অশোক দাশগুপ্ত
‘তোমরা কি কেহ কখনও মাছরাঙা পাখি দেখিয়াছ?’ গ্রন্থের নাম নবনীতিসুধা৷ গ্রন্থকারের নাম যতদূর মনে আছে উপেন্দ্রমোহন দাস৷ নবনীতিসুধা বইয়ের প্রথম রচনাটি মাছরাঙা পাখির বিষয়ে৷ বইয়ের শুরুতেই একটা পূর্ণ পৃষ্ঠা মাঝরাঙা পাখির রঙিন ছবি রয়েছে৷
তখন রঙিন ছবি সুলভ ছিল না৷ খবরের কাগজে, পত্র-পত্রিকায়, বইপত্রে সবই ছিল সাদাকালো ব্লকের ছবি৷
সন, উনিশশো তেতাল্লিশ খ্রিস্টাব্দ, তেরোশো পঞ্চাশ বঙ্গাব্দ৷ মহাযুদ্ধ, মহামারী, মন্বন্তর৷ রঙ্গমঞ্চে নাটকের নায়কের আবেগকম্পিত কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে, ‘বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা৷’
আমি তখন বড় হচ্ছি৷ মফসসল শহরের পুরনো দালান বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নেমে উঠোন পেরিয়ে পুকুরধারের কাঁচা রাস্তা ধরে খোয়া-বাঁধানো সড়কে উঠছি৷ আর একটু এগিয়ে গিয়ে খালপাড়ে ইস্কুল, বিন্দুবাসিনী উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়৷ বড় ইস্কুল৷
আমাকে বড় ইস্কুলে ভর্তি করা হয়েছে৷ ক্লাস থ্রি৷ ওইটাই বড় ইস্কুলের সবচেয়ে নিচু ক্লাস৷
আমি ইস্কুলে একা যাই না৷ আবার পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে দলবেঁধেও যাই না৷ আমাকে কেউ না কেউ বাড়ি থেকে ইস্কুল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে, আবার ছুটির পরে নিয়েও আসে৷
আমাকে একা ছাড়া হয় না দুটো কারণে৷ ইস্কুল যেতে গেলে খালের ওপরে কাঠের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয়৷ তাছাড়া খালের ওপারেই বড় রাস্তা, বাসস্ট্যান্ড৷ সেখানে ধুলো উড়িয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাস আসে জেলাসদর থেকে, আবার ধুলো উড়িয়ে ফিরে যায়৷ তখন মফসসলে, বিশেষত আমাদের ওই নদীনালার দেশে এমন লোকের অভাব ছিল না যারা বাস বা মোটরগাড়ি দেখে অবাক হত, চড়তে ভয় পেত৷
অন্য যে কারণে আমার সঙ্গে ইস্কুল যাতায়াতের পথে লোক দেওয়া হত, সেটা হল লঙ্গরখানা৷
আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামান্য একটু কাঁচা রাস্তা অতিক্রম করে বাঁধানো সড়কে উঠলে ডানদিকে কালীবাড়ি, একটু বাঁদিকে এগোলে মসজিদ৷
বোধহয় সরকারি দাক্ষিণ্যেই সে সময় দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িতদের জন্য শহরে দুটো লঙ্গরখানা খোলা হয়েছে; কালীবাড়ির সামনে হিন্দুদের জন্যে আর মসজিদের সামনে মুসলমানদের জন্যে৷ দু জায়গায় একই খাবার, খিচুড়ি৷ লাল কুমড়ো, শোলা কচু, খোসাসুদ্ধ যে-কোনও জাতের ডাল আর মোটা চাল, বিশাল কাঠের উনুনে বড় বড় টিনের ড্রামে বহুক্ষণ ধরে অনেক জল ঢেলে ঢেলে ফোটানো হত৷ দিনে একবারই, দুপুরের পর বড় বড় লোহার হাতায় গরম খিচুড়ি শরণার্থীদের ভাঙা থালায়, সানকিতে বা কলাপাতায় ঢেলে দেওয়া হত৷ খেয়াল রাখা হত যাতে মন্দির আর মসজিদের খিচুড়ি এক সময়েই পরিবেশন করা হয়, না হলে বড় ধরনের গোলমাল হতে পারে, তাছাড়াও ক্ষুধার্তেরা খাদ্যের লোভে যদি ভিন্ন ধর্মের লোকের ভিড়ে মিশে খাদ্য গ্রহণ করে, তাহলে তো জাত যাবে৷
তবে জাত যাওয়ার ঢের আগে অনেকের প্রাণ চলে যেত৷ কালীবাড়ির সামনের রাস্তায় আর মসজিদের সামনের রাস্তায় প্রতিদিনই দুয়েকটা মড়া পড়ে থাকত৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের কবর দেওয়ার বা দাহ করার কেউ জুটত না৷ অনেকক্ষণ পরে মিউনিসিপ্যালিটির ধাঙড় কালু এসে মৃতদেহ নিয়ে যেত৷ প্রায় ছয় ফুট লম্বা, আবলুস-কালো, বিরাটাকায় দৈত্যের মতো চেহারা ছিল কালুর; চওড়া কাঁধ, বিশাল বিশাল হাতের থাবা৷ একটা বহু ব্যবহৃত, অতি জীর্ণ, শুকনো রক্ত-নোংরা মাখা খেজুর পাতার পাটিতে শক্ত নারকেলের দড়ি দিয়ে মড়াটা বেঁধে কাঁধে তুলে অক্লেশে নিয়ে যেত কালু৷ পরে শুনেছি প্রতিটি মড়া বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে কালুর বরাদ্দ ছিল আট আনা৷ কিন্তু মিউনিসিপ্যালিটির বড়বাবু লঙ্গরখানার মৃতদের নিয়ে যাওয়ার রেট কমিয়ে চার আনা করে দেন এই যুক্তিতে যে অনাহারে মৃত কঙ্কালসার মানুষের ওজন সাধারণের চেয়ে অনেক কম, তাই অর্ধেক রেট৷
বড় তাড়াতাড়ি বড় খারাপ জায়গায় পৌঁছে গেলাম৷ গল্পটা এক প্রায় দুগ্ধপোষ্য বালকের ইস্কুল যাওয়া নিয়ে৷ পাখি-ডাকা, ছায়া-ঢাকা মফসসল শহরের লাল সুরকি বাঁধানো রাস্তা৷ সাইকেল রিকশা তখনও আসেনি, কচিৎ-কদাচিৎ খুটখুট করে ঘোড়ার গাড়ি যায় টমটম, এক্কা৷ পালকি দুরকম, পালকি ঘোড়ার গাড়ি আর বেহারা-টানা হুমহুম পালকি৷ তাতে চড়ে রোগী আসে ডাক্তারবাড়িতে, গ্রামগঞ্জের নায়েব তহশীলদার আসে নথিপত্র নিয়ে উকিল বাড়িতে৷ আর দুই বেহারার কাঁধে ডুলি, কাপড় দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে ঢাকা ডুলির মধ্যে নাকে নোলক-পরা পড়াগাঁয়ের কিশোরী বৌ আকণ্ঠ ঘোমটা টেনে বসে নায়রে যায়, নায়র থেকে পতিগৃহে ফেরে৷
দূরে কালীবাড়ির পিছনে আদালতের মাঠে গত শতাব্দীর একটা অশ্বত্থ গাছ, সারা সময় হাওয়ায় ঝিরঝির করে তার সবুজ পাতা নাচছে, তার চূড়ায় সারাদিন রোদ ছুঁয়ে আছে৷
তারও ওপারে খালের ওপারে সিনেমা হল, বাসস্ট্যান্ড৷ একপাশে হাই ইংলিশ ইস্কুল, তারও বয়েস ষাট পেরিয়ে গেছে৷ পুরনো দিনের লম্বা, টানা টিনের চালা, তার মধ্যে ছেঁচা বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাগ করে করে ক্লাস, শুধু ইস্কুলের অফিসঘর, হেডমাস্টারের ঘর, টিচার্স রুম এইসব একটা সাবেকি থামওয়ালা দালানে৷
সেই দালানের সামনের বারান্দায় একটা আংটার সঙ্গে ঝোলানো আছে খাঁটি কাঁসার বেল একটা৷ তিনজন দপ্তরি তিনরকম ভাবে সে বেলটা বাজায়৷ সুন্দর, মধুসূদন আর ইসমাইল৷ বহু দূর থেকে বেল বাজানো শুনলে সারা শহরের লোক বুঝতে পারত এদের মধ্যে কে বেলটা বাজাচ্ছে৷
বেল বাজানোয় সুদক্ষ ছিল সুন্দর, আমরা বলতাম সুন্দরভাই, সে বিহারী ছিল, আমাদের ওখানকার ভাষায় পশ্চিমদেশী বা পশ্চিমা, সেইজন্যেই বোধহয় সুন্দরদা না হয়ে সুন্দরভাই হয়েছিল৷
বেল বাজানোকে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল সুন্দরভাই৷ ফার্স্ট বেল, সেকেন্ড বেল, টিফিন বেল, ছুটির বেল, হাফ হলিডে বেল— সবকিছুর মাত্রা তাল লয় একটু আলাদা ছিল৷ শুনলেই বোঝা যেত কোন বেলটা কিসের জন্যে৷
বেল বাজানোর পুরো দায়িত্বটাই ছিল সুন্দরভাইয়ের৷ তবে ছুটিছাটায় কিংবা অসুখবিসুখে অন্য দুজন দপ্তরি এ কাজটা করত, কিন্তু তার কোনও মাধুর্য ছিল না৷
ইস্কুল আরম্ভ হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগেই আমি ইস্কুলে পৌঁছে যেতাম৷ দূর গ্রামের দু-চারজন ছাত্র ছাড়া সেই সময়ে আর কেউ এসে পৌঁছাত না৷ অনেকটা হেঁটে, জলকাদা ভেঙে, কিছুটা ডিঙি বা খেয়ানৌকোয় বেশ খানিকটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে আসতে হত বলে দূরের ছাত্ররা কিছুটা সময় হাতে করেই আসত৷
আর আসতেন ভি এম স্যার৷
সকালবেলা তালা খুলে ইস্কুল খোলার আগে থেকে বিকেলে ইস্কুল বন্ধের পর ঠিকমতো তালা লাগানো হল কি না, সবগুলো তালা ধরে টেনে টেনে দেখে তারপর ভি এম স্যার ফিরতেন৷ সেকালে খোলা বারান্দা বা উঠোন থেকেও চেয়ার, বেঞ্চি বা তক্তপোশ চুরি যেত না৷ তবুও প্রতিটি ক্লাসগৃহের তালা টেনে নিজে না যাচাই করে তাঁর মনে শান্তি হত না৷
ঘণ্টা বাজানোর ঠিক আগের মুহূর্তে হেডমাস্টার মহাশয়ের দেয়াল ঘড়ি দেখে ভি এম স্যার ঘণ্টার কাছে এসে দাঁড়াতেন৷ এরপর তিনি আঙুল তুলে নির্দেশ দিলে সুন্দরভাই ঘণ্টা বাজানো আরম্ভ করত৷ তখন ঘড়ির এত ছড়াছড়ি ছিল না, পুরো ইস্কুলে একজন ছাত্রেরও কোনও ঘড়ি ছিল না৷ মাস্টারমশায়দের মধ্যেও মাত্র দুয়েকজনের পকেটঘড়ি ছিল৷ হাতঘড়ি মনে পড়ছে না৷
তা সে হাতঘড়িই হোক, আর পকেটঘড়িই হোক, ঘড়িওলা লোক তখন একজন মান্যগণ্য৷ মাতব্বর মানুষ৷ হাতঘড়ি পরে একটা লোক রাস্তা দিয়ে গেলে বা বাড়িতে এলে লোকে সম্ভ্রমের সঙ্গে তাকিয়ে দেখে৷ এমনকী ঘড়ি দেখা ব্যাপারটাও একটা বিশেষ বিদ্যা বলে ধরা হত, অনেকেই জিজ্ঞাসা করত বিদ্যাবুদ্ধির পরিচয় নিতে গিয়ে, ‘কি খোকা ঘড়ি দেখতে জানো?’ আর কনেদেখার সময় এই প্রশ্নটা অনিবার্য ছিল৷
সে এক অতীতকালের ব্যাপার৷
ভি এম স্যার এক অবলুপ্ত প্রজাতি৷ বহুকালের কথা, বহুদিন হল কোনও ইস্কুলে, বিদ্যালয়ে ভি এম স্যার দেখা যায় না৷
ভি এম মানে ভার্নাকুলার মাস্টার৷ বোধহয় তাই, ভুল হল কিনা বলতে পারছি না৷ হয়ত বা অন্য কিছুও হতে পারে ভি এম, কারও কাছে যাচাই করে নেব এতদিন পরে সে উপায়ও নেই৷
সে যা হোক, আমাদের বিদ্যালয়ের খুচরো তদারকি ছাড়াও তিনি আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর ক্লাস শিক্ষক ছিলেন৷ বড় ইস্কুলে যাওয়ার আগে আমি কোনও পাঠশালায় বা পাড়ার ইস্কুলে পড়িনি৷ সরাসরি ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়েছিলাম৷ সেই দিক থেকে ভি এম স্যারই আমার প্রথম শিক্ষক৷
ভি এম স্যার আমাদের অঞ্চলের লোক ছিলেন না৷ আমরা পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের অন্তর্বর্তী যমুনা-ধলেশ্বরীর অববাহিকার বাসিন্দা৷ ভি এম স্যার এসেছিলেন দূরাঞ্চল থেকে, নোয়াখালি জেলা থেকে৷
ভি এম স্যারের প্রকৃত নাম ছিল মৌলভী নঈমুল হোসেন কিংবা ওইরকম কিছু৷ কিন্তু সে নাম ভি এম স্যার খেতাবের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল৷ বহুকাল ছিলেন তিনি আমাদের শহরে ও ইস্কুলে৷ শেষ বয়সে তিনি গৌরবান্বিত বোধ করতেন এই বলে যে অমুক অমুক বাড়ির বাপ-ঠাকুর্দা-নাতি তিন পুরুষকে তিনি পড়িয়েছেন, তিন পুরুষ তাঁর হাতে কানমলা খেয়েছে৷
ঠিক তিন পুরুষ না হলেও বড় জ্যাঠামশাইকে বাদ দিলে আমার বাবা জ্যাঠারা তিন ভাই এবং আমরা চার ভাই তাঁর কাছে পড়েছি৷ ভি এম স্যার সম্ভবত উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না, বিদ্যালয়ের সবচেয়ে নিচু ক্লাসগুলোতে বাংলা, ইতিহাস— এইসব বিষয় পড়াতেন৷
তখন নিচু ক্লাসের শিক্ষক আর উঁচু ক্লাসের শিক্ষকের তারতম্য আমরা বুঝতাম না৷ কোন মাস্টার বেশি শিক্ষিত বা কম শিক্ষিত, ভাল পড়ান বা খারাপ পড়ান এ নিয়েও খুব একটা মাথা ঘামানো হত না৷
আমরা যখন ভি এম স্যারের ক্লাসে ভর্তি হয়েছি তখন তাঁর বয়েস পঞ্চাশের দিকে৷ সে সময়ে মাস্টারমশায়দের অবসরের বয়েস নিয়েও কড়াকড়ি ছিল না, শরীর স্বাস্থ্য ভাল থাকলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যাকে যতদিন ইচ্ছে রেখে দিতেন৷
ভি এম স্যারকে ধুতি পরতে দেখেছি৷ তবে সাধারণত ইস্কুলে আসতেন ঢিলে হাতা একটা নীল পাঞ্জাবি আর গোড়ালির ওপরে ওঠা খাটো ঝুল একটা পাজামা পরে৷ পায়ে ফিতেওলা কালো চামড়ার জুতো, কেনার পরে সে জুতোয় কোনও কালে কালি দেওয়া হত বলে মনে হয় না৷ জামাকাপড়ও সব সময়ে পরিচ্ছন্ন থাকত তা নয়৷ তবে তখনকার মফসসলে জীবনযাত্রার ধরন-ধারণ ছিল অন্যরকম৷ ফিটফাট, ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা লোকজন খুব কম দেখা যেত৷ ইস্ত্রিহীন সাবান কাচা জামা গায়ে দিয়ে আমাদের বালককাল কেটে গেছে, জুতো একজোড়া বাসায় থাকলেও সব সময়ে পায়ে থাকত না৷
ভি এম স্যার আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর ক্লাস শিক্ষক হিসেবে প্রত্যেক দিন প্রথম ঘণ্টার ক্লাস নিতেন, সেটা বাংলা ক্লাস৷ ওই উপেন্দ্রমোহন দাস প্রণীত নবনীতিসুধা৷ প্রথম রচনাই মাছরাঙা পাখি:
‘তোমরা কি কেহ কখনও মাছরাঙা পাখি দেখিয়াছ?’
আমাদেরও বাঙাল দেশ, আমাদেরও কথার মধ্যে ‘খামু’, ‘যামু’ আছে, কিন্তু ভি এম স্যারের নোয়াখালি উচ্চারণের কাছে সে কিছু নয়৷ বহু বৎসর আমাদের ওদিকে থেকেও তাঁর উচ্চারণে কোনও উন্নতি হয়নি৷ অনেক সময় বুঝতে একটু কষ্ট হত, কিন্তু তিনি দৈনন্দিন কথাবার্তা তাঁর নোয়াখালির উচ্চারণেই সারতেন৷ তাঁর উচ্চারণের অসুবিধে বা অসঙ্গতি সম্পর্কে ভি এম স্যার যথেষ্টই সচেতন ছিলেন৷ এবং সেই জন্যে ক্লাসে পড়ানোর সময়ে তিনি যথাসাধ্য সাধুভাষায় কথাবার্তা বলতেন৷
বহুকাল পরে একটি বিখ্যাত বাংলা চলচ্চিত্রে রূপকথার রাজাকে এইরকম সাধুভাষায় কথা বলতে শুনেছি এবং শোনামাত্রই বহু আগের ভি এম স্যারের কথা মনে পড়েছে৷
চলচ্চিত্রে রাজা সাধুভাষায় কথা বলায় বেশ বৈচিত্র্যের এবং কৌতুকের সৃষ্টি হয়েছিল৷ ভি এম স্যারের ব্যাপারটা অবশ্য ঠিক তা নয়৷
তখন তো পাঠ্যপুস্তকে প্রায় সমস্ত গদ্যরচনাই ছিল সাধুভাষায় আর আমাদের সেই বাঙাল মফসসলে মাস্টারমশায়েরা প্রায় কেউই পড়ানোর সময় বা অন্য সময় প্রকৃত চলিত ভাষায় কথা বলতেন না, বলতে পারতেন না৷ সাধু, বাঙাল এবং চলিত ভাষার একটা গোঁজামিল সংমিশ্রণ তাঁরা ব্যবহার করতেন৷
তার চেয়ে ভি এম স্যারের সাধুভাষা খারাপ ছিল না৷ বিদ্যাসাগর বা বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্য না হলেও মোটামুটি শুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন সাধুভাষা ভি এম স্যার ব্যবহার করতেন, অন্তত ব্যবহার করার চেষ্টা করতেন৷
প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসেই নাম ডাকা শুরু করে ভি এম স্যার একে একে আমাদের প্রত্যেকের বংশপরিচয় জেনে নিলেন৷ আমরা অনেকেই তাঁর চেনাজানা পরিবার থেকে এসেছি, ‘তুমি যোগেন্দ্রের পুত্র, তুমি অনিলের ভাগিনেয়, তুমি ডাক্তারসাহেবের দৌহিত্র’ ইত্যাদি সম্ভাষণে তিনি আমাদের শনাক্ত করলেন৷
ওই প্রথম দিনেই ভি এম স্যার তাঁর দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করতে কোনও দ্বিধা করলেন না৷ আমার পাশে বসে ছিল আমাদেরই পাড়ার জাহেদ, জাহেদদের বাড়ির পেছনের ডোবার ধারে মানকচুর ঝোপ, মাখনের মতো নরম অতি বিখ্যাত সেই মানকচু, সারা শহরে সে কচুর সুনাম৷ তাছাড়া মানকচু নাকি বাতের ওষুধ, ভি এম স্যার পুরনো বাতব্যাধির রোগী, কোমরে ব্যথার জন্যে একটু টেনে টেনে চলতেন৷ তিনি জাহেদকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের বাড়িতে কোনও মানকচু ইহার মধ্যে তোলা হইয়াছে কি?’
সেটা পৌষমাস, জলপাইয়ের ঋতু৷ ভি এম স্যার আমার কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমার কর্তামা জলপাই জারক দিয়াছেন কি?’ অর্থাৎ আমার ঠাকুমা জলপাইয়ের আচার করেছেন কিনা৷
এইরকম সব টুকটাক প্রশ্ন প্রায় সকলকে এবং সবই কোনও দ্রব্যের সন্ধান করার জন্যে৷ পরে বাসায় ফিরে ঠাকুমাকে জলপাইয়ের আচারের কথা বলতে ঠাকুমা বললেন, ‘ওই ভি এম তো? খালি চাওয়া আর চাওয়া৷ কাসুন্দি, আচার, কাগজিলেবু, কলার মোচা তোর বাবার কাছে চাইত, কাকার কাছে চাইত৷ ও লোকটা এখনও আছে?’
আমার ঠাকুমার কথাবার্তা এইরকমই ছিল৷ কিন্তু পরের দিনই সকালে যখন ইস্কুলে যাচ্ছি, আমাকে বললেন, ‘তোদের ভি এম-কে বলিস, রোববার সকালে একটা কাচের বয়াম নিয়ে আসতে৷’
প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসের আরও দুয়েকটা কথা মনে আছে৷ আবার এমনও হতে পারে সবই সেই প্রথম দিনের ঘটনা নয়, আগে-পরে মিলে-মিশে স্মরণে একাকার হয়ে গেছে৷
নাম ডাকা অর্থাৎ রোলকল এবং তৎসহ পরিবার-পরিচয় এবং সম্ভাব্য আদান বিষয়ে কথাবার্তা বলার পরে ভি এম স্যার তাঁর ঢোলা পাঞ্জাবির ঢোলা পকেট থেকে মলিন, অতি জীর্ণ, বহু-ব্যবহৃত দুটো বই বার করলেন৷ একটা গোলাম মোস্তাফার ‘আলোকমঞ্জরী’ আর অন্যটা ওই উপেন্দ্রমোহনের ‘নবনীতিসুধা’৷
বই দুটো দু’হাতে উঁচু করে ধরে পুরো ক্লাসকে জিজ্ঞাসা করলেন ভি এম স্যার, ‘তোমরা বই দুইটি কিনিয়াছ?’
আমরা কয়েকজন কিনেছিলাম৷ বাকিরা পরে কিনবে৷
অনেকে এখনও বই কেনেনি দেখে তিনি যেন একটু খুশি হলেন, বললেন, ‘তোমরা এই সপ্তাহের মধ্যেই বই দুটি খরিদ করিবে৷ খালপাড়ে কাঠের পুলের পাশে বলাই সান্যালের বইয়ের দোকানে আমার নাম বলিবে, টাকায় দুই পয়সা কমিশন পাইবে৷’
বইয়ের দোকানটা অবশ্য বলাই সান্যালের নয়৷ দোকানের মালিক কানাই সান্যাল, অকৃতদার, বিপ্লবী, স্বদেশি৷’ কানাই সান্যাল তখন রাজবন্দী নাকি ইনটার্ন হয়ে গ্রামবন্দী, দোকানটা তাঁর অনুপস্থিতিতে চালাতেন তাঁর ভাইপো বলাই সান্যাল৷
দোকানের নাম ছিল ‘স্বদেশি পুস্তকালয়’, দোকানের বিরাট সাইনবোর্ডে ভারতমাতার ছবি ছিল, উদ্যত ত্রিশূল হাতে ভারতবর্ষের মানচিত্রের ওপর ভারতজননী সামনে এক পা প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে তাঁর মেঘের মতো এলো কালোচুলে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, চোখে আগুন৷
সে বড় ধরাধরি, কড়াকড়ি, টানাপোড়েনের যুগ, আহত ব্রিটিশসিংহ পাগলের মতো আচরণ করছে৷ স্বভাবতই ভি এম স্যার কানাই সান্যাল কিংবা ‘স্বদেশি পুস্তকালয়ের’ উল্লেখ না করে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বলাই সান্যালের কথা বললেন৷
কেউ কেউ বলত, ওই দোকান থেকে বই কিনলে ভি এম স্যার দু-চার পয়সা কমিশন বাবদ পেতেন৷ কিন্তু বোধহয় এটা ছিল বন্ধুকৃত্য৷
ব্যক্তিগত জীবনে কানাই সান্যাল তাঁর সুহৃদ ছিলেন৷ যখন কানাইবাবু জেলে থাকতেন না বা আত্মগোপন করে থাকতেন না, তখন প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় কাছারির মোড়ে বিখ্যাত ‘আইডিয়াল টি স্টলে’র একই কাঠের বেঞ্চির অংশীদার ছিলেন দুজনে৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে অনেক রাতে দুজনে দুদিকে বাড়ি ফিরতেন৷ একেক দিন গল্প করতে করতে একজন আরেকজনের বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন, তারপর অন্যজনের এগিয়ে দেওয়ার পালা, এইভাবে রাত আরও বেড়ে যেত৷ অনেক সময় তাঁরা গলা নামিয়ে নিচু কণ্ঠে কি সব আলোচনা করতেন৷ অনেকের ধারণা ছিল ভি এম স্যারও গোপনে স্বদেশি ছিলেন৷ একসময়ে নাকি খদ্দরের জামাকাপড়ও পরতেন৷
এতদিন পরে আমার মনে হয় কোনওরকম ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, নেহাতই বন্ধুর অনুপস্থিতিতে দোকানের কোনও ক্ষতি যাতে না হয় সেজন্যে তিনি আমাদের ওই দোকান থেকে বই কিনতে বলতেন৷
বছরে কয়েকবার দেশে মানে নোয়াখালিতে যেতেন ভি এম স্যার৷ এমনিতে তাঁর কোনও বিলাসিতা ছিল না, কিন্তু বাড়ি থেকে যখন ফিরতেন একটু রঙিন হয়ে আসতেন৷ তাঁর ছিল একগাল কাঁচাপাকা দাড়ি, কিন্তু বাড়ি থেকে যখন ফিরে আসতেন, দেখা যেত তাঁর দাড়িটা মেহেদি দিয়ে রঙ করা হয়েছে৷ আমাদের শহরের রোদে জলে সেই মেহেদির রঙ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেত৷ যথাসময়ে কাঁচাপাকা দাড়ি বেরিয়ে পড়ত৷ পরে আবার দেশে গিয়ে রঙিন হয়ে আসতেন৷
আমরা যেবার ইস্কুলে ভর্তি হলাম সে বছর ইংরেজি বছরের গোড়াতেই পর পর কয়েকদিন ছুটি, সরস্বতী পুজো, তার আগে ইদ না মহরম কি যেন জুড়ে প্রায় এক সপ্তাহ ইস্কুল বন্ধ৷
ইস্কুল খোলারও দুয়েকদিন পরে ভি এম স্যার ফিরলেন রঙিন দাড়ি নিয়ে৷ যেদিন তিনি ইস্কুলে এলেন, উঁচু ক্লাসের কয়েকটি ছেলে আমাদের ক্লাসঘরে ইস্কুল শুরু হওয়ার আগে ঢুকে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিয়ে গেল,
‘ভি এম স্যারের রঙিন দাড়ি৷’
ভি এম স্যার ক্লাসে এলেন৷ শুধু রঙিন দাড়ি নয়, সাজপোশাকেরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে, এবার পরনে লংক্লথের পাঞ্জাবি, পাজামাটাও নতুন৷ তবে পায়ের বুটজুতো জোড়া অপরিবর্তিত রয়েছে৷
ক্লাসে ঢুকে ব্ল্যাকবোর্ডের লেখাগুলো নজরে পড়তে একটু ভুরু কুঁচকোলেন ভি এম স্যার৷ তারপর কিছুই না বলে ডাস্টার দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডটা পরিষ্কার করে মুছে ফেললেন৷
আজ তাঁর সঙ্গে বই নেই, তিনি সামনের ফার্স্ট বেঞ্চের প্রথম ছেলেটির কাছ থেকে নবনীতিসুধা বার করে পাতা খুলে মাছরাঙা পাখির রঙিন ছবিটা বার করে উঁচু করে ধরলেন, তারপর বললেন, ‘তোমরা কে কে মাছরাঙা পাখি দেখিয়াছ, হাত তোল৷’
অনেকেই হাত তুলল৷ কিন্তু আমি হাত তুলতে সাহস পেলাম না৷ আমাদের বাড়িতে, বাড়ির চারপাশে পুকুরপাড়ে অনেক গাছগাছালি, সেসব গাছে অনেক পাখি, কিন্তু সেসব পাখির নাম জানি না, বিশেষ করে ছবির পাখিটা আমার চেনা নয়৷
আমাকে হাত তুলতে না দেখে ভি এম স্যার বললেন, ‘তোমাদের বাড়ির পাশে অত বড় পুষ্করিণী৷ তুমি মাছরাঙা পাখি দেখ নাই?’
পরের রবিবার সকালে আমাদের বাসায় এসে ভি এম স্যার জলপাইয়ের আচার নিয়ে গেলেন৷ তাঁর মেহেদি-রাঙানো দাড়ির সংবাদ বাড়ির মধ্যেও পৌঁছেছিল৷ অন্দরমহলে তাই নিয়ে একটু হাসাহাসিও হল৷
সে যা হোক, ভি এম স্যার আমাকে পুকুরপাড়ে নিয়ে গেলেন মাছরাঙা পাখি চেনাতে৷ কিন্তু কোনও মাছরাঙা পাখি পুকুরপাড়ে দেখা গেল না৷ অনেক খোঁজাখুঁজির পর ভি এম স্যারের নজরে এল পুকুরের ওপারে একটা তেঁতুলগাছের নিচু ডালে জলের থেকে সামান্য ওপরে একটা মাছরাঙা পাখি ঝিম মেরে নিঃশব্দে বসে রয়েছে৷
সে বছর বৃষ্টি ভাল হয়নি৷ নদীতেও জল কম এসেছিল, বর্ষায় পুকুর-বিল এগুলো মোটেই ভরেনি৷ আর তখন তো শীতকাল, পুকুর মজে গিয়ে প্রায় শুকিয়ে এসেছে৷ ভি এম স্যারের সঙ্গে পায়ে-পায়ে হেঁটে পুকুরের ওপারের দিকে এগোলাম, পাখিটাকে কাছ থেকে দেখতে হবে৷
পাখিটার কাছে পৌঁছানোর আগেই পাখিটা একটা বিদ্যুৎগতি ঝাঁপ দিয়ে জল থেকে একটা মাছ ধরে ওপাশের একটা বড় গাছের উঁচু ডালের আড়ালে গিয়ে বসল৷
মাছরাঙা দর্শন আমার সম্পূর্ণ হল৷ ভি এম স্যার ফিরে গেলেন৷
তখনও মাছরাঙা পাখির পাঠ চলছে৷ পরদিন ক্লাসে মাছরাঙার পাঠ পড়াতে পড়াতে ভি এম স্যার বললেন, ‘মাছরাঙা পাখি জীবন্ত মৎস্য ছাড়া ভক্ষণ করে না৷’
তিনি একটা গল্প বললেন, একবার জেলেরা জাল দিয়ে মাছ ধরছিল, সেই জালের ওপর থেকে ছোঁ দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে একটা মাছরাঙা পাখি জালে আটকিয়ে যায়৷ তিনি সেই পাখিটা জেলেদের কাছ থেকে এক আনা দিয়ে কিনে বাসায় নিয়ে পুষেছিলেন৷ দৈনিক বাজার থেকে ছোট মাছ এনে পাখিটাকে দিতেন৷ কিন্তু সেই পাখিটা ওইসব মাছ খেত না৷ কয়েকদিন পরে পাখিটা মারা যায়৷ তখন তিনি বুঝতে পারেন মাছরাঙা পাখি তাজা মাছ ছাড়া খায় না৷
ভি এম স্যার আমাকে মাছরাঙা পাখি চিনিয়ে দেওয়ার পর আমি যখনই পুকুরপাড় ধরে যেতাম, পাখিটাকে দেখার চেষ্টা করতাম৷ সব সময়ে দেখতে পেতাম তা নয়৷ তাছাড়া মাছরাঙা খুব সতর্ক পাখি, একটু শব্দ হলে, একটু লোকজন দেখলে ফুড়ুৎ করে উড়ে পালায়৷
মাঝে মধ্যে আমাদের উঠোনের নারকেল গাছের ডালে এসে বসত পাখিটা৷ বোধহয় একটাই পাখি ছিল, কারণ একসঙ্গে দুটো পাখি কখনও দেখিনি৷ যখন নারকেলগাছের সতত কম্পমান শাখায় বসে পাখিটা দুলত, আমি বারান্দায় এসে নবনীতিসুধা খুলে রঙিন ছবিটা বের করে পাখিটার সঙ্গে মেলাতাম৷ কেমন যেন মনে হত এ বইতে যে মাছরাঙা পাখির ছবি দেওয়া আছে, আর আমাদের এই মাছরাঙা পাখি, অনেকটা একরকম হলেও ঠিক এক নয়, একটু আলাদা৷
এর মধ্যে একদিন সন্ধ্যাবেলায় হঠাৎ ভি এম স্যার আমার ঠাকুরদার কাছে এলেন৷ ঠাকুরদা ওকালতি করেন, সন্ধ্যাবেলা বাড়ির সামনের দিকে কাছারিঘরে মক্কেলদের নিয়ে বসেছেন৷ সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুমা তুলসীতলায় প্রদীপ দেখাতেন, কাছারিঘরের পিছনেই তুলসীতলা, আমি সে সময় এবং অনেক সময়ই ঠাকুমার কাছে থাকতাম৷ সেই সন্ধ্যায় তুলসীতলা থেকে দেখি ভি এম স্যার কাছারিঘরে ঢুকছেন৷
আমার কেমন আশঙ্কা হল, হয়ত আমার ক্লাসের পড়াশোনায় কোনও গাফিলতির কথা ভি এম স্যার ঠাকুরদাকে বলতে এসেছেন৷
আমি ঠাকুমাকে পুজোর ঘরে পৌঁছে দিয়ে ভি এম স্যার কি বলেন শোনার জন্যে চুপিসারে কাছারিঘরের দরজার একপাশে গিয়ে দাঁড়ালাম৷
অবশ্য তার প্রয়োজন ছিল না, কারণ ঠিক তখনই আমাদের মুহুরিবাবু কাছারিঘর থেকে বাড়ির মধ্যে এলেন ঠাকুমার কাছ থেকে পনেরোটা টাকা নিতে৷ এইরকম অসময়ে ঠাকুরদা কাছারিঘরে টাকা চাওয়ায় ঠাকুমা বললেন, ‘এই রাতের বেলায় এতগুলো টাকা দিয়ে কি হবে?’
মুহুরিবাবু বিচক্ষণ লোক, চাপা গলায় বললেন ‘ভি এম স্যার৷’ ঠাকুমা বললেন, ‘ভি এম? সংসার চালাতে পারে না, বারবার বাড়ি যায় কেন?’ তারপর পনেরোটা টাকা ক্যাশবাক্স খুলে বার করে দিয়ে বললেন, ‘যার যেমন স্বভাব৷’
আসলে ভি এম স্যারের বিষয়ে একটা অকারণ দুর্বলতা ছিল আমার ঠাকুমার৷ তাঁর বাবা ছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার, তিন বছর ছিলেন নোয়াখালিতে৷ ঠাকুমার বাল্যকাল কেটেছে নোয়াখালিতে৷ সেখানে তাঁদের সরকারি বাড়ির সামনে একটা ড্যাফল গাছ ছিল, জীবনে আর কোথাও সে গাছ ঠাকুমা কখনও দেখেননি৷ ভি এম স্যার তাঁকে নোয়াখালির কথা মনে করিয়ে দিত৷
আমি কাছারিঘরের সিঁড়ির ওপরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে, মুহুরিবাবু টাকাটা নিয়ে এসে ভি এম স্যারের হাতে দিলেন, কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তিনি ঠাকুরদার দিকে তাকিয়ে৷
ঠাকুরদার টেবিলে লন্ঠনের আলো জ্বলছে৷ সেই আলোয় ভি এম স্যারের মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি, মুখাবয়বের সিলুয়েট, মাথার সাদা কালো চুল, সহসা, আমার মনে হল ভি এম স্যারকে কেমন যেন অন্যরকম দেখাচ্ছে, এবং তখনই বুঝতে পারলাম ভি এম স্যারকে একদম মাছরাঙা পাখির মতো দেখাচ্ছে, যে পাখির রঙিন ছবি নবনীতিসুধায় রয়েছে৷
এ কোনও গল্প নয়৷
এ গল্পের কোনও মাথামুন্ডু নেই৷ এ এক অলীক স্মৃতিচারণ৷ অল্প কিছুটা সত্যি, কতটা, তা আমি নিজেও জানি না৷ জানতেও চাই না৷ যা আছে মনে মনেই থাকুক, কাগজ-কলমে লিখে একটু বেকায়দা হয়ে যাচ্ছে৷
তবে আরও একটু বেকায়দা আছে৷ সেই যে ভি এম স্যার বলেছিলেন, মাছরাঙা পাখি মরা মাছ খায় না, সে কথাটা সত্যি নয়৷
মরা মাছের কথা জানি না, মরা মানুষের কথা বলি৷
‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ’, শীতের শেষাশেষি আমাদের ও প্রান্তে একটা বড় বৃষ্টি হত, সে বছর সেই বৃষ্টিও হল না৷ চৈত্রমাস আসতে না আসতে নদীনালা, খালবিল সব শুকিয়ে গেল, আমাদের বাড়ির সামনের পুকুর শুকিয়ে বুক ফেটে চৌচির হয়ে গেল৷
তখন একটা-দুটো লঙ্গরখানায় পোষাবে না, হাজার হাজার লঙ্গরখানা দরকার৷ কেউ ধান চাইছে না, চাল চাইছে না, ভাত চাইছে না, শুধু ‘ফ্যান দাও, ফ্যান দাও৷’
ফ্যানই বা কে দেবে, চাল না ফোটালে তো ফ্যান পাওয়া যাবে না৷ সেই চাল কার ঘরে আছে?
মফসসলের নিস্তব্ধ আকাশ চঞ্চল করে উড়ে যাচ্ছে বোমারু বিমান, গোপন এরিয়েলে বর্মা সীমান্ত থেকে ভেসে আসছে নেতাজির মন্দ্র কণ্ঠস্বর, কালীবাড়ি আর মসজিদের সামনের রাস্তায় এত মড়া পড়ে থাকছে যে কালুডোম আর সামাল দিয়ে উঠতে পারছে না৷
পুকুর শুকিয়ে যাওয়ার পরে বহুদিন মাছরাঙা পাখিটাকে দেখিনি৷
মহা মন্বন্তরের চরম দিনে সেদিন একের পর এক মৃতদেহ পড়ে আছে কালীবাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তায়, ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না কোনটা মসজিদের মড়া আর কোনটা কালীবাড়ির মড়া৷
কোনও রকমে মড়া এড়িয়ে ইস্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম, হঠাৎ দেখলাম সেই মাছরাঙা পাখিটাকে৷ পাখিটা মরা মানুষ ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে৷
পরের দিন ইস্কুলে ভি এম স্যারকে এ কথা বললাম৷ তিনি বললেন, ‘হইতে পারে, সর্ব বিষয়ে সর্ব কিছু আমরা জানি না৷’ তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আকালের সময় অনেক কিছু ঘটে৷ তাহার সব ঠিক নহে৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন