সঞ্জয় ভট্টাচার্য
গমগমে অপার্থিব স্বরটা ধমকের সুরে বলল —'আমার বিরুদ্ধাচারন করার স্পর্ধা তোমার হল কি করে? আমি উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে রইলাম। চারপাশে নিকষ্যি অন্ধকারের মধ্যে ভীষণ পঁচা দুর্গন্ধের মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে আছি, মনে হচ্ছিল আবার যেন সেই জঙ্গলের মধ্যে মন্দিরটায় পৌঁছে গেছি! কণ্ঠস্বরটা ফের বলল —'যার প্ররোচনায় তোমার মতিভ্রম হয়েছে, যথাসময়ে ভয়ংকর পরিনতি সে প্রাপ্ত হবে, কিন্তু তোমাকেও প্রাপ্য শাস্তি ভোগ করতে হবে'! সন্ত্রস্ত হয়ে বললাম —'ক্ষমা করুন, এমন ভুল আর হবে না'। অপার্থিব স্বরটা ভর্তসনার পারদ চড়িয়ে বলল —'প্রভুর কর্মে বাঁধা সৃষ্টি করার দণ্ড সেবককে ভোগ করতেই হয়'। আওয়াজটা এবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। গায়ের ওপর তীক্ষ্ন খড়খড়ে কিছুর ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে গেল। ধরমড়িয়ে বিছানার ওপর উঠে বসতেই নরম কয়েকটা মাংসপিণ্ড ছিটকে এদিক ওদিক গড়িয়ে পরল। ভীষণ ঘাবড়ে বেডসুইচ টিপে বাল্বের আলোয় যা দেখলাম তাতে ভয়ে ব্রহ্মতালু অবধি শুকিয়ে যাবার যোগার হল।

ঘর ভর্তি অসংখ্য মেঠো ইঁদুর! কয়েকটা বোধহয় আমার গায়ের ওপর দিয়েই ঘোরাফেরা করছিল, আমি উঠে বসতে বিছানার ওপর গড়িয়ে পড়েছে। পায়ের ওপর একটা বিশ্রী শিরশিরানি অনুভব হতে দেখলাম, একটা পেল্লায় কালো ইঁদুর আমার ঊরুর ওপর দিয়ে চলে সোজা পেটের দিকে আসছে, হাতের চাপড়ে ওটাকে ছিটকে ফেলতেই ইঁদুরটা হিংস্র ভঙ্গীতে ঝাঁপিয়ে আমার ডান হাতের তর্জনীর ডগা কামড়ে ধরল! ছুড়ির মতো ধারাল দাঁতের চাপে আঙুলের নখ আর খানিকটা মাংস উপড়ে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্তের ধারা ছড়িয়ে পড়ল বিছানা আর মেঝের ওপর। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে দেখলাম, কদাঁকার ইঁদুরটা চেড়া জিভ দিয়ে সেই গরম রক্ত চেটে গিলতে শুরু করেছে। কুটুসের কথা মনে পরতেই প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে তাকালাম ওর বাক্সের দিকে, কিন্তু সেখানে তখন ওকে দেখতে পেলাম না, আলমারির তলায় কয়েকটা ধেড়ে ইঁদুরের হুড়োহুড়ি দেখে মনে হল ওখানে কিছু আছে, আর ঠিক তখুনি কুটুসকে টেনে হিঁচড়ে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ঘরের মাঝখানে এনে ফেলল নোংরা জন্তুর দল, কুটুসের দেহে এখনো প্রাণ বাকি আছে, যন্ত্রণাকাতর দৃষ্টে সে তাকিয়ে রয়েছে কড়িকাঠের দিকে, একটা মোটাসোটা ইঁদুর ওর পেটের ভিতর থেকে নাড়ীভুঁড়ি ছিড়ে টেনে ফেলছিল, গোটাকয়েক ইঁদুর এবার একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পরে ওর গায়ের মাংস খুবলে খেতে শুরু করল, প্রচণ্ড বিতৃষ্ণায় ভয় লোপ পেল, টেবিল ল্যাম্পটা হাতে তুলে নিয়ে ইঁদুরের দঙ্গলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ল্যাম্পের কভারটা দিয়ে ধেড়ে ইঁদুরটাকে মারতেই, কাঁচের টুকরো জন্তুটার গায়ে গেঁথে গেল, যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে ইঁদুরটা গড়িয়ে পরল, লাথি মেরে ওটাকে ঘরের অন্য দিকে পাঠিয়ে দিলাম, কিন্তু ততক্ষণে ইঁদুর বাহিনী একজোট হয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কি সাংঘাতিক তাদের বলিষ্ঠ দাঁতের দংশন! খাবলা খাবলা করে গায়ের চামড়া, মাংস উপড়াতে শুরু করে দিল, প্রথম দিকে ল্যাম্পের রড দিয়ে প্রাণপণ লড়াই দেবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমার প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকল না, সামলাতে না পেরে একসময় হুরমুরিয়ে মেঝের ওপর আছড়ে পড়লাম, রডটাও হাত থেকে খসে পড়ল। ইঁদুরগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে আমার গায়ে উঠতে শুরু করল, শেষ চেষ্টা করছিলাম জন্তুগুলো যেন আমার মুখে বা গলায় কামড়াতে না পারে, কিন্তু ইঁদুরের সংখ্যা এতো বৃদ্ধি পাচ্ছিল, মনে হল বেশিক্ষণ আর বোধহয় ঝুঁজতে পারব না।
হঠাৎ সদর দরজাটা আছড়ে দেয়ালে সজোরে ঠোকা খেয়ে খটাং করে শব্দ তোলার সাথে সাথে অনেক গুলো উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি এসে পড়ল আমার মুখের ওপর, আর কয়েক সেকেন্ড পর উচ্চকণ্ঠের দুটো স্বগতোক্তি একসঙ্গে শুনতে পেলাম, 'মাই গড শেষে এমন জঘন্য জিনিসও দেখতে হল', আর 'হায় রাম ইতনা চুহা' কণ্ঠস্বর দুটো অবশ্য আমার পরিচিত।
'ঘরের মধ্যে ঈশ্বর প্রেরিতের মতো এসে হাজির হয়েছেন রুদ্রপ্রসাদ, অরিন্দম আর কিশোরীলাল'।
অরিন্দমের হাতে একটা গাড়ীর স্প্যানার ধরা, বিনাবাক্য-ব্যায়ে সেটা দিয়ে কড়িকাঠের কাছে ঘুরে বেড়ানো ইঁদুরটাকে ঘা মারতেই সেটা মুখ দিয়ে রক্ত উগড়ে লুটিয়ে পড়ল। রুদ্রপ্রসাদ উত্তেজিত স্বরে বললেন —'জয়ন্ত তোমার ফ্ল্যাটে লাঠি গোছের কিছু আছে'? খানকয়েক হকি-স্টিক রয়েছে রান্নাঘরে, স্কুলের ছেলেরা রেখে গেছে, সেদিকে ইঙ্গিত করতেই অরিন্দম বুটের তলায় ইঁদুরগুলোকে পিষতে পিষতে ছুটে গেল, রুদ্রপ্রসাদ এরমধ্যে দেয়াল হাতড়ে সুইচ বোর্ডটা খুঁজে পেয়ে গেছেন, টিউব লাইটের আলোয় ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। হে ভগবান! গোটা কুড়ি ইঁদুর যদি আমাকে আক্রমণ করে থাকে তাহলে অন্তত দুশোটা ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যেদিকে চোখ পড়ছিল শুধু বিশাল বিশাল কালো ধেড়ে ইঁদুর। টের পেলাম ইঁদুরগুলো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যুদ্ধে তেহাই দিয়ে এদিক ওদিক চাইছে, দ্রুত উঠে দাড়িয়ে গা থেকে ইঁদুরগুলোকে ঝেড়ে ফেললাম, অরিন্দম তখুনি ফিরে এলো হাতে স্টিক-গুলো নিয়ে। এরপর শুরু হল মূষিক নিধন যজ্ঞ। ইঁদুরদের চিঁ-চিঁ আর্তনাদ আর নির্দয় প্রহারের শব্দে ফ্ল্যাটের দেয়াল-কটা গমগম করতে লাগল। মূষিক-কূল এর মধ্যে রনে ভঙ্গ দিয়েছে, পাল্টা আক্রমনের বদলে তারা এখন পালাবার পথ খুঁজছে, আমার মনের জোর কিছুটা হলেও ফিরত এসেছে। বাথরুমে এক বোতল অ্যাসিড রাখা ছিল কোমোড পরিস্কারের জন্য, ছুটে গিয়ে সেটা নিয়ে এলাম। কুটুসের কান্নাভেঁজা চোখ দুটো স্মরণ করে ছিপি খুলে ঝাঁজাল অ্যাসিড ঢেলে দিলাম ইঁদুরের জমায়েতের মাঝখানে, মরণ চিৎকার করে জন্তুগুলো দিগ্বদিক জ্ঞ্যানশুনের মতো ছুটে গিয়ে দেয়ালের গায়ে অন্ধের মতো মাথা ঠুকতে লাগল, তার ওপর রুদ্রের দল দরাজ হাতে লাঠির ঘা মেরে মেরে সেগুলোর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটাবার আয়োজন পুর্ন করতে লাগল, ইঁদুরগুলো যতই পালাবার চেষ্টা করুক না কেন ঘরের চারদিক আগলে থাকা আমাদের চারজনের বেদম মারের সামনে অবশেষে শেষ ইঁদুরটাও পিষ্ট হয়ে গেল। ঘরের মাঝবরাবর একটা মড়া ইঁদুরের ঢিপি তৈরি হয়ে গেল, রক্ত আর পোড়া মাংসের গন্ধে বমি পাচ্ছিল। রুদ্রপ্রসাদ ক্লান্ত হয়ে নোংরা মেঝেতেই বসে থুকঃ করে একদলা থুতু ফেলে বললেন —'এগুলো সব নর্দমা থেকে উঠে আসা কাঁদামাখা জন্তু, দেবতাটির দেখছি স্ট্যান্ডার্ডের বালাই নেই'। একটা ইঁদুর কোনোক্রমে বেঁচে গেছে, অরিন্দম লাঠি হাতে সেটার দিকে তেড়ে যেতেই রুদ্র বললেন —'উহু! ওটাকে ফলো করে দ্যাখ তো কোত্থেকে ঢুকল'? অরিন্দম ইঁদুরটার পিছনে ধাওয়া করে রান্নাঘর ঘুরে এসে জানাল ড্রেনের মুখে চাপা দেওয়া ইটের আগল সরে গেছে, ইঁদুরটা ওখান দিয়েই পালাল। রুদ্রপ্রসাদ আমার দিকে চেয়ে বললেন —'সবার আগে তোমার ওই ইনজুরি গুলোর চিকিৎসা দরকার, তারপর অন্য কথা। আর হ্যা তুমি আমাদের সঙ্গে এখুনি রেনি পার্কের বাড়িতে যাচ্ছ, আশা করি বুঝতেই পারছ এখানে থাকাটা তোমার পক্ষে আর সেফ নয়'!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন