ঊনত্রিংশ অধ্যায়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

সকাল আটটা থেকে আকাশ কালো করে বৃষ্টি শুরু হল। যাকে বলে একেবারে মুষলধারে, সেই সঙ্গে প্রচণ্ড ঝড়ের বেগে বড় বড় গাছের ডালগুলো এমনভাবে নুয়ে পড়ে আছাড়ি বিছারি খেতে শুরু করল, ভয় হচ্ছিল তাবুর উপর না ভেঙে পড়ে। গাছের শাখা-প্রশাখায় বাসা বাঁধা পাখি আর বাঁদরগুলো ইতিমধ্যে দারুণ ত্রাসে প্রচণ্ড কোলাহল শুরু করে দিয়েছে। বাবুলালের টিলার ঠিক সামনেটায় একটা ঝাঁকড়া গাছের ডাল মট মট করে ভেঙে পরল। আমাদের চমকে দিয়ে একটা বাঁদর ছুটে এসে তাবুর মধ্যে ঢুকে একটা কোণায় থরথর করে কাঁপতে লাগল, মা বাঁদরের কোলে একরত্তি শিশু, লোকগুলোর মধ্যে একজন হ্যাট হ্যাট করে বানরটাকে তাড়াতে যাচ্ছিল রুদ্রপ্রসাদ আপত্তি করলেন—'আহা থাকুক না, দেখছ না কোলে বাচ্চা'। দিবাকরের ইঙ্গিতে লোকটা ক্ষান্ত হল। এবারে জলের স্রোত কূল কূল করে তাবুর মধ্যে ঢুকতে শুরু করল, একসময় আমাদের গোড়ালি অবধি ডুবে গেল, দমকা হাওয়ার দাপটে যেভাবে বৃষ্টির ছাঁট আসছিল তাতে তাবুর ভিতরে থেকেও আমরা আপাদমস্তক ভিজেই গেলাম। তাবুর দরজার কাপড় আগেই ছিড়ে গেছে, বাইরে চোখ পড়তে যে দৃশ্য দেখলাম তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত! জলের বিরামহীন ধারা ধূসর একটা পর্দা তৈরি করে চোখের সামনে থেকে বাইরের জগৎকে আলাদা করে দিয়েছে। অদ্ভুত অভিজ্ঞতা! প্রকৃতির এই ভয়ংকর রুদ্ররূপ বোধহয় ভাগ্যে থাকলেই দেখা যায়। দিবাকর দুই স্যাঙাতসমেত তারস্বরে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর কাছে লোভনীয় সব মানসিকের প্রস্তাব পাঠাতে শুরু করল। আর তৃতীয় স্যাঙাত হাঁটু গেড়ে জলে থইথই করা মেঝেতে ক্রমাগত মাথা ঠুকে কাকে যে ডেকে চলেছে কে জানে? আর যাকেই ডাকুক, নিশ্চয়ই সমুদ্র দেবতাকে ডাকছে না বলেই আমার বিশ্বাস।

তাবুটা আর দুর্যোগের চাপ নিতে পারছিল না, এমনভাবে দুলছিল মনে হচ্ছিল ওটা বুঝি এখুনি ভেঙে পড়বে, হঠাৎ দুটো জিনিস একসঙ্গে ঘটে গেল। তাঁবুর কাপড়ের ছাদটা ফড়ফড় করে ছিড়ে দু-ভাগ হয়ে গেল, তার সঙ্গে সঙ্গে লোহার স্ট্যান্ডগুলোও প্রচণ্ড ঝন ঝন শব্দ তুলে কাঁপতে লাগল, ওই রডগুলো যদি বর্শার মতো গায়ে বিঁধে যায় তাহলে আর দেখতে হচ্ছে না, হুরমুড়িয়ে বাইরে বেড়িয়ে এসে আমরা এবার খোলা মাঠের মধ্যেই ভিজতে শুরু করলাম। খোলা আকাশের নীচে বৃষ্টির ধারালো ফোঁটাগুলো যেন কাঁটার মতো গায়ে ফুটতে লাগল।

বৃষ্টির বেগ একসময় কমে এল, যেমন আকস্মিক ভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনই শেষ হয়ে গেল। কনঁকনে ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকি লেগে যাচ্ছিল, গায়ের জামা, গেঞ্জি, সোয়েটার সব ভিজে একেবারে এঁকসা হয়ে গেছে। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'দিবাকর এখুনি আগুন জ্বালার ব্যবস্থা করতে হবে নাহলে এতগুলো লোক সব নিউমোনিয়ায় মারা পড়বে'। দ্বিতীয় তাবুটা ঝড়ে ভেঙেচুরে তুবড়ে গেলেও কিছু কাঠ এখনও অবশিষ্ট রয়ে গেছে দেখা গেল, তার থেকে দরকার মতো বের করে একটা অগ্নিকুণ্ড বানানো হল, কিন্তু ভিজে কাঠ কি সহজে জ্বলে! অবশেষে ওই তাবু থেকেই এক বোতল কেরোসিন পাওয়া গেল, এবারে কোনোক্রমে আগুনটা ধরানো গেল। সেঁক নিতে নিতে চারপাশে লক্ষ করে দেখলাম, এই একঘণ্টার বৃষ্টিতেই বেশ জল জাম গেছে, আর এই হঠাৎ বৃষ্টিটার জন্যই হয়ত সকাল ন-টাতেই অবিশ্রান্তভাবে ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের কোরাস শুরু হয়ে গেল। দিবাকর গায়ের টি-শার্ট খুলে নিঙড়াতে নিঙড়াতে বলল—'এমন বিদঘুটে বৃষ্টি আগে কখনো দেখিনি, তা ছাড়া এই জানুয়ারি মাসে'! আমাদের থেকে খানিকটা দূরে বসে গুঙ্গা রাশি রাশি দড়ি নিয়ে কিসব বাঁধাছাঁদা করছে দেখলাম। আগুনের তাপে সবার জামাকাপড় মোটামুটি শুকিয়ে এসেছে, দিবাকর বলল—'চলুন মিত্রবাবু, বেড়িয়ে পরা যাক, অনেকটা হাঁটতে হবে, প্রায় বারো কিলোমিটার রাস্তা'। রুদ্রপ্রসাদ ভ্রু তুলে বললেন—'তুমি ঠিক জানো? পথ কিন্তু আট কিলোমিটার, বারো নয়'।

—'উঁহু, আপনারা যে রাস্তা দিয়ে এসেছেন সেখান দিয়ে যাচ্ছি না, আর্মির লোকেরা ওখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজর রাখতে পারে, আমরা যাব সূতা নদীর পশ্চিম দিকে, একেবারে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, রাস্তাটা সুবিধের নয়! কিন্তু সেফ, হঠাৎ অ্যাটাক হলে অনেক হাইড আউট পাওয়া যাবে'। দিবাকর এবার চাদু সম্বোধন করে যে লোকটাকে ডাকল সে এসে বিনা বাক্যব্যয়ে রুদ্রের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল, রুদ্রপ্রসাদ বিরক্ত হয়ে বললেন—'এ আবার কি ব্যাপার'? দিবাকর বলল—'একটু সার্চ হবে মিত্রবাবু, বুঝতেই পারছেন, রিস্ক নেওয়া যাবে না'। রুদ্রপ্রসাদের পকেট থেকে যে মানিব্যাগটা বের হল তাতে একগাছা নোট ছিল সেগুলো হস্তগত করে দিবাকর নিজের পকেটে পুরে ডেবিট ক্রেডিট কার্ডগুলো জলকাদার মধ্যে ফেলে দিল। রুদ্রপ্রসাদ শ্লেষের স্বরে বললেন—'যে জিনিস খুঁজছিলে সেটা পেয়েছ তো'? দিবাকর উত্তর না দিয়ে সহকারিকে ইঙ্গিত করতে সে এবার আমার পকেট ঘাটতে শুরু করল, প্রথমে যেটা বের হল সেটা আর কিছু নয়, ভেলভেটের বাক্সের মধ্যে রাখা চণ্ড রাজার পাথরটা, ভ্রু কুঁচকে দিবাকর বলল —'এটা কি রে'? বললাম—'এমনি রাস্তায় পড়েছিল, কুড়িয়ে নিয়েছি', দিবাকর পাথরটা নিয়ে দুবার লোফালুফি করে ফের আমার পকেটেই রেখে দিল, এবার অন্য পকেট থেকে বের হল সরবিট্রেটের শিশি। শিশিটা ঝাঁকিয়ে দিবাকর জিগ্যেস করল—'এটা কি'?

—'ওষুধ আমার সঙ্গেই থাকে'। শিশির উপরের ঢাকনাটা খুলে দিবাকর প্রথমে খানিক শুঁকে দেখল তারপর হঠাৎ ট্যাবলেট সমেত শিশিটা একটা বুনো ঝোপের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিল। আমি প্রতিবাদ করে বললাম—'ওষুধটা ফেললে কেন, ওটা আমার সঙ্গে থাকলে কি অসুবিধে হবে'? দিবাকর উত্তরে মুখ খারাপ করে একটা বিশ্রী গালাগালি দিল, আমি প্রত্যুত্তর করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে রুদ্রপ্রসাদ নিষেধ করলেন।

গুঙ্গা কয়েক গাছা দড়ি হাতে হাজির হল। দিবাকর বলল—'মিত্রবাবু একটু কো-অপারেট করতে হবে যে, আপনাদের হাত দুটো বাঁধতে হচ্ছে'। —'কো-অপারেট তো করছি তাও এমন ব্যবহার করছ'? দিবাকর হেসে বলল—'সোনা না পাওয়া অবধি আমি কোনও রিস্ক নিতে পারি না, তা ছাড়া সরকারি অফিসারদের কখনো বিশ্বাস করতে নেই'। গুঙ্গা আমাদের দু-হাতের কবজি একগাছি দড়ি দিয়ে বেঁধে মাঝখানে একটা লম্বা ঘের রেখে দিল, অনেকটা হ্যান্ডকাপের মতো, তবে তেমন শক্ত করে বাঁধল না, প্রয়োজনে হাত কিছুটা ব্যবহার করা যাবে, আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে নিরুপায় আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। রুদ্রপ্রসাদ হতাশ কণ্ঠে বললেন—'তোমাকে বলে রাখি আমি সরকারি চাকুরে নই'। দিবাকর হাসল কোনও উত্তর দিল না। গুঙ্গা এবারে একটা বিশেষ পদ্ধতিতে পাকানো দড়ি মুখের সামনে ঝোলাতে লাগল, অনেকটা ফাঁসির দড়ির মতো, প্রায় চার ফুট লম্বা দড়ির একটা প্রান্তে কুণ্ডলী পাকিয়ে একটা বৃত্ত তৈরি করা হয়েছে, অন্য প্রান্তটা সোজা লাইনে নীচের দিকে ঝুলছে। রুদ্রপ্রসাদ ভ্রু তুলে বললেন—'আমাদের ফাঁসি দেওয়ার মতলব করছ নাকি'? দিবাকর বিনয়ের অবতারের মতো জিভ কেঁটে বলল—'ছিঃ ছিঃ কি যে বলেন? জাস্ট একটু বাড়তি সুরক্ষা'। গুঙ্গা ফাঁসির দড়িগুলো আমার আর রুদ্রপ্রসাদের গলায় পরিয়ে দিল। রুদ্রপ্রসাদ রাগত স্বরে চিৎকার করলেন—'তুমি দেখছি একেবারেই অমানুষ, হাতে বন্দুক আছে বলে আমাদের এভাবে কুকুরের মতো টেনে নিয়ে যাবে'। দিবাকর চটল না, ঠাণ্ডা স্বরে বলল—'মিত্রবাবু কাজের কথা শুনে নিন, এটা একটা ম্যাজিক নট, গুঙ্গা বাঁধতে জানে, আপনারা যদি দৌড়োনোর চেষ্টা করেন, তখন টান পরলে এই নট সোজা গলায় আটকে যাবে, খোলার কোনও রাস্তা থাকবে না, তাই কোনওরকম চালাকি না করে শান্ত ছেলের মতো, সোনা কোথায় আছে দেখিয়ে দিন তারপর আপনাদের ছুটি'। দিবাকরের নির্দেশে এবারে আমাদের যাত্রা শুরু হল।

ঘন গাছপালার মধ্যে দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। পথ বলতে যেটা আছে সেটা বোধহয় মানুষের পায়ের চাপে মাটির উপর যে সমানতা তৈরি হয় সেটুকুই, আদিবাসীরা বোধহয় এদিকে কাঠ কুড়াতে বা মধুর সন্ধানে যাতায়াত করে, যদিও এইমুহূর্তে তার অবস্থাও শোচনীয়। নরম কাদামাটিতে কখনো গোড়ালি অবধি ডুবে যাচ্ছিল তো কখনো প্রায় হাঁটু। এই দলে সবার আগে দিবাকর চলেছে, কাঁধে ঝোলানো রাইফেল আর হাতে আমাদের সঙ্গে নিয়ে আসা বিস্কুটের প্যাকেট। প্যাকেট খুলে দিবাকর গোছা গোছা বিস্কুট খেতে লাগল, মাঝে মধ্যে সঙ্গীদেরও একটা-দুটো করে দিতে লাগল, একসময় দু-প্যাকেট বিস্কুট সাবাড় করে বিশ্রী ঢেঁকুর তুলল। আমার গলায় যে ফাঁসটা ঝোলানো রয়েছে তার অন্যভাগটা গুঙ্গার হাতে ধরা, অনভ্যস্ত পথে চলতে সামান্য পিছিয়ে পরলেই, গুঙ্গা দড়ি ধরে বিশ্রী টান দিচ্ছিল যেন গোরু বাছুর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নিজেকে পশুর অধম মনে হচ্ছিল, জীবনে এত হত্যোদম আগে কখনো বোধ করিনি। এই লোকগুলো যাচ্ছেতাই রকমের বাজে, আর ওই গুঙ্গা এদের মধ্যে সবথেকে অভদ্র, যদি একটা সুযোগ পাই তাহলে এর শোধ তুলে ছাড়ব। রুদ্রপ্রসাদের গলার দড়ি দিবাকরের আর একজনের স্যাঙাতের হাতে ধরা, রুদ্রের থমথমে মুখের দিকে চেয়ে মনে হল সে যেন অপমান আর লাঞ্ছনার এই ওভারডোজ সহ্য করতে পারছে না। প্রায় চল্লিশ মিনিট এভাবে জলকাদা ঘেঁটে একটা সরু খালের সামনে এসে পৌঁছোলাম, এটাই বোধহয় সূতা নদী। নদীর পারে একটা উঁচু মতো টিলার সামনে দিবাকর থামতে বলল। দিবাকর রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল—'দশ মিনিট রেস্ট নেওয়া যাক, কি বলেন'? রুদ্রপ্রসাদ উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। রুদ্রের স্যাঙাতেরা আমাদের দড়ি ছেড়ে দিতে আমরা টিলার উপর গিয়ে বসলাম, দিবাকর আমাদের পাশে বসে রসিকতার ছলে বলল—'মিত্রবাবু দুর্যোগটা না হলে আজকে দারুণ একটা জিনিস আপনাদের খাওয়াতাম, কি হতে পারে বলুন তো'? রুদ্রপ্রসাদ কথার উত্তর দিলেন না দেখে দিবাকরই ফের বলল —'হরিণের মাংস! তোফা খেতে, আমি তো দু-মাস ধরে ওই খেয়েই আছি'। রুদ্রপ্রসাদ শ্লেষের স্বরে বললেন—'কতগুলো হরিণ মেরেছ ভাই, এযাবৎ'?

—'জানিনা, গুনে দেখিনি'।

—'হরিণ মারা তো নিষিদ্ধ', একটু থেমে রুদ্র ফের বললেন 'অবশ্য তুমি জীবনে কোন কাজটাই বা আইন মোতাবেক করেছ'। দিবাকর যেন দারুণ মজার একটা কথা শুনেছে এমনভাবে হেসে উঠল—'আইন মোতাবেক! হাঃ হাঃ'।

আবার পথ চলা শুরু হল, রাইফেলটা একজন সঙ্গীর হাতে চালান করে দিবাকর হাঁসুয়া দিয়ে ডালপালা কাটতে কাটতে যাচ্ছিল, কি মনে করে পিছিয়ে এসে রুদ্রপ্রসাদকে বলল—'মিত্র বাবু কতটা সোনা ওখানে থাকতে পারে মনে হয় আপনার'। রুদ্রপ্রসাদ যেন রহস্য করে বললেন—'কয়েক টন তো হবেই, গেলেই দেখতে পাবে'।

—'শুধু সোনা না অন্য কিছুও, কি বলেন'?

—'অনেক কিছু, রাজারা কি শুধু সোনা জমাত, হিরে জহরতও নিশ্চয়ই প্রচুর পরিমাণে থাকবে!'

দিবাকর বেশ খুশি হয়ে বলল—'মিত্রবাবু গুপ্তধন পেলে, আজকেই কিন্তু আপনাকে ছাড়ছি না, কালকে পেটপুরে হরিণের মাংস খাইয়ে তবেই যেতে দেব'।

—'ও'।

—'আরে আমাকেও তো একটু সেবার সুযোগ দেবেন! নাকি? ওই যে আপনারা কি বলেন না অতিথি দেবঃ ভবঃ'।

—'তা ভাই তুমি কি দেবতার সেবা এভাবেই করো নাকি? গলায় দড়ি বেঁধে টানতে টানতে'।

—'কি করব বলুন সরকারি লোককে তো আর বিশ্বাস করতে পারি না'।

—'তোমার মাথায় কি কথা ঢোকে না? যাকগে আর বলে লাভ নেই'। দিবাকরের মুখে কুটিল হাসি খেলে গেল, বলল—'বিপদে পরলে ওসব সবাই চেপে যায়'। নদীর পার ছেড়ে দস্যুরা আমাদের নিয়ে আরও ঘন জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করল, এখানকার গাছগুলো যেন গায়ে গায়ে লেগে আছে, চলতে গেলে ডালপালার সঙ্গে ঠোক্কর লাগছে, এদিককার পাতাগুলো যেমন খসখসে তেমনই রুক্ষ, শরিরের যেখানেই ছোঁয়া লাগছে জ্বালা ধরে যাচ্ছে, চুলকে চুলকে ফোস্কা পড়ার অবস্থা, অবশ্য চুলকানোর সুযোগও বিশেষ পাওয়া যাচ্ছে না, একটু দেরি হলেই গুঙ্গা দড়ি ধরে হ্যাঁচকা টানছে। অন্তত দেড়-দু কিলোমিটার এভাবে চলার পর এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছোলাম যেখানে জঙ্গল কেটে দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, মাঝখানে একটা জলাভূমির ওপারে আবার নিবিড় অরণ্য।

দিবাকরের হুকুমে এবার জলায় নামতে হল। জলায় জলের স্তর নেহাত কম নয়, প্রায় বুক অবধি কনকনে ঠাণ্ডা নোংরা জল ঠেলে আমরা এগোতে লাগলাম। দিবাকর আগে আগে যাচ্ছে, একটা হাঁসুয়া দিয়ে জলে আঘাত করে কচুরিপানা সরাতে সরাতে, তাও দলা দলা কচুরিপানা এসে গায়ে মুখে সর্বত্র জড়িয়ে যাচ্ছে, নর্দমার মতো পচা জলে একধরনের পোকার কামড়ে অস্বস্তি যেন শতগুণে বেড়ে গেল, মনে হচ্ছিল এবার বোধহয় উন্মাদই হয়ে যাব। প্রায় কুড়ি মিনিটের নরক যন্ত্রণার অবশেষে অবসান ঘটল, আমরা জলা ডিঙিয়ে এপারে চলে এলাম। গভীর অরণ্যের বুক চিড়ে ফের পথ চলা, দিবাকর আগে আগে চলেছে, মাঝখানে আমাদের দুজনের গলার দড়ি ধরে গুঙ্গা আর অন্য লোকটা, সবার পিছনে রাম-দা হাতে যে লোকটা, তার নাম কানহাইয়া। রুদ্রপ্রসাদের মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম সেখানে এখন ক্রোধের পরিবর্তে হতাশা আর অবসাদের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে, তবে কি উনিও সব আশা হারিয়ে ফেলেছেন, এতক্ষণ যেটুকু ভরসা পাচ্ছিলাম রুদ্রকে দেখেই, এবারে আমি যেন আরও দমে গেলাম। যেতে যেতে দিবাকর হঠাৎ থেমে গেল, হাত তুলে থামবার সংকেত করল। পিছনে আমরা পাঁচজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বনের মধ্যে যতদূর দেখা যাচ্ছে নিঝুম, নিস্তব্ধ, দিবাকর কান খাঁড়া করে যেন কিছু শোনার চেষ্টা করল, দলের বাকিরা ঘাবড়ে যাওয়া দৃষ্টে এদিক- ওদিক চাইতে লাগল, নাম না জানা একটা পাখির ডাক, গাছের আড়াল থেকে ভেসে আসছিল, সেটা না থাকলে এতক্ষণে এটাকে মৃতের জঙ্গল বলে বোধ হত। পাঁচ মিনিট পরে দিবাকর হাত নামাল, সংকেত শেষ, আবার যাত্রা শুরু হল, লতা-গুল্ম আর পচে যাওয়া রাশি রাশি পাতা মাড়িয়ে পথ চলা, কারও মুখে আর কোনও কথা নেই, মনে মনে ভাবছি রাত আটটার পর আর্মির লোকেরা যখন এলাকার দখল নেবে তখন হয়তো আমাদের ক্ষতবিক্ষত তাজা লাশগুলো উদ্ধার করবে, এই গভীর জঙ্গলে ডাকাতের হাতে মরাটাই বোধহয় আমার নিয়তি।

আমার চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে গেল কানের কাছে একটা আর্তচিৎকারে, মুহূর্তের জন্য কেউ যেন মরণ আর্তনাদ করেই স্তব্ধ হয়ে গেল। চকিতে পিছন ঘুরে যা দেখলাম তাতে গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। পিছনে থাকা কানহাইয়ার পায়ের চপ্পলের একটা পাটি খুলে গড়াগড়ি খাচ্ছে আর সে নিজে? শুধু তার কোমরের নীচের অংশটাই দেখা যাচ্ছে, যেটা অতি দ্রুত একটা ঝোপের পিছনে মিলিয়ে গেল, দিবাকর রাইফেল থেকে ফায়ার করতে করতে সেদিকে ছুটে গেল, গুঙ্গা আর অন্য লোকটা ওদের নেতাকে অনুসরণ করল। দড়ির ফাঁসে টান পড়তে আমরা দুজনও ছুটতে বাধ্য হলাম। কুড়ি হাত দূরে ঝোপটার পিছনে কানহাইয়া জখম অবস্থায় পরে রয়েছে! গুলির শব্দে ভয় পেয়ে বাঘ অবশ্য শিকার ছেড়েই পালিয়েছে, কানহাইয়ার নিস্তেজ দেহে এখনো প্রাণ আছে, গলার খাঁজে ক্ষতস্থান থেকে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। হিক্কার তুলতে তুলতে আহত লোকটার বুকটা যেন হাঁপরের মতো ওঠানামা করছিল। দিবাকর আর দুই সঙ্গী কিছুক্ষণ নীরব থেকে তাদের সহকর্মীকে শেষ বিদায় জানাল, তারপর রাইফেলের একটা গুলিতে কানহাইয়ার জীবন যন্ত্রণার পরিসমাপ্তি ঘটল।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%