অশোক দাশগুপ্ত
রেল ইয়ার্ডের পাশে ইন্দির ওকে টানতে টানতে নিয়ে এল৷ জায়গাটা এমনিতেই নির্জন, তা এখন তো সন্ধ্যা উতরে গেছে৷ এখন কেউ ভুলেও এদিকে পা দেয় না৷
কুতকুতে চোখে চারপাশ একবার তাকিয়ে দেখে নিল টিটো৷ একদিকে টিনের বেড়া, অন্যদিকে কয়েক থাক ভাঙা রাবিশের স্তূপ, কিছু বনতুলসী আর বুনো কচুর ঝোপ৷ বিকেলের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে৷ পায়ের নিচে তাই কাদা কাদা ঠেকছে৷ তাছাড়া পেট-গুলোনো কেমন একটা গন্ধ ভেসে আসছে মাঝে মাঝে৷ কিন্তু ও সব তখন বড় কথা নয়, কাদা বা গন্ধ টিটো গ্রাহ্য করে না৷ ওর সারা গা জুড়ে তখন কেমন একটা ভিন্ন ধরনের চাপা উত্তেজনা গড়াতে শুরু করেছে৷ বুকের ভেতর যেন দক্ষযজ্ঞ চলছে৷ একটু কান পেতে থাকলেই যেন শোনা যেতে পারে ঢিবঢিব করছে বুকটা৷ কিন্তু ইন্দিরের সে দিকে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই৷ সাঁড়াশির মতো কেবল ওর হাতের কবজিটাকে ধরে রেখেছে ইন্দির৷ আর টানতে টানতে ওকে আরও অন্ধকারের ভিতর সেঁধিয়ে নিয়ে চলেছে৷
আরও খানিকটা এগোতেই টিটো ফিস ফিস করে বলল, কেউ দেখে ফেললে কিন্তু চোর ছ্যাঁচড় ভাববে রে ইন্দির, সেটা কি ভাল হবে?
ইন্দির তখনও ওর হাত ছাড়েনি৷ বিচ্ছুটাকে ওর বিশ্বাস নেই, হাত আলগা পেলেই ছুটে পালাতে পারে৷ সাহস দেবার জন্য বলল, এদিকে কেউ এলে তো দেখবে৷ আর একটু ওপাশে চল টিটো, জিনিসটা একবার একটু দেখেই তোকে ছেড়ে দেব৷
টিটোর ডান হাতে রয়েছে একটা কাগজের মোড়ক৷ কি রয়েছে তাতে কে জানে৷ তবে যাই থাক, টাকা-পয়সা যে নয়, তাতে সন্দেহ নেই৷ টাকা-পয়সা কেউ অমনভাবে কাগজে জড়িয়ে নিয়ে যায় না৷ তাহলে কি থাকতে পারে, সোনা-গয়না? ধুস, সোনাই যদি হবে তাহলে অমনভাবে কেউ ওটাকে সিটের পাশে ফেলে রেখে নেমে যায় না৷ টাকা-পয়সা বা সোনা-গয়না নাই থাক, কিছু একটা যে আছেই তাতে সন্দেহ নেই৷ টিটো খুব সতর্কভাবে ওটাকে আগলে রেখেছে৷
ইন্দিরেরও নজর সেই মোড়কটারই দিকে৷ নইলে কোথায় ওর লিলুয়ায় নামার কথা, ও নেমে পড়ল টিটোর পেছন পেছন৷
ঘটনাটা ঘটেছে খানিকক্ষণ আগে৷ দুজনেই ওরা ডানকুনি লোকালে বাড়ি ফিরছিল৷ দুজনেরই লিলুয়ায় নামার কথা, কিন্তু মাঝপথে একটা মজার ঘটনা ঘটল৷ ওদের কামরাটা ছিল ফাঁকা ফাঁকা৷ স্টেশনে ঢুকবার মুখে গাড়িটা একটু দাঁড়াতেই, দুজন লোক তড়িঘড়ি ট্রেন থেকে নেমে চোখের নিমেষে কোথায় মিলিয়ে গেল৷ নামতেই পারে, কত লোকই তো ওরকম নেমে যায়৷ কিন্তু টিটোর চোখে পড়ল একটা কাগজের মোড়ক৷ লোক দুটোই হয়ত ভুলে ওটা ফেলে গেল৷ কি ভুলো মন রে বাবা! টিটো এগিয়ে এসে সুট করে মোড়কটা তুলে ধরল৷ কিন্তু খুলতে সাহস হল না৷ এদিক ওদিক তাকাল, তারপর কামরা পাল্টাবার জন্য গেটের কাছে আসতেই ইন্দির এসে খপ করে ওর হাত ধরল, কি রে?
টিটো বলল, কিছু না৷
ইন্দিরের যা স্বভাব, হইচই বাধিয়ে দিতে পারে৷ টিটো ফিসফিস করে বলল, চেঁচাস না৷ ভাল হবে না৷
- ঠিক আছে, চল নামি তাহলে৷
টিটো বুঝল ও ধরা পড়ে গেছে৷ এ সময় চেঁচামেচি করলে বলাই, বিষ্টুরাও ছুটে আসতে পারে৷ আর তাহলে সবাই মিলে দেখতে চাইবে জিনিসটা৷ যদি কিছু দামি মাল থাকে, চোর ঠাওরাতেই পারে ওকেই৷ কেউ বিশ্বাস করবে না, মালটা ওর কুড়িয়ে পাওয়া৷ ফলে ইন্দিরের কথায় ও নেমে পড়ল গাড়ি থেকে৷
নেমে পড়তেই ইন্দির ওর কবজি ধরল, আয় এদিকে আয়৷
কোথায়?
আয় না৷ আমি একটা মেয়ে বই তো নই৷ আমাকে অত ভয় পাওয়ার কি আছে, এ্যাঁ?
ভয় ঠিক নয়৷ টিটো এই তেরো-চোদ্দো বছরের খেঁকুড়ে মেয়েটাকে কোনও দিনই বিশ্বাস করে না৷ ভুলিয়ে ভালিয়ে ও জিনিসটাকে যে হাতাবার তাল কষছে তাতে সন্দেহ নেই৷ তবু টিটো এক মুহূর্ত কি ভাবল, তারপর রাজি হয়ে গেল৷ মনে মনে ঠিক করে নিল, তেমন অবস্থা বুঝলে ও ধানখেতের মধ্যে দিয়েই দৌড় লাগাবে৷ ইন্দির তো দূরের কথা, অনেক বড়রাই ওর সঙ্গে দৌড়ে পারে না৷
ইন্দিরের সঙ্গে গায় গায় সেঁটে ও এগিয়ে চলল৷ কিন্তু ততক্ষণে বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে৷ রেল ইয়ার্ডের পাশটায় আরও অন্ধকার৷ সামনেই একটা আদ্যিকালের তেঁতুল গাছ৷ সন্ধ্যা হলেই এসব গাছে হাজার হাজার পাখি এসে ভিড় জমায়৷ পাখিগুলো এখন ডালে পাতায় কোথায় কোথায় লুকিয়ে পড়েছে, কে জানে!
টিটো গাছটার দিকে বেশিক্ষণ তাকাল না৷ তবু ভাল ইন্দির এখন ওর পাশে আছে৷ নইলে একা একা ও এই ভুতুড়ে গাছটার দিকে এগোতেই পারত না৷ অনেক সময় মানুষের আত্মাও যে ওইরকম পাখির বেশ ধরে গাছের ডালে বসে থাকে না, কে বলতে পারে৷ কোনটা আসল পাখি আর কোনটা প্রেতাত্মা, টিটোর পক্ষে তা বিচার করা সম্ভব নয়৷
আরও খানিকটা এগিয়ে একেবারে তেঁতুল গাছের গোড়ায় এসে ইন্দির বলল, বোস এখানে! এই অন্ধকারে এদিকে কেউ আসবে না! একটু শান্ত হয়ে এবার বোস তো!
টিটোর কেমন ভয় ভয় লাগছিল৷ উপায় না দেখে ও ইন্দিরের গা ঘেঁষে বসে পড়ল৷ হাঁটুতে হাঁটু ছুঁইয়ে রাখল ও৷ মাথা ঘোরাতেই ইন্দিরের গায়ের গন্ধটা ও টের পেল৷ ঘেঁটু ফুলের মতো ভেজা ভেজা কেমন যেন একটা গন্ধ আছে ওর গায়ে৷ গন্ধটা ওর স্নায়ুর ভেতর ঢুকে কেমন যেন গেঁথে যেতে লাগল৷
ইন্দির বলল, দে এবার৷ জিনিসটা দেখি৷
টিটো এরকমই একটা ভয় পাচ্ছিল৷ গা ঝাড়া দিয়ে উঠল, ওটা আমার৷
আমার তো কি হয়েছে৷ দেখলে ক্ষয়ে যাবে নাকি! দে না!
টিটো এবার একটু সরে বসার চেষ্টা করে৷ কিন্তু গাছটার দিকে চোখ পড়তেই আবার চমকে ওঠে৷ এদিককার ডালটা কি আগে থেকেই এত ঝোলানো ছিল৷ নাকি টিটো একটু সরার চেষ্টা করতেই ওটা অমন ঝুলে পড়ল৷ ও বলেই ফেলল, আমার ভয় করছে৷
ইন্দির ওর দিকে তাকিয়েই ছিল, বলল, তুই চুরি করেছিস না ডাকাতি করেছিস যে ভয় করবে৷
— ও কথা না৷ টিটো আঙুল তুলে তেঁতুল গাছের ঝোলানো ডালটার দিকে ইঙ্গিত করল৷
কি আছে গাছে? কেমন কৌতুকে তাকায় ইন্দির৷
টিটো ঠিক বুঝিয়ে উঠতে পারল না, এই রাত্রিবেলায় ওখানে কি থাকতে পারে৷ আবার ও খানিকটা সরে ইন্দিরের গায় গায় সেঁটে বসল৷
আর সেই সুযোগে ইন্দির ওকে বুকের কাছাকাছি টেনে নিল৷
ইন্দিরের গাটা কেমন কুকুরের পেটের মতো গরম৷ এক চাপ নরম মাংসও যেন চেপে বসেছে ওর গায়ে৷ টিটোর সারা গায়ে কেমন ঝিমঝিম করা ভাল লাগার একটা স্রোত বইতে শুরু করল৷ বোবা হয়ে গেল ও৷
ইন্দির ওর ঘাড়ের ওপর একটা হাত তুলে রাখল, তুই না একটা ক্যাবলা৷ পুরুষ মানুষের অত ভয় থাকতে নেই৷
টিটো কথা বলল না৷ কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না ওর৷
আমি যদি তোর মতো ছেলে হয়ে জন্মাতাম, এত দিনে দেখতিস কত কিছু করে ফেলতাম৷ ইন্দির ওর গালে আলতো করে একটা টোকা মারল৷
ঘোড়ার ডিম করতিস৷ ছোট্ট করে উত্তর দিল টিটো৷
অবশ্য তুই এখনও পুরোপুরি ছেলে হয়ে জন্মাসনি৷ তুই এখনও শিশু, মায়ের দুধ খাস৷
ভ্যাট৷ এক ঝটকায় ইন্দিরের হাতটাকে কাঁধের ওপর থেকে সরিয়ে দিল টিটো৷
ইন্দির আবার হাতটা তুলে আনল ওর কাঁধে, খাস না বুঝি? কত বয়স তোর শুনি? আমি যতদূর জানি, তোর এখনও দশ হয়নি৷
টিটো দাঁতে দাঁত চেপে বলল, এখানে হাত দিয়ে দেখ না, গোঁফ উঠছে আমার৷ দশ বছরে কারও গোঁফ ওঠে না৷
দেখি! অন্ধকারে ইন্দির হাত তুলে এনে ওর ঠোঁটের ওপর বুলিয়ে নিল, আই বাপ, মেয়েদের মতো ঠোঁট রে তোর৷ কি নরম৷
বাজে কথা৷ তোর ঠোঁট বুঝি ছেলেদের মতো৷
হাত বুলিয়ে দেখ না৷ দেখলেই বুঝতে পারবি৷
আমার দরকার নেই৷ টিটো আবার গাছটার দিকে তাকাল৷ গাছের অন্ধকারটা ক্রমশ যেন ফেঁপে ফেঁপে বড় হয়ে উঠছে৷ অথচ ইন্দিরটার কোনও নজরই নেই সেদিকে৷ একটা কিছু হয়ে গেলে তখন বুঝবে৷
ইন্দির বলল, ঠিক আছে, অনেকক্ষণ তো হল, এবার খুলে দেখা৷ কি পেয়েছিস দেখি৷ টিটো আবার শক্ত করে মোড়কটাকে ধরে বুকের মধ্যে লুকোল৷
— কি হল, দেখা না৷ কথা দিচ্ছি আমি ছোঁব না৷ দেখা৷
টিটো বলল, ঠিক আছে, তুই যদি না ধরিস তাহলে আমি দেখাতে পারি৷
— বললাম তো ধরব না৷
টিটো এবার আড়চোখে একবার ইন্দিরের চোখের ভাষা বোঝবার চেষ্টা করল৷ কিন্তু অন্ধকারে ছাই কিছু বোঝা যায় না৷ তার বদলে ওর চিবুকের কাছে হঠাৎ একটু ইন্দিরের গরম নিঃশ্বাসের হলকা লাগল৷
— ঠিক আছে, তুই একটু সরে বোস, আমি দেখাচ্ছি৷
একটু ঢিল হয়ে সরে বসল ইন্দির৷
টিটো কাগজের মোড়কটা কোলের ওপর রেখে ধীরে ধীরে গুপ্তধন আবিষ্কার করতে বসে গেল৷
— হায় হায়, এ কি রে! কেমন যেন মিইয়ে পড়ল টিটো৷ কয়েক ফেত্যা কাগজের ভাঁজ খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল পাকে পাকে সুতলি জড়ানো দুটো বোমা৷ এতক্ষণ ও দুটোকেই গুপ্তধন মনে করে বুকের ভেতর আঁকড়ে রেখেছিল ও৷ কি বোকা!
ইন্দির টিটোর অবস্থা দেখে হি হি করে হেসে উঠল, খুব হয়েছে, বেশ হয়েছে৷ আরও ওটা আমার আমার কর৷
— আমি কি করে বুঝব, লোক দুটো বোমা ফেলে যাবে ট্রেনে৷
— তুই একটা অপয়া৷ আমি ভাবছিলাম মণিমুক্তো মোহর কত কিছু থাকবে৷
— তোর জন্যই তো এমন হল৷ তুই যদি অমন করে আমার পিছু না লাগতিস তাহলে এমন হত না৷
— ঘোড়ার ডিম হত তাহলে৷ দাঁড়া ও দুটোকে আবার জড়িয়ে রাখি৷ কপাল ভাল, এতক্ষণ ও দুটো নিয়ে ঘুরছিস, ফেটে যায়নি৷ ফেটে গেলে কি কেলেঙ্কারি হত বল তো!
ইন্দির ভয়ে বোমা দুটোকে আবার কাগজের মোড়কে জড়িয়ে একপাশে সরিয়ে রাখল৷
— মিছিমিছি আমরা গাড়ি থেকে নেমে এই এখানে এলাম৷ টিটোর গলায় আক্ষেপ৷
— এখানে এসে ভালই হয়েছে৷ বোকার মতো কোথায় গিয়ে তুই ওটাকে খুলতিস, আর অমনি পুলিস এসে খপ করে তোকে ধরত৷ তুই তো এখনও পুলিসের গুঁতো খাসনি কোনওদিন৷ খেলে বুঝতিস৷
— তুই খেয়েছিস বুঝি?
— আমি বড় হয়ে গেছি না৷ মেয়েদের গায়ে পুলিস কখনও হাত দেয় না৷ তাছাড়া এবার থেকে আমি ফ্রকের বদলে শাড়ি পরতে শুরু করব৷
টিটো একটুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল৷ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, মেয়ে হয়ে জন্মেছিস বলে তোর অনেক সুবিধে৷
— সুবিধে কেন? কৌতুকে ড্যাব ড্যাব করে তাকায় ইন্দির৷
— কেন কি আবার৷ নারানবাবু তোকে মাঝে মাঝেই পয়সা দেয়৷ আমি দেখিনি বুঝি৷
— সে তো আমি ওর গা-হাত-পা টিপে দিই বলে, দোকান থেকে চা-সিগারেট এনে দিই, জল তুলে দিই, তাই৷
— তুই মেয়ে বলেই তোকে দিয়ে ও ওসব করায়৷ আমি কাছে গেলে কেমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে ওঠে দেখিস না৷ এমন ভাব দেখায় যেন ভিক্ষুক তাড়াচ্ছে৷
ইন্দিরা হেসে উঠল, তুই বড্ড ছেলেমানুষ৷ এই জন্যই তো বলছিলাম, তুই মায়ের দুধ খাস৷
আবার খানিকটা বিরক্ত হয় টিটো৷ সত্যি কথা বললে তো তোর গায়ে লাগবেই৷
— সত্যি কথা আবার কি, নারানবাবু আমাকে এমনি এমনি পয়সা দেয় না, রীতিমতো খাটিয়ে পয়সা দেয়৷
টিটোর ঠোঁটের ডগায় অনেক খারাপ কথা এসে যাচ্ছিল, চেপে গেল৷ অনেক সময় অনেক সত্যি কথা বলা যায় না৷ তাছাড়া ইন্দিরাকে এ সময় খারাপও লাগছিল না৷ ভগবান যেন ওকে ছানা-মাখন দিয়ে গড়েছে৷ তাছাড়া ওর শরীরের গন্ধটার মধ্যেও কেমন যেন একটা আকর্ষণ রয়েছে৷
আবার একটু গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে ওরা৷ টিটোর কাঁধের ওপর আবার একটা হাত তুলে দিয়েছে ইন্দির৷ টিটোর বুকের ভেতর আবার যেন দুম দুম করে শব্দ হতে শুরু করেছে৷ কেমন আড়ষ্ট হয়ে সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে ও৷
ইন্দির ওর হাতখানা এবার নিজের কোলের ওপরেই টেনে নিল, ঠিক হয়ে বোস না টিটো৷ তুই না ভয়ানক ভীতু, ভয়েই মরে গেলি৷ অথচ এই সাহস নিয়ে তুই রেলে রেলে ঘুরে বেড়াস কী করে, বুঝি না৷
টিটো অস্বীকার করতে পারে না ও ভীতু৷ চুপ করেই থাকে ও৷
—তাছাড়া তোর গায়ে একদম জোর নেই, এই তো তোর শুকনো শুকনো হাত৷
টিটো একটু বিব্রতভাবে হাসবার চেষ্টা করে৷ তারপর বলে, তোর চেয়ে বেশি জোর৷ ইচ্ছে করলে আমি কালুদার মতো ঘুসি মেরে নারকেল ফাটাতে পারি৷
— ছাই পারিস৷ যাদের হাত-পা অত ঠান্ডা তারা কিচ্ছু পারে না৷
— তোরও তো ঠান্ডা৷ টিটোর গলার স্বর ফ্যাস ফ্যাস করে উঠল৷
আর ঠিক এই সময়ই ওরা দুজনে চমকে উঠল৷ কে একটা লোক যেন এদিকেই এগিয়ে আসছে৷ হাতে একটা টর্চ৷ ইন্দির ফিসফিস করে বলল, চুপ৷
টিটো ঘাড় উঁচু করে দেখার চেষ্টা করল, সত্যি সত্যি একটা ছায়া মূর্তি৷ মূর্তিটা কি তেঁতুল গাছের দিকটাতেই এগিয়ে আসছে নাকি! কি জানি বাবা, কি মতলব রয়েছে মাথায়৷
— কে রে বাবা! এদিকে এই অন্ধকারের দিকে কি চায় ও৷ ইন্দিরও ঠিক বুঝতে পারছে না, কে হতে পারে লোকটা৷ হঠাৎ যদি ওদের দেখে ফেলে এখানে নির্ঘাত চোর চোর করে চেঁচিয়ে উঠবে৷
স্টেশনের দিকটা এখন নিঝুম হয়ে থাকার কথা৷ এ সব স্টেশনে ট্রেন এলেই যা একটু লোকজন দেখা যায়৷ অনায়াসে ওরা স্টেশনে গিয়ে বসেও গল্প করে কাটাতে পারত৷ পরের লোকাল আসতে রাত ন-টা৷
ইন্দির ফিসফিস করে ওর কানের কাছে মুখ এনে বলল, কথা বলিস না টিটো৷ লোকটা বোধহয় চৌকিদার৷ শেডের পিছন দিকটা দেখতে এসেছে৷
টিটো কথা বলবে কি, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে৷ ইন্দিরই এখন ওর ভরসা৷ মেয়েটা আর যাই হোক, বেশ সাহস আছে৷ ফলে ইন্দিরের গায় গায় একদম ও সেঁটে যাচ্ছিল৷ যেন ইন্দিরকে ও সামনে রেখে পাঁচিলের মতো পিছনে লুকোবার চেষ্টা করছিল৷
ছায়ামূর্তির হাতের টর্চটা একবার তেঁতুল গাছের গা ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল৷ আলোটা আর একটু নিচের দিকে নামলেই ওরা ধরা পড়ে যেত৷
কিন্তু ইন্দিরের যেন ভয়ডর বলতে কিছুই নেই৷ এই অবস্থাতেই ও ফিসফিস করে কী যেন বলতে চাইছে৷
— কি? কি বলছিস?
— এখানে বসাটা ঠিক হচ্ছে না৷ চট করে ওই রাবিশগুলোর পিছনে চল৷ এই৷
টিটো একটু ঝাঁকি খেল৷ তুই আগে যা৷
— ঠিক আছে৷ আয়, আমার পিছনে আয়৷ শব্দ করিস না যেন৷
ইন্দির হামাগুড়ি দিয়ে খানিকটা এগিয়ে সুট করে রাবিশের স্তূপের পিছনে এসেই মাথা নিচু করে বসে পড়ল৷
টিটোও অনুসরণ করল ওকে৷ যত রাজ্যের খোয়া ভাঙা আর পাথরের ঢেলার মধ্যে গড়িয়ে পড়ল টিটো৷
ইন্দির আবার ওর গায় গায় সেঁটে গেল৷ তারপর একটু একটু করে মাথা তুলে দেখতে লাগল লোকটা কি করে৷
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ৷ হঠাৎ ইন্দির ফিসফিস করে বলল, আর একটু জোরে চেপে ধর না আমাকে, বেশ লাগছে৷
অন্য সময় হলে টিটো ওর নাকের ওপর একটা ঘুসি চালিয়ে দিত, কিন্তু এখন ইন্দির ছাড়া ওর উপায় নেই৷
টর্চ ঘোরাতে ঘোরাতে লোকটা ততক্ষণে প্রায় তেঁতুল গাছটার কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে৷ একটু থমকে দাঁড়িয়েছে৷ কি জানি বাবা কাগজের মোড়কটা ওর চোখে পড়ে গেছে কিনা৷
ইন্দির ওর গালটাকে টিটোর গালের সঙ্গে চেপে রেখেছে৷ ভীষণ বিড়ি খায় ইন্দির৷ ওর মুখ থেকে বিড়ির গন্ধ ভেসে আসছে৷ তা হোক, এখন আর বিড়ির গন্ধ নিয়ে ভাবলে চলবে না ওর৷
ছায়ামূর্তিটা কিন্তু এবার শেডের দিকটা দেখে নিয়ে আবার ফিরে যেতে শুরু করেছে৷ চৌকিদার যে সন্দেহ নেই৷ চৌকিদার না হলে অমনি করে ফালতু ফালতু আসে কেউ৷
— যাক বাবা বাঁচা গেল৷ ইন্দির আরও কিছুক্ষণ পর বলল৷
টিটোও যেন ততক্ষণে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে৷ তবু নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করল, চলে গেছে? ইন্দিরের দিকে তাকিয়ে থাকল ও৷
— হ্যাঁ গো মশাই, গেছে৷ ভয়ে একেবার কেঁচো হয়ে গেছিস তুই৷
টিটো একটু সহজ হবার জন্য হাসল, ভয় না৷ আসলে লোকটা আমাদের দেখে ফেললে ঝামেলা হত৷
— ছাই করত আমাদের৷ আমরা তো আর চোর নই৷ যারা চুরি করে তাদের ধরুক না ও৷ এই টিটো আর একটু চেপে ধর না আমাকে৷
— ধুত! টিটো মুহূর্তের মধ্যেই ওর হাত দুটো ইন্দিরের গা থেকে সরিয়ে আনল৷ চল, উঠি এবার৷
— উঠে কোথায় যাবি? পরের লোকাল আসবে রাত ন-টায়৷ এখনও ঢের দেরি৷
— চল না প্ল্যাটফর্মে যাই৷ লোকটা আবার যদি দেখতে আসে?
— ছাই আসবে৷ তুই না একটা নাম্বার ওয়ান ক্যাবলা৷
— ক্যাবলা তো ক্যাবলা৷ টিটো ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে৷
ইন্দির বলল, তুই একলা যাস তো, আমি চেঁচিয়ে চৌকিদারকে জানিয়ে দেব৷
চৌকিদারের কথায় আবার একটু থমকে দাঁড়ায় ও৷ এদিক-ওদিক তাকায়৷ ইন্দিরও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে৷ দাঁড়িয়ে একপলক ও টিটোকে দেখে নিয়ে হি হি করে হেসে উঠল৷
— হাসছিস যে? প্রশ্ন করে টিটো৷
— তোর অবস্থা দেখে৷
— কেন, কি করেছি আমি? তুই না এমন করছিস, যেন—
— ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে৷ আর হাসব না৷ এই আমার দিকে একটু তাকা দেখি৷
টিটো ওর চোখের দিকে তাকাল, কি হয়েছে? দেখল, অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে ইন্দিরের চোখ৷
ইন্দির ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাঁধের ওপর হাত দুটো বিছিয়ে দিল, দাঁড়া, একটা মজা করব৷
— কি মজা৷ বুকের ভেতর আবার ঢিব ঢিব শব্দ শুরু হয় টিটোর৷
— আমার দিকে তাকিয়ে থাক না৷
— তাকিয়েই তো আছি৷ টিটো মন্ত্রমুগ্ধের মতো ইন্দিরের দিকে তাকিয়ে থাকল৷ ছায়া ছায়া অথচ নিটোল মোমের মতো ইন্দিরের মুখখানা যেন এগিয়ে আসছে৷ ইন্দির যেন সম্মোহন করে ফেলছে ওকে৷ টিটো চোখ ফেরাতে পারল না৷ জাদুকরীর মতো ইন্দির যেন এখন চোখের খেলা দেখাতে শুরু করেছে৷
এক ঝলক উষ্ণ নিঃশ্বাস ওর কপাল ছুঁয়ে গেল৷ টিটো ভয়ে চোখ বুজে ফেলল৷ ঝাঁঝাল একটা গন্ধ যেন ক্রমশ ওকে ঘিরে ফেলছে৷ বিড়ি-খাওয়া কটু একজোড়া ঠোঁটের স্পর্শ পেল ও৷ আর সঙ্গে সঙ্গে যেন বুকের ভেতর দুম দুম করে বোমা ফাটাতে শুরু করল৷ অনাস্বাদিত একটা জগতে ধীরে ধীরে পৌঁছে যেতে শুরু করল টিটো৷
অনেকক্ষণ ওইভাবে কেটে গেল ওদের৷ লালায় আর রক্তে ঠোঁটটা জ্বালা করে উঠতেই টিটো একটু শব্দ করে ককিয়ে উঠল৷
আর সঙ্গে সঙ্গে ওকে ছেড়ে সরে দাঁড়াল ইন্দির, কি হল?
সমস্ত শরীরটা তখনও থরথর করে কাঁপছে৷ কথা বলতে পারল না টিটো৷ জামাটা উল্টে নিয়ে ঠোঁট মুছতে শুরু করল৷
ইন্দির বলল, ধুত! ফালতু৷ মায়ের দুধ খা-গে যা৷
টিটো কথা বলল না৷
ইন্দির বলল, চল রে ক্যাবলা৷ প্ল্যাটফর্মেই যাই চল৷ আয়৷ টিটোর হাত দুটো আবার সাঁড়াশির মতো চেপে ধরল ও৷
রাবিশের স্তূপ থেকে তেঁতুল গাছটার কাছে আসতেই টিটোর চোখে পড়ল কাগজের মোড়কটা৷
ইন্দির বলল, কি দেখছিস? ভয় নেই রে ক্যাবলা, ফাটবে না, আয়৷
— ফাটবে না কেন? ফ্যালফ্যাল করে তাকায় টিটো৷
ইন্দির হাসে, সব বোমাই কি ফাটে নাকি! তোর মতো ভেজা যে, আয়৷
ওরা প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে লাগল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন