সঞ্জয় ভট্টাচার্য
তপন সামান্য বিরতি নিয়ে বলল—'আমার কাহিনি এখানেই শেষ, এরপর দেড়টা বছর শুধু টাফ স্ট্রাগল করে গেছি। পেরেছি তার কারণ বোধহয় ভাগ্যও আমার কিছুটা সহায়, ছেলেটিকে চুরি করার পরের দিনই সি-আর-পি-এফ সমীরণের ডেরা ঘিরে ফেলে এনকাউন্টার করে ওর বেশিরভাগ স্যাঙাতকে যমের দুয়ার দেখিয়ে দিয়েছিল, নকশালদের দলের কয়েকজন আত্মসমর্পণ করে বাকি ঘাটিগুলোর খবর পুলিশকে দিয়ে দিয়েছিল, সমীরণ প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে পারলেও তার অবস্থা এখন রাস্তার কুকুরের মতোই, পুলিশের তাড়ায় কোনও জায়গায় স্থির হওয়ার জো তার আর নেই। তবে এতকিছুর পরেও বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করা যে কি কষ্টকর সেটা ভুক্তভোগীই জানবে। অচেনা পরিবেশ দেখলেই ছেলেটির নার্ভাস ব্রেকডাউন ঘটে যায়, তখন বিকট চিৎকার করতে করতে মুখ দিয়ে ফেনা তুলে অজ্ঞান হয়ে পরে। আজন্ম শুয়ে থেকে থেকে ওর চলাফেরার শক্তি একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে, দৃষ্টিশক্তিও রীতিমতো ক্ষীণ, পরে রক্ত পরীক্ষা করে জানতে পেরেছি এরমধ্যেই ডায়াবেটিসসহ আর কিছু জটিল স্নায়বিক সমস্যা ওকে ধরে নিয়েছে। ত্রিলোচনের কল্যাণে আর যাই হোক ছেলেটিকে মানুষের পর্যায়ে ফেলা যায় না। ছেলেটির যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করব সে সুযোগও পেলাম না কারণ বিপদ ততদিনে আমার ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে, এরপর শুরু হল আমার পলাতক জীবন, কখনও বাংলার কোনও গ্রামে, কখনও বা ঝাড়খণ্ডের মফঃস্বল শহরে তো কখনও আসামের কোনও অখ্যাত পাড়াগাঁ, কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারিনি, যেখানেই গেছি টের পেয়েছি শত্রুরা আমার পিছু নিয়েছে, একবার তো দেওঘরের বাজারে ক্ষণিকের জন্য একজন অচেনা লোককে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেছিলাম, দাড়ি-গোঁফ ছেঁটে আর দস্তুরমতো প্যান্ট-শার্ট পড়লেও ত্রিলোচন সেদিন আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। তবে আশ্চর্যের বিষয় ওরা দূর থেকে নজর রেখেই এযাবত ক্ষান্ত দিয়েছে, কিন্তু ঠিক কেন সে উত্তর আমার কাছে নেই, তপন একমুহূর্ত চুপ করে বলল—'এবারে আশা করি বুঝেছিস জানলাগুলো ওভাবে বন্ধ রাখার দরকার কেন হয়ে পরেছে, তা ছাড়া আর একটা ব্যাপার আমার উদ্বেগ বাড়িয়েছে, আজ মাংসের দোকানে বৃন্দাবন একটা পরিচিত মুখ দেখে দারুণ ভয় পেয়ে গেছিল, লোকটা সমীরণের অ্যাকশন স্কোয়াডের মেম্বার, একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ার ফলে বৃন্দাবন ওকে ভালোমতোই চেনে'।
আমি এতক্ষণ রুদ্ধশ্বাসে তপনের অভিজ্ঞতা শুনছিলাম এবারে ও থামতেই জিগ্যেস করলাম—'আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজনটাই বা কিসের? নিউজ কভার করেই তো তোর কাজ হয়ে যেত! বাকিটা পুলিশের কাজ'। তপন গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল—'নট ব্যাড, সেক্ষেত্রে নামডাক হয়ত কিছুটা হতো, প্রভাসদার শুয়ে পড়া কাগজ একটা ব্রেকিং নিউজ পেত, আর কে বলতে পারে হয়তো বড় কোনোও সংবাদপত্রের নজরেও পরে যেতে পারতাম। কিন্তু নাঃ সেটা হত বোকামো। বিরাট প্রাপ্তির সম্ভবনাকে পায়ে ঠেলে তুচ্ছ কানাকড়িতে মন ভরানো'! শেষের কথাগুলো বলে তপন একটা রহস্যময় হাসি হেসে সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন তপনের মুখের প্রতিবিম্ব উলটোদিকের দেওয়াল আয়নায় পড়েছে, সেদিকে চোখ পরতেই চমকে উঠলাম, কি হিংস্র আর পাশবিক লাগছিল সেই মুখের অভিব্যক্তি। তপন আমার দিকে স্থির দৃষ্টে চাইল, ওর দৃষ্টিতে কি যেন একটা ছিল, শিকারি বেড়াল যেমনভাবে ফাঁদে পরা নেংটি ইঁদুরকে জরিপ করে, যেন তেমন কিছু।
তামাকের ধোঁয়ার জালে বদ্ধ ঘরের ভুতুড়ে পরিবেশটা ক্রমশ আরও বেশি করে জমাট হয়ে আসছিল, তপন একটা জীবন্ত মাংসপিন্ড নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে! কি তার উদ্দেশ্য? তবে সেটা আর যাই হোক না কেন নিশ্চয়ই সৎ নয়! জিগ্যেস করলাম—'তা হলে তুই চণ্ডের প্রবাদে বিশ্বাস করিস'? তপন মৃদু হাসল, কথার উত্তর দিল না। বিপদের গন্ধ পাচ্ছিলাম, মনের ভাব গোপন করার চেষ্টা করে স্বাভাবিকভাবে জিগ্যেস করলাম—'এসব কথা আমাকে ডেকে এনে শোনালি কেন? আর ছেলেটাই বা কোথায়'?
তপনের ঠোঁটের কোণের রহস্যময় হাসিটা চওড়া হয়ে উঠল, অদ্ভুত স্বরে বলল—'প্রথম প্রশ্নের উত্তর হল তোর সাহায্য ছাড়া আমার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার নয়, এমন কিছু আছে যা শুধু তুই পারবি, সেজন্য একটু কষ্ট দিলাম। দ্বিতীয়টা হচ্ছে এবাড়ির স্টোর রুম'।
—'তোর মতলবটা কি বল তো'? তপন হঠাৎ নরম হয়ে অনুনয়ের সুরে বলল—'জয়ন্ত প্লিজ আমার কথাগুলো একটু মন দিয়ে শোন। আমাদের এই চেনাজানা জগতের পাশাপাশি এমন একটা প্যারালাল জগৎ আছে যার বিষয়ে আমাদের কোনও ধারণাই নেই। ঢেঙ্কানলের জঙ্গল আর পাহাড়ের প্রবাদ চণ্ডরাজার উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে প্রতিপালিত সাত বছর বয়সী রাজপুরুষের বলি নিবেদন করলে তিনি নরকের দরজা খুলে আবির্ভূত হন, যার বলির দানে তিনি দরজা খুলতে পারেন সেই ব্যক্তিকে অসীম ক্ষমতা প্রদান করেন, তবে এখানে যে নিয়মটা খাটে, ছেলেটিকে যেমন রাজ পরিবারের সন্তান হতে হবে তেমন বলিও তিনি শুধুমাত্র কোনও রাজপুরুষের হাত থেকেই গ্রহণ করবেন'। এতক্ষণে তপনের অভিসন্ধিটা পরিষ্কার হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল, বুঝলাম ও আমাকে রাজা ঠাউরেছে। রুঢ় স্বরে বললাম—'মনে হচ্ছে আমাকে দিয়ে কসাইয়ের কাজ করাতে চাস তাইত'? তপন তক্তপোষ থেকে উঠে এসে আমার হাত চেপে গাঢ় স্বরে বলল—'ক্ষুরটা শুধু গলার উপরে হালকা চেপে ধরবি, সামান্য একটু রক্ত ব্যস, বাকি যা করার আমি করব'। দারুণ রাগে গায়ের রক্ত যেন মাথায় চড়ে গেল, তপনের হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালাম, বললাম—'তোর মাথা খারাপ হয়েছে বলে তো আমারও হয়নি'। তপন বলল—'আসল কথাটা বলাই হয়নি, ভেবে দ্যাখ জয়ন্ত জীবনের যা কিছু স্বপ্ন, উচ্চাশা সব তুড়ি মেরে পূরণ করে ফেলব আমরা, আমি আর তুই। আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীদের মতো বাঁচব, সবকিছু আমাদের হাতের মুঠোয় হবে'। আমার হঠাৎ মনে হল তপনের মাথাটা বোধহয় বিগড়েছে! হয়তো সবই ওর বানানো গল্প। ভাবলাম ব্যাপারটা একবার তলিয়েই দেখা যাক, বললাম—'তা ছেলেটাকে আগে একবার দেখি তারপর নাহয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে'।
একচিলতে স্টোর রুমটা সিঁড়ির ঠিক নীচে। আগেই বলেছি এবাড়িতে ইলেকট্রিক আলোর বালাই নেই, মোমের হালকা আলোয় অন্ধকার যতটা দূর হচ্ছিল তার চেয়ে বেশি পরিমাণে যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছিল। বৃন্দাবন তালার ছ্যাঁদার মধ্যে চাবি ঘুড়িয়ে খুলছিল, এখানকার পরিবেশ গোটা বাড়ির তুলনায় যেন আরও মাত্রাতিরিক্ত অপয়া আর ভুতুড়ে, বিরক্ত হয়ে বললাম—'এখানে কোনও মানুষকে কেউ রাখতে পারে'? তপন মৃদুস্বরে বলল—'তোকে তো বলেইছি ও আলো সহ্য করতে পারে না, তা ছাড়া বাজে সব জিনিস সরিয়ে ঘরটাকে পরিষ্কার করে বিছানা পেতে দেওয়া হয়েছে, ও ভালোই আছে'। দরজা খুলে গেল। মোমের হালকা আলোয় কিছুই ঠাহর করতে পারছিলাম না। তপন বলল—'ঘরের কোণে খাট পাতা রয়েছে'।
এবারে তাকে দেখতে পেলাম, খাটের উপর বেকেচুরে শুয়ে থাকা একটা শীর্ণ মনুষ্যাকৃতি। আগেভাগে জানা না থাকলে একে মানুষ বলে ভাবতেও বোধহয় অসুবিধে হত। ছেলেটি কেমন যেন অসার মেরে পরে রয়েছিল। তপন মৃদুস্বরে বলল—'আফিং খেয়ে বেহুশ হয়ে রয়েছে'। মেরুদণ্ড দিয়ে বরফের স্রোত বয়ে গেল। তাহলে তপন এতক্ষণ সত্যি কথাই বলে চলেছে। বিপদের মুখে যে শুধু এই অর্ধমৃত মানব সন্তানটিই একমাত্র নয় আমিও পুরোমাত্রায় আছি সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে আর দেরি হল না। তপন বলল—'ত্রিলোচনের হিসেব মতো কাল ছেলেটির সাত বছর পূর্ণ হবে, সূর্যাস্ত চারটে বেজে সাতান্ন মিনিটে। ছ-টা নাগাদ সন্ধের অন্ধকার নেমে আসবে আর তারপরই আমরা ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলব'। মনের ভাব গোপন রেখে বললাম—'ভালো কথা বাইরে চল তা হলে'। বৃন্দাবন ঘরটায় ফের একবার তালা ঝুলিয়ে দিল। আমরা আবার একতলার বাইরের ঘরটায় চলে এলাম। তপন বলল—'তা হলে জয়ন্ত এবারে উপরে গিয়ে বসা যাক'। আমি সুযোগ বুঝে বললাম—'তপন মাথাটা কেমন যেন ভারী ভারী লাগছে, ভাবছি শোবার আগে একটু তাজা হাওয়া খেয়ে আসব। আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসছি'। তপন সন্দেহজনক দৃষ্টে চেয়ে বলল—'কিন্তু আজ রাতে যে আমাদের কারও, বাইরে যাওয়া চলবে না। কাল কাজ মিটে গেলে অবশ্য আর কোনও বাধা থাকবে না'। প্রতিবাদ করে বললাম—'তার মানে কি আমি তোর বন্দি'? তপন মাথা নেড়ে বলল—'ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর জয়ন্ত, সমীরণের লোকেরা এই বাড়ির উপর লুকিয়ে নজর রাখছে, তোকে ঢুকতে দেখেছে নিশ্চয়ই, এখন তুই রাস্তায়ঘাটে ঘুরলে যদি একটা বিপদ ঘটে তাহলে'! আমি পালটা যুক্তি দিতে যাচ্ছিলাম, তপন কান না দিয়ে বলল—'অবশ্য যতক্ষণ তুই এই বাড়ির ভিতর আছিস চিন্তার কিছু নেই, আমার কাছে বিপদের মোকাবিলা করার মতো অস্ত্র আছে'। তপন এবার ওর ফতুয়ার পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করল। রিভলভারটা আমার দিকে উঁচিয়ে তপন ঠাণ্ডা গলায় বলল—'দেখে নে জয়ন্ত! বিহারের মুঙ্গের থেকে জোগাড় করেছি, এটাকে দেশি পিস্তল বলে, লাইসেন্স নেই কিন্তু তাই বলে মানুষ খুন করা যাবে না এমন কিছু নয়'। তপন সামান্য কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে ধীরেসুস্থে বলল—'তা হলে উপরে গিয়ে বসা যাক'।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও তপনের সঙ্গে চললাম। প্রচণ্ড রাগে তখন আমি ফেটে পরতে চাইছি, তপন যেটা করছে সেটা বন্ধুত্বের নামে চরম বিশ্বাসঘাতকতা, কিন্তু এর যথোপযুক্ত শিক্ষা ওকে দিতে হলে আপাতত মাথা ঠাণ্ডা রাখতেই হবে। তপন ঘরে ফিরেই নির্বিকারে গল্প জুড়ল, গত দেড় বছরে যেসব অসুবিধে ভোগ করে ছেলেটাকে এতদূর নিয়ে এসেছে তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে লাগল। আমার শোনার মতো মন ছিল না। তপন যে ছেলেটাকে হত্যা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সে তো পরিষ্কার বোঝাই যাচ্ছে, তারপর ওর কাছে কার্তুজ ভরা একটা পিস্তলও রয়েছে, সামনা সামনি-বিরোধ করাটা বোকামি হতে পারে। ঘড়িতে বারোটা বাজতে তপন ব্যস্ত হয়ে পরল, বলল—'শুয়ে পরা যাক জয়ন্ত, এখন কালকের দিনটা ভালোভাবে কাটলে হয়'! তপন ডাক দিতেই বৃন্দাবন এসে আলো দেখিয়ে পাশের ঘরে নিয়ে গেল। ঘরে ঢোকামাত্র বৃন্দাবন বাইরে থেকে দরজা এঁটে দিল, তালা মারার শব্দটা কানে অসহ্য লাগল, জীবনে এই প্রথম মোবাইল ফোন ব্যবহার না করার জন্য সাংঘাতিক পস্তালাম। দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় কপালের দু পাশে শিরাগুলো দপদপ করতে লাগল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন