সঞ্জয় ভট্টাচার্য
জঙ্গলের মধ্যে ফুটবল মাঠের মতো একটা ন্যাড়া জায়গা, চারপাশে প্রচুর গাছপালার মাঝে ফাঁকা মাঠটা বেশ একটা পিকনিক স্পটের মতো লাগছিল। মিলিটারির লোকেরা আমাদের জন্য পাশাপাশি দুটো তাবু খাঁটিয়ে দিয়েছেন, একটাতে আমাদের শোবার ব্যবস্থা অন্যটিতে রাজ্যের জিনিসপত্র ডাই করে রাখা, তাতে যে কি আছে তা ঈশ্বরই জানেন! রুদ্রপ্রসাদ সেই যে তাবুটায় ঢুকেছেন এখনও বের হননি, আমি অবশ্য কাজে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু উনি বললেন দরকার পরলে ডাকবেন। আমি যেখানে বসে আছি সেখান থেকে ত্রিশ ফুট দূরে একটা বেশ বড়সড় মাটির ঢিপি, এই সেই বিখ্যাত বাবুলালের টিলা। তপনের মুখে এটার কথা শুনেছি, রুদ্রপ্রসাদ আজকের রাতটা টিলার চৌহদ্দির মধ্যেই কাটাবেন স্থির করেছেন।
ঘড়িতে এখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা, একটু আগে সূর্যাস্ত হয়েছে। পড়ন্ত বিকেলের নিস্প্রভ আলোয় গভীর জঙ্গলের মাঝে বিদায়ী সূর্যের এমন অদ্ভুত রঙের খেলা, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আকাশটাকে কি দারুণ সিঁদুর রঙা লাল দেখাচ্ছে, এমন আকাশ কলকাতা শহরে নিশ্চয়ই কেউ দেখেনি! এখানে গাড়ির বিশ্রী শব্দ, বিষাক্ত ধোঁয়ার বালাই নেই, আছে ডালপালা ছড়ানো বিশাল বড় সব গাছ আর তাদের শাখা-প্রশাখায় কলকাকলি করা নাম না জানা পাখির দল, আমি একটা ডেকচেয়ারে বসে প্রকৃতির অদ্ভুত এই সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম, পায়ের আওয়াজ শুনে ফিরে চাইলাম, রুদ্রপ্রসাদ এসে আমার পাশের চেয়ারটায় বসলেন, হাতে দুটো কফির মগ, একটা আমাকে দিয়ে বললেন—'এখানে আকাশটা বেশ দেখাচ্ছে, না'!
—'অসাধারণ! আমরা কফি খেতে খেতে প্রকৃতির শোভা দেখছিলাম, একটু পরে আমি বললাম—'আমরা এখানে কেন এলাম? চণ্ড মন্দিরের কাছাকাছি থাকলেই তো সুবিধে হওয়ার কথা'। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'দেড়মাস আগে আমি যখন এই অঞ্চলটার সার্ভে করেছিলাম তখন জঙ্গলের শুধু এই অংশটাতেই যা একটু পজিটিভ ভাইব্রেশন পেয়েছিলাম। তুমি বোধহয় অবসার্ভ করনি! এই যে পাখির এত কিচিরমিচির সেটা এই অঞ্চলে অন্য কোথাও পেয়েছ'?
—'আরে তাই তো'! রুদ্রের কথায় খেয়াল হল চৌরি বা ভগীরথপুরের কোথাও সত্যিই পাখি চোখে পরেনি, পাখির ঝাঁক যেন সব দল বেঁধে এই গণ্ডির মধ্যেই এসে জড়ো হয়েছে।—'কিন্তু পাখিগুলো এমন করছে কেন'?
—'কারণ পশুপাখিদের মধ্যে অতীন্দ্রিয় বিষয়ের অনুভূতি মানুষের থেকে বেশি, চণ্ড জেগে উঠেছে জয়ন্ত, পাখির দলের কাছে সেই শক্তির স্পন্দন পৌঁছে গেছে, ওরা ভয়ে মন্দিরের ত্রিসীমানা ছেড়ে এতদূরে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। হঠাৎ বুকের ভিতরটা যেন কেঁপে উঠল, বললাম—'তাহলে এখন কি করনীয়'? রুদ্র হালকা চালে বললেন—'সবার আগে কফিটা শেষ করবে, দুপুরে যে চমৎকার লাঞ্চটা খেয়েছিলাম সেটা এতক্ষণে হজম হয়ে গেছে সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে চিজ-কর্ন স্যান্ডউইচ নিয়ে এসেছি, তাই ভাবছি একরাউন্ড টেস্ট করে দেখলে কেমন হয়? অবশ্য আমাদের ইভিনিং স্ন্যাক্স, ডিনার, কালকের ব্রেকফাস্ট সবকিছুর মেনু কিন্তু ওই একটাই আইটেম, পরে বোর হলে কিন্তু চলবে না, আর হ্যাঁ এখনও ফ্লাক্স ভরতি কফি রয়েছে, মনের সুখে খাও, ফুরিয়ে গেলেও চিন্তার কিছু নেই, নেসক্যাফের একটা কৌটো ব্যাগের মধ্যেই রয়েছে'।
—'আপনি জানেন আমি কি জিগ্যেস করছি'? রুদ্রপ্রসাদ সামান্য চুপ করে থেকে হঠাৎ গম্ভীরভাবে বললেন—'মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে লাভ নেই জয়ন্ত, এতক্ষণে আমাদের দুজনেরই কিছুটা ধারণা হয়ে গেছে আমাদের প্রতিপক্ষ সম্বন্ধে, দিনেরবেলাটা তাও একপ্রকার, কিন্তু রাতের অন্ধকারে চণ্ডের শক্তির বহুগুণে বৃদ্ধি ঘটবে, তখন আমাদের জীবনের কানাকড়ি মূল্যও থাকবে না, এখন ভরসা ওই যে সামনে মাটির ঢিপিটা দেখছ ওখান থেকে যদি কিছু সাহায্য আসে'।
—'মানে'?
—'ওই মাটির ঢিপিটা দেখছ, ওটা আর কিছু নয়, তিনশো বছর আগের অরণ্যবাসী সিদ্ধপুরুষ বাবুলালের সমাধি, বাবুলাল হয়তো রক্ত-মাংসের শরীরে আজ আর বিদ্যমান নন, কিন্তু তার তপস্যার ভাইব্রেসন এখনও এই মাটিতে পাওয়া যায়, আমরা দুজনে আজ সন্ধ্যায় বাবুলালের কাছে প্রার্থনা করব, যদি আমাদের আহ্বান তার কাছে পৌঁছোতে পারে তাহলে চণ্ডের সঙ্গে এই লড়াইয়ে আমাদের ফিফটি-ফিফটি চান্স আছে ধরতে পারো'।
—'কাল সকালে কি হবে'?
—'আলো ফুটলে আমরা জঙ্গলের পথ ধরে বেড়িয়ে পড়ব, যে রাস্তা ধরে এসেছিলাম, অর্থাৎ সেই উত্তরদিকটা ধরেই হাঁটা লাগাব, মোটামুটি আট কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দেওয়ার পর, জঙ্গলের বর্ডার শেষ আর ভগীরথপুর গ্রাম শুরু, এই দুয়ের মাঝখানে চণ্ডরাজার মন্দির, যতদূর মনে হয় মন্দিরের ভিতর আমি ঢুকতে পারব না, বিশেষত কালকের দিনে চণ্ডের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার রিভার্স ম্যাগনেটিক ফিল্ড ভেঙে ঢোকা সাধারন কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, পথে সে আমাকে যেকোনো উপায়ে আটকে দেওয়ার চেষ্টা নিশ্চয়ই করবে, এক্ষেত্রে জীবনহানির সম্ভাবনাটা কিন্তু খুব বেশি'। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম—'তাহলে আপনি এই তাঁবুতেই থাকবেন, আমি গিয়ে বাকি কাজটা সেড়ে আসব'। রুদ্রপ্রসাদ সামান্য হেঁসে বললেন—'সেটা হয় না জয়ন্ত, এই কাহিনির সূত্রপাত আমার হাত দিয়েই ঘটেছে, শেষটা দেখার ভাগ্য হবে কি না জানিনা, কিন্তু মাঝপথে পালাতে পারব না, আমি ফেরত যাওয়ার জন্য আসিনি'। একটু বিরতির পর রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'অবশ্য তোমার ভিতরে প্রবেশ করতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, তোমার মধ্যে চণ্ডের এনার্জির অংশ আছে, ভিতরে ঢুকে পাথরটা বেদিতে বসিয়ে আগুন ধরিয়ে দেবে, আর চণ্ডের মূর্তিটাও একইসঙ্গে ভেঙে টুকরো করে ফেলবে, এই কাজগুলো করে ফেলতে পারলেই, চণ্ড প্রস্থান নিতে বাধ্য হবে আর আমাদের অভিযান শেষ'।
—'আপনি যেভাবে বললেন, সবকিছু কি এতো সহজে হবে মনে হয়'? রুদ্রপ্রসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—'জয়ন্ত আমাদের শত্রুকে চোখে দেখা যায় না, সে সর্বশক্তিমান কি না জানি না কিন্তু মাঝে মধ্যে সেরকমই মনে হচ্ছে, সে খল, ধূর্ত, সর্বত্রগামী, পিঁপড়ে এখানে হাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তবে পিঁপড়েরও কিছু অ্যাডভান্টেজ নিশ্চয়ই আছে, হাতির কানের ভিতর যদি সে একবার ঢুকে যেতে পারে, অতবড় হাতিও কিন্তু তখন কাবু'। উত্তর দেওয়া নিষ্প্রয়োজন, চুপ করেই রইলাম। রুদ্রপ্রসাদ কৌতুকের স্বরে বললেন—'কিহে তোমার মুখ ঝুলে গেল কেন? নার্ভাস লাগছে নাকি'?
—'তা একটু লাগছে'। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'একটু পিছিয়ে যাও জয়ন্ত, আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করো, যারা একসময় প্রবল পরাক্রান্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের পর্যন্ত তাদের সাধের কলকাতা শহর ছেড়ে পাততাড়ি গুটিয়ে সুদূর দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর করতে বাধ্য করেছিল, আমরা শরীরে কিন্তু সেই লোকগুলোর রক্তই বয়ে বেড়াচ্ছি, এত ভয় আমাদের পোষায় না, এসো আমরা দুজনে সমস্বরে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আবৃত্তি করি'। তিতকুটে মুখে বললাম—'আপনি করুন, আমার এখন আসছে না'।
—'বেশ তাই হোক, মন দিয়ে শুনবে কিন্তু'।
''জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন''—'লাইনটা শুনলে তো জয়ন্ত, এবারে পুরো কবিতাটা শোন, ভয় উড়ে যাবে। রুদ্রপ্রসাদ উদ্দাক্ত স্বরে আবৃত্তি শুরু করলেন, আর আমি জুড়িয়ে যাওয়া কফিতে চুমুক মেরে, পানসে মুখে বসে রইলাম।
সূর্যের আলো পুরোপুরি মিলিয়ে যেতেই জঙ্গল এবার অন্য ধরনের রূপ ধারণ করল। বিশাল বিশাল গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের চারপাশে যেন ঘন কালো ভুতুড়ে দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেদিকে যতবারই চোখ পড়ছে অমঙ্গলের আশঙ্কায় মন দুলে উঠছে, যে পাখিগুলো কলকাকলি করে বিকেলটা মাতিয়ে রেখেছিল, সেগুলো কি কোনও জাদুকাঠির ছোঁয়ায় এতো শান্ত, নিস্তব্ধ হয়ে গেল? নাকি ওরা সব ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরেছে? উত্তর জানা নেই! আজকের রাতটা কৃষ্ণপক্ষ, অপরাহ্নের সিঁদুর রঙা আকাশটাকে কেউ এতক্ষণে থিকথিকে কালো ভেলভেট দিয়ে ঢেকে দিয়েছে, আশ্চর্য লাগছিল, কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকৃতির যে অদ্ভুত সুন্দর রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম সেই একই প্রকৃতির এমন বীভৎস রূপ দেখে আতঙ্কে শরীর হিম হয়ে আসছে, তবে ঠিক মৃত্যুভয় নয়, জনহীন এই প্রান্তরে রহস্যময়ী প্রকৃতির গহ্বরে যে কত অজ্ঞাত বিভীষিকা লুকিয়ে রয়েছে! জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েই আমি চিন্তিত, মরার আগে পর্যন্ত যে আর কি কি আমাকে ভোগ করতে হবে, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন!
আমাদের তাবুর সামনে খোলা জায়গাটায় কাঠকুটো জমিয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে, মিলিটারির লোকেরা আমাদের জন্য সবরকম ব্যবস্থাই করে গেছেন, দ্বিতীয় তাবুটায় যত কাঠের টুকরো রাখা আছে দেখলাম, মনে হয় রাত-ভর জ্বাললেও ফুরোবে না। রুদ্রপ্রসাদ বললেন আগুনটা সারারাত জ্বালিয়ে রাখতে হবে, এতে আলো যেমন হবে, বুনো জন্তুও তাবুর কাছে ঘেঁষবে না। ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে সন্ধ্যা সাতটা, রুদ্রপ্রসাদ টিলার উপরটা সঙ্গে নিয়ে আসা ফুল দিয়ে সাজিয়ে মোমবাতি জ্বেলে দিলেন। আমার দিকে ফিরে বললেন—'জয়ন্ত তাবুর ভিতর দুটো আসন রাখা আছে নিয়ে এস দেখি'। আমি আসন আনতেই যাচ্ছিলাম রুদ্র ফের বললেন—'আর দুটো জলের বোতলও নিয়ে আসবে'। রুদ্রের কথামতো জিনিসপত্র এনে হাজির করতেই উনি বললেন—'হাত-মুখ ধুয়ে এস জয়ন্ত, আমাদের এখন আসনে বসতে হবে'। হাত-মুখ ধুয়ে যখন এলাম দেখলাম ততক্ষণে রুদ্রপ্রসাদ তৈরি হয়ে আসনে বসে পড়েছেন, গম্ভীর স্বরে বললেন—'আসনে বসো জয়ন্ত, এখন আমরা বাবুলালকে স্মরণ করব, মনে যেন সন্দেহ আর অবিশ্বাসের লেশমাত্র না থাকে, একমুহূর্ত চুপ থেকে রুদ্র আবার বললেন—'সাড়ে তিনশ বছর আগে বাবুলাল দেহ রেখেছেন, আজকের যুগে কেউ তাকে দেখেনি, জানেনা তিনি দেখতে কেমন ছিলেন, আমাদেরও তার অবয়ব সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা নেই, আমরা তার শরীরের নয় আত্মার ধ্যান করব, আর মনে রেখ যদি কোনও বাধা উপস্থিত হয় তাহলেও স্থির থাকতে হবে'।
—'কেমন বাধা, বিপদজনক কিছু!
—'হতে পারে, তা হলেও! মনে রেখ জয়ন্ত এটাই আমাদের শেষ আশা'। রুদ্রপ্রসাদ চোখ বন্ধ করে ধ্যান শুরু করলেন, আর আমিও চোখ বন্ধ করলাম। যে লোক জীবনে কখনো ধ্যান করেনি তার পক্ষে এভাবে নিশ্চল হয়ে বসে থাকার মতো দুরূহ কাজ বোধহয় আর কিছু নেই। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলাম, যতই চেষ্টা করি না কেন কিছুতেই বাবুলালের উপর মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। উটকো চিন্তাগুলো দল বেঁধে আসতে শুরু করল, আর আমি চেষ্টা করছিলাম সেগুলোকে দূরে ছুড়ে ফেলতে, এরপর যেন মস্তিষ্কের মধ্যে একটা যুদ্ধই বেধে গেল, শেষেমেষে তিতিবিরক্ত হয়ে চোখ মেলে চাইতে বাধ্য হলাম। ঠাণ্ডাটা এরমধ্যে আরও বেড়েছে, সোয়েটার ভেদ করে হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেবে মনে হচ্ছে, পাশে রুদ্রপ্রসাদ পাথরের মূর্তির মতো ধ্যানমগ্ন হয়ে রয়েছেন, লক্ষ করে দেখলাম, ভদ্রলোকের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের বেগও যেন ক্ষীণ হয়ে এসেছে। সামনে যে মোমবাতিগুলো জ্বলছিল তার মধ্যে শুধু দুটো এখনো টিকে আছে, বাকি সবকটাই হাওয়ার বেগে নিভে গেছে। ফের একবার চোখ বুজে বাবুলালের চিন্তায় রত হওয়ার চেষ্টা করলাম, হঠাৎ একটা তীক্ষ্ন কর্কশ শব্দ, ডানা ফরফর করে একটা বাদুড় মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। পাশে রুদ্রপ্রসাদের দিকে চেয়ে বিস্ময়ের মাত্রা বাড়ল বই কমল না, সেই একইরকম নিথর, নিঃস্পন্দ হয়ে বসে রয়েছেন, মোমবাতিগুলো এতক্ষণে সবই নিভে গেছে। কতক্ষণ এই আসনে বসে রয়েছি? একঘন্টা! নাকি দু-ঘন্টা! আরও বেশি হলেও অবাক হব না, মনে হচ্ছে যেন একযুগ পেরিয়ে গেছে। এদিকে নতুন সমস্যা টের পাচ্ছিলাম, আসনে বসার আগে অতটা জল খাওয়া বোধহয় ঠিক হয়নি, তরল বর্জ শরীর থেকে বেরোনোর রাস্তা খুঁজছে, একটু হালকা হতে পারলে ভালো হত, কিন্তু রুদ্রপ্রসাদের কড়া নিষেধ, আসন ছেড়ে ওঠা চলবে না কোনওমতেই। প্রচুর অস্বস্তি নিয়ে ফের চোখ বন্ধ করলাম।
আরও কতক্ষণ কেটে গেল জানিনা, মনে হচ্ছে অনন্তকাল এইভাবেই বসে আছি। শরীরের মধ্যে মূত্রের বেগ এমন তীব্র আকার ধারণ করেছে, মনে হচ্ছে এখুনি নির্গমন না হলে বুঝি উন্মাদ হয়ে যাব। ওডোমসের প্রলেপটাও আর বিশেষ কাজ দিচ্ছে না, মশার ঝাঁক হুল ফুটিয়ে শরিরে দারুন জ্বলুনি ধরিয়ে দিচ্ছিল। রুদ্রপ্রসাদের যথারীতি কোন বিকার নেই, লোকটা বোধহয় ম্যাজিক জানে, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কিভাবে যে এমন স্থির থাকা যায়! তবে আমার সহ্যশক্তির কিন্তু একটা সীমা আছে যেটা ততোক্ষণে প্রায় পেরিয়ে এসেছি, ভাবছিলাম আসনে বসেই হালকা হয়ে যাব নাকি? ঠিক তখুনি ঘটল ঘটনাটা। এই গর্জন আমি আগেও শুনেছি, আলীপুরের চিড়িয়াখানায়, তখন ব্যাঘ্রপুঙ্গব ছিল লোহার গারদের ভিতর আর আমি ছিলাম খাঁচার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে, কিন্তু আজকে এই মহারণ্যের খোলা বধ্যভূমিতে রয়েল বেঙ্গলের উপস্থিতি আমার হাড়ের মধ্যে দারুন ভঁয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিল। আর থাকতে না পেরে চিৎকার করে উঠলাম —'আপনি শুনেছেন'? রুদ্রপ্রসাদ চোখ খুলেছেন, শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন —'শুনেছি, আসন ছেড়ে উঠবে না'। একমুহুর্ত সময়ও কাটল না, ফের সেই ভয়ংকর ব্যাঘ্রগর্জন, এবারে আরও কাছে আরও স্পষ্ট! ধড়মড় করে উঠে পালাতে যাচ্ছিলাম, রুদ্রপ্রসাদ সাঁড়াশির মতো হাতে চেপে ধরে বললেন —'পাগল হোয়োনা জয়ন্ত, উঠলেই বাঘের শিকার হবে, বাবুলাল আমাদের ডাকে সারা দিয়ে এসেছেন, ওনার উপস্থিতি আমি টের পাচ্ছি'। কথা শোনার মতো মনের অবস্থা আমার ছিল না, রুদ্রের বজ্রমুষ্ঠি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রবল ধ্বস্তাধস্তি শুরু করে দিলাম। রুদ্রপ্রসাদের শরীরে যতই জোর থাকুক না কেন অর্ধেক বয়সি একজন যুবকের সঙ্গে পেরে ওঠার মতো শক্তি নিশ্চয়ই নেই, প্রচণ্ড জোর খাঁটিয়ে রুদ্রকে একপ্রকার কাবু করে ফেলেছি, হঠাৎ ঘরঘরে একটা শব্দ, আর চোখের সামনে মাত্র একহাতের মধ্যে আগুন রঙা ডোরাকাটা স্ট্রাইপ চলে ফিরে বেড়াতে লাগল! বাংলার বাঘ সাতকোশিয়ার অরণ্যে তার শিকার দুই বঙ্গসন্তানকে জ্বলন্ত ভাঁটার মতো চোখ দিয়ে জরিপ করছে, আমার শিথিল হয়ে পরা হাত থেকে রুদ্রের মুঠি আলগা হয়ে পড়ল, বাঘের তাড়া নেই, সে বুঝেছে এই শিকার একেবারেই সহজলভ্য, জন্তুটা চক্রাকারে আমাদের পাক খেতে লাগল। পালানোর আর কোনও উপায় নেই আর ক্ষমতাও নেই, জীবন্মৃতের মতো বসে রইলাম বাঘের কামড়ের অপেক্ষায়, পাশে বসা রুদ্রপ্রসাদের আকুল মিনতি কানে এল—'মহাপুরুষ আপনি এখানেই আছেন আমি জানি, ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে আপনাকে বিরক্ত করিনি, যদি আপনার এই ইচ্ছেই হয় যে আমরা আমাদের উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ রেখেই বিদায় নিই তবে তাই হোক'। আবার বিকট গর্জন, বেঙ্গল টাইগার হঠাৎ মন পালটে বিশাল লম্ফ দিয়ে জঙ্গলের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, বাঘ আমাদের জ্যান্ত রেখেই বিদায় নিল। তবে কি বেঁচে গেলাম! এবার রুদ্রপ্রসাদের দিকে চোখ পড়ল, সে তখন বিস্ফারিত দৃষ্টে চেয়ে রয়েছে সামনের দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন