সঞ্জয় ভট্টাচার্য
'দৈনিক জাগরণের' প্রভাসদা শুনে লাফিয়ে উঠলেন—'এটা তোমার কেরিয়ারে কত বড় ব্রেক হতে পারে আন্দাজ করতে পারছ? তা ছাড়া ভেবে দ্যাখ নামকরা সব সংবাদপত্র থাকতে আমাদের কাগজে সমীরনের একসক্লুসিভ ইন্টারভিউ যখন ফলাও করে ছাপা হবে তখন এর ইমপ্যাক্টটা কি হবে! লেগে পড়ো হে'। বললাম—'কিন্তু ওদের একটা শর্ত আছে আমাকে একাই যেতে হবে সঙ্গে ফটোগ্রাফার গেলেও চলবে না'। সম্পাদককে এবার একটু চিন্তিত দেখাল, বললেন—'ডকুমেন্টেশনের বিষয়টা মাথায় রাখবে তপন, ইন্টারভিউটাকে কেউ যেন ফেক বলতে না পারে'। বলে আমার হাতে একগোছা নোট ধরিয়ে রসিদ লিখিয়ে নিলেন, আর আমিও তৈরি হলাম আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য।
যোগেনের ব্যবস্থা মতো হাওড়া থেকে ঢেঙ্কানলের উদ্দেশ্যে ট্রেন ধরে রওনা হওয়া গেল। কেওনঝাড় রোডে নেমে জনৈক সুশীল মহাপাত্রর সঙ্গে দেখা করার কথা। ভদ্রলোক আমার জন্য ষ্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন, বললেন—'রাতে ওদের ক্যুরিয়র আসবে, ততক্ষণ আপনি আমার গেস্ট। খাওয়া-দাওয়া করবেন বিশ্রাম করবেন, আর হ্যাঁ, কেউ জিগ্যেস করলে বলবেন আপনি এখানে ঘুরতে এসেছেন। বুঝতেই পারছেন চারপাশে পুলিশের ফেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে'। সুশীলবাবুর কথা অনুযায়ীই কাজ হল। ভদ্রলোকের বাড়ি ষ্টেশন থেকে মিনিট কুড়ির পথ, ঘোড়ার গাড়ি করে পৌঁছোন গেল, পরে ওনার অনুরোধে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সর্ষের তেল মেখে স্নান সারতে হল তারপর বিউলির ডাল আর পাঁপড় ভাঁজা দিয়ে থালা ভরতি ভাত খেয়ে ঘুম দেওয়ার চেষ্টা করলাম আর একটা সময় ঘুমিয়েও পড়লাম। ঘুম ভাঙতে দেখি সন্ধে নেমে গেছে। সুশীলবাবু কোথাও বেড়িয়েছেন। সুশীলগিন্নি এক পেয়ালা গরম চা দিয়ে গেলেন। এখন আর কিছু করার নেই শুধু রাতের জন্য হাপিত্যেস করে বসে থাকা ছাড়া। একটু পরে ভদ্রলোক বাড়ি ফিরলেন, ফিরেই জমাটি আড্ডা জুড়ে দিলেন, সে আড্ডার সিংহভাগ জুড়েই রইল জঙ্গল আর আদিবাসীদের জীবনযাত্রার কথা, মানুষটি গ্রামের স্কুলের অঙ্ক শিক্ষক, অনেক বাধা বিপত্তির সঙ্গে লড়াই করে আজ এতদূর পৌঁছোতে পেরেছেন, সেজন্য হাবভাবে খানিক আত্মশ্লাঘাও আছে মনে হল, তবে ওইটুকু বাদ দিলে ভদ্রলোক একেবারেই সাদাসিধে আটপৌরে মানুষ। লক্ষ করছিলাম সুশীলবাবু আর সব বিষয়ে কথা বললেও রাজনীতির প্রসঙ্গ একেবারেই এড়িয়ে যাচ্ছেন, আর সমীরণের নাম উঠলেই যেন কুঁকড়ে যাচ্ছেন, বুঝতে পারলাম নেহাত দায়ে ঠেকেই ভদ্রলোককে কলকাতার রিপোর্টার আর মাওবাদি নেতার মাঝে স্যান্ডুইচ হতে হয়েছে। নকশাল রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনও যোগ এর নেই। এরকম একজন নিপাট ভালো মানুষের বাড়িতে এইভাবে উপদ্রব করার জন্য লজ্জিত হয়ে পড়লাম। যদিও সুশীলবাবু ওসব কথা কানেই তুললেন না। বললেন—'রাখুন তো মশাই, তাও অনেকদিন পর একজন শহুরে মানুষের সঙ্গে গল্পগুজব হল, বাইরের দুনিয়ার ফার্স্ট-হ্যান্ড কিছু খবর তো পেলাম, আর আমরা তো এই জঙ্গল দেশের বাইরেই যেতে পারি না, আমাদের এখন জংলি বলাই সাজে'।
রাত ন-টা নাগাদ ভিতর থেকে ডিনারের ডাক পড়ল। দাওয়ায় বসে সুশীলবাবুর সঙ্গে রুটি দিয়ে কুমড়োর ঘ্যাট চিবুচ্ছি সুশীলবাবু বললেন —'তৈরি থাকবেন ওরা বারোটা নাগাদ আসবে'। নৈশাহার সাঙ্গ হতে সুশীলবাবু বিদায় নিয়ে অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ালেন আর আমিও আমার জন্য বরাদ্দ ঘরটায় গিয়ে অপেক্ষায় বসলাম। পরের কয়েকটা ঘন্টা ঝিঁঝিঁর ডাক শুনে আর ঘড়ির দিকে অধৈর্যভাবে চাইতে চাইতে সময় কাটতে লাগল। প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ আমার সজাগ কানে সদর দরজায় সাবধানী টোকার আওয়াজ ধরা পড়ল। বুঝলাম আমার বন্ধুরা এসে গিয়েছে। বাইরে একটা শশব্যস্ত পায়ের আওয়াজ, তারপর ছিটকিনি খোলার শব্দ। সামান্য বিরতির পর পায়ের শব্দটা এবার এই ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। দরজার বাইরে সুশীলবাবু চাপা স্বরে বললেন —'তপনবাবু একবার বাইরে আসবেন'। তৈরিই ছিলাম, কাধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে বেড়িয়ে এলাম। বাড়ির প্রশস্ত উঠোনটায় তখন দুজন আগুন্তুকের আবির্ভাব হয়েছে। লোক দুটির পরনে খাকি প্যান্ট আর হাওয়াই শার্ট, দুজনেরই মুখ গামছা দিয়ে আড়াআড়িভাবে ঢেকে রাখা। সুশীলবাবুকে দেখলাম তঠস্থভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। লোকগুলো ওড়িয়া আর ভাঙা বাংলা মিশিয়ে যা বলল তাতে মাথা ঘুরে গেল। বিশেষ অসুবিধার জন্য সমীরণ ইন্টারভিউ বাতিল করেছে, এ বিষয়ে আর দ্বিতীয় কথা হবে না। লোকগুলোর শরীরী ভাষা আর বাচনভঙ্গিতে স্পষ্ট এরা কথা কানে তোলার পাত্র নয়, ওরা আর কালক্ষেপ না করে ঠান্ডা স্বরে বলে গেল, কাজ যখন হল না তখন শুধুমুধু এখানে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না, আগামীকাল সকাল আটটা চল্লিশের প্যাসেঞ্জারটা ধরলে বারোটার মধ্যে ভুবনেশ্বর পৌঁছোন যাবে। আর ভুবনেশ্বর থেকে কলকাতার গাড়ি পাওয়াটা কোনও ব্যাপার নয়। বুঝলাম এটা পরামর্শের মোড়কে পোরা আদেশের নামান্তর যার অন্যথা করলে এই জঙ্গল রাজ্যে আমার জীবনের মূল্য আর কানাকড়িও থাকবে না।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম, এর ফল আমার জন্য কতটা খারাপ হতে পারে সেটা শুধু আমিই জানি। প্রভাসদা আমার ওপর যে আস্থা রেখেছেন সেটা নষ্ট হতে বাধ্য কারণ ইন্টারভিউয়ের প্রস্তাবটা আমিই হাজির করেছিলাম। এরপর কি উনি আর আমার ওপর ভরসা রাখতে পারবেন? আমার অবস্থা দেখে বোধহয় সুশীলবাবুর দয়া হল। গলার স্বর যথাসম্ভব নামিয়ে বললেন—'সমীরণ যখন দেখা করবে না বলেছে তখন কারও সাধ্য নেই ওর ধারে কাছে যেতে পারে, তবে আপনি এতদূর এসে খালি হাতে ফেরত যাবেন। একটা খবরের সন্ধান আমি আপনাকে দিতে পারি যদি আপনার আগ্রহ থাকে'? সমীরণের ইন্টারভিউ করার চেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ এই মুহূর্তে আমার কাছে আর কিছুই নেই তাও সুশীলবাবুর কথায় সাড়া দিলাম—'কি ধরনের খবর'? সুশীলবাবু গলার স্বর আরও নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন—'এখান থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে জঙ্গলের মধ্যে ভগীরথপুর গ্রামে নরবলি হয়'। শুনে চমকে উঠলাম! লোকটা বলে কি?—'বাবু রান্না হয়ে গেছে'। কর্কশ কণ্ঠস্বরে তপনের কথায় ছেঁদ পড়ল। বৃন্দাবন এসে হাজির হয়েছে। তপন খাট থেকে উঠে পড়ল—'খেয়ে নেওয়া যাক'।
—'কিন্তু তারপর কি হল'?
—'সেকথায় আসছি, ডিনারের পরে'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন