চতুর্বিংশ অধ্যায়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

ভুবনেশ্বর শহরে আমার বসবাস হলেও আমাদের পৈত্রিক বাড়ি উড়িষ্যার একটি প্রত্যন্ত এলাকায়, পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী পৈতৃক ভিটেতেই ছয়মাসের প্রবীণের অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠানের আয়োজন হল। জায়গাটা সেসময় ছিল নকশালদের শক্ত ঘাটি, যাইহোক সেসব নিয়ে আমি তেমন দুশ্চিন্তা বোধ করিনি কারণ স্থানীয় মানুষজনের কাছে এই আজকের যুগেও আমরা বাড়তি একটু সম্মান পেয়েই থাকি, তা ছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে সিকিউরিটিও মোতায়েন করা হল যাতে সবকিছু নিরাপদে মিটে যায়, যদিও সমস্ত হিসেব-নিকেশ অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেলেই উলটে গেল, রাজবাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে আমাদের কুলদেবতা চক্রপাণি মহাদেবের মন্দির, রীতি অনুসারে আমার স্ত্রী, প্রবীণকে নিয়ে মন্দিরে গেছিলেন, পরে জানতে পেরেছিলাম কিছু লোক আগে থেকেই গর্ভগৃহে লুকিয়েছিল, ইনফ্যাক্ট উগ্রপন্থীরা সেদিন পুরো মন্দিরটাই নিজেদের দখলে নিয়ে অপেক্ষা করছিল কতক্ষণে আমরা ওখানে পা রাখব, আমার স্ত্রীর মাথায় বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করে ওরা আমার ছেলে আর আয়াকে নিয়ে মন্দিরের পিছনের দরজা দিয়ে উধাও হয়ে যায়, বাইরে যে গার্ড-রা নজর রাখছিল তারা টেরও পেল না ভিতরে কি ঘটে গেছে, যতক্ষণে বুঝল ততক্ষণে সব শেষ। এতটা বলে রাজাসাহেব থামলেন, সামনে রাখা কাঁচের গ্লাস থেকে জল খেয়ে সামান্য পরে বললেন—'আমার ধারণা হয়েছিল এসব র‌্যানসাম আদায়ের জন্য করা হয়েছে। আমিও ছেলেকে ফিরত পাওয়ার জন্য মূল্য চুকাতে রাজি ছিলাম, কিন্তু দিন তিনেক কেটে গেলেও কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল না, এর মধ্যে আয়া ফিরত এসেছে, কিছুই মাথায় ঢুকছিল না! টাকাপয়সা ছাড়া এই কিডন্যাপের অন্য কি উদ্দেশ্যই বা হতে পারে? আমার তেমন কেউ শত্রু আছে বলে মনে করতে পারছিলাম না, আমাদের এই সম্ভ্রান্ত পরিবারটির যোগাযোগ অনেক দূর বিস্তৃত, আমি কোনও পাথরই ওলটাতে বাকি রাখলাম না। পুলিসও যথাসাধ্য চেষ্টা করল কিন্তু কিছু কাজই হল না। এরমধ্যে একটা খবর কানে এল, মাও নেতা সমীরণ নাকি এই অপহরণের মূল চক্রি। আমি প্রচুর চেষ্টা করে সমীরণের সঙ্গে মিটিং অ্যারেঞ্জ করলাম, সমীরণ অবশ্য নিজে এল না, কিন্তু ফোনে কথা বলল, আমার অনুরোধ উপরোধ টাকার অফার সব উড়িয়ে সে ঝেড়ে অস্বীকার করল, এই ব্যাপারে নাকি তার কোনও ইনভলভমেন্টই নেই, তাই সে আমাকে কোনও সাহায্যই করতে পারবে না। কেন জানি না আমার মনে হয়েছিল লোকটা আগাগোঁড়া মিথ্যে কথা বলছে, কিন্তু সেসময় আমি ওর সামনে একেবারেই নিরুপায় একজন সাধারণ পিতা ছাড়া অন্য কিছু নই'। আমার একটু অবাক লাগল, জিগ্যেস করলাম—'আপনি নিজের সোর্স খাটিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করলেন না কেন? পুলিশ রেড করলে তো হয়ে যেত'। রাজাসাহেব ম্লান হেসে বললেন—'আপনার মাও ইনসার্জেন্সি সম্বন্ধে ঠিক কি ধারণা আছে'? মাথা নেড়ে বললাম—'তেমন কিছু নয়, ওই খবরের কাগজে একটু-আধটু', রাজাসাহেব আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন—'সেটা আমি বুঝেছি, এই যে উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ জঙ্গল পাহাড়ে ঘেরা অঞ্চলটা, নামে ভারতবর্ষ হলেও এতদিন এই জায়গাটা একটা প্যারালাল অ্যাডমিনিসট্রেসনের অধীনে ছিল আর সে প্রশাসন ছিল এমন কিছু লোকেদের হাতে যাদের একজন ওই সমীরণ, অনেকগুলো বছর ইন্ডিয়ান আর্মিও এখানে পা রাখতে পারেনি, পুলিস তো দুরের কথা। তবে গত দু-বছরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল, সেন্ট্রাল কমব্যাট ফোর্স একটু একটু করে জমি দখল করছিল, আর নকশালরা পিছু হটছিল, মাওপন্থীদের মধ্যেও আত্মসমর্পণের ঢল নেমেছিল, শেষের দিকে পরপর কয়েকটা সিরিয়াস অ্যাসল্টে নকশালদের একেবারে কোমর ভেঙে গেল, সমীরণ যেন কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেল, আর আমার ছেলেরও কোনও হদিশ বের হল না, তবে আমার ছেলে যে ওর কব্জাতেই ছিল, সে বিষয়ে পাকা খবর পেয়েছিলাম। নতুন করে কোমর বাঁধলাম, সমীরণকে খুঁজে বের করবই, প্রচুর টাকা খরচ করে একটা কমব্যাট টিম তৈরি করলাম সমীরণকে ধাওয়া করে শিকার করার জন্য। এক্স আর্মি আর পুলিসের লোক দিয়ে তৈরি দলটার একটাই উদ্দেশ্য ছিল সমীরণকে ট্র্যাক করে আমার ছেলের সন্ধান। কিন্তু প্রতিবারেই সমীরণ পাঁকাল মাছের মতো হাত থেকে ফসকাতে লাগল, কখনো খবর পেতাম সমীরণকে দেখা গেছে আসামের কোনও গ্রামে তো আবার কখনো শুনতাম ঝাড়খণ্ডের কোনও এক মফঃস্বল শহরে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে, শুধু একবারই ওদের লেজের ডগা ধরা গেছিল, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার কাছে আমার ছেলেদের সঙ্গে ওদের মুখোমুখি সংঘাত বেঁধে যায় এতে ওদের একটা লোক গুলি খেয়ে মরলেও সমীরণ আর ওর দলের বাকিরা পালিয়ে যায়। খুনোখুনি করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, সমীরণকে জ্যান্ত ধরার অভিপ্রায়ই ছিল, পুলিশের ঝামেলা এড়াতে এরপর কিছুদিন আমাকে এই ফলো-আপটা বন্ধ রাখতে হল। এরমধ্যে খবর পেলাম কলকাতায় পুলিস এনকাউন্টারে সমীরণের ডেথ হয়েছে, সঙ্গে একটা সাত বছরের বাচ্চাও সেখানে ছিল, সবকিছুই মিলে যাচ্ছিল, আমি ছেলেটির বডি ফ্লুইড জোগাড় করে ডি-এন-এ টেস্ট করে জানলাম আমার খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার আর কোনও প্রয়োজন নেই'। রাজাসাহেব এতটা বলে থামলেন।

ঘরের আবহাওয়া হঠাৎ যেন অতিমাত্রায় বিষণ্ণ হয়ে পরল। কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না, সামান্য পরে রুদ্রপ্রসাদ নৈঃশব্দ ভেঙে বললেন— 'সেসময় চণ্ডের পাথরটা সংগ্রহ করার জন্য আমাকেও এই কেসটায় জড়িয়ে ধরতে হয়েছিল, সেটাতো তুমি জানোই, তখন ভিতর থেকে একটা খবর পেলাম, উড়িষ্যার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, যিনি আবার কার্যক্ষেত্রে একটি রাজপরিবারের সদস্যও বটে ভিক্টিমের ব্যাপারে অতিমাত্রায় উৎসাহী, রাজাসাহেবের খোঁজ পাওয়াটা খুব কঠিন হয়নি, আমি এসে ওনার সঙ্গে দেখা করলাম, আর সঙ্গে সঙ্গে শিকলের আর একটা বৃত্তও খুঁজে পেলাম। রাজাসাহেবের সন্তানকে নিশ্চয়ই ফেরত দিতে পারব না তবে আর কোনও পিতা যাতে এই কারণে সন্তানহারা না হন সে চেষ্টা অবশ্যই করব বলে ওনাকে কথা দিয়েছি, আর রাজাসাহেবও এই চণ্ড আগ্রাসন প্রতিরোধ করার জন্য যেমন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তার তুলনা হয় না, নেপালের রাজপরিবারের সংগ্রহশালা থেকে চণ্ড-বিজয় পুঁথিটা যে দেখার সুযোগ পেয়েছি সেটা শুধু এনার জন্যেই, তা ছাড়া আমাদের এই অভিযানে যেভাবে প্রশাসনের সাহায্য লাগছে তা আমি কিছুতেই ম্যানেজ করতে পারতাম না'। রাজাসাহেব রুদ্রের কথা যেন হাত নাড়িয়ে উড়িয়ে দিয়ে বললেন—'আমার থেকে আপনার অবদান অনেক বেশি মিস্টার মিত্র, আপনি সব জেনেশুনে চুপ করে থাকতে পারতেন, এত বড় ঝুঁকিটা আপনার না নিলেও চলত! কিন্তু আপনি তো বিপদের পরোয়া করেননি, আর হ্যাঁ আমাদের দুজনের থেকেও যদি কেউ মহৎ থাকে তাহলে অবশ্যই এই যুবকটি, এত নিঃস্বার্থ মানুষ সত্যি আগে দেখিনি'। রাজাসাহেব হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে এসে আমার হাতটা চেপে ধরলেন, গাঢ় স্বরে বললেন—'আমার ছেলের অন্তিম সময়ে তুমি তাকে দেখেছ, সে কেমন অবস্থায় ছিল? ওরা কি তার উপর অত্যাচার করত? তুমি যা কিছু দেখেছ আমাকে বলতে দ্বিধা করবে না'। অদ্ভুত পরিস্থিতি! রুদ্রপ্রসাদের দিকে চাইতে বুঝলাম চোখের তারায় উনি কিছু বলার চেষ্টা করছেন, পড়ে নিতে অসুবিধে হল না। রাজাসাহেবের হাতে চাপ দিয়ে বললাম—'ও খুব খারাপ ছিল না, তপন ওর ভালো দেখাশোনা করত আর শুনেছি তার আগে সমীরণের লোকেরাও ওর যত্নে কখনো ত্রুটি করেনি'। রাজাসাহেব কিছুক্ষণ আমার চোখে চোখ রেখে তেমনই দাঁড়িয়ে রইলেন তারপর হঠাৎ উৎকটভাবে হেসে বললেন—'যে প্রশ্নের উত্তর জানা আছে, তা যে কেন বোকার মতো করে ফেলি'? সন্তান শোকাতুর পিতাকে কি ভাষায় সান্ত্বনা দিলে উপশম ঘটবে আমার জানা নেই, চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, রাজাসাহেব খানিক সামলে উঠলেন, বললেন—'ধন্যবাদ অনেকটা সময় দিলেন, ইচ্ছে ছিল দুপুরের লাঞ্চটা একসঙ্গে করি, কিন্তু আপনাদের তো আবার লম্বা রাস্তা পাড়ি দিতে হবে', রুদ্রপ্রসাদ হাতঘড়িতে চোখ রেখে বললেন —'হ্যা আর দেরি করা যাবে না, সূর্যাস্তের আগেই ভগীরথপুরে পৌছতে হবে'।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%