অশোক দাশগুপ্ত
এর নাম গরুখোঁজা৷ গিরীন কাল সন্ধে থেকে প্রথমে বল্লির মাঠ, সেখান থেকে সাঁপুইদের আমবাগান, বাগান পেরিয়ে ডাকাত-মগের মাঠ, তার ওপাশে ঘোড়ুইদের বাঁশবন, তারপর আজ ভোর থেকে পঞ্চবটির থান পেরিয়ে, ঘুরঘুট্টির বিল, অশথের দ’, নিমসন্নিসির মাঠ, পাড়ুই পাড়া, লালতাকুঁড়ি, অশ্বিনীপল্লী, বসন্তপুরের হাট— মায় সাত কোশ দূরের মারাঠা-বিল পর্যন্ত খুঁজে এসেছে৷ তবু তার ধবলা গাইটার কোনও তত্ত্ব তালাস পায়নি৷ প্রায় ঝড়-খাওয়া কাকের মতো উসকো-খুসকো চুল আর মুখে কালচে ছাপ ও ঘাম নিয়ে যখন দাওয়া পেরিয়ে ঘরে ঢুকল, তখন বাইরে একগলা রোদ বিকেলের দিকে ঢলে পড়বে এমন মন করেছে৷ ঘরে তখন বিছানায় গা এলিয়ে আধশোয়া হয়ে রয়েছে পাতাসী, মুখখানা টোপাকুলের মতো ফোলা ফোলা, ঠোঁটটা পানের রসে লাল, চুলের রাশ খোলা, এলানো৷ সেদিকে তেমন করে নজর না করেই গিরীন বলল, গাইটা ঘরে এয়েচে? তার কথায় একটু রুক্ষতা, চোখে মুখে ক্লান্তি৷ পাতাসীও সেদিকে নজর না করে ঘরের আড়ার দিকে তাকিয়ে বলল, তার আমি কী জানি?
গিরীন ঠিক এতটা আশা করেনি৷ চোখমুখ কুঁচকে বলল, জানিসনি মানে? ঘরে রইছিস, গাইটা ফিরল কিনা সে খবর রাখবিনি? কেবল ঘরে শুয়ে ঘাস চিবুলি চলবে?
পাতাসী অবশ্য চিবুচ্ছিলই, তবে ঘাস নয়, পান৷ সে হাই তুলে ঘুম-ঘুম চোখে বলল, এলি তো গোয়ালে থাকবে৷ দ্যাখো গে যাউ সিখেনে—
শুনে পিত্তি জ্বলে গেল তার, খেঁকিয়ে উঠে বলল, গোয়ালে থাকলি তো তোরে আর জিগেস করতম নি৷ তুই দেখিছিস কিনা— না, আর একটা হাই তুলে তক্তপোশের ওপর গা এলিয়ে অন্যদিকে পাশ ফিরে শোয় পাতাসী, না, তুমার গাই তুমি খোঁজ রাখোগে যাউ৷
এমন হাড়জ্বালানো কথা শুনে দপ করে জ্বলে ওঠে গিরীন৷ মাঠেঘাটে এখন উদোম চলছে বলে সে তার গাইটা ছেড়ে দিয়েছিল ঘুরেফিরে ঘাস খাবে বলে৷ মাঠে ধান থাকলে তো ঘরের গরু ঘরে বেঁধে রাখতে হয়৷ ধান উঠে গেলে তবেই না উদোম, তবেই না গরুগুলো একটু ঘাস খেয়ে বাঁচে৷ উদোমের সময় মাঠে সবুজ চিকন ঘাস বেড়ে ওঠে লকলক করে৷ চার গাঁয়ের গরুগুলো সারা দিনমান কুচকুচ করে ঘাস চিবোয়, আর সাঁঝ হলেই যার যার গরু পথ চিনে ফিরে আসে ঘরে৷ গিরীনের ধবলা গাই কাল সন্ধের পর আর ঘরে না ফিরতেই এত হেনস্থা৷ মাঝরাত পর্যন্ত গাঁ-গেরাম ঢুঁড়ে যখন ফিরেছিল তখন পাতাসী অঘোরে তক্তপোশ জুড়ে ঘুমোচ্ছে৷ জানতেও চায়নি, গাইটা পাওয়া গেল কিনা৷ ঠান্ডা জুড়োনো ভাত খেতে গিরীনের হাত ওঠেনি৷ তারপর আজ কাকভোর থেকে আবার ঢুঁড়ানি৷ চারদিকের তল্লাট তন্ন তন্ন খুঁজে হয়রান৷ তবু ধবলাটার হদিশ মেলেনি কোথাও৷ শেষবেলায় ঘরে ফিরেছে এই আশায় যে, হয়ত এতক্ষণে গাইটা হাম্বা হাম্বা রব তুলে গোয়ালে এসে সেঁধিয়েছে৷ কিন্তু গোয়াল তো খাঁ খাঁ শূন্যি৷ তার ওপর পাতাসীর এই একবগগা গা-এলানি ভাব, আর পেছন দেখানো— দেখে একেবারে হন্যে হয়ে গেল গিরীন৷ তেড়ে গিয়ে চোখমুখ লাল করে বলল, কী বললি?
যা বললম তাতো শুনতি পালে৷ তুমার গাই কুথায় না কুথায় ঘুরে বেড়ায় তার আমি কী জানি!
আর পারল না গিরীন, মাথার মধ্যে যেন একটা পাগল ঢুকে গেল৷ কাল রাত থেকে সে মরিয়া হয়ে ঘেঁটেঘুঁটে বেড়াচ্ছে আগান-বাগান, মাঠ-ঘাট, বিল-বাঁওড় আর, ঘরের বৌ কিনা তক্তপোশে আড় হয়ে শুয়ে ঠোঁট লাল করে জাবর কাটতে কাটতে পেছন দেখাচ্ছে! গাইটা সবে গাভীন হয়েছিল,বাচ্চা বিয়োলে তিন সের-চার সের করে দুধ হতে পারত! হঠাৎ তার চোখে পড়ল ঘরের কোণে জিরোতে থাকা একখানা বাঁশের লাঠি৷ লহমায় লাফ দিয়ে পড়ে সেখানা বাগিয়ে ঘরে ধাঁই ধাঁই করে মারল পাতাসীর পেছনে, মাগী দিন দিন ছিনাল হতিছে— লাঠিটা কত জোরে মেরেছিল তা গিরীন বুঝতে পারেনি৷ লাঠির ঘা খেতেই একটা ক্যাঁ-ক করে শব্দ বেরুল পাতাসীর গলা থেকে, দু-এক মুহূর্ত চোখ উল্টে গোঁ-গোঁ আওয়াজ করল, তারপর শরীরটা গেল থির হযে৷
সম্বিত ফিরতেই গিরীন বুঝল, কাজটা তেমন ভাল হয়নি, লাঠিখানা ফেলে সে খানিকক্ষণ থম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মাঝখানে৷ নড়ছেও না চড়ছেও না পাতাসী৷ কেমন ম্যাদামারা হয়ে নেতিয়ে পড়েছে তক্তপোশের ওপর৷ কাছে গিয়ে হঠাৎ তার কেমন সন্দ হল৷ নিচু হয়ে দ্যাখে, পাতাসীর উঁচু বুক দুটো উঁচুই হয়ে রয়েছে৷ উঠছেও না, নামছেও না৷ নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখল, নিঃশ্বাসও পড়ছে না৷ যাহ শালা, তার বৌটা মরে গেল নাকি!
গিরীনের কপালে মোটে বৌ টেকে না৷ পাতাসী গিরীনের তৃতীয় পক্ষ৷ আগের বৌ দুটো এদিক-ওদিক হয়ে যাওয়ার পর এই কচি বউটারে সে ঘরে নিয়ে এসেছিল এই বছর তিনেক৷ গিরীনের শরীর-স্বাস্থ্য তো আর খারাপ নয়৷ কালো শুঁট ধরনের চেহারা, মুখে সবসময়ে খোঁচা খোঁচা দাড়ি৷ পেল্লাই গোঁফজোড়া৷ বয়স তিনকাল পার হওয়ার পথে, তবু এখনও কোমর নুইয়ে একবিঘের ধান সে পলকে বুনে দিতে পারে৷ ঘর থেকে সাতক্রোশ পথ মহকুমা শহরে কাজ সেরে ফিরে আসতে পারে হেঁটে হেঁটেই৷ বাসে ওঠার তোয়াক্কাই করে না৷ ছেলে-ছোকরারা বলে গিরীন খুড়োর দশ বিঘে জমিনের ধান তো মরাইতে পচে হেজে গেল৷ এত টাকা খাবে কে? ছেলেপুলে তো আর হলোনি—
এই শেষ কথাটাই গিরীনের মনে বড় দাগা দেয়৷ প্রথম বিয়ের পর তিন-চারটে বছর যা একটু নিশ্চিন্দি ছিল৷ হাল-লাঙল দিয়ে তার মস্ত জমির ফালে চাষ দিতে দিতে কাবার করে ফেলত বেলা৷ তার ঘরে একজোড়া হেলে-বলদ, একটা দুধেল গাই৷ তার মস্ত মরাই ভোর বছর উপছে পড়ে ধানে৷ তার পুকুরে জাল ফেললেই ঘাই দিয়ে ওঠে মস্ত রুই-কাতলা৷ আর তার প্রথম পক্ষের বউ জবাও ছিল ভারি ভাল মেয়ে৷ সাত চড়ে মুখে রা-টি কাড়ত না৷ কিন্তু একদিন গিরীন মাঠে হাল-লাঙল নিয়ে যাচ্ছে, পথে দেখা চৌষট্টি পাড়ার গণেশ বুড়োর সঙ্গে৷ খক খক করে কেবল কাশে, আর গলায় খ্যা-ক-খ্যা-ক শব্দ করে৷ মাথার চুল শননুড়ির মতো৷ সে কিনা হঠাৎ গিরীনকে দেখে বলল, কী বাবা, শেষকালে আঁটকুড়ো হয়ে রইলে?
গিরীন কথাটা শুনে চমকে উঠেছিল৷ হিসেব করে দেখল, তার বিয়ে হয়েছে তা তিন চার বছর হবে৷ এই ক’বছরে জবার কোনও বাচ্চা হয়নি৷ তার বছরখানেক পরে বিয়ে হয়েছে এ পাড়ার মহেন্দ্রর, তারই খেতের পাশচাষী৷ তার এর মধ্যেই একটা বাচ্চা হাঁটতে শিখেছে, আর একটা নাকি হব-হব৷ কদিন ধরে গিরীন তার পুরুষ্টু গোঁফে আঙুল বোলাতে বোলাতে কথাটা খুব করে ভাবল৷ ভাবল নয়, ভাবাল৷ কারণ আরও দু-চারজন তাকে বলতে শুরু করল, এই যে, আঁটকুড়ো চলেছে কেমন হন হন করে৷ কিংবা কী গো আঁটকুড়োর পো, এত সকালে চললে কোথায়? কথাটা একদিন সে বলেও ফেলল মহেন্দ্রকে খেতে লাঙল ঠেলতে ঠেলতে, কী ব্যাপার বলত মহেন্দর, আমার কোনও ছেলেপুলে হলোনি!
মহেন্দ্র আবার একটু ফক্কড় গোছের লোক, চোখটা ছোট করে একগাল হাসল, ছেলে কি আর তোমার অমনি হবে৷ ভাল করে খাটাখাটুনি করো, দেখবে ঠিক—
গিরীন আরও মন দিয়ে তার খেতে হাল-লাঙল করতে থাকে, দামড়া বলদটাকে গায়ে ঠোক্কর দিয়ে হাঁকাড় দেয়, হেই, হট হট, ভুঁয়ে নিচু হয়ে ঘাসগুলো তুলে তুলে পরিষ্কার করে, কিন্তু তবুও তার—
ক’মাসের মধ্যে ব্যাপারটা আরও ঘোরালো হয়ে দাঁড়াল৷ তার আঁটকুড়ো নামটা বেশ চাউর হয়ে গেল আশপাশের পাঁচ-দশটা গাঁয়ে৷ মুখে-মুখে গিরীন গুঁই-এর নামটাই হয়ে গেল আঁটকুড়ো গুঁই৷ কিছুকালের মধ্যে মহেন্দ্রর দ্বিতীয় বাচ্চাটা বড় হয়ে গিয়ে তার পরের বাচ্চাটারও আসার সময় হয়ে গেল৷ একদিন গিরীন ভোরে উঠে তার হাল-লাঙল নিয়ে চলেছে তার খেতের দিকে, অমনি দেখা হয়ে গেল মন্মথ সাঁপুই-এর সঙ্গে৷ সাঁপুই বেশ অবস্থাপন্ন লোক, কিন্তু শরিকে শরিকে এমন মামলা বেধেছে যে ভিটেমাটি ক্রোক হবার মুখে৷ গিরীনকে দেখেই হঠাৎ বললেন, এহ, এই ভোরবেলাতেই তোমার ওই আঁটকুড়ো মুখটা আমায় দেখালে! সকালে মায়ের নাম করে বেরিয়েছি৷ আজ আবার আমার মামলার রায় বেরুবে৷ আর তুমি কিনা দাঁড়িয়ে রয়েছ রাস্তার মধ্যিখানে৷ বলিহারি আক্কেল তোমার—
কথাটা প্রায় পেরেকের মতো গিঁথে গেল গিরীনের বুকের মাঝখানে৷ আর সমস্ত রাগটা গিয়ে পড়ল তার বৌ জবার ওপরে৷ তার পরদিন খবর পেল, মামলায় ডাহা হার হয়েছে মন্মথ সাঁপুই-এর৷ এখন প্রায় সে সর্বস্বান্ত, সারাদিন হাউমাউ করে কাঁদছে, আর গাল পাড়ছে গিরীনকে৷
সেদিনই ঘরে ফিরে সন্ধেবেলা সে হামলে পড়ল জবার ওপর, বাঁজা-মাগী, আর তোর জন্যি আমার এমন হেনস্থা৷
তার পরদিনই জবা গিয়ে ঝুলে পড়েছিল বাড়ির পিছনের আমগাছের ডালে৷ কিন্তু তাতে গিরীনের আঁটকুড়ো নাম ঘোচেনি৷ হয়ত তাই-ই বছর খানেক পরে সে আবার একটা বিয়ে করল৷ এ বৌটার ভাল নাম কী ছিল তা এখন আর গিরীনের মনে নেই, ডাকনাম ছিল কঞ্চি৷ কঞ্চির মতো ছিপছিপে শরীর, লম্বা ধরনের গড়ন৷ ভাবভঙ্গিও ছিল খানিকটা ফিচেল ধরনের৷ কথায় কথায় ফিক করে হাসত৷ কিন্তু দু বছর যায়, তিন বছর যায়, চার বছর যায়— এ বৌটারও কোনও ছেলেপুলে হল না৷
মহেন্দ্র একদিন ধান বুনতে বুনতে তার পাশের খেত থেকে হাঁকাড় দিয়ে বলল, কী রে গিরীন, যত বাঁজা মেয়ে সব তোর কপালেই জুটছে?
তার সঙ্গে আড়াআড়ি করেই বোধহয় মহেন্দ্রর বৌ বছর বছর একটা করে বাচ্চা বিয়োচ্ছে৷ গিরীন মুখ ব্যাজার করে উঠে আসে মাঠ থেকে৷ বাচ্চা তার হলোনি তো হলোনি৷ তাতে তোর দরকার কী হে সুমন্দির পো! যথারীতি তার যত ঝাল গিয়ে পড়ল কঞ্চির ওপর৷ যত্তো সব বৌ জুটেছে আমার কপালে—
কঞ্চি তার দিকে ভ্রূকুটি করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, হুঁ, ঢ্যামনা সাপে আবার ফোঁসফোঁস করে!
ঢ্যামনা! গিরীন থমকে দাঁড়ায়, কী বললি? যে সাপের বিষ নেই গো, বলে ধপ ধপ শব্দ করে কঞ্চি দাওয়া থেকে ঘরের মধ্যে গিয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে৷ বিষ নেই তার আবার কুলো পানা চক্কর!
কদিন পরে গিরীন সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্যাখে, তার বিছানায় কঞ্চি নেই৷ খাঁ খাঁ করছে ঘর, দরজা৷ গোয়াল, আমবাগান আঁতিপাতি খুঁজে বুঝল, এ বউটা ঝুলে পড়েনি৷ পালিয়েছে৷ ব্যাপারটা দেখেশুনে গিরীন বেশ হতভম্ব হয়ে গেল৷ বেশ হম্বিতম্বি করল মাঠে ধান গাছের গোড়া থেকে ঘাস তুলতে তুলতে, হুঁ! মেয়েছেলে জাতটার ওপর ঘেন্না ধরে গেল৷
মহেন্দ্র তা শুনতে পেয়ে ফকড়ামি করল যথারীতি, এবার তো তোরই ঝুলে পড়া উচিত গিরীন৷ মদ্দা জোয়ানের ঘর থেকে বউ পালায়!
কিন্তু গিরীন ঝুলে পড়ল অন্যভাবে৷ সে ঠিকই করেছিল মেয়েছেলের আর ধারকাছ দিয়ে মাড়াব না৷ কিন্তু চার পাড়ার লোক তাকে উসকোতে লাগল, কী হল গিরীন, একটা বৌ ভেগে গেল বলে হাল ছেড়ে দিলে৷ আরে, বৌ ভেগে গেলে অমন কত বৌ পাওয়া যায়৷ পুরুষ মানুষের অমন গোঁ থাকলে চলে! কেউ আবার উসকোয়, কী হে আঁটকুড়ো গুঁই, তোমার আঁটকুড়ো নামটা ঘুচোও৷ সকালে তোমার মুখ দেখলে যে ঘরে আর খাওয়া জোটে না৷ উনোনে হাঁড়ি চাপালে হাঁড়ি ফেটে যায়৷
শেষমেশ অনেক ভেবেটেবে আর একবার ঝুলে পড়ল গিরীন৷ পাড়ার এ ও নতুন মেয়ের খবরও এনে দিচ্ছিল আড়ালে-আবডালে, তোমার এত সম্পত্তি কে খাবে হে? একটা কচি মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফ্যালো—
তা পাতাসী বেশ কচিই ছিল৷ নেহাত গিরীন তেজোবরে বর, তাই সে মুখখানা গোমড়া করে থাকত৷ কিন্তু সে এত কচি, তার শরীরখান এমন জুতসই যে মহেন্দ্র একদিন বলেই ফেলল, তোর এবার ছেলে না হয়ে যায় না, আমি হলে তো মেয়েটা বছরে দু’বার বিয়োতো৷
তা মহেন্দ্রর সেরকম এলেম আছে বটে৷ একদিন গিরীন তার বাড়ি গিয়ে দেখল, মহেন্দ্রর বাড়িতে ইস্কুল বসে গেছে৷ তার গোটা দাওয়ায় একগুচ্ছের ছেলেমেয়ে কেউ সুর করে পড়ছে, কেউ আঁক কষছে৷ কী রে মহেন্দর, পাড়ার সব ছেলেমেয়ে জুটিয়েছিস যে!
মহেন্দ্র লাজুক-লাজুক মুখ করে বলল, পাড়ার কোথায় রে, এ সবই আমার৷ মা ষষ্ঠীর কিরপা—
তা গোটা বারো-চোদ্দ হবে বোধহয়৷ গিরীন থ হয়ে আঙুল কামড়াতে কামড়াতে ঘরে ফিরে এসেছিল৷ কিন্তু তার কপাল যাকে বলে হদ্দ খারাপ৷ তিন বছর পরেও যখন পাতাসীর কোনও ছেলেপুলে হল না, তখন একদিন মহেন্দ্র বলল, ধুর শালা, এ নিশ্চয় তোর দোষ৷ তুই ডাক্তার দেখা গিরীন—
এতদিন ধরে এই ভয়টাই করছিল গিরীন, তবু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ধ্যেস—৷ বলে কোনওক্রমে মহেন্দ্রর কাছ থেকে পালিয়ে এল বটে, কিন্তু মনের খুঁতখুঁতানি গেল না৷ আর পাতাসী তো তার দিক থেকে সবসময় মুখ ঘুরিয়েই থাকে৷ তবু সেটাও মেনে নিয়েছিল গিরীন৷ কিন্তু তার মাথাটা একদিন ঘুরে গেল, যখন খেত থেকে ঘেমেনেয়ে সন্ধে-সন্ধে ঘরে ফিরে দেখে, তারই বেড়ার ধারে বসে এক বেপাড়ার ফচকে ছোঁড়ার সঙ্গে গপ্পো মারছে পাতাসী৷ ফের আর একদিন দেখে, তারই দাওয়ায় দুটিতে বসে ফিসিরফিসির করছে৷ খবরটবর নিয়ে জানল, ছোকরার নাম প্রহ্লাদ৷ কোনও মহাজনের ঘরের বাগাল৷ তার সঙ্গে পাতাসীর নাকি বিয়ের আগে থেকে আসনাই ছিল৷ কদিন পরে আবার চোখে পড়ল, ছোঁড়া তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে পট করে সেঁধিয়ে গেল পিছনদিকে৷ দেখার পর মাথার একটা জ্বলুনি ছিলই, তার ওপর গাভীন গরুটা গেল হারিয়ে৷ এই দুয়ে মিলে...
লাশটা নিয়ে গিরীন এখন কী করবে ভেবে পেল না৷ আগের দুটো কেস তবু একটু অন্যরকম ছিল৷ প্রথমবার পুলিস-টুলিস এসেছিল, থানা-মর্গ অনেক হল, হয়রানিও কম নয়৷ কঞ্চির বেলাও কম হইচই হয়নি৷ তবু বউ ভেগে যাওয়ার ব্যাপার গাঁ-গ্রামে আরও হয়ে থাকে৷ কিন্তু পাতাসীর কেসটা যে একেবারে অন্যরকম৷ একটা লাঠির ঘায়ে সে যে চোখ উল্টে শুয়ে থাকবে তা কে জানত! এখন এই বেআক্কেলে মড়াটা নিয়ে সে এখন কী করে!
গিরীনের ঘরখানা অবিশ্যি গাঁয়ের একপ্রান্তে৷ সে হাড়কেপ্পুনে বলেই হোক, আর তার ব্যাভার খারাপ হলেই হোক, এ দিগরে জনমনিষ্যি ঘেঁসে না৷ রাত হওয়াতক সে বসে রইল গালে হাত দিয়ে দরজায় খিল তুলে৷ তারপর যেই অন্ধকার মিশ হয়ে নামল গাঁয়ের মধ্যে, অমনি পাতাসীকে সপাটে তুলে নিল ঘাড়ে৷ এর আগেও অনেকবার তুলেছে৷ কিন্তু এবার বেশ খানিকটা ভারী ঠেকল৷ বাইরে এসে হাতে নিল একখানা কোদাল৷ বেড়া খুলে লাশ কাঁধে নিয়ে হাঁটতে থাকল ফাঁকা জমিনের ভিতর দিয়ে৷ একেবারে তার দশবিঘে জমিনের ফালের কাছে এসে থামল৷
জমিনের চারপাশে মাটির চাঙের ওপর চাঙ বসিয়ে আল৷ প্রায় আধমানুষ সমান উঁচু৷ এই ক’দিন হল সে বসিয়েছে চাঙড়গুলো৷ সেগুলো আবার একে-একে সরিয়ে দিব্যি একটা শোয়ার জায়গা করে ফেলল পাতাসীর৷ জায়গাটা জমির এককোণে, তার ওপাশে পতিত জমি৷ নিশ্চিন্দি জায়গা৷ সেখানে পাতাসীকে শুইয়ে দিয়ে, তার ওপর ফের চাঙড়গুলো একে একে সাজিয়ে রেখে যেমনকে আল তেমন করে দিল৷ ব্যস, আর কাকপক্ষীটাও জানতে পারবে না৷ কাল সকালে পাড়ার লোক জানবে, গিরীনের এ পক্ষের বউটাও কার না কার সঙ্গে ভেগে গেছে৷
কাকপক্ষীতেও না জানলেও পাতাসীর খবর টেনে বার করল শিয়াল-কুকুরে৷ দিনদুয়েক পর হঠাৎ কে না কে দেখে ফেলল, গিরীনের জমির ধারে বেরিয়ে রয়েছে একটা মেয়ে মানুষের হাত৷
খবর পেয়ে থানার দারোগা, সন্ধেবেলা ফোন করল মহকুমা শাসকের দপ্তরে, স্যার একটা ডিস-ইন্টারের কেস আছে৷ একজন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে আসতে হবে এক্ষুনি৷ ম্যাজিস্ট্রেট না হলে তো স্যার—
ম্যাজিস্ট্রেট ভৌমিকসাহেব মেসেজটা হাতে পেয়ে বিরক্তিতে বিড়বিড় করতে লাগলেন, দারোগা আর খবর দেবার সময় পেল না৷ রাতটুকু কাটিয়ে সকালে ফোন করলে কী হত? এখন গাঁয়ের ভিতর রাতের বেলা কোথায় লোকজন কোথায় কী—
কিন্তু ততক্ষণে গাঁয়ের মাঠে প্রায় সার্কাস বসে গিয়েছে৷ ও সি-কে নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট যখন স্পটে পৌঁছলেন তখন রাত প্রায় নটা৷ গাঁয়ের রাত নটা মানে শহরের মধ্যরাত৷ অন্ধকারে ঢি ঢি করছে গোটা গাঁ৷ স্পট পর্যন্ত আবার জিপ গেল না৷ মেটেরাস্তা যেখানে ভেঙেচুরে খন্দ হয়ে রয়েছে, সেখান থেকে দেড় কিলোমিটার হেঁটে যেতে হল গাঁ পেরিয়ে মাঠের একেবারে শেষপ্রান্তে৷ জিপের হেডলাইট নিভতে অন্ধকার আরও দ্বিগুণ৷ দারোগা অবশ্য অভয় দিয়ে বললেন, স্যার, টর্চ আছে৷
দারোগার টর্চের দাপটও অবশ্য কম নয়৷ মিশ অন্ধকারে টর্চের আলোয় পোস্টমর্টেম৷ করতে করতে হেঁটে পৌঁছুলেন যখন, তার আগেই সেখানে গোটা দুই হ্যাচাকের আলো৷ চারপাশে গুচ্ছের লোক ভিড় করে মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় যেন সার্কাস দেখছে৷ পুলিস দেখেই ‘এই সর সর, পুলিস এসেছে’ বলেই ভিড়ের লোক সরে দাঁড়াল খানিক৷ লোকজন ঠেলেঠুলে দুজনে ভিতরে ঢুকতে দেখলেন, মাঝখানে বসে আছে একটা আধবুড়ো লোক, কাঁচাপাকা চুল, উসকো-খুসকো৷ গায়ের জামা, পরনের লুঙি সব ছেঁড়াখোঁড়া৷ গোঁজ হয়ে বসে আছে দু-হাঁটুর ভিতর মাথা গুঁজে৷
জিপ থেকে নেমে এতখানি পথ হেঁটে এসেছেন দারোগাবাবু, তার ওপর আবার রাত হয়েছে৷ মেজাজটা তাই বেশ চড়েই ছিল৷ যে দারোগাবাবু এতক্ষণ, ‘স্যার স্যার’ করতে করতে আসছিলেন, হঠাৎ গিরীনের দোমড় হয়ে থাকা শরীরটার দিকে চোখ পড়তেই মুখখানা বেমালুম অন্যরকম হয়ে গেল৷ ‘স্যার’-এর পরিবর্তে বেরল ‘শালা’— শালা, হারামির বাচ্চা, বছর-বছর এট্টা করে বিয়ে করবে, আর দু-চার বছর পরেই ভোগে দেবে, বলেই পাক্কা ফুটবলারদের মতো পোজ করে একখানা কিক মারলেন গিরীনের মাজায়, শালা আঁটকুড়ো গুঁই—
গিরীন, মুখে কোঁৎ করে একটা শব্দ করে গড়িয়ে গেল তিনচারবার ভল্ট খেয়ে৷ এতক্ষণ জনগণ তাকে তুলোধোনা করে হাতের সুখ করেছে, তা মুখ গোঁজ করে সয়ে গেছে গিরীন, একবারও মুখ তোলেনি৷ এবার মুখ তুলে দেখল৷ পুলিসের বুটের মর্যাদাই আলাদা৷ এ মারখানা যেন অন্যরকম৷
ক্রিমিনাল সামনে দেখতে পেলে দারোগাদের মুখচোখ কিরকম অদ্ভুতভাবে বদলে যায় তাই-ই অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট ভৌমিকবাবু৷ ও সি ততক্ষণে ধমকে উঠছেন, অ্যাই, সর সর, সব মাঠের ভিতর ভিড় করে মজা দেখতে এয়েছে৷ কই, চৌকিদার—
চৌকিদার হল গিয়ে গাঁয়ের লোয়েস্ট লেভেলের পুলিস৷ হাঁটুসোর ধুতির ওপর খাকি জামা৷ কোমরে একটা ঢলঢলে বেল্ট৷ ওপরওলার হাঁক শুনে শশব্যস্ত হয়ে গিয়ে দাঁড়ায় দারোগাবাবুর সামনে৷ তাকে একটা হাফ-খিস্তি দিয়ে ও সি বললেন, ধাঙড় জোগাড় করেছিস? লাশটা খুঁড়ে বার করতে হবে তো!
চৌকিদার স্যালুট দিতে শেখেনি৷ সে হাতের লাঠি-সহ দু’হাত জোড় করে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার—
ভিড়ের মধ্য থেকে তখন তড়পাচ্ছে অনেকে, ব্যাটাচ্ছেলের এবার একটা শিক্ষে হবার দরকার৷ মেরে একেবারে লাট করে দিন, দারোগাবাবু৷
আর একজন কে বলে উঠল, গরু হারিয়েছে বলে বৌটারেই মেরে ফেলাল, এ্যাঁ? বলি গরু বড়, না বৌ বড়?
অন্য একজনের গলা শোনা যায়, আগের বৌটারেও মেরে ফেলাইছিল, শুধুমুধু বদনাম দিয়ে বলেছে, বউ ভেগে গেছে—
নিয্যাস সত্যি কথাটা ত্যাখোন ভেবে দেখিনি তো৷ ওর বাড়ির আশপাশটা খুঁড়ে দ্যাখ তো৷
লাশ খুঁড়ে বার করতে করতে রাত দুপুর৷ দু’দিন ধরে মাটি চাপা পড়ে সেই লাশ আর তখন পাতাশী নেই৷
দিন দুয়েকের মধ্যে মর্গ থেকে রিপোর্ট এসে পৌঁছল পুলিসের কাছে৷ সে রিপোর্ট কোর্টে দাখিল করতে আদেশ হল, হাজত থেকে গিরীন চলে যাবে জেল-কাস্টডিতে৷ এখন বিচার কতদিনে শেষ হয় কে জানে৷ বড়দারোগা কাগজপত্তরে চোখ বোলাতে বোলাতে বললেন, শালার ফাঁসি না হয়ে যায় না! না হলে অন্তত যাবজ্জীবন৷
পুলিসের গাড়িতে তুলে চালান দেবার জন্য দারোগাবাবু চললেন হাজতের দিকে, শালা, তাহলে তুই দুটো খুন করলি, আঁটকুড়ো গুঁই! গিরীন ক’দিন ধরে ঝিম মেরে আছে৷ এ কয়দিনে এত মার খেয়েছে—৷ বড়দারোগার কথা শুনেও উচ্চবাচ্য করল না৷ কার কথা বলছেন দারোগাবাবু! জবার কথা? নাকি কঞ্চিকেও জড়িয়ে দিচ্ছেন এর মধ্যে!
বুঝলি, তোর বৌটার পেটে একটা বাচ্চা ছিল গিরীন৷ এ ক’দিনে একটাও রা কাড়েনি মুখে, হঠাৎ বড়দারোগার কথা শুনে ঝট করে মুখ তোলে, কী বললেন?
তোর বৌটা পোয়াতি ছিল রে৷ মর্গের ডাক্তার রিপোর্ট দিয়েছে৷ চার-পাঁচমাসের— গিরীন অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে থাকে বড়দারোগার দিকে৷ তার মাথার ভিতরে সব যেন তাল পাকিয়ে গোলমাল হয়ে গেল৷ সেই জন্যেই এই কয়েক মাস শরীরটা কেমন ভার-ভার ঠেকত পাতাসীর৷ বলত, একটু টক এনো তো, খুব খেতে ইচ্ছে করছে৷
চোখে শূন্যদৃষ্টি নিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে গিরীন৷ বাচ্চাটা কি সত্যিই তার! না কি ওই ফচকে ছোড়া প্রহ্লাদের৷ কিন্তু সে যারই হোক পাতাসীর কোলে একটা বাচ্চা এলে তার আঁটকুড়ো নামটা তো ঘুচত—
পুলিসের গাড়ি ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে হাজতঘরের কাছে৷ কোথায় যেতে হবে সে জানে না, চিরকালের জন্য কিনা তাও জানে না৷ গাড়িতে ওঠার আগে দারোগাবাবুর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, বাচ্চাটার মুখখানা একবার দেখাবেন, দারোগাবাবু! যাবার আগে দেখে যাই—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন