অশোক দাশগুপ্ত
বাবা আর ছেলে তালকোটরা সুইমিং পুল স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে এসে কুড়ি মিনিট ধরে চেষ্টা করছে একটা অটোরিকশা বা ট্যাক্সি পাওয়ার জন্য৷ নানান রুটের বাস চলাচল করছে বটে কিন্তু ওরা জানে না কত নম্বরেরটা তাদের হোটেলের রাস্তা দিয়ে যাবে৷ নেহরু স্টেডিয়ামে এশিয়ান গেমসের উদ্বোধন দেখে ফেরার সময় একটা লোকের কথা শুনে বাসে উঠে তারা দিল্লির উত্তরপ্রান্তে চলে গেছল৷ তখনই ঠিক করে আর বাসে ওঠা নয়৷
‘আমাদের হোটেলের সামনে দিয়ে নিশ্চয়ই একটা না একটা বাস যায়৷ কন্ডাক্টারকে জিগ্যেস করে উঠে পড়ি, চল৷’ বরুণ সম্মতির জন্য ছেলের মুখের দিকে অনিশ্চিতভাবে তাকাল৷ বলুর ইচ্ছা বা অনিচ্ছা তার কাছে অনেক কিছুর থেকে প্রিয়৷ ‘কাছাকাছিও যদি যায় তাহলে, এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকার থেকে—’
‘কিন্তু গভর্নমেন্টেরই তো ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল৷ কত ফরেন ট্যুরিস্ট এসেছে, দেশের কত জায়গা থেকে লোক এসেছে, সবাই কি আর শুধু পাবলিক বাসেই চড়বে?’ বলুর স্বরে যতটা না বিরক্তি তার থেকেও সমালোচনার ঝোঁকটাই ফুটে উঠেছে৷ বরুণের তা ভাল লাগল, বিশেষ করে ‘গভর্নমেন্ট’ উচ্চারণটা৷
ভ্রূ তুলে সে কাঁধ দুটো ওপরে নিচে ওঠানামা করিয়ে বলল, ‘একটা গাড়ি পাবার জন্য এতক্ষণ ধরে ছোটাছুটি বিদেশে হলে কি এরকম হত?’
বলু চুপ রইল৷ বরুণ আপনমনে গজগজ করে বলল, ‘দেশের সব জায়গায় এই ব্যাপার! ...ট্যাক্সি, অটো, বাস, ট্রাম ঠিক সময়ে কিচ্ছুটি পাবার উপায় নেই... ফুটবল ম্যাচটা কটায়?’
ব্লেজারের হাতা তুলে ঘড়ি দেখতে গিয়ে বরুণের মনে হল বগলের কাছে সেলাই ছেঁড়ার শব্দ যেন শুনতে পেল৷ আটাশ বছরের পুরনো ব্লেজার৷ সুধা এতদিন যত্নে রেখেছে তাই মোটামুটি গায়ে দেবার মতো অবস্থায় রয়েছে৷ কিন্তু সুতো যদি পচে যায় কী আর করতে পারে৷ আটাশ বছর আগের গায়ের মাপও আর নেই৷ তখন সে ছিল এক মন আটাশ সের৷ চারদিন আগে হাওড়া স্টেশনে ওজন নিয়েছে৷ ছিয়াত্তর কেজি, মানে কত মন কত সের?
ট্যাক্সির দিকে বলু দৌড়ল, পিছনে বরুণও৷ কিন্তু সে কয়েক পা দৌড়েই থেমে গেল৷ ডাক্তারের মানা আছে শরীরকে দিয়ে হঠাৎ কিছু করানোয়৷ জোরে হেঁটে সে ট্যাক্সির কাছে পৌঁছল৷ লোকটি ভাড়া মিটিয়ে একবার ওদের দিকে তাকাল৷ ব্লেজারে চোখ পড়তেই বরুণের মুখের দিকে চোখ উঠল৷ একটা চেষ্টা লোকটির চাহনিতে ফুটে উঠল কয়েক সেকেন্ডের জন্য৷ ব্লেজারের পকেটের লেখাটা পড়ার চেষ্টা করল৷ তারপর আবার বরুণের মুখের দিকে তাকিয়ে, ফিকে হাসি ঠোঁটে টেনে দিয়ে পুলের গেটের দিকে এগিয়ে গেল৷
হঠাৎ একটা আত্মপ্রসাদ বরুণের মনে প্রাণে ছেয়ে এল৷
তাকাল কেন?
ব্লেজারটা কি খুব বেমানান লাগছে? ব্লেজার যত পুরনো হয় ততই কদর বাড়ে৷ এটা কি মিউজিয়ামে রাখার মতো অবস্থায় এসে গেছে? আমাকে কি খুব বয়স্ক দেখাচ্ছে?
লোকটা কি আমার দিকেই তাকিয়েছিল? আমাকে কি কেউ চিনবে?
বরুণ ছেলের দিকে তাকাল৷ ট্যাক্সির জানলা দিয়ে বলু রাস্তা, বাড়ি, গাছ, আলো গোগ্রাসে গিলে যাচ্ছে৷ এই প্রথম ও দিল্লিতে৷ সে প্রথম এসেছিল কবে? প্রথম ডুরান্ডে খেলতে৷ কোন সালে? বরুণের মুখে হাসি ফুটল৷ দেখতে দেখতে একত্রিশটা বছর কেমন পার হয়ে গেল৷
‘বাড়িগুলো কি সাজানো, বিউটিফুল, কি চওড়া চওড়া পরিষ্কার রাস্তা আর গাছ! কান ফাটানো হর্ন বাজে না৷’
বলু উত্তেজিত হয়ে উঠেছে দেখে বরুণ গম্ভীর মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘মনে রেখ এটা ইন্ডিয়ার ক্যাপিটাল আর এখানে চলছে এশিয়ার গ্রেটেস্ট বিগেস্ট স্পোর্টিং ইভেন্ট৷ ঝকঝকে ঝলমলে করে তো রাখতেই হবে৷ দেশের প্রেস্টিজের ব্যাপার এটা৷ ফরেন ডিগনিটারিজরা সব সময় আসছে যাচ্ছে...’
ব্লেজারের বগলের সুতো তাকে ভাবনায় ফেলেছে৷ যদি ছিঁড়ে গিয়ে থাকে তাহলে এখন সেলাই করাবে কোথায়?
‘ব্যাডমিন্টন দেখতে আর যাব না, তোর ইচ্ছে আছে নাকি?’
‘আর একদিনের টিকিট তো রয়েছে৷’
‘প্রকাশ নেই, ইন্ডিয়া থেকে একটা চ্যালেঞ্জ অন্তত তাহলে থাকত৷ ...স্টেডিয়ামটা করেছে কিন্তু জব্বর, আমাদের সময় এসব ভাবাই যেত না৷ পঁচিশ হাজার লোকের ইনডোর স্টেডিয়াম, দিল্লি দেখাল বটে!’
‘কাল একটা রাস্তার নাম দেখলাম কোপার্নিকাস মার্গ৷ এমন নামের রাস্তা কলকাতায়ও থাকা উচিত৷’
‘কেন আছে তো, শেক্সপীয়র সরণি!’
‘সায়েন্টিস্টের নামে থাকা উচিত৷’
‘আইনস্টাইন?’
‘হ্যাঁ৷’
বলু মুখ ফিরিয়ে হাসল৷ ‘কলকাতার মতো পলিটিক্যাল নেতাদের অকথ্য বাজে মূর্তি দিয়ে শহরটা নোংরা নয়৷’
‘ঠিক, কারেক্ট৷’ বরুণ বার-দুই মাথাটা বাতাসে ঠুকল৷ বলুর মন বয়সের তুলনায় যে অনেক ম্যাচিওরড এটা খুবই ভাল৷
এশিয়ান গেমসের জন্য তৈরি নতুন হোটেলটার ফটক দিয়ে ঢুকে পোর্টিকায় ওদের ট্যাক্সিটা থামতেই সেখানে অপেক্ষমাণ এক দম্পতি ব্যগ্র হয়ে এগিয়ে এল৷ বরুণ ভাড়া মিটিয়ে একবার মুখ ঘুরিয়ে দেখল নতুন যাত্রী কারা৷ টাক শুরু হওয়া, ভারী গতরের, শ্যামবর্ণ পুরুষটির চোখ তার ব্লেজারের বুক পকেটে সোনালি সুতোয় এমব্রয়ডারি করা: ‘ইন্ডিয়ান ফুটবল টিম৷ ম্যানিলা এশিয়ান গেমস ১৯৫৪’ অক্ষরগুলোর দিকে৷ অক্ষরগুলো বিবর্ণ, সুতো আলগা, চট করে পড়া যায় না, যদিও হোটেলের দরজায় যথেষ্ট আলো৷ সে লোকটির দিকে শরীর ঘুরিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল যাতে পড়তে পারে৷ লোকটি হাসি হাসি ভাব মুখে ফুটিয়ে চোখ তুলে তাকে দেখল৷ বরুণও সৌজন্যবশত হাসল এবং লক্ষ্য করল গাড়িতে ঢুকেই লোকটি বউকে কিছু বলল এবং ট্যাক্সি চলতে শুরু করা মাত্রই দু’জনে মুখ ঘুরিয়ে পিছনের কাচ দিয়ে তার দিকে তাকাল৷
বরুণ ভ্রূ কুঁচকে সিঁড়ির ধাপে পা রেখে বলুর দিকে তাকিয়ে দেখল ওর মুখে বিস্ময়৷
‘তোমার চেনা?’
‘এমনি৷’
আবার সে আত্মপ্রসাদ অনুভব করল৷ ’আশ্চর্য, এক একটা লোকের স্মৃতিশক্তি কী ভীষণ যে জোরালো হয়!’ নিজেকে শুনিয়ে বরুণ বলল৷
ঘরের চাবি নেবার সময় বরুণের মনে হল রিসেপশনিস্টের চোখ যেন তার বুক পকেটের ওপর তিন সেকেন্ডের জন্য বসেই উড়ে গেল৷ ছোকরাকে সে কাউন্টারে আগে দেখেনি৷ ওর মুখ দেখে মনে হল না ব্লেজারটা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কৌতূহল বোধ করছে৷ হয়ত ফুটবল ভালবাসে না কিংবা সিনেমা স্টার ছাড়া আর কিছুতে আগ্রহী নয়৷ ম্যানিলা গেমসের সময় নিশ্চয় ওর জন্ম হয়নি৷ বরুণ চ্যাটার্জি নামটা ওর বাবা-কাকা হয়ত জানতে পারে৷ অবশ্য যদি তারা যৎসামান্যও ফুটবল নিয়ে মাথা ঘামিয়ে থাকে৷
রিসেপশন লবির প্রান্তে টিভি সেটের সামনে সোফাগুলোয় ঠাসাঠাসি দর্শক, কিছু লোক দাঁড়িয়ে দেখছে৷ বলু সেদিকে এগিয়ে গেল৷ মেয়েদের ভলিবল ম্যাচ চলছে৷
‘বলু হারি আপ, ফুটবল ম্যাচ কটায়?’
বরুণ বাঁহাতটা তুলতে গিয়ে তুলল না, লবির দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাল৷
বরুণ লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ভাবল, লোকটা কে হতে পারে? সে কুড়ি-একুশ বছর আগে খেলা ছেড়ে দিয়েছে, লোকটার বয়স কম করেও চল্লিশ বিয়াল্লিশ৷ দেখে তো মনে হল বাঙালি, হয়ত কলকাতার লোক এখানে চাকরি করতে এসেছে৷ যদি সতেরো বছর বয়সেও, সেটা এখন বলুর বয়স, মাঠে যাতায়াত শুরু করে থাকে তাহলে নিশ্চয় তার নাম শুনেছে তো বটে, খেলাও দেখেছে৷ চেহারা মনে রাখা এমন কিছু শক্ত নয়৷ কাগজে বছরে দু-তিনবার ছবি বেরতই, অবশ্য ছবিগুলো বেশিরভাগই চব্বিশ পঁচিশ বছর বয়সের৷ তাহলেও একটু মোটা হওয়া আর সামনের দিকের চুল উঠে যাওয়া ছাড়া সে প্রায় কিছুই বদলায়নি৷
লোকটা কি আমায় চিনেছে, নাকি নিছকই ব্লেজারটার জন্য কৌতূহল৷
তবু সে আবার আত্মপ্রসাদ অনুভব করতে করতে টের পেল এই এশিয়ান গেমসের মাঝে সেও যেন একটা ভূমিকায় রয়েছে৷ কিছু একটা তাকে করতে হবে৷ বলুর ওই ‘তোমার চেনা?’ কথাটা আর অবাক চোখে তাকানো, তাকে যেন পথ দেখাল৷ বরুণ বহুদিন বাদে নিজের অস্তিত্ব যেন খুঁজে পাচ্ছে৷ ছেলের কাছে তার আলাদা একটা পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ এসেছে৷ এমন সুযোগ কলকাতায় কখনও পায়নি, সেখানে এই ব্লেজার পরলে লোকে হাসবে৷ দিল্লি এশিয়ান গেমসের কাছে সে কৃতজ্ঞবোধ করল৷
লিফট থেকে কিছু লোক বেরিয়ে এল৷ বরুণ লক্ষ্য করল না তাদের মধ্যে একজন একবার থমকে তার দিকে তাকিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেল৷ বরুণের নজর তখন বলুর দিকে৷ ছেলেটা জমে গেছে টিভি-র সামনে৷
ভ্রূ কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড ছেলের দিকে তাকিয়ে বরুণ চ্যাটার্জি কোটের হাতা টেনে তুলে ঘড়ি দেখল৷ চট করে কী একটা হিসেব করে নিয়েই দ্রুত বলল, ‘পনেরো মিনিট, বড় জোর কুড়ি... তৈরি হয়ে নাও৷ গরম মোজা পর, ফুলহাতা সোয়েটারটা, জ্যাকেটটা আর টুপিটাও নাও৷ ওভারকোটটা হাতে নিও৷ আমি ততক্ষণ বাথরুমের থেকে ঘুরে আসছি৷ চা বলছি, কিছু খাবে কি? একদম খালি পেটে থাকা উচিত নয়, ফিরতে ফিরতে দশটা হয়ে যাবে, কাল কটায় ফিরেছিলাম আমরা?... স্যান্ডুইচ বলছি৷ আর শোনো, তোমার ওই জিনসের প্যান্টটা বদলাও৷ দিল্লির ঠান্ডা কী জিনিস তা তো জানো না, গরম প্যান্টটা পরে নাও৷ আমরা যখন ডুরান্ড খেলতে আসতাম...’
বরুণ টেলিফোন তুলল৷
‘স্পিকিং ফ্রম রুম নাম্বার ফোর জিরো ফাইভ, ইয়েস ইয়েস চারশো পাঁচ, দো প্লেট চিকেন স্যান্ডুইচ ঔর এক পট চায়ে ভেজ দেনা... সেন্ড কুইকলি প্লিজ৷’
আড়চোখে সে ছেলের দিকে তাকাল৷ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ছে৷ ক্লাস নাইন৷ মোটামুটি ফরফরিয়েই বলে, উচ্চারণটাও অন্যরকম৷ ওর সামনে ইংরেজিতে কারুর সঙ্গে কথা বলতে অস্বস্তি হয় বরুণের৷ সে বাহান্ন সালের আই এ পাস৷ কলেজে থার্ড ইয়ার আর্টসে শুধু নামটাই যা লেখানো ছিল, পড়াশুনো আর হয়নি৷ ফুটবল খেলার জন্য মাঠে মাঠে ঘোরাঘুরি করেই পড়ার পাট চুকিয়ে দেয়৷ দুবার সে ভারত দলের সঙ্গে বিদেশেও গেছল তার একটি ম্যানিলায় এশিয়ান গেমসে, কিন্তু ইংরেজি বলাটা রপ্ত করতে পারেনি৷ জীবনের প্রথম তিরিশ বছর ইংরেজিতে কথা বলার দরকার বা সুযোগ হয়নি৷
সে মুখচোরা তার ওপর সব সময়ই ভয়, ব্যাকরণ অশুদ্ধ ইংরেজি বলে অন্যদের অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠবে৷
বলু পিছন ফিরে প্যান্ট নামিয়ে পা থেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছে৷ ভাল স্বাস্থ্য, খেলায় আগ্রহী, স্কুল টিমে সেন্টার স্ট্রাইকারে খেলে৷ খেলতে চাইলে খেলুক, তার আপত্তি নেই৷ নিজের চেষ্টায় গড়ে তোলা পেইন্টের এজেন্সির ব্যবসা, তিনতলা বাড়ি যা থেকে মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়াও পাচ্ছে আর সল্টলেকে চার কাঠার জমিটা, এ সবই ও পাবে৷ অর্থাভাব হবে না৷ নামী ফুটবলার হলে খ্যাতি-পরিচিতি সম্মান পাবে যেমন সে নিজে একদা পেয়েছে হয়ত আজও পায়৷ ... এখনও কি পায়? কেউ কি তাকে চেনে বা চিনতে পারবে?
বলু তার একমাত্র ছেলে৷ আজকালকার চ্যাংড়া, অসভ্য নয়, বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে, পড়াশুনোয় ভাল, দেখতেও সুন্দর হয়েছে, মুখখানি ওর মায়ের মতো৷ বরুণ ছেলেকে ভালবাসে৷ ছেলের চোখে নিজেকে বড় করে তুলে ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়৷ সফলও হয়৷ গতমাসে বলু দুটো অটোগ্রাফ বইয়ে তার সই করিয়ে নিয়ে গেছে৷
‘ওভারকোটটা নেব না, এমনকী ঠান্ডা!’
‘না না ইউ মাস্ট... অবশ্যই নেবে৷ ঠান্ডাটা ভীষণ ট্রেচারস এখানে৷ মনে হবে লাগছে না কিন্তু... দিল্লিতে সন্তোষ ট্রফি খেলতে এসে আমার লেগেছিল৷ হেঁটে ফিরছিলাম নাইট শোয়ে সিনেমা দেখে... তোমাকে তো সে গল্প করেছি৷ বুকে চাপ চাপ সর্দি, একটা ম্যাচও ফাইনালের আগে খেলতে পারিনি, অবশ্য আমার গোলেই বেঙ্গল ট্রফি জিতেছিল৷ মনে রেখ খোলা স্টেডিয়ামে বসতে হবে, একদমই এই ঠান্ডাকে অবহেলা করবে না৷’
বরুণ বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল এবং দশ মিনিট পরেই বেরিয়ে এল৷ ততক্ষণে চা, স্যান্ডুইচ এসে গেছে৷ বলুর একহাতে স্যান্ডুইচ অন্য হাতে চামচ নাড়ছে চায়ে৷
‘টিকিটগুলো দেখে নাও, তারিখ ঠিক আছে কিনা চেক কর৷’
বরুণ দ্রুত সোয়েটারটা পরে নিয়ে খাটের ওপর রাখা তার আটাশ বছর আগের আকাশি নীল ব্লেজারটা স্নেহভরে তুলে নিল৷ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে লাল আধ ইঞ্চি একটা সুতো খুঁটে তুলে নিল৷ ঘাড়ের কাছে টোকা দিয়ে ধুলো ঝাড়ল৷ তারপর সন্তর্পণে হাত গলিয়ে পরতে লাগল৷ পেটের কাছে বোতামটা আঁটা যায় না, কাঁধেও চাড় পড়ে৷ বরুণ কুঁকড়ে থাকে ব্লেজারটা গায়ে দিয়ে৷ সব সময় তার ভয় হয়, এই বুঝি সুতো ফেটে গেল৷ ’কমাতে হবে, বড্ড চর্বি জমে গেছে’, প্রতিবারই ব্লেজারটা গায়ে দিয়ে সে মনে মনে বলে৷ এখনও বলল৷
বলু দুটো টিকিট বরুণের অ্যাটাচি কেস থেকে বার করে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘ঠিকই আছে, এই তো আজকের তারিখই লেখা!’
‘তবু দেখে নেওয়া ভাল৷ সিঙ্গাপুরে একবার আমাদের...’
সে থেমে গেল৷ বলু ঝুঁকে জুতোয় ফিতে বাঁধছে, কথাগুলো শুনছে না৷ সম্ভবত সতেরো আঠারো বার শুনেছে৷ স্যান্ডুইচ-চা খেয়ে বরুণ ঘরের চারিদিকে চোখ বোলাল৷ আয়নায় নিজেকে দেখে নেবার সময় কানের পাশ থেকে টাকের ওপর টেনে আনা চুলে সে আলতো চাপড় দিল৷
‘দেখে নাও তো বারান্দার দরজাটা লক করা আছে কিনা৷’
নিজেও সে টেনে দেখল সুটকেস দুটোয় চাবি দেওয়া কিনা৷
‘যদিও চুরি যাবে না জানি, বড় হোটেলে বেয়ারাদের তুমি বিশ্বাস করতে পার, তবু অভ্যাসটা থাকা ভাল৷ সবসময় সাবধান হবে, চল এবার৷’
ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় চাবি দেবার আগে বরুণ টাকার ব্যাগ খুলে পরিমাণটা দেখে নিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসল৷
‘আজ কনট প্লেসে কাকেদায় খাব৷ ঝাল ঝাল বেশ লাগে, তবে বড্ড রিচ ওই এক আধবারই খাওয়া ভাল৷’
রাস্তায় বেরিয়ে ওরা অপেক্ষা করতে লাগল অটোরিকশার জন্য৷ হাত নেড়ে একটা খালি রিকশাকে দাঁড় করিয়ে বরুণ বলল, ‘নেহরু স্টেডিয়াম৷’
মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানিয়ে অটোওয়ালা চলে গেল৷ দু’জনে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে হাঁটতে শুরু করল৷
‘এইখানেই দাঁড়াই৷’
সংসদ মার্গ আর অশোক রোডের মোড়ে রাস্তার আলো যেখানে উজ্জ্বল, বরুণ সেখানে দাঁড়াল৷ ব্লেজারটা চোখে পড়ার মতো আলো এখানটায়৷
‘এই এক ঝামেলা, বাবুদের অনুমতি নিয়ে তবে অটোয় উঠতে হবে৷’
‘কলকাতার ট্যাক্সিওয়ালারাও তাই করে৷ অবনক্সাস, আমরা যে কত আন্ডার-ডিভেলাপড, এই থেকেই বোঝা যায়৷’
ইংরেজি শব্দগুলো বরুণের ভাল লাগল৷
‘আর আমরা কিনা থার্ড ওয়ার্ল্ডের নেতা!’
বরুণের মনে হল, ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ শব্দটা ফুটবলার হিসাবে ভারতে সে প্রথম উচ্চারণ করল৷ এখনকার ক’টা ফুটবলার পারবে?
‘ধর ধর, বলু৷’
ওদের দেখে অটোরিকশাটা নিজে থেকে শুধু থামলই না, নেহরু স্টেডিয়াম বলা মাত্র যেতে রাজি হয়ে গেল৷
স্টেডিয়াম থেকে প্রায় আধ মাইল দূরে ওদের নামতে হল৷ স্রোতের মতো লোক চলেছে৷ তাদের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে ওরা স্টেডিয়াম পৌঁছল৷ সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বরুণ তারই বয়সী ব্লেজার পরা এক শিখকে দেখে স্মিত হেসে মাথা হেলাল৷ লোকটি এক হাত সামান্য তুলে মাথা ঝাঁকাল সামান্য এবং দ্রুত উঠে গেল৷ ওর ব্লেজারে টোকিও এশিয়ান গেমস ১৯৫৮ লেখা৷ কোন টিমে ছিল সেটা আর পড়া হল না, বোধহয় অ্যাথলেটিকস কিংবা হকির কেউ৷
‘তোমার চেনা নাকি?’
‘আমার? কই না তো!’
‘হাত তুলল দেখলাম৷’
‘তাই নাকি! হয়ত চিনতে পেরেছে৷’
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবল ম্যাচ৷ পঁচাত্তর হাজার লোকের স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরা৷ কোনওক্রমে ওরা দু’জন জায়গা করে বসল৷ ওদের আশেপাশে যে অধিকাংশই বাঙালি সেটা কথাবার্তাতেই বোঝা যাচ্ছে৷
‘টুপিটা এবার পরে নাও৷’
‘পরে৷’
‘না না এখনই, দিল্লির ঠান্ডা বড় ট্রেচারাস৷’
অনিচ্ছাভরে বলু টুপি মাথায় দিল৷ কান দুটো ঢাকা পড়েনি, কিনারা ধরে বরুণ টুপি টেনে নামাল৷
ভারত দু’গোলে জিতল৷ ঠেলাঠেলি করে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বরুণের পাশের লোকের মন্তব্যের জবাবে একজন বলল, ‘থার্টি ইয়ার্ডস থেকে প্রসূন দুটো শট নিল আর দুটোতেই গোল, কোনও ইন্টারন্যাশনাল স্টান্ডার্ডের গোলকিপার কি ওই শটে গোল খায়৷’ ‘নিশ্চয় খেতে পারে... কি দুর্দান্ত শট আর কতটা সোয়ার্ভ করেছিল!’
‘আমরা যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে বলের সোয়ার্ভ দেখা যায় নাকি? কি সব গুলগাঁজা মারছিস৷’
দু’জনের গলার স্বর ক্রমশ চড়ে উঠছে, বহু লোক ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে, শুনছে৷ নিচের ধাপে বলুর দিকে একটু ঝুকে বরুণ বলল, ‘থার্টি কেন ফর্টি ইয়ার্ডস থেকেও গোল হতে পারে, রোভার্সে সঞ্জীবকে গোল দিয়েছি প্রায় ফর্টি ইয়ার্ডস থেকে, সঞ্জীব তখন ইন্ডিয়ার বেস্ট তো বটেই, ওয়ার্ল্ডেরও ওয়ান অফ দ্য বেস্ট ছিল৷’
যতটা গলা নামিয়ে বললে বলু শুনতে পায় বরুণ ততটা নামায়নি৷ অনেকের মাথা পাশে ফিরল পিছনে ফিরল৷ তীক্ষ্ণ চোখগুলো তার মুখটাকে খুঁটিয়ে দেখেই ব্লেজারের দিকে উৎসুকভাবে নেমে গেল৷ ভিড়ে বুক পকেটটা আড়াল পড়ে গেছে, বিশেষ করে সামনে বলু৷ বয়সের তুলনায় বড় বেশি লম্বা হয়ে গেছে৷
কৌতূহলী কয়েকটা প্রশ্ন ফিসফিস হল৷ ‘কে রে লোকটা?’
‘ইন্ডিয়া টিমের ব্লেজার... কোন সাল দেখ তো?’
‘বাবাদের আমলের৷’
‘চিনতে পারিস?... কোন ক্লাবে খেলত?’
‘নাম জিজ্ঞেস কর না?... লজ্জা কিসের কর না?... দাদা, আপনার নামটা বলবেন?’
‘বরুণ চ্যাটার্জি৷’
ঈষৎ অবহেলা ভরে সে বলল৷ কেউ আর কোনও প্রশ্ন করল না৷ সে আড়চোখে দু’পাশে তাকিয়ে মুখগুলো লক্ষ্য করল৷ নির্বিকার৷ সদ্য দেখা খেলাটি নিয়ে আবার মন্তব্য চলতে লাগল৷ কেউ তার দিকে আর তাকাল না৷
স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে প্রায় আধ মাইল হেঁটেও ওরা কোনও অটোরিকশা বা ট্যাক্সি পেল না৷ বাসে উঠল না৷ কেন না বাস কোথায় যে নিয়ে পৌঁছে দেবে সে সম্পর্কে বরুণের ভীতি আছে৷
‘এখানেই দাঁড়াই৷’
‘কালও এরকম হয়েছিল৷ বিকেলে তালকোটরা থেকে ফেরার সময় তো এরকম অসুবিধে হয়নি৷’
পর পর দুটো ট্যাক্সি চলে গেল লোক ভর্তি হয়ে৷ এক অটোরিকশাওয়ালা প্রত্যাখ্যান করল তাদের তুলতে৷
‘চল আর একটু পিছিয়ে গিয়ে মোড়টায় দাঁড়াই৷’
রাস্তাটা নির্জনই ইতস্তত কিছু পথচারী ছাড়া৷ শুধু একটা লোক, বোধহয় তাদের মতোই, বাহনের জন্য অপেক্ষা করছে৷ কিছুক্ষণ পর লোকটি এগিয়ে এসে বলল, ‘আপনারা কতদূর যাবেন?’
‘জনপথ রোড, হোটেল অলিভ৷’
‘আহ, আমি তো কাছেই অশোক যাত্রীনিবাসে, ভালই হল... দেখেছেন ট্রান্সপোর্টের কি দুর্দশা, কুড়ি মিনিট দাঁড়িয়ে৷’ বলতে বলতে লোকটা বরুণের ব্লেজারের দিকে তাকাচ্ছিল৷ ‘আপনি ফিফটি ফোর এশিয়ান গেমসের৷ আমি ফিফটি ওয়ানের সাইক্লিং টিমে স্ট্যান্ড বাই ছিলাম... জিমি দস্তুর৷’
হাত বাড়িয়ে দিতেই বরুণ ধরে ঝাঁকাবার সময় লোকটার মুখের দিকে তাকাল৷ টার্টলনেক ভারী লাল সোয়েটারটা চমৎকার মানিয়েছে গায়ের ফর্সা রঙের সঙ্গে৷ ঘন ভুরু, মাথার সামনের দিকে টাক৷ কপালে কাটা দাগ৷ দস্তুর তারই বয়সী প্রায়৷
‘একসঙ্গেই যাওয়া যাবে৷ কিন্তু...’ বলতে বলতেই দস্তুর ছুটল হাত তুলে, ‘ট্যাকসিইই, ট্যাকসিইইই...’
ট্যাক্সিটা থেমে গেল৷ ড্রাইভারের সঙ্গে কয়েকটা কথা বলে দস্তুর ওদের হাত নেড়ে ডাকল৷ ওরা পৌঁছতেই দরজা খুলে ধরে বলল, ‘উঠুন, ভাগ্যটা আমাদের ভালই৷ পাওয়া গেছে তবু৷’
পথে এক সময় দস্তুর বলল, ‘আমি বোম্বাইয়ের লোক, ফুটবল প্রায় দেখি, ভাল লাগে৷’
‘আমি আটবার রোভার্সে খেলেছি, দু’বার ফাইনালে৷’
‘সত্যি! কী নাম আপনার৷ কোন ক্লাবে খেলেছেন? এ কি আপনার ছেলে?’
‘বরুণ চ্যাটার্জি... মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল দুটো ক্লাবেই, ফিফটি থেকে ফিফটি নাইন, হ্যাঁ আমার ছেলে৷’
বলু হেসে হাত বাড়িয়ে দিল৷
‘তাহলে নিশ্চয় আপনার খেলা দেখেছি৷ আপনার নামটা শুনেছি মনে হচ্ছে, আচ্ছা, আই সি এল-এর সঙ্গে ফিফটি টুয়ে কি খেলেছেন?’
‘হ্যাঁ৷’
‘গোল দিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ৷’
‘তাই বলুন, দারুণ গোল... দারুণ দারুণ! এখনও চোখে ভাসছে... রাইট আউট চিপ করল, আপনি ধরেই দু’জনকে ডজকরে কোনাকুনি শট নিলেন, তা প্রায়... কত গজ হবে... টোয়েন্টি? টোয়েন্টি-ফাইভ?... তাই কি?’
‘ফর্টি ইয়ার্ডস৷’
বলু নিঃশ্বাস চেপে অস্ফুটে বলল৷
ঘন ভুরু দুটো জুড়ে নিয়ে দস্তুরের চোখে বিভ্রান্তির ছায়া পড়ল৷
‘ফ...র...টি! তাই কি? গোলে তো সঞ্জীব ছিল৷’
‘হ্যাঁ, ফরটি... আমার মনে আছে৷’
বরুণ বিনীত নম্রস্বরে তথ্যটি পেশ করল বটে কিন্তু মনে মনে অনিশ্চিত উদ্বেগ নিয়ে৷
‘তা হবে৷ কিন্তু দারুণ গোল হয়েছিল৷ এখনও চোখে ভাসে৷’
দস্তুর আগে ওদের নামিয়ে দিতে চাইল৷ বরুণ আপত্তি জানাল, ট্যাক্সি ভাড়া সে দিতে চায়৷ অবশেষে ঠিক হল দু’জনের হোটেলের মাঝামাঝি জায়গায় তারা নামবে, তাহলে দুশো গজের বেশি কাউকেই হাঁটতে হবে না৷
‘কিন্তু ভাড়া আমি দেব৷’
বরুণ জেদ ছাড়েনি৷ এই প্রথম সে একজনকে পেল যে তার গোলের কথা মনে রেখে দিয়েছে৷ লোকটিকে ছাড়তে তার ইচ্ছে করছে না৷
‘বাবা আমরা তো এখন কাকেদায় খেতে যেতে পারি, ট্যাক্সি না ছাড়লেই তো হয়৷’
বরুণ তাজ্জব হয়ে গেল৷ কি আশ্চর্য, এই সহজ সরল সমাধানটা এতক্ষণ তার মাথায় আসেনি কেন! ফুটবল খেলার দিনগুলোয়, কেউ তো তাকে বলতে পারেনি ‘মাথামোটা’৷ অথচ বলু কেমন বুদ্ধিমানের মতো...৷
‘বাবা ওঁকেও আমাদের সঙ্গে খেতে বলো৷’
বলু কানের কাছে মুখ রেখে বলল৷ বরুণ প্রায় লাফিয়ে উঠল৷
ট্যাক্সিওয়ালাকে কনট প্লেসে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে সে দস্তুরের হাত চেপে ধরল৷
‘মিস্টার দস্তুর, আজ আমাদের সঙ্গে আপনি ডিনার করবেন৷... না না প্লিজ, আমার ছেলের অনুরোধ৷’
কিছু একটা আপত্তি তোলার চেষ্টা করতে গিয়েও বাবা আর ছেলের সাগ্রহ মুখ দুটি দেখে দস্তুর হেসে, হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল৷
‘আজ কার মুখ দেখে যে উঠেছিলাম৷ তবে ট্যাক্সি ভাড়া আমি দেব৷’
‘সে আপনার খুশি৷’ বরুণ উদারভাবে অনুমতি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল৷
কাকেদা রেস্টুরেন্টে দোতলায় তক্ষুনি একটা টেবল খালি হয়েছে, তাই ওদের আর অপেক্ষা করতে হয়নি৷
বরুণ খাবারের মেনুটা দস্তুরের সামনে এগিয়ে ধরল৷
‘আপনি যা পছন্দ করবেন৷’
‘আমি খুব ঝাল খাই না৷ নান আর ডিমের তরকা, রাতে পেটভরে খাওয়ার অভ্যাস নেই৷’
‘বরুণকে অবাক এবং হতাশ দেখাল৷ সে ভেবেছিল দস্তুরকে চোব্যচোষ্য খাইয়ে, রোভার্সে তার গোল দেওয়ার কথাটা মনে রাখার জন্য ঋণ শোধ করবে৷’
‘আপনারা যা খেতে চান খান না, আমি রাতে বেশি খাই না৷’
‘আমরাও খুব বেশি খাই না৷ বলু তুই অর্ডার কর৷’
মেনু কার্ড পাশে ছেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে সে মুখ নামিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘প্লেয়ারদের যেমন খাওয়া উচিত তেমনি বল৷’
ভেবেচিন্তে বলু যখন পরিবেশককে জিজ্ঞাসা করে করে খাদ্যের ধরন জেনে নিয়ে অর্ডার দিচ্ছিল দস্তুর তখন হাসিমুখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে৷
‘আমার ছেলেও ফুটবল খেলে৷’
‘বটে! আমার এক মেয়ে, সে খেলাটেলা পছন্দ করে না, পিয়ানো শিখছে৷’
‘ভালই তো, কালচারাল সাইডেই আছে৷ আপনি ফিফটি ওয়ানের পর আর ইন্ডিয়া টিমে আসেননি?’
দস্তুর মৃদু হাসল৷ মাথা নেড়ে বলল, ‘আর তো ইন্ডিয়ান সাইক্লিং টিম কোথাও পাঠানোই হয়নি৷ যখন কম্পিটিটিভ সাইক্লিং ছেড়ে দিয়েছি ইন্ডিয়া তখন টোকিও অলিম্পিকসে টিম পাঠায়৷ দেশে ভেলোড্রোম নেই তাই তাতে চালানোরও অভ্যাস নেই৷ ফরটিফাইভ ডিগ্রি খাড়াই অ্যাঙ্গেলে রেস করতে প্র্যাকটিস থাকা দরকার, দু-চারদিনে সেটা রপ্ত হয় না৷ টোকিওয় আমাদের সাইক্লিস্টরা চালাতেই পারেনি, স্ক্র্যাচড হয়ে যায়৷’
‘অন্য কোনও স্পোর্টস নিতে পারতেন৷’ বলু গম্ভীর মুখে বলল৷ মনে মনে সে খুবই উদ্বিগ্ন৷ যে সব খাবার আনতে বলল সেগুলো খেতে কেমন হবে জানে না৷
‘অন্য স্পোর্টস বলতে ফুটবলই আমার প্রিয়৷’
‘সেটা বুঝতেই পেরেছি, নইলে কবে আমি গোল করেছি, কীভাবে বলটা ধরেছি, ডজ করেছি, শট নিয়েছি...’
‘ফর্টি ইয়ার্ডস থেকে৷’ বলু নিঃশ্বাস চেপে বলল৷
দস্তুরের ভ্রু কুঁচকে উঠল৷ কী একটা বলতে গিয়েও থেমে শুধু অস্ফুটে বলল, ‘গোলে তো সঞ্জীব ছিল৷’
শুনতে পেয়েছে বরুণ৷ মুখটা পাংশু হল লহমার জন্য৷ আড়চোখে বলুর দিকে তাকাল৷ তার কপালে ভাঁজ৷
‘মিস্টার দস্তুর আপনি জানেন না আমার শটে কত জোর ছিল৷ বার্মার গোলকিপার তা জানে, ম্যানিলায় ওই একটা ম্যাচেই ইন্ডিয়া ফার্স্ট হাফ পর্যন্ত ওয়ান-নিলে এগিয়ে ছিল৷ ফর্টি ইয়ার্ডায়...ওখানকার কাগজের কাটিংটা...বলু তোর মা বোধহয় সেই ফাইলটা...চীনের গোলকিপার অদ্ভুতভাবে ডাইভ দিয়ে কর্নার করে বাঁচায়, সেটাও থার্টি ফাইভ টু ফর্টি ইয়ার্ড ছিল৷’
দস্তুরকে কিঞ্চিৎ কাঁচুমাচু দেখাল৷ বরুণ যে তার সামান্য ছোট্ট মন্তব্যে এতটা গুরুত্ব দিয়ে ফেলবে এটা সে ভাবেনি৷ সঞ্জীবকে গোল দিয়েছিল বরুণ ঠিকই কিন্তু চল্লিশ গজটা হজম করতে হলে বোধবুদ্ধি কিছুটা নামিয়ে আনতে হয়৷ তাছাড়া এখন সে অতিথি, এমন কিছু বলা উচিত নয় যাতে হোস্ট মনে কষ্ট পেতে পারে৷
‘আপনার শুটিংয়ের কথা আমি অনেক শুনেছি, মুম্বইয়ে, কলকাতাতেও৷’
‘কলকাতায়!’ বলু অবাক হল৷
‘আমি তো অনেকবার কলকাতায় গেছি৷ বাঙালি বন্ধুও আছে৷ তাদের কাছেই শুনেছি ফিফটিসিক্স অলিম্পিকসে আপনাকে বাদ দিয়েছিল নাকি অন্যায় ভাবে৷’
বরুণ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে ফেলল৷ আড়চোখে ছেলের দিকে তাকাল, বলুর চোখে বিস্ময়৷
‘বাবা কই আমাকে তো বলোনি?’
বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল বরুণের৷ ছেলের চোখে শুধুই কি বিস্ময়, প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় ওর কিশোর মুখটিও ছেয়ে গেছে৷ পরের জেনারেশনের কাছে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? এই শ্রদ্ধা বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হবে৷ বলুর ছেলে তার ছেলে তার ছেলে, ওরা শুনবে তাদের পূর্বপুরুষ, এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিল এক নামী প্রতিভাবান ফুটবলার, দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছে কিন্তু অন্যায়ভাবে তাকে অলিম্পিক দলে নেওয়া হয়নি যদিও যোগ্যতা ছিল৷ বহুকাল সে বেঁচে থাকবে৷
‘এসব বলে কী লাভ৷ নিজের ছেলের কাছে নিজের মুখে কী বলা শোভা পায়? ব্যাপারটা তাহলে কুরুচিকর হয়ে যায়৷ এই এনার কাছে শুনলে, হয়ত আরও কারুর কাছে শুনবে, এইভাবেই আর কি৷’
খাবার এসে গেছে৷ প্লেটের পর প্লেট নামিয়ে লোকটি টেবল ভরিয়ে দিল৷
‘এত খাবার, এ তো অসম্ভব!’ দস্তুর সত্যিই আঁতকে উঠল৷
‘যতটা পারেন নিন, না পারলে ফেলে রাখুন৷’ বরুণের মুখে ফেলে ছড়িয়ে হাসির প্রাচুর্য৷
‘আবার কবে আপনার সঙ্গে দেখা হবে কে জানে, কলকাতায় গেলে নিশ্চয় জানাবেন, কার্ড দিয়ে দেব, ফোন করবেন৷’
‘আমারও সৌভাগ্য যে এখানে এসে এত বড় ফুটবলারের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল৷’ দস্তুর মুখ নামিয়ে পনির মটরে নানের টুকরো ডোবাল৷
‘আমাকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়ার কথা কবে শুনেছেন?’
‘ওই সময়েই৷ কী যেন এক গুপ্তা তাকে ঢোকাবার জন্য আপনাকে মেডিক্যালি আনফিট করে দেওয়া হয়৷ তাই কি?’
‘হ্যাঁ৷’
‘গুপ্তা কে বাবা?’
‘গুপ্ত, বাঙালি গুপ্ত, নাম শুভেন্দু৷ তোরা শুনিসনি এ নাম৷ ওই অলিম্পিকে যাওয়া ছাড়া জীবনে আর ইন্ডিয়া টিমে চান্স পায়নি৷ মেলবোর্নেও এগারোজনে আসেনি৷ আসবে কী করে রহিম তো প্লেয়ার চেনে৷ আমার সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে রহিমসাহেব বলতেন, সরি বরুণ, অলিম্পিক ব্লেজার তোমারই পাওয়া উচিত ছিল আর পেল কিনা একটা গাধা৷ ...এরকমই তো হয়, কত রামাশ্যামা সিলেক্টারদের তেল দিয়ে, পা টিপে দিয়ে, বাজার করে দিয়ে অলিম্পিয়ান হয়ে দ্যাখ বুক ফুলিয়ে ব্লেজার পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে... এখানেই কত দেখবি৷’
দস্তুরই প্রস্তাব দিল, হেঁটে ফেরা যাক৷ নানান গল্প করতে করতে তিনজনে প্রায় নির্জন সংসদ মার্গ ধরে হেঁটে এসে অশোক যাত্রী নিবাসে পৌঁছল৷ ধন্যবাদ ও শুভরাত্রি জানিয়ে দস্তুর বিদায় নিল৷ ওরা দুজন আর একটু হেঁটে নিজেদের হোটেলে পৌঁছল৷
লবিতে যা কিছু ভিড় টিভি সেটটার সামনে৷ রাত মাত্র দশটা৷
‘তুই কি এখন বসে দেখবি নাকি?’
‘দেখে যাই৷’
বলু ভিড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াল৷ ঘরের চাবি চেয়ে নিয়ে বরুণ লিফটের দিকে যাচ্ছে সেই সময় ভারী গলায় পিছন থেকে তাকে কে ডাকল৷ সে থমকে ফিরে তাকাল৷
‘কিরে ব্যাটা, কবে এলি, আজই তোকে দেখলুম লিফট থেকে নামার সময়৷ তাড়া ছিল বলে ডাকলুম না৷’
বরুণ ভূত দেখার মতো চোখে শুধু তাকিয়ে আছে৷ মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়ে ফ্যাকাশে৷ হাতের আঙুল থরথর কাঁপছে৷ আশ্চর্য, শুভেন্দু গুপ্ত এখানে এই সময়৷
‘তুই?’
‘হ্যাঁ আমিই রে৷ কেন এশিয়ান গেমস দেখতে আসতে পারি না? কেরানির চাকরি বলে কি দিল্লি আসার পয়সা নেই ভেবেছিস?’
পানের ছোপ পড়া দাঁত বার করে শীর্ণ লোকটা কাঁচা-পাকা চুলের ওপর দিয়ে হাতের তালু বোলাল৷ কুচকুচে চামড়ায় কমলালেবু রঙের ফুলশার্ট মাথার মধ্যে গজাল বসাচ্ছে৷ গলার টাইটা বিবর্ণ রঙ চটা৷ বরুণ চিনতে পারল, এমন টাই তারও আছে তবে সে পরেনি৷
‘যাচ্ছিস কোথায়, ঘরে? চল একটু বারে গিয়ে বসি, অনেকদিন পর দেখা৷ কচ্ছিস কি, সেই রঙের কারবার?’
কিন্তু বলার আগেই শুভেন্দু তার কনুই ধরে টেনে নিয়ে গেল বারের দিকে৷ একবার সে মুখ ফিরিয়ে দেখল বলু সেটের দিকে একাগ্র তাকিয়ে৷ সে স্বস্তি বোধ করল৷ যাক বলু দেখতে পায়নি৷
‘এখানে আছিস কোথায়?’ বরুণ জিজ্ঞাসা করল৷
‘পাঁচশো চব্বিশ নম্বর ঘর৷’
অনেক টেবলই খালি৷ দেওয়াল ঘেঁষে একটা টেবলে দুজনে বসল৷ বরুণের এখন চিন্তা, কীভাবে এর হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়৷ লোকটাকে বরাবরই অপছন্দ করে এসেছে৷ উদ্ধত, ঠোঁট কাটা, লোভী এবং অশিক্ষিত৷ মদ, গাঁজা কিছুই বাদ যায় না৷
‘কি খাবি?’ বরুণ ব্যস্ততা দেখাতে হাতঘড়ি দেখল৷
‘.খাওয়াবি? ভাবলুম আমিই তোকে খাওয়াব৷’
‘ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন৷ হার্টের ট্রাবল৷ তাছাড়া এইমাত্র ভরপেট খেয়ে আসছি৷’
‘একটা ছোট পেগ নে৷ সামনে সাজিয়ে রেখে বসে থাক, নইলে আমার অস্বস্তি হবে৷’
ওয়েটারকে দেড় খানা রাম আর সোডা আনতে বলল শুভেন্দু৷
‘মনে হচ্ছে খেয়ে এসেছিস৷’
‘সামান্য৷ দু-চারটে ভক্ত এখনও আছে তো৷ গুরু বলে ধরে পড়ে, না বলতে পারি না৷ এই যে হোটেলে রয়েছি, এটাও এক ভক্তের পয়সায়৷ শখ হয়েছে এশিয়ান গেমস দেখবে৷ প্লেনে নিয়ে এসেছে, একসঙ্গেই ঘরে আছি, একসঙ্গেই ফিরব৷ অগাধ টাকা, খাবার লোক নেই৷ সোনা স্মাগলিংয়ের কারবার, কাউকে বলিসনি যেন৷’
ওর হাতে যে একটা কোট ঝোলানো ছিল এতক্ষণে বরুণের তা খেয়াল হল যখন পাশের চেয়ারে সেটা ঝপাৎ করে ছুঁড়ে ফেলল৷ চেয়ার থেকে কোটটা মেঝেয় পড়ে যেতেই বরুণ তাড়াতাড়ি নিচু হল তোলার জন্য৷
ঠিক তার গায়ের ব্লেজারটার মতোই একটা ব্লেজার৷ শুধু বুক পকেটের লেখাটা অন্যরকম৷ এটা অলিম্পিক ব্লেজার৷
‘এত অযত্নে রেখেছিস কেন?’ বরুণ ধুলো ঝেড়ে ব্লেজারটা টেবলের ওপর রাখল৷ চোখে পড়ল একটা বোতাম নেই৷
ওয়েটার গ্লাস এবং সোডা টেবিলে নামিয়ে রেখে গেল৷ শুভেন্দু গ্লাসেই সোডা ঢালল৷
‘চিয়ার্স৷’
বরুণ নিজের গ্লাসটা তুলে ধরেই নামিয়ে রাখল৷
যত্নআত্তি কিছুই করি না৷ ওটা যে এতদিন ঘরে ছিল এটাই জানতুম না৷ আসার সময় ছেলে বলল, নিয়ে যাও৷ তা সঙ্গে নিলুম৷ ও হরি, এখানে গায়ে দিতে গিয়ে দেখি ঢলঢল করছে৷ ওই হাতে নিয়েই ঘুরছি৷ একবার তো হকি দেখতে পাশে নিয়ে বসেছি, উঠে আসার সময় ভুলেই গেছি৷ একটা লোক ডেকে আমায় বলতে মনে পড়ল৷ তোর ওটা তো দিব্যিই গায়ে ফিট হয়ে আছে৷ শরীরটা খুব যত্নে রেখেছিস৷’
শুভেন্দুর স্বরে খেদ বা আনন্দ কিছুই নেই৷ চোখের চাহনিটা আগের মতোই ধূর্তামিতে ভরা৷ গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে তারিয়ে তারিয়ে৷ বরুণ বুঝতে পারছে না ওর মনে এখন কি ধরনের মতলব ঘুরছে৷ ওর খেলার মতো ওকেও বোঝা দায়৷ কোনখান দিয়ে এসে গোলে বল ঢোকাবে ভারতের কোনও ডিফেন্স তার হদিশ জানত না৷
‘ফুটবল দেখলি?’
‘দেখলাম৷’ নিঃস্পৃহ স্বরে শুভেন্দু বুঝিয়ে দিল এই আলোচনায় ইচ্ছুক নয়৷ গ্লাস খালি করে ইশারায় ওয়েটারকে আবার দিতে বলল৷
‘গোলগুলো কেমন হল?’
‘হল৷ তুইও নামলে গোল পেতিস৷ ফোর্থ ক্লাস৷’
বরুণের মুখ শুকিয়ে গেল৷ শুভেন্দু বরাবরই তাকে থার্ড ক্লাস বলত, লোকজনের সামনেও৷ সে ঘড়ি দেখল৷
‘অত ঘড়ি দেখছিস কেন আমাকে ভাল লাগছে না, তাই তো? সঙ্গে কেউ আছে?’
‘ছেলে৷’ তারপরই মনে পড়ল ঘরের চাবিটা তার কাছেই, বলু হয়ত ওপরে গিয়ে করিডরে অপেক্ষা করে আছে৷ প্রায় লাফিয়ে সে উঠে দাঁড়াল৷ শুভেন্দু চোখ তুলে তাকাল৷
‘কত নম্বর ঘর?’
‘চারশো পাঁচ৷ চাবিটা আমার কাছে৷’ বরুণ চাবি দেখাল৷
‘যাবি? আর খাওয়াবি না?’
‘নিশ্চয় নিশ্চয় নে না৷’ বরুণ দ্রুত হাত নেড়ে ওয়েটারকে ডাকল৷
‘এ সাবকো ঔর বড়া চার পেগ দে দো৷ ঔর জলদি বিল লে আও৷... কিরে আর চারটেতে হবে?’
‘হবে৷’
‘ব্লেজারটা ফেলে যাসনি যেন৷’
শুভেন্দু অবহেলায় ব্লেজারটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটার থাকা আর না থাকা৷ কি লাভ হল ফুটবল খেলে? গরুর গাড়ি চালাতে শিখলে বরং কাজ দিত৷ ফুটবল তোকে অনেক দিয়েছে৷ অথচ দেখ, তোর থেকে আমি অনেক ভাল খেলতুম৷ ফিফটি ফোরে হাঁটুতে লাগল, আমি সিলেক্ট হয়েও যেতে পারলুম না, তুই গেলি, সেই ব্লেজার পরে এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিস৷ ... শোন আমাকে কয়েকটা টাকা দিবি৷’
‘টাকা৷’
‘শ পাঁচেক৷’
‘কোথায় পাব?’ বরুণের স্বরে ঝাঁঝ ফুটে উঠল৷
‘আমার হাঁটুটা তোকে ব্লেজার পরিয়েছে৷ হাঁটুকে টাকা দিবি৷’
বরুণ উত্তর দিল না৷ ওয়েটারকে বিল মিটিয়ে, বখশিস দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এল৷
বলু দাঁড়িয়েই ছিল, বাবাকে দেখে শুধু জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল৷
‘আর বলিস কেন৷’ চাবি দিয়ে দরজা খুলতে খুলতে বরুণ কৈফিয়ত দেবার স্বরে বলল৷
‘পড়েছিলুম সেই গাধাটার পাল্লায়৷ কাকেদায় দস্তুর যার কথা বলল... গুপ্তা... শুভেন্দু, তার সঙ্গে দেখা৷ কি অদ্ভুত যোগাযোগ৷’
‘শুভেন্দু গুপ্ত! তোমাকে আনফিট করিয়ে যাকে অলিম্পিকে পাঠানো হয়েছিল? এখানে কী করছ?’
‘এই হোটেলেই রয়েছে৷ অলিম্পিক ব্লেজার গায়ে চড়িয়ে লোককে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, দেখলে হাসি পায়৷’
পোশাক বদলে, আলো নিভিয়ে দু’জনে শুয়ে পড়ল৷
‘কাল সকালে কিছু নেই, বিকেলে হকি, তাই তো?’
‘হ্যাঁ৷’
কিছুক্ষণ পর বলু অস্ফুটে ডাকল, ‘বাবা’৷
‘কি৷’
‘এশিয়াডের থেকে অলিম্পিক ব্লেজারের সম্মান বেশি, তাই না?’
বরুণ চুপ করে রইল৷ বলু আর কথা বলল না৷
সকালে বরুণ ঘর থেকে বেরোল যখন বলু বাথরুমে ছিল৷ মিনিট কুড়ি পর ফিরে এসে দেখল বলু জুতো পরছে৷ রুম বয় খালি কাপ-প্লেটগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেল৷
‘বেরোচ্ছিস নাকি, এখন আবার কোথায় যাবি?’
‘একটু হেঁটেই বেড়াই, মাটির নিচে পালিকা বাজারটা কেমন একবার দেখে আসি৷ তুমি যাবে?’
‘নাহ৷ পেটটা একটু গোলমাল করছে যেন, কাল খাওয়াটা বেশি হয়ে গেছে৷ টাকা লাগবে?’
‘দাও৷ একটা বেল্ট কিনব৷’
বরুণ একশো টাকার একটা নোট দিল৷ বলু বেরিয়ে যাবার পর সে একটা ফোন করল৷ তারপর খবরের কাগজটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকল৷
ঘণ্টাখানেক পরে ফোন বেজে উঠল৷ বরুণ তখন চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে৷ ধড়মড়িয়ে উঠে ফোন ধরল৷
‘না এখনও ফেরেনি... আমিই ফোন করে জানিয়ে দেব... হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছি তো৷’ কথা অসমাপ্ত রেখেই রিসিভার নামিয়ে বিছানায় এসে আবার শুয়ে পড়ল৷
ঘরের বেল বাজতেই বরুণের ঘুম ভেঙে গেল৷ উঠে দরজা খুলে দেখল বলু৷
‘দেরি হল যে?’
‘ডাইভিংয়ের হিটস আর মেয়েদের ভলিবল টিভি-তে দেখাচ্ছে৷’
বলুর কোমরে নতুন বেল্ট৷ সেটা বাবাকে দেখাল, আপ্পু ছাপ দেওয়া একটা স্পোর্টস গেঞ্জিও কিনেছে৷
‘ভালই কিনেছিস৷ চান করে নে এবার৷ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ক’দিন সকাল-সন্ধে যা ধকল যাচ্ছে৷’
বলু বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই বরুণ প্রায় ছুটে গিয়ে ফোনটা তুলল৷
বাথরুমের দরজা খুলে বলু বেরিয়ে এল৷ বরুণ তাকে দেখতে পেল না পিছন ফিরে কথা বলায়৷ চেয়ারের ওপর থেকে তোয়ালেটা তুলে নিয়ে আবার বাথরুমে ফেরার সময় সে শুনতে পেল ‘পনেরো মিনিট পরে আয়৷’
তোয়ালেটা মাথায় ঘষতে ঘষতে বলু বেরিয়ে আসতেই বরুণ ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘চান করে খালি গায়ে থেক না, পট করে ঠান্ডা লেগে যাবে৷’
বলু গেঞ্জি পরে চিরুনিটা হাতে তুলে নিয়েছে তখন বেল বেজে উঠল৷ অবাক হয়ে সে বাবার দিকে তাকাল৷
‘দেখ তো এখন আবার কে জ্বালাতে এল৷’ বলু দরজা খুলল৷ ‘বরুণ চ্যাটার্জি কি এখানে.. ওহ এই যে বরুণ৷’
ঢলঢলে পুরনো ব্লেজার পরা, কালো রঙের শীর্ণ লোকটি ঘরের মধ্যে চলে এল৷ ‘খবর পেলুম এই হোটেলেই রয়েছ তাই ভাবলুম একটু হ্যালো করে যাই৷ কেমন আছো? এটি কে, ছেলে?’
‘হ্যাঁ৷’ বরুণের মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল৷ ‘আমি এখন চান করতে যাব৷’
‘বড় প্লেয়ারের মেজাজ দেখছি আজও বদলায়নি৷ জানো খোকা ...কি নাম?’
‘বলেন৷’ শুকনো স্বরে নাম বলে ব্লেজারের দিকে বলু তাকিয়ে রইল৷ এই লোকটার জন্যই যে বাবা অলিম্পিকসে যেতে পারেনি, এটা মনে হতে তার মন বিরূপ হয়ে উঠেছে৷
‘জানো বলেন শুটিং প্র্যাকটিস করত তোমার বাবা আর আমরা গোলের পেছনে দাঁড়িয়ে বল কুড়িয়ে ফেরত পাঠাতাম৷ একটু দেরি হলেই গালাগাল৷ কত লোক দাঁড়িয়ে তোমার বাবার শুটিং দেখত, তিরিশ-চল্লিশ গজ দূর থেকে মারত, গোলকিপার ডাইভ দেবার টাইমই পেত না৷ সঞ্জীবের মতো গোলকিপার, সেও কিনা হ্যান্ডস ডাউন বিট হল৷ জানো তো?’
‘জানি রোভার্সে, ফিফটি টুয়ে, তারপরই তো ম্যানিলা গেমসে৷ সেখানেও বার্মাকে গোল দিয়েছিল ফর্টি ইয়ার্ড থেকে৷’
‘বাহ তুমি তো বাবার অনেক খবরই জানো৷’
শুভেন্দু চেয়ারে বসল৷ বরুণ তার পেছনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বলুকে ইশারায় জানাল চটপট বিদায় করে দেবার জন্য৷
‘নিশ্চয়ই জানি৷ কীভাবে মেলবোর্ন যাওয়া থেকে বঞ্চিত হল তাও জানি৷’ বলু চোখ ছোট করে হিংস্র চাহনিতে তাকিয়ে রইল৷ এই লোকটার জন্যই বাবা যেতে পারেনি৷
‘ত্যিই অত্যন্ত অন্যায় করা হয়েছে ওর ওপর৷ এখন ভাবলে আমার খালি মনে হয় পাপ করেছি, এ পাপের ক্ষমা নেই৷ একটা যোগ্য লোককে বঞ্চিত করে আমিই বা কি পেলাম?’ শুভেন্দুর গলার স্বরে অনুশোচনা, মাথাটা নত৷ বরুণ তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে৷
‘কেন ওই ব্লেজারটা!’
শুভেন্দু মুখ তুলে শূন্য দৃষ্টি মেলে বলুর দিকে তাকাল৷ ধীরে ধীরে চোখে ফিরে এল গাঢ় দুঃখ, হতাশা আর শ্রান্তি মেশানো অদ্ভুত একটা চাহনি৷
‘হ্যাঁ, ব্লেজারটা৷ এটা গায়ে দিলেই মনে হয় অন্যের জিনিস চুরি করে পরেছি৷ অনেক সময় মনে হয়েছে বরুণকে দিয়ে দি৷ আবার কেমন লজ্জাও করে৷ যদি না নেয়? আমার থেকে কত বড় ফুটবলার সে ছিল৷ ওর সময়ে ভারতে কেউ বরুণের ধারে কাছে আসতে পারত না৷ ব্লেজারটার কোনও মূল্য নেই আমার কাছে৷ সিংহের চামড়া গায়ে দেওয়া গাধার গল্পটা জানো তো, এটা হল তাই৷ এটা গায়ে দিয়ে কি বরুণ চ্যাটার্জি হতে পারব? সিংহ সিংহই, বরুণ বরুণই৷’
বলুর মুখে শান্ত, প্রসন্নতা ফুটে উঠছে৷ যে জঙ্গি ভাবটা সারা শরীরে ছড়িয়ে ছিল সেটা মিলিয়ে গিয়ে বন্ধুত্বে ইচ্ছুক সহৃদয় ভঙ্গি এসেছে৷
‘আপনি কি চা খাবেন?’
‘না এত বেলায় আর চা নয়৷ বরুণ তোমাকে কাল বলেছিলুম একবার আসব তাই এলুম৷ ইচ্ছে করেই ব্লেজার পরে তোমার সামনে এসেছি, যাতে তুমি মনে মনে আমায় ঘৃণা কর, এটাই আমার শাস্তি হবে৷’
‘না, না, সেকি৷’ এতক্ষণে বরুণ কথা বলল৷ কিরকম একটা ঘোরের মধ্যে যেন তার সময় কাটছিল৷ ‘আমি তোমায় ঘৃণা করব ভাবলে কেন!’
‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়৷’
‘কিরকম৷’
‘ব্লেজারটা আমি পুড়িয়ে ফেলব৷’
‘য্যা!’ বলু প্রায় আঁতকে উঠল৷
‘এসব পাগলামি আবার মাথায় ঢুকল কবে?’ বরুণ ধমকেই উঠল৷
‘কালকেই৷ তোমার গায়ে ব্লেজার দেখে মনে হল, ওটা তো আমার পরার কথা নয়৷ সারারাত ঘুম হল না৷’
শুভেন্দু হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে ব্লেজারটা এক ঝটকায় খুলে ফেলল৷ উত্তেজিত দেখাচ্ছে তাকে৷ দুটো চোখের মণি ঠিকরে বেরিয়ে আসবে যেন৷ এধার ওধার তাকাল কিছু খুঁজে৷
‘দেশলাই আছে?’
‘আপনি বসুন তো৷’
‘কি পাগলামি হচ্ছে শুভেন্দু৷’
বরুণ এগিয়ে এসে হাত থেকে ব্লেজারটা কেড়ে নিল৷
‘রাখো, তোমার কাছেই থাক৷’
উজ্জ্বল হয়ে উঠল শুভেন্দুর মুখ৷ বিরাট একটা পাথর যেন বুক থেকে নেমে গেছে এমন স্বস্তি ভরে তাকিয়ে থাকল ব্লেজারটার দিকে৷ অনুনয়ের স্বরে বলল, ‘রাখবে আমার এই অনুরোধ৷’
দু’গাল বেয়ে জল গড়িয়ে নামল৷ বরুণের দুটি হাত সে চেপে ধরেছে৷ বলু তাকাল বাবার দিকে৷ এখন কী করবে? লোকটাকে যতটা খারাপ ভেবেছিল, দেখছে একদমই তা নয়৷ খুবই সৎ৷ ঘটনাটা যদি কলকাতায় বন্ধুদের কাছে সে বলে তাহলে কেউই বিশ্বাস করবে না৷ রীতিমতো নাটকীয়৷
বরুণ বিপন্ন চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে যেন বলতে চাইল— কি করব রে এখন?
‘বাবা তুমি রেখে দাও?’
শুভেন্দু কাতর চোখে বরুণ আর বলুর মুখের দিকে বার বার তাকাল৷
‘আচ্ছা৷’
‘তুমি একবার পরো, আমি দেখি৷’
শুভেন্দুর অনুরোধ রাখতেই বিব্রত মুখে বরুণ ব্লেজারটা পরল৷ চমৎকার ফিট করেছে৷ আয়নার দিকে তাকিয়ে আপনা থেকেই আত্মপ্রসাদের হাসি তার ঠোঁটে লেগে রইল৷
‘আমি যাই, আমি যাই৷’ বলতে বলতে শুভেন্দু ছুটে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল৷
‘অদ্ভুত মানুষটা তো... এমন জিনিস কেউ দিয়ে দেয়?’
হোটেলের রেস্টুরেন্টে খেয়ে এসে দু’জনেই বিছানায় গড়িয়ে পড়ল৷ বলু পুরনো একটা খেলার ইংরেজি পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিল এমন সময় ফোন বেজে উঠল৷ পাশে তাকিয়ে দেখল বাবা ঘুমোচ্ছে৷ উঠে ফোন ধরল৷
‘কিরে ব্যাটা ঘুমোচ্ছিলিস নাকি? কেমন করলুম বল৷ আমি তো নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলুম৷ শোন ও শালা ব্লেজার তুইই রেখে দে বরং আমায় আরও দুশো টাকা দে... হ্যালো, হ্যালো৷’
রিসিভারটা রেখে দিয়ে বলু জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল৷ তার হাঁটু দুটোয় আর জোর নেই, এবার হয়ত সে ভেঙে পড়বে৷ গলা শুকিয়ে গেছে৷
‘কার ফোন রে বলু?’
‘রং নাম্বার৷’
বাবার পাশ ফিরে শোয়ার শব্দ পেল, বলু চেয়ারে বসে পড়ে দু’হাতে মুখ ঢাকল৷ সে কিছুই আর চিন্তা করতে পারছে না৷ চিন্তা করতে চায় না৷ শুধু একটা কথাই তার মনে ঘুরে ঘুরে বৃত্ত তৈরি করে যাচ্ছে— কার জন্য, কার জন্য বাবা এটা করল?
ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে হকি খেলা দেখতে যাবার জন্য দু’জনেই তৈরি৷
‘টিকিট দুটো পকেটে? ...গরম জামা? ঠিক আছে এবার তাহলে যাওয়া যাক৷’
বরুণ দরজার দিকে এগোল৷
‘বাবা৷’
বরুণ ঘুরে দাঁড়াল৷
‘ব্লেজারটা পরো৷’
‘সে কি! চেনা লোকেরা যে দেখলে হাসবে৷ অলিম্পিকেই যাইনি...’
‘তারা হাসল তো বয়েই গেল, আমার ভাল লাগবে৷ সুন্দর ফিট করেছে৷’ বলু খুব উৎসাহে ঝকঝক করে উঠল৷ ‘পরো পরো৷ উনিতো বলেই গেলেন এটা আসলে তোমারই৷’
ব্লেজারটা পরে বরুণ যখন হোটেলের বাইরে এসে অটোরিকশার জন্য দাঁড়াল তখন বলু উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল, ‘তোমাকে অলিম্পিয়ানের মতোই দেখাচ্ছে৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন