অশোক দাশগুপ্ত
এই তো আমরা এসে পড়েছি৷ আমাদের বাড়ির মোড়ে৷ এই রিকশা, রোখকে৷
আর একটু চলুক, চলুক না! কয় কদমই বা! ঠিক বাড়িটার সামনে নামলেই হবে৷
না বাপু, নামি৷ চাপা রিকশা, তোমার পাশে ঘেঁষাঘেঁষি, চাপাচাপি—
ভাল লাগে না?
তা লাগে৷ গায়ে কেমন কাঁটা৷ আবার একটু একটু লজ্জাও করে৷
অদ্ভুত তো৷ লজ্জা কী৷ পরপুরুষ পরস্ত্রী নই, আমরা তো স্বামীস্ত্রী৷
কিন্তু লোকে দেখবে যে৷ ওদের চোখের সামনে— ছিঃ৷
তোমার সব তাতেই বাড়াবাড়ি৷
লাজলজ্জা ভাল নয়?
এতটা নয়৷ সব জায়গাতে নয়৷
কী জানি৷ ওটা আমাদের ভূষণ, তাই তো জেনেছি৷
বাড়াবাড়ির কথা বলছি৷
একটু থাক, একটু থাক না৷ নইলে মানুষে আর কুকুর-বেড়ালে আর তফাত রইল কী?
বলতে বলতে রিকশা থামল৷ দরজার সামনেই, ঠিক৷ কথা কাটাকাটি করতে করতে লীলার খেয়াল ছিল না, চমকে চেয়ে দেখে, আর এই তো তাদের এক কামরার ফ্ল্যাটওয়ালা বসতবাড়ি৷
ঠিক ঠিক ধরলে অবিশ্যি দেড় কি পৌনে দুই৷ কিন্তু ফালতু আসবাব আর জিনিসপত্তরে (বিয়েতে যা পেয়েছিল) আর রান্নার চিলতে জায়গা বের করতে বাড়তি তেকোনা ঘরটা ঠাসা ভর্তি৷ কলঘর অবিশ্যি একতলারই আর দু’ঘর ভাড়াটের সঙ্গে এজমালি৷
ঘরে ঢুকেই কমলেন্দু তক্তপোশটায় টান টান হল৷ বাইরের জামাকাপড় বদলাবারও তর সয়নি৷ একটা চার্মস ঝাঁকিয়ে বের করে বলল, বাব্বা:! এতক্ষণে একটু আয়েশ-আরাম, খিলখোলা৷
খিলখোলা কথাটা শুনেই লীলা দরজার ছিটকিনি এঁটে দিল তাড়াতাড়ি৷ আরাম তারও লাগছে৷ তার চেয়েও বেশি৷ ঘুমঘুম আমেজ৷
সারা বিকেল সোজা চক্কর তো নয়৷ এই রোদ তো এই বৃষ্টি৷ সিনেমায় হাউস ফুল৷ তো চলো থিয়েটারে৷ আরেব্বাস, এ যে আর এক কাঠি৷ লম্বা লাইন, সাপের লেজ৷
কমলেন্দু বলল, এখানে দাঁড়াব না৷ আমার পকেটে আজ অনেক টাকা৷ কড়কড়ে নোট, ক্যাশ৷ নীলু রেডিই রেখেছিল৷ এক ছুটে নিয়ে এলাম না? আমার হাতঘড়িটা ছুঁয়েও দেখল না, পরেও দেখল না, সরবেড়িয়ার চাষজমির ডিড-টা৷ সব ভল্টে তুলে ভল্ট থেকেই টাকা বের করে গুনে দিল, তাড়াতাড়ি, যেই বললাম তোমাকে গাছতলায় দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি৷
খুব বিশ্বাস তো!
হ্যাঁ৷ এসব কাজে আসল ব্যাপার হল ট্রাস্ট, যদিও ওর সবচেয়ে তেজি বিজনেসই হল তেজারতি!
আর কেউ দেখেনি?
ছিলই না অন্য কেউ৷ আমরা পুরনো বন্ধু তো৷ একসঙ্গে পড়েছি৷ আমার সম্মান নীলু রাখবে না? তাছাড়া ও নিজেও খুব সাবধানী৷
যাই বলো, খুব সাহস ওর৷ না হলে এত টাকা নিজের বাড়িতে—
আরে রেখেছিল বলেই তো পেয়ে গেলাম৷ নইলে কাল রবিবার, ব্যাঙ্ক বন্ধ, এত নগদ কোথায় পেতাম? ক্যাশ ডাউন করতে হবে কালই৷ অবিশ্যি নীলুকে আগে থেকে বলা কওয়া ছিল, ভাগ্যিস!
তবে চলো, বেশি ঘুরে কাজ নেই৷ তাড়াতাড়ি ফিরি৷
একটু ফাঁকা জায়গায় এসে কমলেন্দু বলেছে, ফিরবই তো আলবৎ৷ ফিরতে হবেই৷ তাই বলে থিয়েটার না, সিনেমা না, এক্ষুনি? তোমাকে সঙ্গে পাব, কিন্তু এত টাকা কোনওদিন কি সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে পারব? একটু ঘুরি-টুরি! এই দ্যাখো, এটা শীতকালের কই মাছের মতো মোটাসোটা৷
চামড়ার থলিটা বের করে কমলেন্দু মজা করে লুফতে লাগল৷ লীলার চোখ ছানাবড়া৷ লোকটা কী! বরাবরই এইরকম বেপরোয়া৷
তারপর হাঁটতে হাঁটতে সেই হলঘরটা৷ কমলেন্দু থামল৷ বলল, দাঁড়াও৷ অন্য ছবি দেখা যখন হলই না, তখন এই ছবিটা দেখি৷ মাথার ওপর একটা বিশাল পোস্টার৷ লীলা ভেবেছিল, তার স্বামী বুঝি সেই ছবির কথাই বলছে৷
কিন্তু না তো, তাকে হাত ধরে টানতে টানতে কোথায় নিয়ে এল কমলেন্দু, এখানে কী৷
কমলেন্দু বলল, এগজিবিশন৷ ছবির৷ এসো, একটু দেখা যাক৷
সেই হলঘরের ঘোরার কথা ভাবলে এখনও, এই বাসায় ফিরেও কেমন অদ্ভুত লাগছে লীলার৷ মাথা এখনও ঝিম ঝিম৷ এসব কি ছবি? তেকোনা, চৌকো, খোঁচা খোঁচা লাইনে আঁকা৷ রঙ কোনওখানে চড়চড়ে, কোনওখানে গমগমে, কোনওটা ছাই ছাই৷ দু’একটার এখানে ধড়, তো ওখানে মুন্ডু গড়াচ্ছে৷
একটা ছবির সামনে এসে কমলেন্দু থ মেরে যেই দাঁড়িয়ে গেল, তখন লজ্জায় নিজেরই মাথা কাটা যাচ্ছে লীলার৷ একটা মেয়ে৷ একটা হাত তোলা, একটা ঠ্যাং কেমন বেঁকা, কিন্তু একদম উদোম৷
এই, চলো, চলো৷
আঃ, দাঁড়াও না, আর একটু দেখি৷
রাগে কান লাল, লীলা সরে গেল৷ যতটা পারে ততটা৷ আসলে সে ফুঁসছিল৷
আশ মিটেছে? কমলেন্দু ফিরে আসতে সে উথলে-ওঠা কেটলির ঢাকনির মতো রাগী-ভেজা গলায় বলে উঠল৷
বাইরে অবিশ্যি তখন ঝিরঝিরে বাতাস৷ তাছাড়া কমলেন্দু তাকে কুলপি কিনে দিয়েছে বলে লীলা একটু ঠান্ডাও৷
মালাই চুষতে চুষতে বলল, আচ্ছা ওই মেয়েটা কি সত্যিকার, না মন থেকে আঁকা৷
মন থেকে হতে পারে, আবার সত্যিও৷ এমন কত আছে৷
ওভাবে দাঁড়ায় কী করে?
ওরা মডেল যে! এটাই ওদের রুজিরোজগার৷
তাই বলে ওই রাস্তায়! কী বিচ্ছিরি!
কমলেন্দু নিজেও যদি আর একটু তৈরি হত, তবে বলতে পারত যে, ভাতকাপড়, মাথার ওপরে ছাদ আর একটুখানি সুখের জন্যে কী পুরুষ, কী মেয়েদের যা কিছু করতে হয় লীলা, সবই বিচ্ছিরি!
এখনও মনে আছে৷ হলঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসছে, তখন আশপাশের দু-চারজনের ফিসফিস আলাপ লীলার কানে তরল সীসে ঢেলেছে৷ শুনতে পেয়েছে ‘এরা উটকো মাল৷ এগজিবিশনে ছবি দেখার পার্টি না৷’
কুলপির পর লীলা যখন এক ফুচকাওয়ালার সামনে দাঁড়াতে যাবে, কমলেন্দু তখন ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিচ্ছে৷ এসো, এসো৷ এখানে না৷
এখানে যদি না, তবে কোথায়?
খাবার দোকানে৷ আজ আমরা বাইরে খাব৷ বাসায় রান্নাটান্নার ঝামেলা আজকে নয়৷ একে টাকা হাতে এসেছে, তাতে শনিবার৷ এই বারটায় অনেকেই বাইরে খায়৷
শুনে লীলার চোখ উপছে খুশি গড়িয়ে পড়েছে৷ চোখ— ওইরকমই৷ ছোট৷ আর খুশির স্বভাব বরাবর একই, কথায় কথায় উছলে ওঠা খুকি যেন৷
রাত্তিরে বাড়িতে রান্না নেই শুনে মনও কি হাত আর পা দুটোকে নেচে উঠতে ইশারা করে! তবে শরীরে আর একটুও ভার নেই, এটা ঠিক৷ পাখি পাখি, পালক পালক— হালকা৷
পারলে শমিতাকে এক্ষুনি উড়ে উড়ে গিয়ে খবরটা বলে৷ মাসতুতো বোন, ওর বর অরিন্দম কিছুদিন হল দিল্লি থেকে বদলি হয়ে এসেছে৷ প্রায়ই ওরা ঘুরে ঘুরে বাইরে খায়৷ পার্ক স্ট্রিট, থিয়েটার রোড, গড়চা থেকে মেরেডিথ স্ট্রিট৷ কত নাম, কত ডিশ৷ এত শোনাও একরকম ধার৷ যদি খানিকটা শুনিয়ে দিতে পারে এবার লীলাও, তবে খানিকটা শোধ সেই ধার৷
কত গেল?
বিয়াল্লিশ৷
ওরে বাবা, বলেই লীলা জিভ কেটেছে৷ এসব জায়গায় এই রকমই, সে জানে৷ মাসতুতো বোনের বর অরিন্দম আবার খাবারের সঙ্গে বিয়ারও নেয়৷ ওদের কমসে কম শ’খানেক টাকা হাওয়া হয়ে যায়৷ লীলাদেরও বা আজ এমন কম কী৷ বিয়াল্লিশ আবার টিপস (এখানে দিতে হয় কমলেন্দু জানে) তারপর ঘোরাঘুরি, পান, ট্রাম, রিকশা ধরে— তা এ-ও প্রায় শ’খানেকের কাছাকাছি বৈকি!
হোক, কীই বা যায় আসে৷ পকেটে নোট যখন আজ বিস্তর, কড়কড়ে৷ শহরতলির জমিটুকু, ঘড়ি, আর কী সব বাঁধা দিয়ে জোগাড় হয়েছে৷
খামোখা নয়৷ এই টাকায় আড়াই কাঠার একটা ফ্ল্যাট (কমলেন্দু বলে অ্যাপার্টমেন্ট) হাতের মুঠোয় এসে যাবে৷ আসলে সঠিক বলতে গেলে পায়ের তলায়৷ কারা যেন বিপাকে পড়ে জলের দরে বেচে দিচ্ছে৷ দালালের যোগসাজশে খবরটা এনেছে কমলেন্দুই৷ থোক টাকা কমলেন্দুর অফিসের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ধার৷ কিছুটা কো-অপ৷ বাকিটা ব্ল্যাক৷
সেই টাকাই কমলেন্দু গুনছে মাথা নিচু করে পাছে একটা ফসকায়, ভুলচুক হয়, তাই আঙুল ডুবিয়ে নিয়ে ভিজে স্পঞ্জে৷ স্পঞ্জটাও অফিসের৷ কমলেন্দু কখন ঢোলা পাতলুনের পকেটে পুরে এনেছে৷
ফ্ল্যাট, থুড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, হে ভগবান, যত তাড়াতাড়ি হাতে এসে যায়৷ তাহলে লীলা তার মাসতুতো বোন শমিতার ক্লাসে একলাফে উঠতে পারে৷ সরাসরি৷ দেড় কামরা থেকে আড়াইটেওয়ালায়৷ লম্বাচওড়া মিলিয়ে কত স্কোয়্যার ফুট?
কমলেন্দু না হয় জামাকাপড় ছাড়েনি, কিন্তু লীলার তো বদলানো চাই-ই চাই৷ নইলে গা ঘিন ঘিন৷ শাড়ি বদলানোও সোজা নাকি৷ একটা মোটে ঘর যেখানে? আড়াই কামরার আস্তানা হলে সমস্যা থাকবে না৷ আর কমলেন্দুর এখন না হয় মাথা নিচু, নোট গুনে গুনে থোক থোক সাজিয়ে রাখছে৷ একবার যদি মাথা তুলে চায়? আড়চোখে তাকায়? পুরুষের ছলচাতুরি, বিশ্বাস কী? করে যে, সেই মেয়ে বোকা৷
এই৷ একবার ওদিকে তাকাও তো৷ ঘুরে বোসো৷ দেওয়ালের দিকে মুখ করে৷ ভাল ছেলে হয়ে৷
কেন?
বারে, আমি শাড়ি বদলাব না?
বদলাও না৷ কে মানা করছে৷
আর তুমি প্যাঁট প্যাঁট করে গিলবে, ওই এগজিবিশনের ছবি যেভাবে গিলেছ, তেমনই? কত রঙ্গই জানো৷
কেন, তোমার চেহারা কেমন, তা কি আমি জানি না?
সে তো অন্ধকারে৷ বাতি নিভলে৷
পুট করে বেডসুইচটা কতদিন জ্বেলে দিইনি? দেখিনি৷
সে তুমি নেহাত অসভ্য বলে৷ যাও, এবার চোখ বোজো, ঘাড় ফেরাও৷ আমার ঠিক এই তিন মিনিট৷
শাড়ির একটা আঁচলের কোণ উঁচু করে দাঁতে চেপে লীলা যখন খালি শাড়ি নয়, ব্লাউজ শায়াও বদলে নিচ্ছে, তখন সে ঘরটার এক কোণে মুখ ফিরিয়ে৷ এখানটায় আলো অল্প, লজ্জাহরণ মধুসূদন৷ তবু আলোতেই টের পেল, নতুন ব্লাউজটার বোতাম নেই, বগলটাও ফ্যাঁসফ্যাঁসে৷ ব্রা-টাও, মাগোঃ ঘামে ঘিন ঘিন৷
সব বদলাতে হবে৷ তবে কি আর কুলোবে তিন মিনিটে? তিনের বদলে পাঁচ কি ছয় যখন বয়ে গেল, তখনই—
লীলার খটকা লাগল ঠিক তখনই৷ একটা ছায়া যেন জানলায়৷ ফট করে সরে গেল৷ তক্ষুনি চেঁচিয়ে উঠল লীলা, এই৷ তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি৷ গোনাগাঁথা আজকের মতো থাক না!
হয়ে এসেছে৷ আর একটুখানি৷
একটা হুইসল ঠিক তখনই৷ জানলার শিক কামড়াচ্ছে কয়েকটা হাত, এই রে, পাল্লা দুটো আলগা, এবার?
আবছা মনে পড়ে, মেঝের ওপর কয়েক জোড়া পায়ের দুপদাপ৷ তার ব্লাউজ ধরে হ্যাঁচকা টান৷ ফট করে ছিঁড়ে গেল শায়ার দড়ি৷ শাড়িটা ফালাফালা৷ আর কমলেন্দুর বুকফাটা চিৎকার, শুকনো কুয়োর তলা থেকে যেমন আওয়াজ উঠে আসে৷ আর? গোঁ গোঁ৷ পরে? সব শীতল, হিম, চুপ৷ চোখ দুটো ঠিকরে বাইরে আসছে, নীল কি কষ্টিকালো কমলেন্দুর শ্বাসনালি৷
আর মনে নেই৷
একবার কি ফের বৃষ্টি হয়, খানিকক্ষণের জন্যে লীলা ফিরে পায় সম্বিত? নিজের দিকে তাকানো যায় না, কমলেন্দুর খাট থেকে গড়িয়ে পড়া শরীরটার দিকেও না৷ আর কি অবাক ব্যাপার, নোটগুলিও যে নেই; তাও ওই আধো ঘোরেও লীলার চোখ এড়ায় না৷
ওই নোটগুলোই কি লোকগুলোর লক্ষ্য ছিল— গন্ধে গন্ধে পিছু নিয়ে এসেছিল? নাকি লীলা নিজে— তার শরীর? শাড়িটা এখন কুটিকুটি, ক’গাছি সুতোর চেয়ে খুব বেশি কিছু বাঁচেনি, পেটিকোটটার বাহারী লেসটার কারুকার্য সব মাটি, বুকের বোঁটার ওপর দিয়ে নখের লম্বা দাগ৷ না, নাভির দিকে নিচু হয়ে চেয়ে লীলার বিশ্বাস হল, এর চেয়ে বড় রকমের কোনও ক্ষতি তার হয়নি৷ হয়ত হয়ত কেন, নিশ্চয়ই— বাধা দিতে গিয়েছে, এসব ছেঁড়াছেঁড়ি তারই ছাপ৷ ধস্তাধস্তির৷ আর কিছু হলে গায়ে কি পাথর চাপা পড়ার মতো ব্যথা হত না?
ঠান্ডা মাথায়, আশ্চর্য, লীলা এসবই ভাবতে পারছে৷ চোখ স্থির, তাই কমলেন্দুর নিথর শরীরটাও একদৃষ্টে দেখছে৷ ঠোঁটের কোণে ফেনা, বুকে চাপ চাপ রক্ত, কিন্তু চোখ? যেন আরও বিশাল হয়ে কোটর থেকে ছিটকে নিষ্ঠুর গোলার মতো ভেঙে চুরে ফেলেছে লীলাকে৷ ভাঙছে, না ফাটছে?
হাতোর মুঠো শক্ত, কিন্তু স্নায়ু শিথিল৷ আবার ফিট৷
গুনগুন গলা শুনে জ্ঞান ফিরে আসে৷
পুরুষের স্বর: বুঝলেন অফিসার, বোধহয় দোতলায় আমাদেরই খবর দিতে আসছিল৷ পারেনি, ঢলে পড়ে থাকবে৷ গোলমাল শুনে আমরাই নেমে আসি, ওকে দেখতে পাই৷ পড়ে আছে ঠিক এইভাবে চৌকাঠে৷ তখনই খবর দিই আপনাদের৷
থানায় আমরা একটুও দেরি করিনি৷ জিপটার সেলফটা ঠিক করতে যা কয়েক মিনিট, তারপরই ঝড়ের বেগে— যাক৷ কিছু ছোঁবেন না, যেমন আছে তেমনি থাক৷ আমাদের ফটোগ্রাফার কাল সকালে এসে—৷ তাছাড়া ফিংগারপ্রিন্ট৷
আমার খালি একটা খটকা স্যার৷ খবর দিতে ওপরে যদি আসছিল, তবে এই অবস্থাতে?
জামাকাপড়ের কিছু প্রায় বাকি নেই, দেখতেই তো পাচ্ছেন, তাকানো যায় না৷
দোতলার সেই লোকটা বলছে যে রোজ আড়চোখে এ ঘরের ফাঁকে চোরা চোখে তাকাতে তাকাতে অফিস না কোন চুলোয় যেত৷
হয়ত বদলানোর সময় পায়নি৷ কিংবা এতই গরিব যে স্পেয়ার শাড়িটাড়ি হয়ত ছিল না ওর, তাও সম্ভব৷
ভারি গলায় আরও কী বলতে যাচ্ছিল রাশভারি অফিসার, দোতলার লোকটিই বাধা দিয়ে বলল, ছিল৷ ওরা বড়লোক না হোক, খুব গরিবও নয়৷ রকমারি রঙের কাপড়ে অন্তত দেখেছি, দু-চার রকমের৷
নার্ভাস কোলাপস ইন দ্যাট কেস৷ ওরকম সময়ে কি হুঁশ থাকে? আপনিও তো বেশ!
গটগট করে বিদায় নিলেন থানা অফিসার৷ ঝিম ঝিম জ্ঞান ফিরে এসেছে, লীলার মনের আধখানায় যেমন কান্না, বাকি আধখানায় অদ্ভুত একটা হাসিও পাচ্ছে৷ কিচ্ছু জানে না এইসব জ্ঞানবাগীশ লোকেরা৷ কিচ্ছু না৷
হুঁশ ছিল না? অফিসারকে ডেকে বলবে নাকি যে আরে, হুঁশ ছিল বলেই তো৷ আলো-জ্বলা ঘরে কমলেন্দুর চোখের সামনে কবে সে কাপড় ছেড়েছে, ছাড়তে পেরেছে৷ কমলেন্দুর চোখদুটো যখন ছিটকে বেরিয়ে এসে বিঁধছে, বিরাট হচ্ছে ক্রমে, গোলগাল আরও বড়, তখন তো অসম্ভব আরও৷ যদি মেনেও নেওয়া যায়, ওই মণি কাটা মাছের মতো মরা, তবু— তবু লীলার নিজের চোখ আর লাজুক পলক আর ভরা শরীর, সব যে জ্যান্ত! এতকালের অভ্যেস ছাড়া, সেও একরকমের মরা৷ সহমরণে যেতে শীত-শীত করল বলেই তো কাপড় ছাড়া গেল না৷ বড় কটকটে আলো৷ লীলার চোখে ছবির সেই উদোম মেয়েটা, এগজিবিশনের সব ক’টা দেওয়াল দুলছিল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন