সঞ্জয় ভট্টাচার্য
গাড়িতে আসতে আসতে রুদ্রপ্রসাদকে জিগ্যেস করলাম—'আপনি রাজাসাহেবকে বলেননি, ওনার ছেলের গলায় ছুরি আমিই বসিয়েছিলাম'। রুদ্রপ্রসাদ শান্ত কণ্ঠে বললেন —'কি দরকার শুধুমুধু ওনার দুঃখ বাড়িয়ে, তা ছাড়া তুমি তো আর স্বেচ্ছায় কিছু করনি'। হোটেলে পৌঁছেই রুদ্রপ্রসাদ বললেন —'জয়ন্ত আর ঘন্টাখানেক সময় হাতে আছে। ঠিক বারোটার সময় আমরা ভগীরথপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব, এখান থেকে মোটামুটি তিন ঘন্টা লাগবে, ওখানে ক্যাপ্টেন বিকাশ সবরহাল দায়িত্বে রয়েছেন, উনিই আমাদের বাকি ব্যবস্থা করে দেবেন, ভগীরথপুর থেকে আট কিলোমিটার দূরে ঘন জঙ্গলের মধ্যে আজকের রাতটা আমাদের ক্যাম্প করে থাকতে হবে, আসল কাজ শুরু হবে কাল সকালে, সূর্য ওঠার পর, এবারে সবার আগে আমরা লাঞ্চ করব তারপরে স্নান সেরে বাকি কথা কি বল'?
—'সাধারণত আমি স্নান আগে করি, খাই পরে'।
—'আমিও', রুদ্র বললেন—'কিন্তু ইচ্ছে আছে পথে জংলা-চণ্ডী মন্দিরে মাকে প্রণাম করে যাব, আমাদের রাস্তাতেই পরবে। স্নান করেই তো মন্দিরে প্রবেশ করা উচিত, তাই না'।
—'বেশ চলুন তাহলে'। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা আবার লিফটে সওয়ার হলাম, এবার লক্ষ্য একতলার রেস্টুরেন্ট। রুদ্রপ্রসাদ টেবিলে বসে খাসির মাংস, ভাত অর্ডার দিয়ে বসলেন, আমি তখন মেনু কার্ড ঘাটছি, দেখেশুনে বললাম—'উঁহু আমি মাংস খাচ্ছি না, এদের মেনুতে ক্র্যাব আছে দেখছি, আমি ওটা খাব', রুদ্র উৎসাহিত হয়ে বললেন—'তাইতো! কাঁকড়ার ঝোল তো অমৃত-সমান, কতদিন যে খাইনি, বেশ দুটোই খাওয়া যাক তবে, কি বল'? আমার বলার অপেক্ষা না করেই অবশ্য রুদ্রপ্রসাদ মাংসের সঙ্গে কাঁকড়াও অর্ডার করে দিলেন, তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন—'জয়ন্ত খাবার আসতে তো মনে হয় মিনিট দশেক লাগবেই, ততক্ষণে তুমি একটু রিসেপশনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে এস না, আমাদের গাড়িটা এসে গেছে কি না'। রুদ্রপ্রসাদের কথামতো রিসেপশনে গিয়ে হাজির হলাম, চেক-ইন করার সময় যে মেয়েটিকে দেখেছিলাম এখনও তাকেই দেখতে পেলাম, বেঁটেখাটো শ্যামলা গড়ন, সুশ্রী চেহারা। আহামরি সুন্দরী কিছু না হলেও মেয়েটির মধ্যে একটা আলাদা চটক আছে অনুভব করলাম, রিসেপশন ফাঁকাই ছিল, মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল—'মে আই হেল্প ইউ স্যার'? আসার উদ্দেশ্য জানাতে মেয়েটি ফোন করে কারও সঙ্গে উৎকল ভাষায় খানিক কথা বলে জানাল—'ইয়োর কার কুড বি হিয়ার এনি মোমেন্ট'! ভালো কথা! চলে যাচ্ছিলাম, মেয়েটি এবারে আমাকে অবাক করে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল—'চিন্তা করবেন না স্যার আমাদের স্টাফ ড্রাইভাররা খুব পাংচুয়াল'। আমি বললাম—'আপনি বেশ বাংলা জানেন, দেখছি'।
—'এখানে এত বাঙালি টুরিস্ট আসে যে কিছুটা শিখে গেছি'।
—'আচ্ছা'! মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল—'আপনার জন্য আর কিছু করতে পারি স্যার? চেক-ইন করার সময় লক্ষ করেছিলাম মেয়েটি যেন আড় চোখে ফিরে ফিরে চাইছিল, সেটা কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগছিল। একটু সাহস করে বললাম—'হ্যাঁ মানে আপনি কি কাছাকাছির মধ্যেই থাকেন'? মেয়েটির চোখের তারায় বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল, একটু সময় নিয়ে বলল—'হ্যা ক্যানাল রোডে, এখান থেকে অটোয় পাঁচ মিনিট লাগে'। আমার হঠাৎ উদয় হওয়া সাহসের দুর্দান্ত গতিবেগ দেখে এবারে আমি নিজেই বিস্মিত হয়ে পরলাম, কেননা পরের প্রশ্নটা আমার মুখ দিয়ে ততক্ষণে বেড়িয়ে গেছে—'আপনি বোধহয় অবিবাহিত তাই না'? মেয়েটি হাঁসফাঁস করতে করতে বলল—'হ্যা স্যার, তাই'।
—'ফাইন! যদি আপনার নামটা বলতে আপত্তি না থাকে'?
—'সোনালি রাউত'।
—'বেশ সুন্দর নাম'। মেয়েটি খানিকটা গুছিয়ে উঠেছে কারণ সে আমাকে এরপর জিগ্যেস করল—'কিন্তু স্যার আপনার নামটা তো বললেন না'।
—'জয়ন্ত সিংহ রায়'।
—'আপনি কি কোনও কাজে এসেছেন নাকি হলিডে'?
—'কাজেই বলতে পারেন'।
—'ও'। এবার যে কি বলব বুঝতে না পেরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম, সোনালি আমার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল। কিছু বলা দরকার, কিন্তু কি যে বলি! হঠাৎ মোবাইলটা টুংটাং শব্দ করে আমাকে বাঁচিয়ে দিল, মেসেজ এসেছে রুদ্রপ্রসাদ পাঠিয়েছেন, বাংলায় লেখা এক লাইন 'বসে আছি পথো চেয়ে'। লাঞ্চের কথা ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম, সোনালির কাছে অনুমতি নিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে হাঁটা দিলাম।
আজকের দিনটা বড়ই আশ্চর্যের! এই আমি জয়ন্ত সিংহ রায় যে কিনা অপরিচিত মহিলাদের সঙ্গে সোজাসুজি কথা বলতেও এযাবৎ হেঁচকি তুলে এসেছে সে একজন সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে পরিচয় বিনিময়ের প্রথম ধাপটা পেরিয়ে এল! রুদ্রপ্রসাদ টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসেছিলেন, আমাকে দেখে বললেন—'কি হে খাবারগুলো যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল'। আমি একটা বাজে অজুহাত দিয়ে বসে পরলাম, রুদ্রপ্রসাদ হঠাৎ অদ্ভুতভাবে চেয়ে বললেন—'দ্যাখো আমরা একটা বিশেষ কাজে এসেছি, এইভাবে হোটেলের স্টাফদের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা করা আমাদের শোভা পায় না'। অবাক হয়ে বললাম—'কার সঙ্গে আবার ঘনিষ্ঠ হতে দেখলেন'। রুদ্র তর্জনী তুলে আমার পিছনে ইঙ্গিত করলেন, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম একটা চল্লিশ ইঞ্চি টিভিতে হোটেলের ভিন্ন ভিন্ন জায়গার ক্যামেরা ভিউ, রিসেপশনে এইমুহূর্তে সোনালি ল্যান্ড ফোনে কথা বলছে দেখলাম। বুড়োটা তাহলে বসে বসে আমার উপর নজর রাখছিল! লজ্জার মাথা খেয়ে খাবারে মন দিলাম, এখন মুশকিল হল এই বুড়ো ব্যাচেলরটাকে তরুণ হৃদয়ের উথালপাথাল কি করে বোঝানো যাবে জানিনা! চেষ্টা না করাটাই যুক্তিসঙ্গত। খেতে খেতে সোনালির কথাই ভাবছিলাম, মেয়েটি তেমন সুন্দরী হয়তো নয়, কিন্তু কি সুন্দর ওর ব্যবহার, এই প্রথম কোনও মেয়ে আমাকে এমনভাবে আকর্ষণ করল, যদি ওকে বিয়ে করতে পারতাম, অবশ্য আমি বাঙালি আর ও ওড়িয়া তাতে কি কোনও সমস্যা হতে পারে? কে জানে! হঠাৎ রুদ্রপ্রসাদ জলদগম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন—'হ্যাঁ হ্যাঁ তোমার চান্স আছে, আমি বলছি হবে'। দারুণ চমকে বিষম খেলাম,—'কি হবে? কীসের চান্স'? রুদ্রপ্রসাদের মুখ দুষ্টু হাসিতে ভরে উঠেছে, বললেন—'ওই যে রিসেপশনের মেয়েটার কথা ভাবছ তো, আমার মনে হচ্ছে ও তোমাকে বেশ পছন্দই করেছে, আর তোমাদের বিয়ে হওয়াটাও কিন্তু অসম্ভব নয়'।
—'আপনাকে কে বলেছে আমি কোনও মেয়ের কথা ভাবছিলাম'।
—'সেকি'! রুদ্রপ্রসাদ অবাক হওয়ার ভান করলেন—'তোমার বয়স আর স্বাস্থ্য থাকলে আমি কিন্তু ওই নিয়েই ভাবতাম'।
—'আমি অন্য বিষয়ে চিন্তা করছিলাম'। মুখে বড়সড় একটা মাংসের টুকরো পুরে রুদ্রপ্রসাদ বললেন—'সত্যিই অন্য কথা ভাবছিলে তাহলে'? এই বুড়োটাকে আমি এতদিন যতটা ধড়িবাজ ভাবছিলাম, এখন দেখছি তার থেকেও কয়েক কাঠি ওপরে। মনে মনে তুলোধোনা করে খাওয়ায় মন দিলাম। এর মধ্যে রুদ্রের মোবাইল বেজে উঠেছে, ড্রাইভার এসে গেছে, আর আমাদের এখনি ঢেঙ্কানলের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। পরের কুড়ি মিনিটের মধ্যে আমাদের দুজনের স্নান হয়ে গেল, আর আমরা একটা টাটা সুমো গাড়িতে চেপে হোটেল ছাড়লাম, মনে একটা আক্ষেপ রয়ে গেল সোনালির সঙ্গে বোধহয় এ জীবনে আর কখনো দেখা হবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন