ত্রিংশ অধ্যায়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

চলছি তো চলছি, পথের যেন আর শেষ নেই। চলার অযোগ্য পথে দলের গতি রীতিমতো শ্লথ হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে আমাদের দুজনের, জঙ্গলের পথে যেতে যেতে মাঝে মধ্যেই হরিণের দলের মুখোমুখি হয়ে পড়ছি, হরিণগুলো বেদম ভীতু, মানুষ দেখলেই ছুটে পালাচ্ছে, এরপর এল একটা শেয়াল, শেয়ালটা একটা রাজহাঁস ধরেছে, হাঁসটা ঘাড় ভেঙে শেয়ালের দাঁতের ফাঁকে ঝুলছিল, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত জন্তুটার মুখ গড়িয়ে ভেজা মাটিতে পরছিল, আমার একটু আগে দেখা কানহাইয়ার পরিণতি মনে পড়ল। সবশেষে দেখলাম একটা শজারু কেমন যেন দুলকি চালে চলে গেল, সামনে থাকা মানুষদের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে। ইতিমধ্যে দিবাকরের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পালটে গেছে, বোধহয় সঙ্গীকে এভাবে হারানোর ধাক্কাটা সামলাতে পারছে না, থমথমে মুখে সে যথারীতি আগে আগে চলছে তবে মাঝে মধ্যেই গুঙ্গা আর চাঁদুর উপর চোটপাট করছে। ধমক খেয়ে লোক দুটোরও বোধহয় মেজাজ বিগড়ে গেছে তাই এরা মাঝে মধ্যে সম্পূর্ণ অকারণেই আমাদের গলার দড়িতে হ্যাঁচকা টান মারছে, প্রতিটা টানে দড়ি আর গলার দূরত্ব কমে আসছে, অসোয়াস্তি বাড়ছিল, দড়িটাকে গলা থেকে সরিয়ে রাখার জন্য আমি হাত দুটোকে লম্বালম্বি দড়ি আর গলার মাঝামাঝি রেখে দিলাম, বিষয়টা রুদ্রের হ্যান্ডলার চাদুর চোখে পড়েছে, সে হাঁটা বন্ধ করে আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চাইল, তারপর হঠাৎ বিশ্রী গাল দিয়ে ধাঁ করে চড় কষিয়ে দিল। রাগে আর অপমানে গায়ে যেন আগুন জ্বলে উঠল, ক্ষিপ্ত হয়ে হাত দুটো জোড়া করে লোকটাকে ঘুষি মারতে যাচ্ছিলাম, অবস্থা বুঝে গুঙ্গা দড়ি ধরে প্রচণ্ড টান মারল। টাল সামলাতে না পেরে ঘাস জমির উপর মুখ থুবড়ে পড়লাম, ফাঁসটা এবার গলার চারপাশে এমনভাবে চেপে বসল, মনে হচ্ছিল বুঝি জিভটা মুখের ভিতর থেকে ঠেলে বের হয়ে আসবে। রুদ্রপ্রসাদ হুঙ্কার ছেড়ে বললেন—'দিবাকর তোমরা দেখছি একেবারেই অমানুষ! আমাদের মধ্যে একটা ভদ্রলোকের চুক্তি হয়েছিল, তোমার গুপ্তধন চাই, আর আমি তোমাকে সেখানে পৌঁছে দেব, কিন্তু প্রথম থেকেই তুমি আমাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করে চলেছ তা কেউ জানোয়ারের সঙ্গেও করে না। এবার আমি আর এক পাও নড়ব না, যদি ইচ্ছে হয় গুলি করে মেরে দাও'। রুদ্রপ্রসাদ সত্যি সত্যি ঘাসের উপর বসে পড়লেন। দিবাকর এতক্ষণ ঘটনার উপর নজর রাখছিল, মাঝখানে হস্তক্ষেপ করেনি, এবারে রুদ্রের কথার উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে চাদুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল—'হুকুম কার চলে এখানে'? চাদু কথার উত্তর না দিলেও দিবাকরের চোখ থেকে নিজের চোখ সরালো না, সে চোখের দৃষ্টিতে বিদ্রোহের আভাষ। দিবাকর গলার স্বর একপর্দা চড়িয়ে বলল—'তোকে আগেও বলেছি নিজের মর্জি খাটাতে হলে অন্য জায়গা দ্যাখ, শুয়োরের বাচ্চা তুই সর্দার হবি'। হঠাৎ দিবাকর গামবুট পরা পা তুলে চাদুর পেটে সজোরে লাথি মেরে বসল। প্রহারের বেগ সামলাতে না পেরে লোকটা একহাত দূরে ছিটকে পড়ল, যখন উঠল তখন তার চোখে আগুন জ্বলছে। হিংস্র স্বরে বলল—'তু মোদের লেতা লোস, লেতা যে ছিল মরে গেছে, আর শুয়ার হবে, তোর বাপ'। চাদু অকস্মাৎ দিবাকরের গালে প্রচণ্ড একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিল। ঘটনার এই অপ্রত্যাশিত মোচড়ে দিবাকরও যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, কিন্তু সেটা মুহূর্তের জন্য, তারপরেই হিংস্র শার্দুলের মতো চাদুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হয়ে গেল সুন্দ উপসুন্দের লড়াই, দিবাকরের ঘুষিতে চাদুর মুখ ফেটে হা হয়ে গেল আর পরক্ষণেই চাদুর কনুইয়ের ঘা সোজাসুজি এসে লাগল দিবাকরের নাকে, দুজনে এবার জড়াজড়ি করে জলকাদার মধ্যে গিয়ে পড়ল, একফাঁকে চাদু পকেট থেকে ছোট একটা ছুরি বের করে ফেলেছে, সেটা চালিয়ে দিল দিবাকরের কণ্ঠনালি লক্ষ্য করে, ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গলা বাঁচিয়ে নিলেও দিবাকর আঘাত এড়াতে পারল না, জামা ছিড়ে বুকের কাছটা কেটে রক্তারক্তি হয়ে গেল, তবে দিবাকর এতক্ষণে চাদুকে কব্জা করে ফেলেছে, ওর হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে বসিয়ে দিল পাঁজরের গভীরে, ফিনকি দিয়ে রক্ত উঠল। গুঙ্গা এতক্ষণ অস্থিরভাবে সঙ্গীদের মারামারি দেখছিল এবার উন্মাদের মতো বিহ্বল হয়ে দড়ি ফেলে ছুটল, দিবাকরকে চেপে ধরে কিসব আকুতি জানাতে শুরু করল তার মানে বোঝা ভার। কাঁধে হঠাৎ অস্থির হাতের চাপ, রুদ্রপ্রসাদ অধীর স্বরে বললেন -'হা করে দেখছ কি? ওরা এখন আমাদের দেখছে না, চল পালাই'।

জঙ্গলের গভীরে অনেকদূর চলে এসেছি। ভয় হচ্ছিল দিবাকর ধাওয়া করে আমাদের ধরে না ফেলে। রুদ্রপ্রসাদ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড হাঁপাতে শুরু করলেন, একটু পরে সামান্য ধাতস্থ হয়ে বললেন—'এতটা রাস্তা যা ছুটলাম'। যদিও আমার মনে হল হাঁপানোর ধরনটা কেমন যেন অস্বাভাবিক, নিছক ক্লান্তির থেকে অন্যধরনের। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'মনে হচ্ছে ওরা কাছাকাছির মধ্যে নেই, সবার আগে নিজেদের মুক্ত করা যাক'। আমরা দুজনে এবার দড়ির গিঁটগুলো নিয়ে পড়লাম। হাতের বাঁধন খুলতে তেমন অসুবিধে না হলেও সমস্যা হল গলায় ঝোলা দড়িটা নিয়ে, ওটার প্যাঁচ খুলতে হিমশিম খেয়ে গেলাম, অবশেষে যখন খুলল, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। রুদ্রের কথামতো দড়িটা বুনো ঝোপের আড়ালে ফেলে দিলাম, ফের যদি দিবাকরের পাল্লায় পড়তেই হয়, অন্তত বাঁধতে আর পারবে না। এবারে ভালো করে জঙ্গলের দিকে চাইলাম, যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু বনের ঘন পাঁচিল, প্রকাণ্ড সব গাছের পাতা জায়গায় জায়গায় যেন চাঁদোয়ার মতো সৃষ্টি করেছে, এমনিতেই দিনটা মেঘলা, যেটুকু আলো হয়তো আসত তাও এই পাতার আবরণ ভেদ করে ঠিকমতো আসতে পারছে না। ক্ষুতপিপাসা ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পরতে চাইছে। সামনে একটা ঝাঁকড়া গাছে লাল টসটসে ফল ঝুলছে, হাত দিয়ে পেড়ে নিতেই রুদ্রপ্রসাদ হা হা করে উঠলেন—'মরবে নাকি! বিষফল কি না কে জানে'। ফলটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে বললাম—'কিন্তু দারুণ খিদে পেয়েছে যে, তার কি করা যায়'? রুদ্রপ্রসাদ একটু ভেবে বললেন—'কাছাকাছির মধ্যে নিশ্চয়ই পুকুর-ডোবা কিছু থাকবে, আমাদের খুঁজে নিতে হবে'। সকালে যে তুমুল বৃষ্টিটা হয়েছে তার চিহ্ন সর্বত্র। গাছের পাতাগুলোর খাঁজে খাঁজে জল জমেছে, আমি কয়েকটা পাতায় মুখ লাগিয়ে জল চুষে খেলাম, এতে যাহোক গলা কিছুটা ভিজল, আমার দেখাদেখি রুদ্রপ্রসাদও তাই করলেন। ভাঙা ডালপালা পচা পাতা মাড়িয়ে আমরা আবার জঙ্গলের পথে চলতে লাগলাম। খানিকটা হাঁটার পর বললাম—'আমরা কি ঠিক পথে চলেছি না আরও ভিতরে ঢুকে পড়ছি'? রুদ্রপ্রসাদ চিন্তিত স্বরে বললেন—'একটা হিসেব কষেছি, তবে সেটার গ্যারান্টি দেওয়া যাবে না, দিবাকর নদীর পশ্চিম দিক ধরে বনের পথ ধরেছিল। তা হলে পূর্ব দিকে গেলে হয়তো আমরা আবার সূতা নদীর ধারে এসে পড়ব, একবার যদি সূতা নদী খুঁজে পাওয়া যায় তা হলে ধার ঘেঁষে চললে ভগীরথপুর গ্রামে পৌঁছোন সম্ভব'।—'আপনি নিশ্চিত এটা পুর্ব দিক'?

—'আমার হাতে কম্পাস নেই জয়ন্ত, তবে মনে হয় দিকভুল হয়নি'।

—'কিন্তু নদীর ধার দিয়ে গেলে তো আবার দিবাকরের পাল্লায় পড়ার সম্ভাবনা আছে'? রুদ্রপ্রসাদ বললেন—রিস্ক তো একটা রয়েইছে! তবে আমরা যেমন দলে দুজন, ওরাও এখন কিন্তু ঠিক তাই, শুধু আগ্নেয়াস্ত্রটাই যা তফাত গড়ে দিচ্ছে। আমরা এবার সূতা নদীর সন্ধানে পূর্বদিকে চলা শুরু করলাম।

জঙ্গলের একঘেয়ে দৃশ্য দেখতে দেখতে চলছিলাম, মাথায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা, অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর গাছপালা যেন এবার একটু হালকা হয়ে আসছিল, মনের কোণে আশা জেগে উঠল তবে কি জঙ্গলের সীমানা পেরিয়ে আসছি। রুদ্রপ্রসাদকে সে কথা বলতে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক কিছুটা পিছিয়ে গেছেন, একটা শাল গাছের উপর ভর দিয়ে হাঁপাচ্ছেন, আমি পাশে গিয়ে বললাম—'শরীর খারাপ লাগছে নাকি'? রুদ্র যেন জোর করে মুখে হাসি ঝুলিয়ে বললেন—'ও কিছু নয়, মাঝে মধ্যে একটু হাঁপ ধরে, বয়স হচ্ছে তো, এসব অ্যাডভেঞ্চারের কি আর বয়স আছে'?

যেতে যেতে একটা ন্যাড়া মতো জায়গায় এসে পৌঁছোলাম, এখানকার ঘাস ছোট ছোট বনবাদাড়ও বিশেষ ঘন নয়, একটা বিষণ্ণ কর্কশ শব্দ কানে এল তারপর চোখের সামনে দিয়ে হঠাৎ যেন রঙের বন্যা বয়ে গেল। একটা ময়ূর! রংবেরঙের পেখম মেলে দুলকি চালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ময়ূরটা আমাদের দেখে হঠাৎ থমকে গেল তারপর বোধহয় ভয় পেয়েই পেখম গুটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে সেধিয়ে গেল। মাঠের মাঝখানে কয়েকটা মাটির ঢিপি চোখে পড়ল। ভাবলাম ওটার গায়ে হেলান দিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক, কিন্তু রুদ্রপ্রসাদ নিষেধ করে বললেন—'উঁহু! কেমন যেন লাগছে? একটু দেখতে দাও তো'! বড়সড় একটা পাথরের টুকরো তুলে ঢিপিতে ছুড়ে মারলেন, আর তক্ষুনি কিলবিল করতে করতে অসংখ্য কৃমি জাতীয় ক্ষুদ্র আকারের পোকা বেড়িয়ে এল, রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'এগুলো হচ্ছে উইপোকা, আমাদের সবার বাড়িতেই এ জিনিস অল্পবিস্তর পাওয়া যাবে, তবে একত্রে কোটির ঝাঁকে যদি কোনও মানুষকে ছেঁকে ধরে তবে কিন্তু মুশকিল'!

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%