন্দিরের ওই মূর্তি, আর তৃতীয় যে ত্রিকোণটা তৈরি হয়েছে সেটা হয়তো সাময়িক কিন্তু এর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ'। এতটা বলে রুদ্রপ্রসাদ থামলেন, একটু সময় নিয়ে বললেন—'আর তৃতীয় ত্রিকোণটা যে কি হতে পারে আশা করি তুমি আন্দাজ করতে পারছ'? একটা ভয়ংকর সম্ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, মুখে বললাম—'বলতে থাকুন, শুনছি'। রুদ্রপ্রসাদ স্থির দৃষ্টে চেয়ে বললেন—'সেটা অন্য কিছু নয়, তুমি নিজেই, চণ্ডের ত্রিকোণের সবথেকে ক্ষতিকারক আর অপরিহার্য শেষ বিন্দু'! টের পেলাম আমার কপালের দু-পাশের শিরাগুলো হঠাৎ বিশ্রীভাবে দপদপ করতে শুরু করেছে, আমি রগ দুটোকে ডান হাতের আঙুল দিয়ে টিপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। সামান্য পরে রুদ্রপ্রসাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম—'সময় ফুরিয়ে এসেছে জয়ন্ত, আর তিন দিন ব্যাস, এর পরে ধীরে ধীরে সে তোমার মনের দখল নিতে শুরু করবে, তোমার হাত দিয়েই তার প্রাণ পাথরের মুক্তি ঘটবে, কারও ক্ষমতায় কুলাবে না সেটা আটকানোর, আর ভগীরথপুরেও তুমি নিশ্চয়ই যাবে, তবে স্বেচ্ছায় কি না সে প্রশ্ন অবান্তর'! রুদ্রপ্রসাদকে থামিয়ে অধৈর্যভাবে বললাম—'আপনি আবার হেয়ালি করছেন! তিন দিন পরে আবার কি ঘটতে চলেছে'?

রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'ঠিক তিনদিন পর অমাবস্যা, মাঘ মাসের অমাবস্যা, আদিবাসীদের মধ্যে এই তিথিটা চণ্ডের রাত বলে পরিচিত। দেবতাটির সে রাতে শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি ঘটবে, যতদূর মনে হয় ওইরাতেই চণ্ডরাজা জঙ্গল, মন্দির পরিত্যাগ করবেন আর তোমার শরীর-মন পুরোপুরি ভাবে কব্জা করে নিজের খেলা শুরু করবেন। আমি এতটা শুনে বললাম—'চণ্ড তা হলে ওইদিনটার অপেক্ষাই করছে'?

—'উপায় নেই, চণ্ডেরও কিছু লিমিটেশন আছে, বলি দেওয়ার সময় তুমি বিধিমতো চণ্ডের সামনে আত্মসমর্পণ করনি, ও কাজটা সমীরণের করার ছিল, ভগীরথপুরের নিষিদ্ধ মন্দিরে বসে চণ্ড বিগত দু-মাসের উপর তোমার পথ চেয়ে বসে আছে, কবে তুমি এসে তাকে মুক্তি দেবে, তবে চণ্ডের রাতে সব হিসেব-নিকেশ পালটে যাবে, তখন তুমি চণ্ডের ইচ্ছেমতো কাজ করতে বাধ্য। তারপরেই হাজার বছরের বন্দিদশা থেকে বেড়িয়ে রাজাটি যে কি তাণ্ডব ঘটাবেন সে একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। আমি বললাম—'তাহলে কি আমার মৃত্যুতেই চণ্ডকে ঠেকানো যাবে'? রুদ্রপ্রসাদ মাথা নাড়লেন—'হ্যাঁ তবে আত্মহত্যা নয় আত্মবলিদান! কিন্তু সেটাও দস্তুরমতো নিয়ম অনুযায়ী করতে হবে। পারবে কি তুমি'? উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না, চুপ করেই রইলাম, মনের মধ্যে যেটুকু জোর ছিল তা যেন হাওয়ায় উড়ে গেছে, নীরবতা ভেঙে রুদ্রপ্রসাদই ফের কথা বললেন—'যদি এমন একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে মনের সায় না পাও তবে ঠিক আছে, আর যাই হোক এই পরিস্থিতির জন্য তুমি কোনওভাবেই দায়ী নও'। ঘরের পরিবেশ হঠাৎ অসহ্য লাগতে শুরু করল। বললাম—'আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসতে চাই'। রুদ্রপ্রসাদ চিন্তিত স্বরে বললেন—'কিন্তু তোমার শরীর যে এখনও দুর্বল রয়েছে'।

—'থাকুক তা হলেও বেরোনো দরকার'। রুদ্রপ্রসাদ বললেন— 'অরিন্দম এখন বোধহয় বেড়িয়েছে আমি কিশোরীলালকে বলছি গাড়ি বের করতে'। -'গাড়ির প্রয়োজন নেই, আমি দিব্যি হেঁটে যেতে পারব'।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%