সঞ্জয় ভট্টাচার্য
এতোটা বলে রুদ্রপ্রসাদ একটু থামলেন, তারপরে কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন —'পরের কয়েকটা দিন আমি মেতে উঠলাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিলালিপির টুকরো গুলোকে সঠিক ক্রমানুযায়ী জুড়ে খন্ডচিত্র-টাকে একটা স্পষ্ট রুপ দেওয়ার চেষ্টায়, সারাদিন কলেজের কাজে ব্যাস্ত থাকার পর সন্ধ্যে হলে কোয়ার্টারে আমার ঘরের দরজা, জানলা বন্ধ করে এই কাজ চলত, একাজে সমীরণও আমার সাথে হাত লাগাত, অনেক রাত অবধি কাজ করার পর ভোরের দিকে আমরা কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে নিতাম, হাজার বছর অযত্নে পরে থাকার ফলে লিপির অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছিল, তবে যেটুকু উদ্ধার করা গেছিল তাতেই ইতিহাসে লুকিয়ে রাখা একটা অধ্যায়র ওপর থেকে পলি সরে গেল। লিপিগুলো সোমবংশীয় শাসক প্রথম জন্মেজয়ের সময়কালের, খুব সম্ভবত ৯০০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে। এতে শিবদত্ত নামে একজন রাজার বিষয়ে উল্লেখ করা রয়েছে, আমার বইয়ে তুমি এর সম্মন্দে পড়েছ তবে সেটা জাস্ট ফ্র্যাকসান অফ দি ইন্সিডেন্ট, আসল বিষয়টা লেখা অনুচিত বিবেচনা করে এড়িয়ে গেছিলাম। যাইহোক মোদ্দা কথায় আসি, শিবদত্তের সঙ্গে গভীর জঙ্গলের মধ্যে একজন সাধুর আলাপ পরিচয় ঘটল, সাধুর অলৌকিক শক্তির পরিচয় পেয়ে সম্রাট তাকে নিজের রাজধানী সুবর্নপুরে এনে হাজির করলেন, রাজার সেসময় রীতিমতো কোনঠাসা অবস্থা, ঘরে বাইরে শত্রুদের মোকাবিলা করতে করতে পায়ের তলার জমি একটু একটু করে সরে যেতে বসেছে। সাধু বলভদ্র রাজাকে ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেন, বিনিময়ে রাজা প্রাসাদ সংলগ্ন জমিতে বিশাল চণ্ডমন্দির গড়ে দিলেন, এখানে অবশ্য আপত্তি এলো রাজপরিবারের ভিতর থেকেই, বিশেষ করে রাজগুরু অনঙ্গদেব যাকে তাম্রলিপিতে বর্ণনা করা হয়েছে মহাজ্ঞানী রুপে তিনি এই বিদ্যা সাধনের ক্ষতিকারক দিকটা রাজাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও ওসব আপ্তবাক্যে কান দেবার মতো সদিচ্ছা সম্রাটের সেসময় একদমই ছিল না। অনঙ্গদেব ক্রমশ সম্রাটের বিষনজরে পরে যাচ্ছিলেন শেষে এমন একটা দিন এলো যখন বলভদ্রের মন্ত্রণায় রাজা শিবদত্ত গুরুর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করলেন, অনঙ্গদেবের মুণ্ডচ্ছেদ করে জঙ্গলের মধ্যে পুতে দেওয়া হল, অনঙ্গদেব অবশ্য বুদ্ধিমান ব্যাক্তি ছিলেন, আগেভাগেই রাজার মতিগতি আঁচ করে ফেলেছিলেন, তাই সময় থাকতেই দরকারি কাজটা সেরে ফেললেন, চণ্ড বিনাশ পদ্ধতি একটা পুঁথিতে বিশদে লিপিবদ্ধ করে নিজের বিশ্বস্ত লোকের হাত দিয়ে তাঁর অন্যতম শিষ্য নেপাল রাজের দরবারে পাঠিয়ে দিলেন, সেই পুঁথি কিন্তু এখনো আজকের দিনেও নেপালরাজের ভল্টে রাখা আছে, আমি নিজে গিয়ে সেটা স্টাডি করে এসেছি, যদিও পুঁথির কিছুটা অংশ যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে তাহলেও চণ্ডের মোকাবিলা করার অন্তত একটা রাস্তা খুঁজে পাওয়া গেছে। যাইহোক অনঙ্গদেবের মৃত্যুর পর রাজার কাজে বাঁধা দেওয়ার মতো আর কেউ রইল না, এবার বলভদ্রের পরামর্শে রাজ পরিবারের একটি শিশুকে বলপুর্বক চণ্ড মন্দিরের অন্ধকার কুঠুরির খাঁচার মধ্যে বন্দি করে রাখা হল, বলভদ্র ছাড়া আর কারও অধিকার রইল না ছেলেটির কাছে যাবার। শিশুটি জীবনে না শুনল স্নেহভরা মিষ্টি আদরের কোন ডাক, না পেল মমতার একফোঁটা ছোঁয়া, সে শুধু দেখল বলভদ্রের রুক্ষ নির্দয় মুখ, একসময় ছেলেটির বয়স সাত পুর্ন হতে তাকে চণ্ডের উদ্দেশ্যে বলি দিয়ে রাজা শিবদত্ত চণ্ডের শক্তির অধিকারী হলেন। পরবর্তি সময়ে শিবদত্তের পরাক্রমে সমগ্র পুর্ব এবং মধ্য ভারত কেঁপে উঠেছিল। বিরুদ্ধ সব শক্তিকে পরাস্ত করে রাজা ক্ষমতার মিনারে প্রতিষ্ঠিত হলেন। প্রতিবেশী রাজ্যের শাসকরা বশ্যতা স্বীকার করে কোনোক্রমে মাথা বাচাল। অহঙ্কারে মত্ত শিবদত্তের উগ্রতার পরিমান দিন দিন বেড়েই চলেছিল, মতের সামান্য অমিলও দমন হতো অতি কঠোর শাসনে, খেয়াল খুশিমতো নির্দয় অত্যাচার চলত প্রজাদের ওপর, পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছিল বলভদ্রের দৌরাত্ম্য, নিজের সামনে অন্য কাউকে সে মনুষ্যপদবাচ্য বলেই গণ্য করত না। শিবদত্তের শাসনের জাঁতাকলে পরে ধনি-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সকলের নাভিশ্বাস উঠতে আর বাকি ছিল না। একদিন হঠাৎ এই শিবদত্তের মৃত্যু ঘটল। এরপর যতটুকু জানা গেছে রাজপদের অধিকারী হলেন জন্মেজয়, প্রথম কাজ যেটা তিনি করেছিলেন, তা ওই বলভদ্রকে খতম করা, পরপরই চণ্ডমন্দির ধ্বংস করে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হল। তবে চণ্ডের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা শিলাটিকে নষ্ট করার সাহস বোধহয় সম্রাটের হয়নি। সেই পাথর আর এই ঘটনার যাবতীয় বিবরণ শিলালিপিতে অঙ্কিত করে ভগিরথপুরের আদি মন্দিরে পাঠিয়ে দেওয়া হল যেখান থেকে একদিন সেটা এই রাজধানীতে এসেছিল। এরপর প্রায় এগারশ বছরের পলি জমে ইতিহাসের পাতা থেকে রাজা শিবদত্ত আর তার আরাধ্য দুটোই যে কখন মুছে গেল, সে খোঁজ আর কেউ রাখেনি'।
আমি এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলাম, এবার বললাম —'বেশ ইন্টারেস্টিং সন্দেহ নেই, কিন্তু এই চণ্ডটি আবার কেমন দেবতা? আগে তো কখনো শুনেছি মনে পরছে না'। রুদ্রপ্রসাদ বললেন —'হিন্দু দেবতা নন, তিব্বতি বৌদ্ধ বা ওইধরনের কিছু, উঁহুঃ ইনি তাও নন, যতদূর বোঝা গেছে ইনি একেবারেই অনার্য, ভারতবর্ষে আর্যদের আগমনের পুর্বেই এর উৎপত্তি, আর্য সভ্যতার প্রভাবে আদিম বাসিন্দাদের ধর্ম আর সংস্কৃতির অনেকটাই বিস্মৃতির অন্ধকারে বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু আজকের দিনেও এক শ্রেণীর আদিবাসীরা চণ্ডকে দেবতা বলে মান্য করে, তবে এই দেবতার প্রকৃতি কিন্তু সাত্ত্বিক নয় উল্টে ঘোর তামসীক, আদিবাসীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, চণ্ড হলেন নরকের অবিসংবাদী রাজা যিনি পৃথিবী আর নরকের মাঝের দরজাটাকে নিজের শক্তির দ্বারা বন্ধ রাখেন। দেবতাটির রক্তপিপাসা লাগামছাড়া, একবার এর জাগরণ হলে অসংখ্য মানুষের দুর্দশার কারন হতে বাধ্য, এর উপস্থিতির কুপ্রভাবে ব্যাধি, মৃত্যু হিংস্রতার বৃদ্ধি আর মনুষত্যের নাশ অবশ্যম্ভাবী। আজকের দিনে চণ্ডের সম্মন্দে খুব বেশি কিছু জানার উপায় আর নেই, তবে কয়েকটা শিলাচিত্র দেখে বুঝেছি দেবতাটি কিছু কিছু ছোট প্রাণীর ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, যেমন ইঁদুর, মাকড়শা, আশা করি ইঁদুরের অস্বাভাবিক আচরণের কারনটা বুঝতে পারছ'।
রুদ্রপ্রসাদ কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললেন —'চণ্ড সাধারণত নিজের নরকের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকে যতক্ষণ না কোন সাধক বিশেষ ক্রিয়ার মাধ্যমে তার উত্থানের ব্যাবস্থাটা পাকাপোক্ত করে ফেলছেন। নির্দিষ্ট পক্রিয়ার মাধ্যমে বিশেষ বলি নিবেদন করে কেউ তাকে আহ্বান করলে চণ্ড বায়ুমণ্ডলে নেমে এসে সেই সাধকের দেহে ভর করেন, চণ্ডের শক্তিতে বলিয়ান আহ্বানকারি সম্রাট তুল্য প্রতিপত্তি লাভ করেন, এই পৃথিবীর বুকে এমন কোন মানুষ নেই যে চণ্ডাশ্রিত ব্যাক্তির সামনে ঝুঁকতে বাধ্য হবেন না। কিন্তু আসল ঘটনাটা একটু অন্যরকম, এখানে সাধু বলভদ্র রাজা শিবদত্তকে পুরো সত্যটা বোধহয় বলেননি, বললে নিশ্চয়ই শিবদত্ত এই প্রস্তাবে সারা দিতেন না। চণ্ডের প্রবল সত্ত্বায় ধীরে ধীরে আবিষ্ট ব্যাক্তির নিজস্ব সত্ত্বা বিলোপ পেতে থাকে, একসময় সে পুরোপুরি চণ্ডের হাতের পুতুলে পরিণত হয়ে পরে। কখনো সখনো চেতনা ফিরত এলে সেই ব্যাক্তি উন্মাদের মতো আচরণ করতে বাধ্য। শিলালিপিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে শিবদত্ত মাঝে মধ্যে উন্মত্তের মতো আচরণ করতেন, অনেক সময় হয়ত নিজেকেই আহত করে ফেলতেন, সভাসদদের বলতেন তাকে হত্যা করতে কিন্তু ঘোর কেটে যেতেই ফের দেখা যেত সেই দুর্দান্ত পরাক্রমশালী সম্রাটকে। এখন কোনটা যে ঘোর আর কোনটা সচেতন অবস্থা তার উত্তর দেবার মতো আর কেউ নেই'।
এতোটা শোনার পর আমি আর না বলে পারলাম না —'তা সমীরণের মতো বুদ্ধিমান লোক কি জেনেশুনেই নিজেকে চণ্ডের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল'? রুদ্রপ্রসাদের ঠোঁটের কোনে মুচকি হাঁসি খেলে গেল, বললেন —'এমন অনেক বিষয়ই ছিল যা ও জানত না, জানার সুযোগ পায়নি, সে অন্য কাহিনী, তোমাকে বলছি শোন, আমাদের রিসার্চ চলাকালীন হঠাৎ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে একটা গোলমাল বাধে, কিছু ছাত্র প্রিন্সিপালকে বেদম মারধোর করে, ফলস্বরুপ পুলিস বিদ্রোহী ছাত্রদের গ্রেফতার করে, যার মধ্যে সমীরণও ছিল। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় সমীরণকে ইউনিভার্সিটি থেকে রাসটিকেট করা হয়, এই ঘটনার ফলে সমীরণের প্রতি আমার মোহভঙ্গ ঘটে, যদিও সত্যি কথা বলতে কি ওর অভাব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম, এমন করিতকর্মা সহকারী চাইলেই মেলে না। এর কিছুদিন পরে আমি কটকের কাজ সেরে কলকাতায় ফিরি। সঙ্গে করে নিয়ে আসি চণ্ডমন্দির থেকে সংগ্রহ করা শিলালিপি গুলো। আর হ্যা ততদিন আর্কেওলজিকাল ডিপার্টমেন্টকে জানিয়ে দিয়েছি ওই লিপির পাঠোদ্ধার আমাকে দিয়ে হবে না, কালের গর্ভে যা হারিয়ে গেছে সেটাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলে কারও কোন উপকার হবে অন্তত আমার মনে হয়নি'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন