সঞ্জয় ভট্টাচার্য
উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলাম। মাথার মধ্যে চিন্তাগুলো সব যেন জট পাকিয়ে গেছে, তার সঙ্গে আসন্ন মৃত্যুর ভয় আমাকে একেবারে অস্থির করে তুলল। একটা সিট খালি বাস পেয়ে গন্তব্য না জেনেই বসে পড়লাম। পার্ক স্ট্রিটের মোরে বাসটা এসে দাড়াতেই আবার কিছু না ভেবেই নেমে পরলাম। পার্ক স্ট্রিটের আলো ঝলমল করা রঙচঙে দোকান রেস্টুরেন্ট পানশালাগুলোতে আমোদ পেয়াসী সুসজ্জিত নারীপুরুষের ঢল নেমেছে। এত আনন্দ উল্লাসের মাঝে নিজেকে অর্বাচীন মনে হচ্ছিল, হাটতে হাটতে রাসেল স্ট্রিটের মাঝামাঝি পৌঁছোতেই বিরক্তি চরমে উঠল, এর থেকে গঙ্গার হাওয়া খেতে যাওয়া ভালো, একটা হলুদ ট্যাক্সি দাড় করালাম, সামান্য চাকরি করি, ট্যাক্সির বিলাসিতা আমাকে পোষায় না, অন্তত এতদিন পোষায় নি, কিন্তু জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এত হিসেব নিকেশ করতে আর মন চাইছিল না। গঙ্গার দিকে যেতে বলে গাড়িতে চেপে বসলাম। চলন্ত গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে হুহু করে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল। এইসময় গঙ্গার হাওয়া খেলে নির্ঘাত জ্বর হতে বাধ্য, ভাবতেই হাসি পেল, শরীর খারাপ হলে নিশ্চয়ই চণ্ডরাজা নিজের দরকারে সারিয়ে নেবেন, আর সুস্থ থাকলে রুদ্রপ্রসাদ বলি দেওয়ার জন্য আবদার জুড়বেন। হঠাৎ বেশ রাগ হল, যদি কিছু লোক মরে কিছু লোকের সুখে যদি চোনা পরে তাতে আমার কি? মরে মরুক গে! আর আত্মার নরকস্থ হওয়া? আত্তা ফাত্তা দেখিনি জানিনা কি জিনিস, আগে তো প্রাণ ভরে বেঁচে নিই, পরে ভাবা যাবে। ট্যাক্সি আর্মেনিয়ান ঘাটের সামনে এসে দাঁড়াল। পকেট ঝেড়েঝুড়ে যা বেরোল তা ভাড়া চুকাতেই চলে গেল। ঘাটের উলটোদিকের ফুটপাথের উপর সৈনিক বেশে নেতাজির পূর্ণাবয়ব কাট-আউট দিয়ে সাজানো মঞ্চে তখন দেশাত্মবোধক গানের রেকর্ড বাজছিল। আজ তেইশে জানুয়ারি, নেতাজির জন্মদিবস। ছবির দিকে তাকিয়ে নেতাজির জীবনের কথা ভাবছিলাম।
চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে গেল, নারী কণ্ঠে বিলাপের স্বর কানে এল। একটা গাড়ি ঘাটের গেটে এসে দাঁড়িয়েছে তার থেকে নেমে কিছু লোক ঘাটের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছে, দলটার মধ্যে একজন মহিলা, মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে মাঝে মধ্যে বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠছেন। বুঝতে পারলাম এনার সন্তান বিয়োগ ঘটেছে। মহিলাটি মাঝবয়েসী, বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স হবে হয়তো, তা হলে কত বয়স হবে মৃত ছেলেটির! চব্বিশ কি পঁচিশ, কি এসে গেল? ওর আর বয়স বাড়বে না! দলটা জলের ধারে গিয়ে জড়ো হল, আমি একটু দূরে সরে গেলাম, এ জিনিস আগে আমাকেও দু-বার করতে হয়েছে, বাবা-মায়ের অস্থি বিসর্জন করতে এমনই কোনও ঘাটের ধারে কোনও একসময়ে আমিও হাজির হয়েছিলাম, মহিলাটির বিলাপ কানে আসছিল ''খোকা তুই কোথায় গেলি, ফিরে আয়'' শীতের রাতে এই ক্লেদাক্ত পরিবেশে আবার নতুন করে অনুভব করলাম কত ঠুনকো আর পলকা আমাদের অস্তিত্ব, অথচ কি সীমাহীন আমাদের জীবনের প্রতি মোহ।
মনের দুর্বলতা কেটে গেল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে রুদ্রপ্রসাদকে ফোন করে জানালাম—'আমি রাজি, বলুন কি করতে হবে'? রুদ্রপ্রসাদের উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেল—'আগে বল তুমি এখন কোথায় আছো'?
—'আর্মেনিয়ান ঘাটে'।
—'জয়ন্ত তুমি ওখানেই থাকবে, অন্য কোথাও যাবে না, আমি এখুনি আসছি'।
শীতের সন্ধ্যেয় গঙ্গার ঘাট একেবারে লোকশুন্য, কনকনে ঠান্ডা জোলো হাওয়ায় মাঝে মধ্যেই দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকি লেগে যাছিল, তাও বসে জলের শোভা দেখছিলাম, এই সব দৃশ্য হয়ত আবার দেখার সুযোগ ঘটবে না। ভাটার সময় দেখলাম জল অনেকদূর সরে গিয়ে ছড়ানো ছিটানো ময়লা, প্লাস্টিক, বিশ্রী টিনের টুকরো দাঁত বের করে বেড়িয়ে পরেছে। জলের দিকে চেয়ে নিবিষ্ট মনে চেয়েছিলাম, রুদ্রপ্রসাদের ডাকে পিছন ফিরে চাইলাম, উনি ঘাটে এসে হাজির হয়েছেন, ভদ্রলোক ঘাটের সিঁড়িতে আমার পাশে বসে পরলেন। দুজনে নিঃশব্দে গঙ্গার শোভা দেখছিলাম, কিছুক্ষণ পরে রুদ্রপ্রসাদ মৃদুস্বরে বললেন —'সবদিক ভেবেই সিদ্ধান্ত নাও, সঙ্কল্পে যদি সফল হও তাহলে কিন্তু পরিনতিতে তোমার মৃত্যু অবধারিত'। উত্তর দিতে একটু সময় লাগল, যথাসম্ভব শান্ত স্বরে বললাম -'আমার ভাবা হয়ে গেছে'। রুদ্রপ্রসাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন —'জয়ন্ত গর্বে আমার বুক ফুলে উঠছে, তপন আর সমীরণের মতো লোকগুলো যে এখনও এই দেশটার বারোটা বাজিয়ে দিতে পারছে না সেটা তোমার মতো দু-চারটে ছেলে আছে বলেই'। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম—'তাহলে এবার আমায় কি করতে হবে'? রুদ্রপ্রসাদ বললেন —'সবার আগে চণ্ডের দান ফেরত দিতে হবে, এক্ষেত্রে নৃপতিপুরের রাজবাড়ি'। আমার বিস্ময় চরমে উঠল, বললাম -'মানে! রাজবাড়ি আমি পেলাম কোথায়'? রুদ্রপ্রসাদ হেয়ালি করে বললেন —'এখনও হয়ত পাওনি কিন্তু পঁচিশ তারিখের পর নিশ্চয়ই পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে যাবে'।
—'কিভাবে'?
—'জয়ন্ত খবর তোমার কানে এসে পৌঁছোয়নি, কিন্তু তোমার জ্যাঠতুত দাদা কুণাল এইমুহূর্তে সাদা জ্বরের প্রকোপে কাহিল হয়ে পরেছে, অবস্থা মোটেই সুবিধের নয়'। রুদ্রপ্রসাদ দেখছি প্রতিমুহূর্তেই আমাকে অবাক করছেন, বললাম—'আপনি তো দেখছি সব খোঁজখবরই নিয়ে বসে আছেন'।
—'খোঁজ নেওয়ার থেকেও বেশি কিছু করেছি, কাল সকালে তোমার জ্ঞান ফিরতে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে পরেছিলাম, তোমার মনে আছে আশা করি। গেছিলাম নৃপতিপুরে তোমার এই মামলাবাজ দাদাটির খোঁজে, যেমনটি ভেবেছিলাম তেমনটাই পেলাম, দেখলাম কুণাল জ্ঞান হারিয়ে ঘরের মেঝেতে পরে রয়েছে, তোমাকে না জানিয়ে ওকে আমি এখানকার একটা নার্সিং হোমে ভরতি করেছি, দেবু ওর দেখাশোনা করছে। একমুহূর্ত আমার দিকে স্বপ্রশ্ন দৃষ্টে চেয়ে রুদ্র বললেন—'কাজটা আমি কি ঠিক করেছি, জয়ন্ত'? রুদ্রের প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে বললাম—'নৃপতিপুরে কুণালের কিছু আত্মীয় রয়েছে যারা ওর জন্য হয়ত দুশ্চিন্তা করছে! তাছাড়া ওর ছেলে তো বাইরে কোথাও থাকে, তাকে না জানিয়ে'! রুদ্র আমার কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন—'আত্মীয় স্বজন! ছোঁয়াচে রোগের ভয়ে সব পালিয়েছে! এই অবস্থায় ওর ছায়া মাড়াতেও কেউ রাজি নয়'।
—'কিন্তু ওর ছেলেকে তো খবরটা জানাতে হবে'।
—'খবর কাকে দেবে? যে মরতে বসেছে তাকে'!
—'মানে'?
—'মানে, দিন তিনেক আগে একটা পথ দুর্ঘটনায় কুণালের একমাত্র সন্তানটি সাংঘাতিকভাবে জখম হয়ে এইমুহূর্তে সাউথ চেন্নাই হসপিটালে চিকিৎসাধীন। ভেন্টিলেসন চলছে। কুণাল অবশ্য ঠিক সময়েই খবরটা পেয়েছিল, তড়িঘড়ি করে প্লেনের টিকিটও বুক করে ফেলেছিল কিন্তু শেষ অবধি ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো আর হোল না। রওনা হবার আগেই জ্বরের ঘোরে পরে গেল, আমি যখন গিয়ে পৌছলাম তখন ও বেহুঁশ হয়ে মেঝেতে পরে ছিল, জামার বুক পকেটে ছিল প্লেনের টিকিট আর হাসপাতালের ই-মেলের প্রিন্ট-আউট'। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম—'ছেলেটা কি বাঁচবে'?
—'পঁচিশ তারিখ বিকেল চারটে একত্রিশ পর্যন্ত! সূর্যাস্ত ওইসময়েই হচ্ছে কিনা! তারপর খুব সম্ভবত বাবা আর ছেলে দেশের দুটো ভিন্ন শহরে একই সময়ে মরতে চলেছে, এছারা আরও প্রায় সাতশো বত্রিশ জন সাদা জ্বরের রোগী, যারা এইমুহূর্তে শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভরতি, কেউ কেউ হয়তো একটু সেরেও উঠছে তারাও সবাই কিন্তু রাত কাটার আগেই একে একে মারা পড়তে বাধ্য, তবে এতসব কিন্তু সবেমাত্র সূচনা। এরপর যে কি ঘটবে সেটা ধারণা করা খুব মুশকিল ব্যাপার'। রুদ্রপ্রসাদ এবার আমার কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে বললেন—'শীতের রাতে গঙ্গার হাওয়াটা কিন্তু স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়, আরও দুটো দিন অন্তত আমাদের শরিরটাকে সুস্থ্য রাখতেই হবে'। উঠে পরলাম। ঘাটের সামনের রাস্তায় গাড়ি পার্ক করা ছিল, রুদ্র নিজেই চালিয়ে নিয়ে এসেছেন, আমি পাশে বসে বললাম—'তাহলে নেক্সট স্টেপ-টা কি'? রুদ্রপ্রসাদ স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন —'সবার আগে চণ্ডরাজার শিলাপাথর মন্দিরের বেদী থেকে খুঁড়ে বের করে নিতে হবে, পরবর্তি গন্তব্য হবে ভগীরথপূরের জঙ্গল-মন্দির, যেখানে ওই পাথর বেদীর ওপর রেখে আগুনে পুড়িয়ে দিতে হবে। যদি আমরা এই কাজে সফল হই তাহলে চণ্ডের পরাজয় হবে, সে পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেবে, তবে এই সাফল্যের মূল্য কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবন দিয়ে চুকাতে হবে, আগেই বলেছি তোমার জীবন আর চণ্ডের অস্তিত্ব একই সুতোয় জুড়ে রয়েছে'। শীতের রাতে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি হুহু করে ছুটছিল, অল্পসময়ের মধ্যে ইডেন গার্ডেন্স পেরিয়ে পার্ক স্ট্রিট মল্লিক বাজার হয়ে বালিগঞ্জের রাস্তায় এসে পড়লাম। এতক্ষণ আমরা কোনও কথা বলিনি এবারে আমি বললাম—'কুণালের সঙ্গে একবার দেখা করা যায় না'।
—'কাল সকালে সে ব্যবস্থা হবে, আজকের রাতটা ভালো করে বিশ্রাম নাও। আমারও কয়েক ঘন্টা ঘুমের ভীষণ প্রয়োজন'।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখন বেশ ঝরঝরে লাগছিল। রাত্রে বাড়ি ফিরে রুদ্রপ্রসাদ আমার হাতে কড়া ঘুমের ট্যাবলেট ধরিয়ে, নিজেও একটা খেয়ে নিলেন, সেটা না পেলে অবশ্য দুশ্চিন্তায় ঘুম আসত কি না বলা মুশকিল। তরতাজা মনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় সহজ হয়ে পরে, মনের সবরকম দ্বিধা-দ্বন্দ ঝেড়ে একটা জটিল সমস্যার চুড়ান্ত সমাধান করে ফেললাম, দু-পুরুষের মামলাটার এখানেই ইতি করতে হবে, এখন অপেক্ষা শুধু রুদ্রপ্রসাদের, সাড়ে সাতটা নাগাদ রুদ্রপ্রসাদ আর চায়ের পেয়ালা একসঙ্গেই চলে এলো। চা খেতে খেতে রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'তাহলে যুদ্ধের জন্য তৈরি তো জয়ন্তবাবু'! বললাম—'হ্যাঁ আমি রেডি, কিন্তু সবার আগে কুণালের সঙ্গে দেখা করতে চাই, তারপরে একবার কোর্টে যেতে হবে, একটা কাজ আছে'। রুদ্রপ্রসাদ ঘড়ি দেখে বললেন—'তাহলে তো প্রচুর কাজ আছে হে, চল তাহলে ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে পরা যাক'।
দক্ষিণ কলকাতার একটা বিখ্যাত নার্সিং হোমে যতক্ষণে পৌঁছোলাম ততক্ষণে ঘড়িতে প্রায় সাড়ে আটটা, হাসপাতালের ভিজিটিং আওয়ার্সের যদিও দেরি আছে কিন্তু রুদ্রপ্রসাদ আগে থেকে ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন তাই অবাধেই তিনতলার কন্টেজিয়াস ওয়ার্ডে পৌঁছে গেলাম। কুণালকে শেষ দেখেছিলাম বর্ধমান সদর আদালতে, কত সাবলীল আর আত্মপ্রত্যয়ী লেগেছিল সেদিন, আর আজ! এ যেন সেই ডাকাবুকো কুণালের ভগ্নাংশ মাত্র! না কামানো কাঁচাপাকা দাড়ি গজাঁনো গাল দুটো ভেঙে যেন কোটরে ঢুকে গেছে, কপালের শিরাগুলো বিশ্রীভাবে ফুলে নীলচে আভার সৃষ্টি করেছে, হাতের শিরায় স্যালাইন বোতলের নল ঢোকানো। হাউজ ফিসিসিয়ান দেখলাম রুদ্রের পরিচিত, দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলেন, রুদ্রপ্রসাদ জিগ্যেস করলেন—'কেমন আছে এখন'?
—'আগের থেকে ভালো, জ্ঞান ফিরেছে, এখন ঘুমোচ্ছে'।
—'দেখা করা যেতে পারে'? ডাক্তার সামান্য ইতস্তত করে বলল—'ঠিক আছে, তবে পেসেন্টের কিন্তু বেশি কথা না বলাই ভালো'। এরপর ডাক্তার নিজে থেকেই গিয়ে ধীরস্বরে কুণালকে ডাকতে ও হালকা চোখ মেলে চাইল। কুণালের চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট, কারণ ও আমাকে দেখতে পেয়েছে। দুর্বল স্বরে জিগ্যেস করল—'আমি এখানে এলাম কিভাবে'? রুদ্রপ্রসাদ বললেন— 'কুণালবাবু আপনার সাদা জ্বর হয়েছে, অজ্ঞান হয়ে ঘরের মেঝেতে পড়েছিলেন, রোগটা ছোঁয়াচে নিশ্চয়ই জানেন? আপনার নিজের লোকেরা কেউ দায়িত্ব নিতে চাইল না, আমি একপ্রকার বাধ্য হয়ে আপনাকে অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে এখানে নিয়ে এসেছি, তবে এতসব আমি করেছি আপনার এই ভাই জয়ন্তর জন্যে, যাকে আপনি পৈতৃক ভিটে থেকে উৎখাত করার কোনও চেষ্টায় বাকি রাখেন নি'। কুণাল এ কথার কোনও উত্তর দিল না শুধু হতবুদ্ধির মতো আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি এগিয়ে গিয়ে কুণালের হাতে চাপ দিয়ে বললাম—'এখন কেমন বোধ হচ্ছে? কুণাল হঠাৎ শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে বলল—'আমার ছেলে কৌশিকের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, ও কি বেঁচে আছে'? এবারেও রুদ্রপ্রসাদই উত্তর দিলেন, বললেন—'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমার ছোট ভাই একজন নামী ডাক্তার সে পরিচিত কলিগদের মাধ্যমে আপনার ছেলের খোঁজখবর রাখছে, ওর চিকিৎসায় কোনও ত্রুটি যে হবে না সে গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি, কুণালের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখ দিয়ে শুধু এটুকুই বের হল—'আচ্ছা'! রুদ্রপ্রসাদ এবার বললেন—'আর একটা কথা জেনে রাখুন আপনি আর আপনার ছেলে দুজনেই যদি এই ধাক্কা সামলে উঠে আরও কিছু বছর চালিয়ে যেতে পারেন, তার সব কৃতিত্ব কিন্তু আপনার এই ছোট ভাইটির'। আমি রুদ্রপ্রসাদকে থামিয়ে বললাম—'যাইহোক, কুণাল একটা দরকারি কাজে কলকাতার বাইরে যাচ্ছি, মনে হয় আমাদের আর কখনো দেখা হবে না। রাজবাড়ির প্রয়োজন আমার ফুরিয়েছে! আমার অবর্তমানে যাতে ও বাড়ির মালিকানা পেতে তোর অসুবিধে না হয় সে ব্যবস্থা অবশ্য করে যাব'। কুণাল বেকুবের মতো চেয়ে রইল। আমাদের কথার বিন্দু বিষর্গও সে বুঝতে পারেনি! আর এইমুহূর্তে না বোঝাটাই বাঞ্ছনীয়।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রুদ্রপ্রসাদ জিগ্যেস করলেন কোর্টে কি করতে যাবে? বললাম—'ভাবছি, রাজবাড়িটার দানপত্র করে যাব, যাতে পরে কুণালের দখল নিতে অসুবিধে না হয়'। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'অ্যাবসার্ড! উইল করতে কত সময় আর টাকা খরচ হয় জানো? সে সময় আমাদের দিচ্ছে কে'?
—'তাহলে'? রুদ্রপ্রসাদ সামান্য চিন্তা করে বললেন—'অবশ্য একটা এফিডেভিট করা যেতেই পারে, তবে সেটা কতটা কার্যকারী হবে সঠিক বলতে পারব না, তবে কিছুটা কাজে লাগবে নিশ্চয়ই'।
—'আর হ্যাঁ ব্যাংকে কিছু টাকা জমানো আছে সেটা জগন্নাথদা যাতে পায়'! রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'ব্যাংকে গিয়ে নমিনেসন ফর্ম ভরতে পারো তবে সেখানেও অনেক হ্যাপা, তার থেকে দুটো আলাদা আলাদা এফিডেভিট করা যাক, একটা কুণালের কাছে যাবে আর অন্যটা যাতে জগন্নাথ পায় সে ব্যবস্থা তুমি করবে'। পরের দু-ঘন্টায় দুটো ষ্ট্যাম্প পেপারে এফিডেভিট তৈরি হয়ে হাতে চলে এল। রুদ্রপ্রসাদ সেগুলো ব্যাগে পুরতে পুরতে বললেন—'আমার কাছে আপাতত থাকুক, রাতে দেবুকে দিয়ে যা বলার বলে দেব'। রুদ্রপ্রসাদ হঠাৎ বললেন—'জয়ন্ত আত্মীয়-বন্ধু কেউ আছে যার সঙ্গে শেষ দেখা করতে চাও'? উত্তর দিতে চিন্তা করার প্রয়োজন হল না, বললাম—'নাঃ আমার তেমন কেউ নেই। তবে একবার জগন্নাথদার বাড়ি যেতে হবে, কাগজটা দেবার আছে'। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'একটা কথা খেয়াল রেখো রাস্তায় বেশি ঘোরাঘুরি করাটা কিন্তু আমাদের দুজনের কারোর পক্ষেই ভালো নয়, তার থেকে দুজনের একসঙ্গে থাকাটাই নিরাপদ, আর হ্যাঁ তোমার কাজ মিটলে পর আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবে'?
—'কোথায়'?
—'গড়িয়ায়, ত্রিপুরেশ্বরী কালী মন্দিরে, চণ্ডের প্রাণ-ভোমরাটাকে মুক্তি দেওয়ার সময় এসে গেছে'। বললাম—'বেশ তো চলুন, যাব'। রুদ্রপ্রসাদ স্থিমিত স্বরে বললেন—'আজ সন্ধেটা দেবুকে বাড়িতে থাকতে বলেছি, ও ব্যস্ত মানুষ, কাজের জায়গায় অসুবিধে হবে, কিন্তু আমার অনুরোধ রাখবে বলেছে', একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না—'আপনি কি ওদের সব কথা খুলে বলে দিয়েছেন'?
—'মাথা খারাপ! তা হলে ওরা আমার কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না? অবশ্য একটা চিঠিতে সব লিখে রেখেছি, যতক্ষণে সেটা হাতে পাবে'। রুদ্রপ্রসাদ আর কিছু না বলেই কথা শেষ করলেন। গাড়ি এবার চলল ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের উদ্দেশ্যে, জগন্নাথদা আজকাল ওখানেই থাকেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন